একবিংশ শতাব্দীর রাষ্ট্রব্যবস্থা

গণতন্ত্র রক্ষা আর প্রাতিষ্ঠানিক বা নির্বাচনী সংস্কারে সীমাবদ্ধ নয়; ডিজিটাল অধিকারেরও প্রশ্ন

ডিজিটাল কর্তৃত্ববাদের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো এর অদৃশ্য ও নরম প্রকৃতি। এখানে রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করা বা সংবাদপত্র বন্ধ করার প্রয়োজন হয় না, বরং নির্বাচনী ব্যবস্থা, সাংবিধানিক কাঠামো এবং আনুষ্ঠানিক গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান বজায় রেখেই এমন একটি নিয়ন্ত্রণ কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব, যেখানে নাগরিকরা আইনগতভাবে স্বাধীন থাকলেও বাস্তবে তাদের মতপ্রকাশ, সংগঠন এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ক্রমে সংকুচিত হয়ে আসে

একবিংশ শতাব্দীতে রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রকৃতি অতীতের যেকোনো ঐতিহাসিক আগের তুলনায় অনেক জটিল, বহুমাত্রিক ও প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠেছে। অতীতে স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল সামরিক অভ্যুত্থান, প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক দমন-পীড়ন এবং রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যমের একচেটিয়া আধিপত্য। কিন্তু সমকালীন বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ক্ষমতা প্রয়োগের রূপান্তর ঘটেছে একটি ‘হার্ড-ফোর্স’ ভিত্তিক কাঠামো থেকে ‘ডেটা-ভিত্তিক এবং অ্যালগরিদমিক শাসন ব্যবস্থার’ দিকে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিগ ডেটা বিশ্লেষণ, অ্যালগরিদমিক সিদ্ধান্ত নেয়া এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নির্ভর তথ্য ব্যবস্থা কর্তৃত্ববাদের জন্য নতুন ধরনের সূক্ষ্ম, বিস্তৃত এবং অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো তৈরি করেছে। এ নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতাকে সমসাময়িক গবেষণায় ‘ডিজিটাল কর্তৃত্ববাদ’ (ডিজিটাল অথরিটারিয়ানিজম) হিসেবে অভিহিত করা হয়।

ডিজিটাল কর্তৃত্ববাদের কেন্দ্রীয় বৈশিষ্ট্য হলো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা এখন আর শুধু বলপ্রয়োগ বা আইনি-প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতার মাধ্যমে পরিচালিত হয় না; বরং এটি তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ, নাগরিক আচরণগত ডেটা বিশ্লেষণ এবং ডিজিটাল অবকাঠামোর ওপর কৌশলগত আধিপত্যের মাধ্যমে ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত আচরণকে নিয়ন্ত্রিত করে। এর ফলে ক্ষমতার প্রকৃতি দৃশ্যমানতা থেকে সরে গিয়ে অদৃশ্যতা, পূর্বাভাসযোগ্যতা এবং অ্যালগরিদমিক নিয়ন্ত্রণের দিকে অগ্রসর হয়েছে।

একসময় ব্যাপকভাবে ধারণা করা হতো যে ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম স্বাভাবিকভাবেই গণতন্ত্রায়নের অনুঘটক হিসেবে কাজ করবে। আরব বসন্ত সেই ধারণাকে আরো শক্তিশালী করেছিল। কিন্তু পরবর্তী এক দশকের অভিজ্ঞতা এ প্রযুক্তিনির্ভর আশাবাদকে গভীরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। প্রযুক্তি নিজে গণতান্ত্রিক বা কর্তৃত্ববাদী নয়; বরং এর রাজনৈতিক ফল নির্ধারিত হয় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কাঠামো, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং প্রযুক্তির ব্যবহারের উদ্দেশ্য দ্বারা।

সমসাময়িক বৈশ্বিক অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, ডিজিটাল নজরদারি ও তথ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোয়ও ক্রমে বিস্তৃত হচ্ছে। ইউরোপীয় প্রেক্ষাপটে সন্ত্রাসবিরোধী আইন ও জাতীয় নিরাপত্তা নীতির আওতায় ব্যাপক অনলাইন পর্যবেক্ষণ, মেটাডেটা সংগ্রহ এবং সিসিটিভি-নির্ভর নগর নজরদারি কাঠামো গড়ে উঠেছে। যুক্তরাজ্যের ক্ষেত্রে ডিজিটাল যোগাযোগ পর্যবেক্ষণ ও অনলাইন বিষয়বস্তু নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চলমান রাজনৈতিক বিতর্কে নিরাপত্তা ও নাগরিক স্বাধীনতার মধ্যে একটি স্থায়ী টানাপড়েন পরিলক্ষিত হয়।

অন্যদিকে কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা কেলেঙ্কারি আধুনিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অভ্যন্তরে ডেটা-ভিত্তিক রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের গভীর সংকটকে উন্মোচন করেছে। একইভাবে ফেসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্লাটফর্মগুলো রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন, ব্যবহারকারীর আচরণগত তথ্য এবং অ্যালগরিদমিক ফিড কাঠামোর মাধ্যমে জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এর ফলে গণতান্ত্রিক জনপরিসরে এক নতুন ধরনের ‘ডিজিটাল মধ্যস্থতা’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্যই রাজনৈতিক ক্ষমতা পুনর্বণ্টনের অন্যতম প্রধান উপাদানে পরিণত হয়েছে।

চীনের ক্ষেত্রে ডিজিটাল কর্তৃত্ববাদের সর্বাধিক সুসংহত ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পরিলক্ষিত হয়, যেখানে রাষ্ট্রীয় পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা, অ্যালগরিদমিক শাসন এবং বিস্তৃত ইন্টারনেট সেন্সরশিপ একত্রে একটি কেন্দ্রীভূত নিয়ন্ত্রণ কাঠামো গঠন করেছে। তথাকথিত ‘মহা প্রাচীর ইন্টারনেট’ ব্যবস্থা তথ্যপ্রবাহকে রাষ্ট্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত করে একটি স্বতন্ত্র ডিজিটাল সার্বভৌমত্বের কাঠামো তৈরি করেছে, যা প্রযুক্তির মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সর্বাত্মক কেন্দ্রীকরণকে নির্দেশ করে।

দক্ষিণ এশিয়ার অভিজ্ঞতা এ প্রযুক্তি-ক্ষমতা সম্পর্কের দ্বৈত প্রকৃতিকে আরো স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। ভারত, বাংলাদেশ, শ্রীলংকা এবং নেপালের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক আন্দোলনগুলো প্রমাণ করে যে ডিজিটাল প্রযুক্তি একদিকে যেমন গণআন্দোলনের সংগঠন, বিস্তার এবং সমন্বয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে, অন্যদিকে রাষ্ট্র একই প্রযুক্তিকে ব্যবহার করেছে রাজনৈতিক বিরোধিতা নিয়ন্ত্রণ, তথ্যপ্রবাহ সীমিতকরণ এবং নজরদারি সম্প্রসারণের জন্য।

এশিয়ার বৃহত্তম গণতন্ত্র ভারতের অভিজ্ঞতা এ দ্বৈততার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। একদিকে ডিজিটাল ভারত কর্মসূচি, বায়োমেট্রিক পরিচয় ব্যবস্থা এবং অনলাইন প্রশাসনিক সেবার সম্প্রসারণ রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা ও প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি করেছে; অন্যদিকে ইন্টারনেট বন্ধ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পর্যবেক্ষণ এবং বিশেষ করে সংবেদনশীল অঞ্চলগুলোয় দীর্ঘমেয়াদি নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্নতার ঘটনা ডিজিটাল অবকাঠামোর রাজনৈতিক ব্যবহার নিয়ে গভীর প্রশ্ন তৈরি করেছে। ফলে ভারতের প্রেক্ষাপটে প্রযুক্তি একই সঙ্গে উন্নয়ন, অন্তর্ভুক্তি, নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারির একটি দ্বৈত কাঠামো হিসেবে কাজ করছে।

বাংলাদেশে ২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলন, পরবর্তী কোটা সংস্কার আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান ডিজিটাল যোগাযোগনির্ভর রাজনৈতিক সংগঠনের শক্তি ও সীমাবদ্ধতাকে একসঙ্গে প্রকাশ করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল প্লাটফর্মগুলো বিকল্প জনপরিসর তৈরি করে আন্দোলনের দ্রুত বিস্তারে সহায়তা করলেও একই সময়ে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ইন্টারনেট গতি সীমিতকরণ, প্লাটফর্ম নিয়ন্ত্রণ এবং অনলাইন নজরদারির সম্প্রসারণের ঘটনাও ঘটেছে। ফলে ডিজিটাল পরিসর এখানে একদিকে প্রতিরোধের অবকাঠামো, অন্যদিকে নিয়ন্ত্রণের প্রযুক্তিগত ক্ষেত্র হিসেবে দ্বৈত ভূমিকা পালন করছে।

শ্রীলঙ্কার ২০২২ সালের ‘আরাগালায়া’ আন্দোলন এ দ্বৈত বাস্তবতার আরেকটি সুস্পষ্ট উদাহরণ। গভীর অর্থনৈতিক সংকটের প্রেক্ষাপটে ডিজিটাল যোগাযোগের মাধ্যমে সংগঠিত এ আন্দোলন রাজনৈতিক পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। তবে আন্দোলন তীব্রতর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্র ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রাম এবং হোয়াটসঅ্যাপসহ বিভিন্ন ডিজিটাল প্লাটফর্ম সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়, যা প্রমাণ করে যে ডিজিটাল অবকাঠামো একই সঙ্গে রাজনৈতিক আন্দোলন এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ উভয়েরই মাধ্যম।

নেপালের ক্ষেত্রেও ডিজিটাল প্রযুক্তি রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও আন্দোলন সংগঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ, অনলাইন বিষয়বস্তু পর্যবেক্ষণ এবং নতুন নিয়ন্ত্রক কাঠামোর সম্প্রসারণ নাগরিক স্বাধীনতার ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করেছে। ফলে গণতান্ত্রিক উত্তরণের অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও দেশটি ডিজিটাল কর্তৃত্ববাদের উদীয়মান প্রবণতা থেকে সম্পূর্ণভাবে মুক্ত নয়।

এ আঞ্চলিক অভিজ্ঞতাগুলোর ভিত্তিতে বলা যায়, ডিজিটাল কর্তৃত্ববাদ প্রধানত তিনটি আন্তঃসম্পর্কিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিকশিত হচ্ছে: (ক) ডিজিটাল অবকাঠামোর উপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের ক্রমবর্ধমান বিস্তার, (খ) তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণের জন্য ইন্টারনেট শাটডাউন, বিষয়বস্তু অপসারণ ও নজরদারি ব্যবস্থার সম্প্রসারণ এবং (গ) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংগঠিত বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা, ট্রল নেটওয়ার্ক এবং অ্যালগরিদমিক প্রভাবের মাধ্যমে জনমত নির্মাণ ও বিকৃতি।

এর ফলস্বরূপ গণতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে গভীর চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে কেবল দৃশ্যমান দমন-পীড়ন নয়, বরং জনপরিসরের ধীরে ধীরে ক্ষয়। তথ্যের সত্যতা ও মিথ্যার মধ্যে সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে পড়া, রাজনৈতিক মেরুকরণের তীব্রতা বৃদ্ধি এবং সামাজিক আস্থার অবক্ষয় গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতাকে ক্রমে দুর্বল করে তুলছে।

ডিজিটাল কর্তৃত্ববাদের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো এর অদৃশ্য ও নরম প্রকৃতি। এখানে রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করা বা সংবাদপত্র বন্ধ করার প্রয়োজন হয় না, বরং নির্বাচনী ব্যবস্থা, সাংবিধানিক কাঠামো এবং আনুষ্ঠানিক গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান বজায় রেখেই এমন একটি নিয়ন্ত্রণ কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব, যেখানে নাগরিকরা আইনগতভাবে স্বাধীন থাকলেও বাস্তবে তাদের মতপ্রকাশ, সংগঠন এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ক্রমে সংকুচিত হয়ে আসে। এ কারণেই একে ‘কর্তৃত্ববাদের সফটওয়্যার সংস্করণ’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়।

একবিংশ শতাব্দীতে গণতন্ত্র রক্ষার প্রশ্ন কেবল প্রাতিষ্ঠানিক বা নির্বাচনী সংস্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি ক্রমশ ডিজিটাল অধিকারের প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, তথ্যপ্রবাহের স্বাধীনতা এবং ডিজিটাল প্লাটফর্মের জবাবদিহিতা নিশ্চিত না করা গেলে গণতন্ত্রের কাঠামো বহাল থাকলেও তার কার্যকর প্রাণশক্তি ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হবে।

সাম্প্রতিক ঘটনা প্রবাহ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে কর্তৃত্ববাদ সবসময় দৃশ্যমান সহিংসতার মাধ্যমে আবির্ভূত হয় না; অনেক সময় এটি ডেটা, অ্যালগরিদম এবং নেটওয়ার্ক অবকাঠামোর নীরব অথচ কার্যকর নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়। তাই একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রশ্ন হলো, ডিজিটাল প্রযুক্তি কি নাগরিক স্বাধীনতাকে প্রসারিত করবে, নাকি নিয়ন্ত্রণের আরো সূক্ষ্ম ও দক্ষ হাতিয়ারে পরিণত হবে? এ প্রশ্নের উত্তরই ভবিষ্যতের গণতন্ত্রের গতিপথ নির্ধারণ করবে।

মো. আল আমিন: সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় এবং পিএইচডি গবেষক, ইউনিভার্সিটি অব কেন্টাকি, যুক্তরাষ্ট্র

আরও