বাংলা ভাষায় প্রাচীন পারস্য তথা বর্তমান ইরানের নববর্ষ উৎসব নওরোজ
নিয়ে আলোচনা করতে গেলেই মনে পড়ে যায় আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘নওরোজ’ কবিতার
কথা।
রূপের সওদা কে করিবি তোরা আয় রে আয়,
নওরোজের এই মেলায়!
ডামাডোল আজি চাঁদের
হাট
লুট হল রূপ হল লোপাট!
খুলে ফেলে লাজ শরম-ঠাট
রূপসিরা সব রূপ
বিলায়
বিনি-কিম্মতে হাসি-ইঙ্গিতে
হেলাফেলায়
নওরোজের এই মেলায়!
কবি হয়েও তিনি তার এ কবিতায় নওরোজের সৌন্দর্য যেন চিত্রশিল্পীর ন্যায়
চিত্রিত করেছেন। ‘নওরোজ’ ফারসি শব্দ যার অর্থ নতুন দিন এবং এটি আবেস্তা ভাষার শব্দ
থেকে নেয়া হয়েছে। নওরোজ মূলত দুটি শব্দ নও (নতুন) আর রোজ (দিন) এর মিলিত রূপ। ইরানের
সবচেয়ে প্রাচীন ও বড় জাতীয় উৎসব। ইরানি উৎসবগুলোর মধ্যে
সবচেয়ে আড়ম্বরপূর্ণ জনপ্রিয় একটি উৎসব। যা ইরানি সৌরবর্ষের প্রথম মাস ফারভারদিন
ও ঋতুরাজ বসন্তের প্রথম দিন, সাধারণত ২০ অথবা ২১ মার্চ সূর্য উদয়ের
মাধ্যমে যার উদযাপন শুরু হয়। উৎসবটি ইরান ছাড়াও তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তান, আজারবাইজান,
আর্মেনিয়া, ইরাক, সিরিয়া, রাশিয়াসহ বিশ্বের যে স্থানে ইরানিরা রয়েছেন সেখানেই উদযাপিত
হয়। নওরোজকে ইউনেস্কো বিশ্ব মানবতার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও আধ্যাত্মিক উপাদান হিসেবে
অন্তর্ভুক্ত করেছে এবং জাতিসংঘ ২০ অথবা ২১ মার্চ অর্থাৎ নববর্ষের প্রথমদিনকে ‘আন্তর্জাতিক
নওরোজ দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। যারদুশত ও বাহায়ান ধর্মমতের অনুসারীদের কাছেও এটি
একটি পবিত্র দিন ও ধর্মীয় উৎসব হিসেবে বিবেচিত। পৌরাণিক কাহিনী অনুযায়ী বাদশাহ জামশিদের
সময়ে নওরোজ উৎসবের প্রচলন হয় বলে বিবেচনা করা হয়। ইরানের বিখ্যাত কবি ও লেখকরা যেমন
হাকিম আবুল কাসেম ফেরদৌসী, আবু রায়হান বিরুনী এবং তাবারিও জামশিদকে নওরোজের প্রচলনকারী
হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। ইরানিরা চাহার শাম্বে সুরি (বছরের শেষ বুধবার) উৎসবের মাধ্যমে নওরোজকে
স্বাগত জানায়। ‘চাহার শাম্বে সুরির’ মাধ্যমেই নওরোজের মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। ‘চাহার
শাম্বে সুরির’ রেওয়াজ অনুযায়ী আগুন জ্বালানো, ঐ আগুনের ওপর দিয়ে লাফ দেয়া এবং আতশবাজি
ফোটানো হয়। নতুন বছরে পদার্পণের সময় মানুষ নতুন পোশাক-পরিচ্ছদ কেনাকাটা ও পরিধান করেন
এবং সোফরেয়ে হাফত সিনের পাশে বসেন ও দোয়া পাঠ করেন। সচরাচর এই সোফরের (দস্তরখান) ওপর কোরআন,
আয়না, সেক্কে বা পয়সা, পানি, রুটি, অ্যাকুরিয়ামে ছোট ছোট সোনালী মাছ ও ডিম ছাড়াও হাফত
সিন অর্থাৎ সাতটি জিনিস রাখা হয় যেগুলোর প্রথম অক্ষর আরবি বা ফারসি বর্ণমালার (সিন
س) অক্ষর দিয়ে শুরু হয়। সাবজে: গম থেকে
অঙ্কুরিত সবুজ উদ্ভিদ যা নব জীবনের প্রতীক। সেরকে: সিরকা ধৈর্য ও প্রাচীনত্বের প্রতীক।
সোমাক: মসলা বিশেষ যা সূর্য ওঠার পূর্বের লালাভ ও অন্ধকারে আলোর প্রতীক। সামানু: মিষ্টান্নবিশেষ
যা গম থেকে তৈরি হয়, জীবনের সুন্দর মূহুর্তের প্রতীক। সেনজেদ: তুঁতের মতো ফলবিশেষ যাকে
প্রেমের প্রতীক বলা হয়। সীব: লাল আপেল যা সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। সীর:
রসুন যেটি সুস্থতার প্রতীক। নওরোজের নানাবিধ রীতিনীতির অংশ হিসেবে এ উৎসব কেন্দ্র
করে মানুষ তাদের ঘরবাড়ি ও সকল আসবাবপত্র পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে থাকে, একে অপরের সঙ্গে
সাক্ষাৎ করে, দরিদ্র মানুষদের সাহায্য করাসহ বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয় স্বজনদের সঙ্গে
মিলিত হন। বেশিরভাগ সময় ছোটরা বড়দের হাত চুম্বন করে ও বড়রা ছোটদের ও কাছের লোকদের সালামি
দিয়ে থাকে। নওরোজের এ সময় ইরানের স্কুল, কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি-বেসরকারি অফিস
আদালতে ১০ বা ১৫ দিনের জাতীয় ছুটি থাকে। এই দীর্ঘ ছুটিতে মানুষজন তাদের নিজ জন্মস্থান
অথবা অন্যান্য দর্শনীয় জায়গাগুলোয় ভ্রমণের উদ্দেশ্যে বের হন। ফারভারদিন মাসের তেরোতম
দিন (সিজদেহ বে দার) নওরোজ ঈদের শেষ দিন। ওই দিন মানুষ বাড়ির বাইরে অবস্থান করেন এবং
তাদের সময়গুলো বসন্তের নব পত্রপল্লবের সাজে সজ্জিত প্রকৃতির মাঝে খোলা জায়গা, বাগান
ও পার্কগুলোয় কাটান।
সুজন পারভেজ: শিক্ষার্থী,
ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।