খাদ্যের বাজার

সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় স্বয়ংক্রিয়তা, স্বচ্ছতা ও তথ্য সংগ্রহ খুবই গুরুত্বপূর্ণ

স্বপ্ন থেকে আমরা নিজেদের প্রয়োজনেই ভোক্তা আস্থা সূচক (সিসিআই) পরিমাপ করি। জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত এ সূচক বেশ খারাপ অবস্থায় ছিল। এটা ৩১ দশমিক ২-এ নেমে এসেছিল।

স্বপ্ন থেকে আমরা নিজেদের প্রয়োজনেই ভোক্তা আস্থা সূচক (সিসিআই) পরিমাপ করি। জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত এ সূচক বেশ খারাপ অবস্থায় ছিল। এটা ৩১ দশমিক ২-এ নেমে এসেছিল। অর্থাৎ জাতীয় অর্থনীতির প্রতি ভোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল নিরুৎসাহ ও হতাশাজনক। অথচ গত মার্চেও সিসিআই ছিল ৪২ দশমিক ৭। তবে বর্তমানে এর উন্নতি হয়েছে এবং এটা হয়তো নিরপেক্ষ অবস্থানে আছে। প্রত্যাশা রয়েছে, অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ে তোলা হলে সামনে এটি আরো বাড়বে। ভবিষ্যতের বাংলাদেশ নিয়ে আমার দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক।

বর্তমানে ৬৪টি জেলায় আমাদের স্বপ্নের ৬৩৭টি স্টোর আছে। মাসে প্রায় ২১ লাখ পরিবারকে সেবা দিচ্ছি। আমরা ২৫টি পয়েন্টের মাধ্যমে সারা দেশ থেকে বিভিন্ন পণ্য সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে গ্রহণ করি। এর ৫৪ দশমিক ৫ শতাংশ সবজি এবং ২৮ দশমিক ২ শতাংশ মাছ সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে গ্রহণ করি। তাদের কাছ থেকে সরাসরি পণ্য নেয়ার যাত্রা আমাদের ১২ বছর। সেখানে আমি দেখেছি, মাঠ পর্যায়ের অনেক ইস্যু রয়েছে যেগুলো অনেক সময় জানা যায়় না। সুতরাং সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় স্বয়ংক্রিয়তা, স্বচ্ছতা ও তথ্য সংগ্রহ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের খাদ্যের জন্য রিয়েল টাইম অনলাইন ডাটাবেজ তৈরি হয় এবং সেটিতে যদি সবাই প্রবেশাধিকার পান তাহলে খুবই ভালো হবে। এর জন্য আধুনিক ব্যবসার অবশ্যই প্রসার ঘটাতে হবে। বর্তমানে দেশে আধুনিক ব্যবসার অবদান ২ শতাংশ আর পার্শ্ববর্তী দেশে এটি ৯-১০ শতাংশ। আমাদের একটি লক্ষ্যমাত্রা থাকতে হবে—আগামী পাঁচ বছরে কী কী পলিসি গ্রহণ করে এটি ৯-১০ শতাংশে উন্নীত করা যায়।

বাংলাদেশে ধান উৎপাদন হচ্ছে প্রতি হেক্টরে গড়ে ৪ দশমিক ৭৪ টন, যা চীনে ৭ দশমিক ১ ও ভিয়েতনামে ৬ দশমিক ২ টন। বাংলাদেশে উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ আছে। উৎপাদন-পরবর্তী আমাদের ক্ষতি ১৩-১৪ শতাংশ। চীনে সেটি ৫ শতাংশের নিচে এবং ভিয়েতনামে ৫-৬ শতাংশ। উৎপাদন-পরবর্তী ক্ষতির একটি অংশ হচ্ছে চাষাবাদ। চাষাবাদ যান্ত্রিকীকরণ হলে ক্ষতি ৪-৫ শতাংশ কমানো সম্ভব। যান্ত্রিকীকরণ চাষাবাদ প্রক্রিয়া সারা দেশে বিকেন্দ্রীকরণ করা হলে একটি ভালো সমাধান হতে পারে। দ্বিতীয়ত, আমরা সবসময় মজুদের কথা বলি। সরকারি খাতে আমার জানামতে, মজুদের হার একটু কম। তবে বেসরকারি খাতে মজুদের হার বেশি। যেহেতু ধানের মজুদ বেসরকারি খাতে বেশি হয়, তাই দাম অস্থিতিশীল হয় এবং মূল্যস্ফীতিকে প্রভাবিত করে।

ধান বা চালের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রিত, স্বচ্ছ ও রাজনীতিমুক্ত ন্যাশনাল বাফার পলিসি তৈরি একটি ভালো সমাধান হতে পারে। পাশাপাশি জলবায়ু সহনশীল হাইব্রিড ভ্যারাইটিগুলোর ব্যবহার বাড়াতে হবে।

খাদ্যের মধ্যে ভোজ্যতেলও খুব গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। আমার কাছে তথ্য আছে, জনপ্রতি পুষ্টি ভোজ্যতেল কত শতাংশ মানুষ গ্রহণ করছেন। বাংলাদেশের ফুড ডায়েটারি গাইডলাইন অনুযায়ী, দিনে জনপ্রতি ভোজ্যতেল গ্রহণ করা হয় ৩০ দশমিক ৯ গ্রাম, যদিও তা গ্রহণের কথা ৩০ গ্রাম। এর অর্থ হলো, আমরা ভোজ্যতেল অনেক বেশি গ্রহণ করি।

ভোজ্যতেল এত ব্যবহার না করে মানসম্পন্ন তেল ব্যবহার করতে পারি, যেমন রাইস ব্র্যান, ক্যানোলা, সানফ্লাওয়ার ও মাস্টার্ড তেলের ব্যবহার বাড়াতে হবে। এজন্য ভোক্তা পর্যায়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। এটি জাতীয় পর্যায় ও সরকারি পর্যায় থেকে উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। বেসরকারি খাতের পক্ষে ভোক্তাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।

আমাদের জানামতে, এখন পর্যন্ত উপজেলা পর্যায়ে একজন বা দুজন পশুচিকিৎসক থাকেন। প্রতি উপজেলায় ১০-১২ জন এবং প্রতি ইউনিয়নে একজন করে পশুচিকিৎসক দেয়া গেলে গবাদিপশুর রোগবালাই নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা যেত। পশুচিকিৎসক নন এমন ব্যক্তিরা অনেক অননুমোদিত ড্রাগস ব্যবহারের পরামর্শ দেন। কাজী ফার্ম ব্যতীত অনানুষ্ঠানিক খাতে প্রসেসিং এবং স্লটারিং পোলট্রি পর্যায়ে স্লটারিংয়ের আগে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়, যা অনেক বেশি বিপজ্জনক। তাই এখানেও মেকানাইজেশন ও মডার্নাইজেশনের বিকল্প নেই।

মাছ নিয়ে আমাদের আরো অনেক কাজ করার সুযোগ আছে। আমাদের হিসাবে ৫৮ শতাংশ পোস্ট-সার্ভিস লস হয় এখানে। লো ভ্যালু এক্সপোর্ট যা হয়, এখানে অনেক হাই ভ্যালু অ্যাডিশন করা সম্ভব। আমাদের পাঙাশ মাছগুলো ইয়েলোইশ হয়। এটা একটু হোয়াইটিশ করতে হবে। তেলাপিয়ায় গন্ধ পাওয়া যায়। সেখানে বটম ক্লিন করা হলে ভালো হয়। আমরা মাছে ইন্টেলিজেন্ট ফার্মিংয়ের চিন্তাভাবনা করছি। এর মাধ্যমে রফতানি উপযোগী মাছ উৎপাদন করা সম্ভব। এক্ষেত্রে ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড মডেল অনুসরণের মাধ্যমে রফতানি হলে ভালো কিছু করা সম্ভব। মাছ রফতানির জন্য বাংলাদেশের ব্র্যান্ডিং নতুন করে সাজাতে হবে। চিংড়িতে আমাদের অভিজ্ঞতা এত বেশি ভালো নয়; আমরা খুব খারাপ করছি। শুধু প্রোডাক্টিভিটি, লজিস্টিকস ও ট্রেসেবিলিটিকে চিহ্নিত করে ভর্তুকি দেয়া উচিত। রিয়েল টাইম ডিজিটাল ফুড অবজারভেটরি যদি আমরা তৈরি করতে পারি যেখানে সরকার, প্রক্রিয়াকরণে সম্পৃক্ত, উৎপাদনকারী ও বিক্রেতা একসঙ্গে কাজ করতে পারি তাহলে একটি টেকসই ফুড ভ্যালু চেইন এবং ফুড সাপ্লাই সিস্টেম উন্নয়ন করা সম্ভব।

সাব্বির হাসান নাসির: ব্যবস্থাপনা পরিচালক

এসিআই লজিস্টিকস লি. (স্বপ্ন)

[বণিক বার্তা আয়োজিত কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা ও প্রাণ-প্রকৃতি সম্মেলনের ‘খাদ্যের বাজার, সরবরাহ ও দেশজ সক্ষমতা’ বিষয়ক অধিবেশনে প্যানেল আলোচকের বক্তব্যে]

আরও