রাজধানীর কারওয়ান বাজারে চলন্ত পথে এক বৃদ্ধা আমাকে ডেকে দাঁড় করালেন। কাঁধের মলিন ব্যাগ থেকে এক মুঠো জমানো ‘সম্পদ’ বের করে হাতে দিলেন—দুই, পাঁচ টাকার কিছু কয়েন আর কয়েকটা কাগুজে নোট। বললেন, ‘দেখ তো বাবা এইহানে কয় ট্যাকা আছে?’ ডান থেকে বাঁ হাতে একটা একটা করে কয়েন চালান করে এবং এলোমেলো নোটগুলো ভাঁজ করে গুনে বললাম—৩৮ টাকা। পাল্টা প্রশ্ন রেখে তিনি বললেন, ‘এক কেজি চাউল কিনতে আর কয় ট্যাকা লাগব?’ বৃদ্ধাকে সব হিসাব বুঝিয়ে দিয়ে আবার ছুটতে শুরু করলাম। আমিও তো নিজের হিসাব মেলাতে বেরিয়েছি। ঘড়ির কাঁটায় চোখ রেখে নিত্য এ পথচলা।
নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম লাগামহীন। কিছু পণ্য তো রীতিমতো রেকর্ড গড়ে বসে আছে, যা নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জীবনকে করে তুলছে কঠিন। ঝাঁজ বেড়েছে পেঁয়াজের। আদায় লেগেছে আগুন। চিনিতে মজুদ সংকট দেখিয়ে চলছে যাচ্ছেতাই। হঠাৎই ব্রয়লার মুরগির দাম কেজিতে বেড়েছে ২০-৩০ টাকা। অনেক পণ্যের ক্ষেত্রে দ্বিগুণের বেশি দাম বাড়তেও দেখা গেছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অনেকেই আবার বলে থাকেন, যেকোনো খাবারের দাম বেড়ে গেলে সেটি খাওয়া বন্ধ করে দেয়াই মুশকিল আসান, চড়া দাম নেমে আসবে তরতরিয়ে! তবে ক্ষুধার্ত বাঙালির কি আর সেই সূত্র মেনে চললে পেট ভরবে? দিন এনে দিন খাওয়া মানুষরা তো বটেই, অধিকাংশ সাধারণ মধ্যবিত্তের হিসেবি জীবনেও অল্পবিস্তর ছন্দপতন। অর্থাৎ উচ্চবিত্ত ও উচ্চমধ্যবিত্ত ছাড়া প্রায় সবাই টিকে থাকতে লড়ে যাচ্ছেন।
রাজধানীর ইস্কাটনে সম্প্রতি ফল কিনতে গিয়ে হেনস্তার শিকার হন এক বৃদ্ধ। পাশের এসপিআরসি অ্যান্ড নিউরোলজি হসপিটালে ভর্তি ছিলেন তার স্বজন। মূলত ওই রোগীর জন্যই দুটি আপেল কিনতে গিয়েছিলেন। দোকানদার কেঁকিয়ে উঠে বললেন, এক কেজির নিচে কোনো খুচরা ফল বিক্রি করেন না। বৃদ্ধের আকুতি, তার কাছে এক কেজি আপেল কেনার মতো টাকা নেই। তবু দোকানদারের ওই এক কথা। উল্টো বুড়ো মানুষটির সঙ্গে বিশ্রী আচরণ শুরু করেন। তখন দুয়েকজন যুবক প্রশ্ন রাখেন—কোথায় এমন নিয়ম রয়েছে একটি বা দুটি আপেল বিক্রি করা যাবে না? কেউ কেউ মারমুখী হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে দোকানদার শেষ পর্যন্ত দুটো আপেল বিক্রি করতে বাধ্য হন।
আসলে কিছু মানুষের অপরিমিত ভোগ তত্ত্বের কারণেই বিক্রেতারা এখন আর অল্প পণ্য বিক্রি করতে চান না। পরিবারের দুই-তিনজন সদস্যের জন্য আমার দরকার আড়াইশ গ্রাম মাংস, কিন্তু চাপে পড়ে কিনতে হচ্ছে এক কেজি। অল্প চাইলে উল্টো অপমান হতে হচ্ছে দোকানির কাছে।
বৈশ্বিক ভোগ্যপণ্যের বাজারে মূল্যের অস্থিতিশীলতার কারণে আমদানীকৃত পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না বলে দাবি করেছেন ব্যবসায়ীরা। এজন্য কভিডের প্রাদুর্ভাব থেকে শুরু করে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অভিঘাত, বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনের ব্যাঘাতসহ নানাবিধ কারণকে দায়ী করা হয়েছে। যদিও গত কয়েক মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি থেকে শুরু করে অধিকাংশ পণ্যের দাম অব্যাহত হারে কমেছে। কোনো কোনো পণ্যের দাম এরই মধ্যে প্রাক-কভিড পর্যায়ে নেমে এসেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের মূল্য ক্রমেই কমতে থাকায় বিশ্বের প্রায় সব দেশেই মূল্যস্ফীতির চিত্রে দেখা গেছে বড় পরিবর্তন। দেশের বাজারে অবশ্য পুরোপুরি বিপরীত চিত্র। ভোগ্যপণ্যসহ সব পণ্যের দাম এখনো অস্থিতিশীল। নিয়ন্ত্রণে আসছে না মূল্যস্ফীতির হার। অথচ দেউলিয়া হওয়া শ্রীলংকার মূল্যস্ফীতিও এখন আমাদের চেয়ে কম (বণিক বার্তা, ৩ আগস্ট, ২০২৩)।
সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবেই জুনে দেশে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯ দশমিক ৭৪ শতাংশ। এর আগে মে মাসে দেশে মূল্যস্ফীতির পারদ চড়েছিল ৯ দশমিক ২৪-এর ঘরে, যা কিনা এক যুগের সর্বোচ্চ। জুলাইয়ে অবশ্য দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৯ দশমিক ৬৯ শতাংশ হয়েছে। তবে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয়েছে ৯ দশমিক ৭৬ শতাংশ। আগের মাস, অর্থাৎ জুনে এ হার ছিল ৯ দশমিক ৭৩। সরকার বা বিবিএসের দেয়া হিসাবের চেয়ে যদিও এ হার বাস্তবে অনেক বেশি হয়, অর্থনীতিবিদরা তা সবসময়ই বলে আসছেন। অর্থনীতির ভাষা বা হিসাব যাই হোক না কেন, টিকে থাকার লড়াইয়ে দৈনন্দিন বাজারসামগ্রীর এ আগুনে-দাম ভোক্তাকেই চোকাতে হয়। এর মধ্যে আবার মাসান্তে নিশ্চিত রোজগারটুকুও অনিয়মিত হওয়ার সম্ভাবনা এখন প্রবল। দিন দিন তাই ওএমএসের (ওপেন মার্কেট সেলস) পণ্য কিনতে আসা মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেকেও এখন মুখ ঢেকে দাঁড়াচ্ছেন লাইনে। তবে চাহিদার তুলনায় জোগান কম হওয়ায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও মিলছে না ন্যায্যমূল্যের চাল-আটা।
দেশের দিনমজুর, শ্রমিকসহ বেসরকারি পেশাজীবীরা যে আয় করছেন, তা দিয়ে মূল্যস্ফীতির এ চাপ সামাল দেয়া যাচ্ছে না। উল্টো আরো বেশি খরচের বোঝা চাপছে তাদের মাথায়। সঞ্চয় ভেঙেও জীবনযাত্রার চাহিদা মেটানো দুঃসাধ্য হয়ে উঠেছে। শিক্ষিত যুবসমাজও হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে, পরীক্ষার দামি মার্কশিট আর সার্টিফিকেটের ভারের মতোই বেকারত্বের যন্ত্রণাকে বহন করে যেতে হবে অনবরত। কারণ, আমাদের দেশে দৈন্যদশা আপাতত প্রকট। আর্থিক এ সংকট থেকে মুক্তি পেতে সরকারকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফের দ্বারস্থ হতে হয়েছে। ঋণ নেয়া হচ্ছে বিশ্বব্যাংক, এডিবিসহ অন্য দাতা দেশ ও সংস্থার কাছ থেকেও।
বিবিএস গত ২ মে প্রথমবারের মতো প্রান্তিকভিত্তিক শ্রমশক্তি জরিপ প্রকাশ করে। শ্রমশক্তি জরিপের তথ্যানুসারে, চলতি বছরের জানুয়ারি-মার্চ সময়ে আগের তিন মাস, অর্থাৎ ২০২২ সালের শেষ প্রান্তিকের তুলনায় দেশে বেকারের সংখ্যা ২ লাখ ৭০ হাজার বেড়েছে। চলতি বছরের মার্চ শেষে দেশে বেকার ছিলেন ২৫ লাখ ৯০ হাজার লোক। গত বছরের ডিসেম্বর শেষে সেই সংখ্যা ছিল ২৩ লাখ ২০ হাজার। আর ত্রৈমাসিক শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৩-এর প্রথম প্রান্তিকের ফলাফল অনুযায়ী, দেশের শ্রমশক্তিতে নিয়োজিত মোট জনগোষ্ঠী ৭ কোটি ৩৬ লাখ। এছাড়া কর্মে নিয়োজিত জনগোষ্ঠী রয়েছে ৭ কোটি ১১ লাখ। এর মধ্যে অর্থনৈতিক খাত অনুযায়ী কৃষিতে নিয়োজিত আছে ৩ কোটি ১৯ লাখ, শিল্প খাতে ১ কোটি ২২ লাখ, সেবা খাতে ২ কোটি ৬৯ লাখ মানুষ।
প্রতিবেদনে যদিও বলা হয়, বেকার জনগোষ্ঠী মূলত তারাই, যারা গত সাত দিনে কমপক্ষে এক ঘণ্টাও কাজ করেনি, কিন্তু এ সময়ে কাজ করার জন্য প্রস্তুত ছিলেন। পাশাপাশি গত ৩০ দিনে বেতন মজুরি বা মুনাফার বিনিময়ে কাজ খুঁজেছেন। তবে বেকারের এ সংজ্ঞা নিয়ে বিতর্ক আছে। সংজ্ঞা বদলানো হলে দেশে বেকারের সংখ্যা আরো বাড়বে বলে মনে করেন এ খাতের বিশ্লেষকরা।
দেশের কৃষি শ্রমিকদের প্রাপ্ত মজুরির বিপরীতে ক্রয়ক্ষমতা নিয়ে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি), বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি) ও ইন্টারন্যাশনাল রাইস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (ইরি) গত বছর যৌথ এক গবেষণা চালায়। ‘অ্যান অ্যাসেসমেন্ট অব রাইস প্রাইস হাইক ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালেও একজন কৃষি শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি দিয়ে দৈনিক ১৩ দশমিক ৪ কেজি চাল কেনা যেত। বর্তমানে সে সক্ষমতা নেমে এসেছে সাড়ে আট কেজিতে। এ অনুযায়ী গত চার বছরে দৈনিক মজুরিভিত্তিক কৃষি শ্রমিকের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে ৩৬ দশমিক ৫৬ শতাংশ। তাছাড়া নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের মধ্যে মোটা চাল খাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে ২০১৯ সালে মোটা চাল খাওয়ার হার ছিল ৮২ শতাংশ, যা ২০২২ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ৯২ শতাংশে। আর মধ্যম আয়ের মানুষের মধ্যে এ সময়ে মোটা চাল খাওয়ার হার ৩৫ থেকে ৪৬ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে (বণিক বার্তা, ১ জানুয়ারি, ২০২৩)। অন্যদিকে দেশের বাজারে গত তিন বছরে মোটা চালের দাম বেড়েছে প্রায় ৬৭ শতাংশ। গোটা এশিয়ায় চালের মূল্যবৃদ্ধির হার এখন বাংলাদেশেই সর্বোচ্চ (সূত্র: মার্কিন কৃষি বিভাগ—ইউএসডিএ)।
ভোক্তাদের পক্ষ থেকে প্রায়ই বলা হয়, বাজার মনিটরিংয়ের অভাবে বাড়ছে নিত্যপণ্যের দাম। অন্যদিকে বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকার বরাবরই নানা পদক্ষেপের কথা জানায়। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করে দাম না বাড়ানোর অনুরোধ জানানো হয়। বিভিন্ন পণ্যের পর্যাপ্ত মজুদের তথ্য দিয়েও আশ্বস্ত করা হয় জনগণকে। পাশাপাশি থাকে বাজার সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার হুমকি। তবে সরকারের এসব পদক্ষেপ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কতটা কাজ হয়, তা অবশ্য কমবেশি সবারই জানা!
ওবায়দুল্লাহ সনি: সাংবাদিক