গ্লোবাল সাউথ বিশ্বের কোনো আলাদা অঞ্চল নয়। বস্তুত এটি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, অর্থনীতি ও রাজনীতিতে ব্যবহৃত একটি পরিভাষা, যা মূলত আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা, এশিয়া ও ওশেনিয়া অঞ্চলে অবস্থিত উন্নয়নশীল, স্বল্প শিল্পোন্নত এবং ঐতিহাসিকভাবে সুবিধাবঞ্চিত দেশগুলোকে বোঝাতে ব্যবহার হয়।
সম্প্রতি ভারতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস সম্মেলন থেকে বিশ্বব্যাপী আবারো আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে গ্লোবাল সাউথ। গ্লোবাল সাউথের ধারণা স্নায়ুযুদ্ধের সময়কার ভূরাজনৈতিক শ্রেণীবিভাগ থেকে বিবর্তিত হয়ে বর্তমানে এমন একটি কাঠামোয় পরিণত হয়েছে, যা আফ্রিকা, এশিয়া, লাতিন আমেরিকা ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সেসব দেশকে বোঝায়, যাদের ইতিহাসের বিরাট অংশজুড়ে রয়েছে ঔপনিবেশিক শাসন, কাঠামোগত অসমতা এবং উন্নয়নের ক্ষেত্রে প্রান্তিকীকরণের মতো বিষয়। বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৮০ শতাংশেরও বেশি এ দেশগুলোর অন্তর্ভুক্ত এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও পরিবেশগত এজেন্ডা নির্ধারণে তারা ক্রমে প্রভাবশালী হয়ে উঠছে বলেই মনে হচ্ছে।
সমসাময়িক ও নিকট অতীতের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় গ্লোবাল সাউথ বা উন্নয়নশীল বিশ্বও সক্রিয়ভাবে ভূমিকা পালন করছে। বৈশ্বিক শাসন ব্যবস্থার সংস্কার প্রক্রিয়ায় গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর অংশগ্রহণ উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব ও কণ্ঠস্বরকে আরো জোরালো করে তুলছে। পাশাপাশি উদীয়মান অর্থনীতি ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে সংহতি এবং সহযোগিতার বিভিন্ন প্লাটফর্ম ক্রমাগত গতিশীল ও শক্তিশালী হচ্ছে। এছাড়া নতুন বহুপক্ষীয় উন্নয়ন ব্যাংক প্রতিষ্ঠা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার করার ক্ষেত্রেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে ব্লকটি। বিশ্বে দ্বিমেরু ব্যবস্থার জায়গা এখন বহুমেরুকেন্দ্রিক হয়ে গেছে, যার মূলে রয়েছে অনুন্নত কিংবা উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোর সমন্বয়ে গড়ে ওঠা নানা ফোরাম।
নানাভাবে পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত বিশ্ব ব্যবস্থায় সব রাষ্ট্র এখন আর একই সমতলে দাঁড়িয়ে নেই। এ বিশ্বে অর্থনৈতিক মন্দা, মহামারী ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো সমস্যাগুলো সব দেশকেই প্রভাবিত করে, যদিও সব দেশের ওপর এসবের প্রভাব সমান নয়। বলা হয়ে থাকে, এ প্রেক্ষাপটে বিশ্বকে নতুন করে গড়ে তোলা কিংবা গভীর রূপান্তরের অন্যতম লক্ষ্য নিয়েই ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর উত্থান।
তথ্য-উপাত্ত থেকে দেখা যায়, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় গ্লোবাল সাউথের অন্তর্ভুক্ত দেশগুলো তাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধন করেছে। একবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকের তুলনায় গ্লোবাল সাউথের মোট অর্থনৈতিক উৎপাদন প্রায় ৫ দশমিক ৪ গুণ বেড়েছে; এর বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার ৫ দশমিক ১ শতাংশ, যা বৈশ্বিক গড়ের (৩ দশমিক ৫ শতাংশ) চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। উন্নয়নশীল এসব দেশে যেমন শিল্প উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়েছে, তেমনি শিল্পায়ন প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে এবং বেশকিছু প্রতিযোগিতামূলক শিল্প গড়ে উঠেছে। বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটেছে। পণ্য রফতানি ও আমদানি—উভয়ই এবং সেই সঙ্গে বহির্বিশ্বে বিনিয়োগ সবই প্রায় পাঁচ গুণ বেড়েছে।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলো গবেষণা ও উদ্ভাবনেও বিশ্বে বিশেষ স্থান করে নিয়েছে—এক্ষেত্রে চীনের নাম উল্লেখ না করলেই নয়। এ ব্লকের অনেক দেশ দারিদ্র্য বিমোচনের ক্ষেত্রেও ঐতিহাসিক সাফল্য অর্জন করেছে। উন্নয়নশীল বিশ্বের এক বিলিয়নেরও বেশি মানুষ চরম দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে এসেছে। স্বাস্থ্য খাতেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হয়েছে; যেখানে মানুষের গড় আয়ু প্রায় ৬২ থেকে বেড়ে প্রায় ৭০ বছরে উন্নীত হয়েছে। শিক্ষার সুযোগ ক্রমে সম্প্রসারিত হচ্ছে—উচ্চ শিক্ষায় ভর্তির হার ১৩ থেকে বেড়ে ৩৮ শতাংশে পৌঁছেছে। এসব উপাত্তই আশাজাগানিয়া।
গ্লোবাল সাউথকে এখন কোনো একক বা অভিন্ন সত্তা ভাবার কারণ নেই; বরং এটি বিভিন্ন উন্নয়ন পর্যায়ে থাকা অর্থনীতির এক বৈচিত্র্যময় সমষ্টি, যা দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি ও সহনশীলতা অর্জনের অভিন্ন প্রত্যাশাগুলোকে যেন একই সুতোয় বেঁধেছে।
গ্লোবাল সাউথ বা উন্নয়নশীল বিশ্বের দৃষ্টিভঙ্গি যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, সেটা এখন বিশ্ব অনুধাবন করতে পারছে। এরপরও অগ্রাধিকারের ভিন্নতা এবং সম্পদের সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক সময় সাধারণ চ্যালেঞ্জগুলোর সমাধানে নেতৃত্ব দেয়ার ক্ষেত্রে এসব দেশের সক্ষমতা বাধাগ্রস্ত হতে দেখা যায়। ২০২২ সালের বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাব-সাহারা আফ্রিকা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বেশ কয়েকটি অর্থনীতি ধারাবাহিকভাবে বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল অর্থনীতির তালিকায় স্থান করে নিয়েছে। কিন্তু এ অগ্রগতি সত্ত্বেও উল্লেখযোগ্য কিছু বাধা এখনো বিদ্যমান। এর মধ্যে রয়েছে—কাঠামোগত বৈষম্য, প্রাথমিক পণ্য রফতানির ওপর নির্ভরতা, প্রযুক্তির সীমিত ব্যবহার এবং দুর্বল শাসন ব্যবস্থা, যা টেকসই উন্নয়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অভিঘাত এবং ভূরাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার ক্ষেত্রেও এসব দেশ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি এখানে অত্যন্ত প্রকট।
অনেক অগ্রগতির মাঝেও এটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে ‘গ্লোবাল সাউথ’ বা উন্নয়নশীল বিশ্ব নতুন নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। বৈশ্বিক অর্থনীতির মন্থরগতি, ভেঙে পড়া বহুপক্ষীয় বাণিজ্যনীতি, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি এবং আঞ্চলিক সংঘাত ও অস্থিতিশীলতার মতো বাহ্যিক অভিঘাতগুলো এসব দেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। গ্লোবাল সাউথের অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে কোনো কোনোটি অবকাঠামোগত ঘাটতি, উন্নয়ন অর্থায়নে (যেমন সীমিত সম্পদ, উচ্চ ব্যয়, জটিলতা এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে পর্যাপ্ত বরাদ্দের অভাব) বড় ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। এর বাইরে রয়েছে আন্তর্জাতিক রাজনীতি; সেখানে কোনো মোড়ল চাইবে না যে তার সামনে অন্য কোনো মোড়ল এসে দাঁড়াক।
উন্নত বিশ্বের দূষণে বিক্ষত গ্লোবাল সাউথ এ অভিঘাত থেকে নিজেকে বাঁচাতে বারবার হোঁচট খাচ্ছে। বৈশ্বিক গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণে ‘গ্লোবাল সাউথ’ বা উন্নয়নশীল বিশ্বের অবদান সবচেয়ে কম হলেও এর পরিণতির একটি বড় ও অসম ভার তাদেরই বহন করতে হচ্ছে। যার মধ্যে রয়েছে চরম আবহাওয়া পরিস্থিতি, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং কৃষি পদ্ধতিতে পরিবর্তন যা খাদ্য নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য খাতকে হুমকির মুখে ফেলছে। সম্প্রতি নেপালে ঘটে যাওয়া আকস্মিক পাহাড়ি ঢলে বহু মানুষের প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত ধ্বংস চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, কীভাবে উন্নত বিশ্বের কর্মের ফল ভোগ করতে হচ্ছে উন্নয়নশীল দেশ তথা গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোকে। এ নিয়ে জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে নেপালের প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে যে ক্ষোভ ঝরে পড়েছে তা যেন উন্নয়নশীল দেশগুলোর মনের কথা।
গ্লোবাল সাউথের মাঝেও দুই শ্রেণীর রাষ্ট্র রয়েছে। এক শ্রেণী এরই মধ্যে অর্থনৈতিকভাবে অনেক উন্নতি লাভ করেছে এবং এ উন্নতি করতে গিয়ে পরিবেশ-প্রতিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে, যার পরিণতি ভোগ করতে হচ্ছে গরিব রাষ্ট্রগুলোকে। এ নিয়ে গ্লোবাল সাউথের মাঝেও অন্তর্দ্বন্দ্ব রয়েছে। এর বাইরে এ অন্তর্দ্বন্দ্বের সুযোগ নিয়ে গ্লোবাল সাউথের সম্পদ লুটেপুটে নিয়ে যাচ্ছে অনেক উন্নত ও ক্ষমতাধর রাষ্ট্র। একই সঙ্গে গ্লোবাল সাউথ ব্লকের অনেক দেশে ঋণের বোঝা বেড়ে যাওয়ায় অবকাঠামো, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক পরিসর সংকুচিত হয়ে পড়েছে। দেশগুলোর অভ্যন্তরে বৈষম্য এখনো প্রকট; বিশেষ করে গ্রামীণ ও শহুরে এলাকার মধ্যকার ব্যবধান, লিঙ্গবৈষম্য এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে মূলধারার বাইরে রাখার প্রবণতা সামাজিক সংহতি ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে ব্যাহত করছে।
বস্তুত সুষম ও টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য বৈশ্বিক অংশীদারত্বের ক্ষেত্রে একটি মৌলিক পরিবর্তনের প্রয়োজন। এ পরিবর্তনে সহায়তা-নির্ভরতা কাটিয়ে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে এমন পারস্পরিক লাভজনক সহযোগিতার পথে এগিয়ে যেতে হবে, যা উদ্ভাবন, বাণিজ্য এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের বিষয়গুলোকে উৎসাহিত করে। গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর মধ্যে এ পারস্পরিক সহযোগিতা ও নির্ভরতা কতটা আছে, তার ওপরও নির্ভর করে দেশগুলোর এগিয়ে যাওয়া।
পারস্পরিক সহায়তা ও সুবিধার পরিপূরকতার নীতির ওপর ভিত্তি করে ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর উচিত অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সহযোগিতা জোরদার করা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতার সম্ভাবনা সম্প্রসারিত করা, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও জ্ঞান আদান-প্রদান ত্বরান্বিত করা, নিজস্ব উন্নয়ন সক্ষমতা বৃদ্ধি করা এবং নিজেদের মধ্যে নতুন উন্নয়ন কার্যক্রম এগিয়ে নেয়া। তবে এটাও বলা যায়, ‘গ্লোবাল সাউথ’ আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। এর সামনে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো যেমন জটিল ও গভীরে প্রোথিত, তেমনি রূপান্তরের সুযোগও এখন অসামান্য। উদ্ভাবনকে কাজে লাগিয়ে, শক্তিশালী ও স্থিতিস্থাপক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে এবং সুষম অংশীদারত্ব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এ দেশগুলো এমন এক উন্নয়নের পথ রচনা করতে পারে, যা হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক, টেকসই এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য যুগান্তকারী পরিবর্তনের বাহক।
ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর উচিত বৈশ্বিক শিল্প ও সরবরাহ শৃঙ্খলের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখা এবং গ্লোবাল নর্থের সঙ্গে সংলাপ ও সহযোগিতা জোরদার করা। একই সঙ্গে সুস্থ প্রতিযোগিতা অব্যাহত রাখা, যাতে উত্তর ও দক্ষিণ একই অভিমুখে যৌথভাবে কাজ করতে পারে। পাশাপাশি ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর উচিত সুযোগগুলোকে কাজে লাগানো, মৌলিক প্রবণতাগুলোকে গ্রহণ করা এবং মানবতার জন্য ‘অংশীদারত্বমূলক ভবিষ্যতের একটি সম্প্রদায়’ গঠনের লক্ষ্য নিয়ে নিজেদের মধ্যে সংহতি ও সহযোগিতা এগিয়ে নেয়া।
ড. এএসএম সাইফুল্লাহ: অধ্যাপক, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়