বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প

কারখানা বন্ধ হওয়ার আগে বাঁচানোর নীতি আরো কার্যকর হোক

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (আরএমজি) শিল্প বর্তমানে তার অন্যতম কঠিন একটি রূপান্তরমূলক সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বৈশ্বিক বাজারে অনিশ্চয়তা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, উচ্চ সুদের কারণে অর্থায়নের খরচ বেড়ে যাওয়া এবং নগদ অর্থপ্রবাহ (ক্যাশ ফ্লো) সংকট—এসব কারণে অনেক কারখানা টিকে থাকার জন্য কঠিন সংগ্রাম করছে।

একই সঙ্গে বিশ্বব্যাপী উৎপাদন খাতও একটি বড় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। নতুন প্রযুক্তি, পরিবর্তিত ভোক্তা চাহিদা, বৈশ্বিক বাণিজ্য নীতি, ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাসের ফলে বিশ্বের প্রায় সব শিল্পই নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়ার চেষ্টা করছে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়।

এ বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশ সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বিজিএমইএ শিল্পকে সচল রাখা, কর্মসংস্থান রক্ষা এবং আর্থিক সংকটে থাকা কারখানাগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যে বিভিন্ন ইতিবাচক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এসব উদ্যোগ অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার। কারণ শিল্পকে সচল রাখা মানেই দেশের অর্থনীতি, রফতানি ও লাখো মানুষের জীবিকা রক্ষা করা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক সহায়তা নীতিতে মূল গুরুত্ব দেয়া হয়েছে বন্ধ বা দীর্ঘদিন অচল থাকা কারখানা পুনরায় চালু করার ওপর। উদ্দেশ্য নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কিন্তু একই সঙ্গে যেসব কারখানা এখনো উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে, অথচ মারাত্মক আর্থিক সংকটে টিকে থাকার লড়াই করছে—তাদের জন্যও সমান সুযোগ থাকা জরুরি।

বর্তমানে শিল্প মালিকদের মধ্যে একটি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, যারা সব বাধা সত্ত্বেও কারখানা চালু রেখেছেন, তারা হয়তো সেই সহায়তা থেকে বঞ্চিত হতে পারেন; অথচ যারা এরই মধ্যে কারখানা বন্ধ করেছেন, তারা নীতিগতভাবে বেশি সুবিধা পাবেন। এমন ধারণা তৈরি হলে কিছু উদ্যোক্তা বাধ্য হয়ে কারখানা বন্ধ করার দিকেও ঝুঁকতে পারেন যা কোনোভাবেই কাঙ্ক্ষিত নয়।

যেকোনো সহায়তা নীতির মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত কারখানা বন্ধ হওয়ার আগেই তাকে রক্ষা করা, শুধু বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর পুনরায় চালু করার চেষ্টা নয়। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, গত দুই বছরে ৪৫৭টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। এর মধ্যে বিজিএমইএর ১০৮টি এবং বিকেএমইএর ৩৫টি সদস্য কারখানা রয়েছে। এছাড়া শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, সময়মতো কার্যকর সহায়তা না পেলে আরো প্রায় ৩০০টি পোশাক কারখানা আর্থিক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এ সংখ্যাগুলোর পেছনে রয়েছে হাজার হাজার শ্রমিক, কর্মকর্তা, উদ্যোক্তা, সরবরাহকারী, পরিবহনসেবা, ব্যাংক এবং অসংখ্য পরিবারের জীবন-জীবিকা।

আরো একটি বিষয় আমাদের মনে রাখা উচিত। এমন অনেক উদ্যোক্তা আছেন, যারা নিজের কোনো ব্যর্থতার কারণে নয়; বরং ক্রেতার দেউলিয়া হয়ে যাওয়া, রাজনৈতিক অস্থিরতা, জ্বালানি সংকট, আর্থিক জটিলতা কিংবা ব্যাংকিং সমস্যার কারণে কারখানা বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছেন। তাদের অনেকেই আজও নতুনভাবে শুরু করার ইচ্ছা ও সক্ষমতা রাখেন। তাদের জন্যও বাস্তবসম্মত পুনরুদ্ধার সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আমি ব্যক্তিগতভাবেও এ বাস্তবতার সাক্ষী। রিয়াজ গার্মেন্টস লিমিটেড ২০১০ সালে সক্ষমতা, অভিজ্ঞতা এবং কাজ করার আন্তরিক ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তৎকালীন নীতিগত ও আর্থিক বাস্তবতার কারণে উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছিল। সে সময় আজকের মতো সমন্বিত নীতিগত সহায়তার সুযোগ ছিল না। তাই বর্তমানে সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বিজিএমইএর সমন্বিত উদ্যোগ আমাদের নতুন আশার আলো দেখায়। আমরা বিশ্বাস করি, এসব উদ্যোগের মাধ্যমে অনেক সম্ভাবনাময় কারখানা আবার উৎপাদনে ফিরতে পারবে।

সবশেষে আমি আমাদের কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শ্রমিক ভাইবোনদের প্রতি একটি আন্তরিক অনুরোধ জানাতে চাই। কঠিন সময়ে আপনাদের ধৈর্য, ইতিবাচক মনোভাব এবং সহযোগিতা একজন উদ্যোক্তার জন্য অনেক বড় শক্তি। একজন কারখানার মালিক শুধু নিজের ব্যবসার জন্য নয়, শত শত বা হাজারো পরিবারের জীবিকার দায়িত্বও বহন করেন। যদি কর্মী ও ব্যবস্থাপনা একসঙ্গে মালিকের পাশে দাঁড়ান, তাহলে অনেক উদ্যোক্তাই নতুনভাবে পরিকল্পনা করে আবার কারখানা চালু করার সাহস পাবেন।

গত পাঁচ দশকে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প অসংখ্য সংকট অতিক্রম করে আজকের অবস্থানে পৌঁছেছে। আমি বিশ্বাস করি, সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক, বিজিএমইএ, ব্যাংকগুলো, উদ্যোক্তা, কর্মকর্তা ও শ্রমিক—সবাই যদি পারস্পরিক আস্থা, সহযোগিতা এবং দূরদর্শিতার সঙ্গে কাজ করি, তবে ইনশা আল্লাহ এ পরিবর্তনের সময়ও আমরা সফলভাবে অতিক্রম করতে পারব।

আমাদের লক্ষ্য শুধু বন্ধ কারখানা চালু করা নয়; বরং যাতে একটি সম্ভাবনাময় কারখানাও অপ্রয়োজনীয় কারণে বন্ধ না হয়, সেই পরিবেশ ও নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করা।

মো. সালাউদ্দিন: পরিচালক, রিয়াজ গার্মেন্টস লিমিটেড

আরও