সদ্য সাবেক
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সংঘটিত গণ-অভ্যুত্থানের
মাধ্যমে পদত্যাগে বাধ্য হয়েছেন। তিনি গত ৫ আগস্ট দেশ থেকে পালিয়ে পার্শ্ববর্তী
রাষ্ট্র ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন। পরবর্তী সময়ে সংবাদপত্রের প্রতিবেদন
এবং তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ও নিশ্চিত করেছেন যে, শেষ মুহূর্ত
পর্যন্ত
তিনি দেশ ত্যাগে ইচ্ছুক ছিলেন না। তার পরিবারের সদস্যরা হাসিনাকে সেদিন ভারতে পালিয়ে
যেতে বাধ্য করেছিলেন। কারণ তারা তার সরকারি বাসভবনের দিকে তেড়ে আসা ছাত্র-জনতার
রোষানলে পড়ে তার প্রাণহানির আশঙ্কা করেছিলেন।
এদিকে জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৬ জুলাই থেকে ৬ আগস্ট পর্যন্ত
বাংলাদেশে প্রায় ৬৫০ জন মানুষ নিহত হয়েছেন। বিক্ষোভের সময় নিরস্ত্র বেসামরিক জনতা,
শিশু ও ছাত্রদের নির্বিচারে ও নৃশংসভাবে হত্যা করেছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী
বাহিনী।
নিহতদের পরিবারের
সদস্য, বিক্ষোভকারী এবং ছাত্রদের অভিযোগ, তাদের অনেককে পুলিশ শেখ হাসিনার
নির্দেশে গুলি করেছিল। এর ফলে ১৩ আগস্ট ঢাকার মুখ্য
মহানগর হাকিম আদালতে তার বিরুদ্ধে প্রথম ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়। তারপর থেকে
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (যা আসলে তার শাসনামলে ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধীদের
বিচারের জন্য গঠন হয়েছিল) গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য এবং সাধারণ ফৌজদারি
আদালতে একের পর এক দেশের বিভিন্ন স্থানে হত্যা, গুম, নির্যাতন, অপহরণ, হামলা ইত্যাদি
অভিযোগে হাসিনাসহ তার মন্ত্রিসভার সদস্য, দলের সদস্য এবং সহযোগীদের বিরুদ্ধে ৫০টিরও
বেশি ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
তবে ভারতে পালিয়ে
যাওয়ার পর থেকেই তাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার এবং তার নেতৃত্বে সংঘটিত নির্যাতন, গুম,
হত্যাসহ সব অপরাধের বিচার করার দাবি শুরু হয়েছিল। হাসিনার বিরুদ্ধে এসব ফৌজদারি
মামলা দায়েরের পর সে দাবি পুনরায় জোরালো হয়েছে। নবগঠিত অন্তর্বর্তী
সরকারের আইন উপদেষ্টাও দায়িত্ব গ্রহণের পর বলেছেন, তারা আন্দোলনের সময়
তার মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে যাবেন।
এখন ভারত থেকে শেখ
হাসিনার আইনগত প্রত্যর্পণের প্রশ্নটি প্রবলভাবে আলোচিত হচ্ছে। যদিও ফৌজদারি আদালত ও
আন্তর্জাতিক
অপরাধ ট্রাইব্যুনাল উভয় জায়গাতেই অভিযুক্তের অনুপস্থিতিতে বিচার করার ব্যবস্থা রয়েছে।
তবে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ না নিয়ে তার বিরুদ্ধে বিচার করার উদ্যোগ নিলে তা
ফলপ্রসূ হবে না।
কোনো
দেশ
থেকে পালিয়ে যাওয়া ব্যক্তি বা অভিযুক্তকে সে দেশে
প্রত্যর্পণ একটি জটিল আইনগত প্রক্রিয়া; যা শুধু আইনগতভাবেই নয় বরং আন্তর্জাতিক,
রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও মানবাধিকার সংক্রান্ত উদ্বেগের সঙ্গেও জড়িত।
সুতরাং ভারত থেকে শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে প্রত্যর্পণের আইনগত সম্ভাবনা, জটিলতা ও তা
নিরসনের উপায় উন্মোচন করাই এ লেখার উদ্দেশ্য।
নয়াদিল্লি ও
ঢাকার
মধ্যে হাসিনার শাসনামলেই ২০১৩ সালে একটি বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি
স্বাক্ষর হয়েছিল, যা পরবর্তী সময়ে ২০১৬ সালে একবার সংশোধন করা
হয়েছিল। ৷এ চুক্তির আওতায় এরই মধ্যে উভয় দেশ বেশকিছু
বন্দি নিজেদের মধ্যে বিনিময় করেছে বলে জানা যায়। তবে বাংলাদেশের
ইতিহাসে এই প্রথম কোনো ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী গণ-অভ্যুত্থানের
ফলে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়ে সরাসরি ভারতে পালিয়ে গেল। শেখ হাসিনা এখন ভারতে নাকি অন্য
কোনো দেশে রাজনৈতিক আশ্রয় নেবেন সে বিষয়টি তার
তরফ থেকে এখনো স্পষ্ট করা হয়নি। পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠেছে
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার গত ২২ আগস্ট হাসিনা, তার উপদেষ্টা, মন্ত্রিসভার সদস্য, সদ্যবিলুপ্ত
দ্বাদশ জাতীয় সংসদের সব সদস্য, তাদের স্ত্রী ও সন্তানদের কূটনৈতিক পাসপোর্ট
বাতিল করার পর। তিনি ভারতে সেই লাল পাসপোর্টের বিশেষাধিকারে অবস্থান
করছেন বলে ধারণা করা হচ্ছিল। ভারত-বাংলাদেশের মধ্যকার ভিসা-সংক্রান্ত
দ্বিপক্ষীয় চুক্তি অনুসারে কূটনৈতিক পাসপোর্টধারী
ব্যক্তিরা ভিসা ছাড়াই সর্বোচ্চ ৪৫ দিন পর্যন্ত সেখানে অবস্থান
করতে পারেন। যদিও ভারতে হাসিনা কীভাবে বা কোন মর্যাদায় পালিয়ে যাওয়ার পর থেকে অবস্থান
করছেন সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানাতে ভারত শুরু থেকেই নীরবতা পালন করে আসছে।
এখন তার কূটনৈতিক পাসপোর্ট বাতিলের পর অন্য কোনো দেশে রাজনৈতিক আশ্রয়
চেয়ে সেখানে যাওয়াও তার পক্ষে কঠিন হয়ে গেল।
বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন
সরকার অদ্যাবধি শেখ হাসিনাকে ভারত থেকে ফিরিয়ে এনে বিচার শুরু করার নিমিত্তে দৃশ্যমান
কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। শুধু পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা সাংবাদিকদের প্রশ্নোত্তরে জানিয়েছেন
যে সরকার সিদ্ধান্ত নিলে তারা তাকে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু করবেন। তাই এর মধ্যে
তিনি যদি ভারতে বা অন্য কোনো দেশে রাজনৈতিক আশ্রয় চান তাহলে
ভারত থেকে হাসিনাকে প্রত্যর্পণের আলোচনার কোনো মানে নেই। তবে শেখ
হাসিনা এর আগে ১৯৭৫ সালে তার পিতার হত্যার পর একবার ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়েছিলেন
ও পেয়েছিলেন।
প্রত্যর্পণ হলো
দুটি
দেশের মধ্যে একটি আইনি প্রক্রিয়া, যার ফলে কোনো
পলাতক
অভিযুক্ত বা দোষী ব্যক্তিকে অনুরোধকারী দেশের এখতিয়ারে সংঘটিত অপরাধের বিচার বা শাস্তির
জন্য অনুরোধকারী রাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করতে অনুরোধপ্রাপ্ত দেশ চুক্তিগতভাবে সম্মত
হয়। তবে দেশভেদে বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি একে অন্যের থেকে ভিন্ন ভিন্ন
হয়। কেউ কেউ প্রত্যর্পণযোগ্য অপরাধ কী তা নির্ধারণ করে দেয়; কেউ আবার কিছু কিছু ক্ষেত্র
নির্ধারণ করে দেয় যখন পক্ষরা পলাতক ব্যক্তিকে প্রত্যর্পণ
করতে অস্বীকৃতি জানাতে পারে। দেশগুলো সাধারণত সন্ত্রাসবাদ এবং অন্যান্য
সহিংস অপরাধের ব্যতিক্রমসহ বিশেষত সামরিক বা রাজনৈতিক অপরাধের জন্য কোনো
ব্যক্তির
প্রত্যর্পণ অস্বীকার করে। কিছু দেশ কোনো অবস্থাতেই মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন
কারাদণ্ড হতে পারে এমন বিচারিক আশঙ্কা থাকলে প্রত্যর্পণ করে না। তবে
অনুরোধকারী দেশ যদি সেই দণ্ড আরোপ না করার অঙ্গীকার করে তবে প্রত্যর্পণ বিবেচনা করতে
পারে।
বাংলাদেশ ও
ভারতের
মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় প্রত্যর্পণ চুক্তির আইনি কাঠামোর মধ্যে বাংলাদেশের ভারত
থেকে হাসিনার প্রত্যর্পণ চাওয়ার সুযোগ রয়েছে। যদিও ওই একই চুক্তির অধীনে বাংলাদেশের
সেই অনুরোধ ভারতের অস্বীকার করার বিধান এবং সুযোগও রয়েছে। চুক্তি অনুসারে অনুরোধ করা
রাষ্ট্র তার দেশে আশ্রয় নেয়া পলাতককে প্রত্যর্পণ করবে, যদি তার বিরুদ্ধে মামলা করা
হয়ে থাকে অথবা তার বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগ দায়ের করা হয় বা সে আদালত কর্তৃক দোষী
সাব্যস্ত হয় বা প্রত্যর্পণযোগ্য অপরাধ করার জন্য বিচারিকভাবে প্রদত্ত দণ্ড কার্যকর
করার জন্য তাকে ফেরত চাওয়া হয় (অনুচ্ছেদ ১(১))। শুধু যেসব
অপরাধে
ন্যূনতম শাস্তি এক বছর কারাদণ্ড রয়েছে সেসব অপরাধকে প্রত্যর্পণযোগ্য অপরাধ
বলে গণ্য করা হয়, যার মধ্যে আর্থিক অনিয়মও অন্তর্ভুক্ত (অনুচ্ছেদ
২(১))।
উপরন্তু প্রত্যর্পণযোগ্য
অপরাধের জন্য দ্বৈত অপরাধের নীতি অবশ্যই পালন করতে হয় (অনুচ্ছেদ ১(২))। অর্থাৎ অপরাধটি
উভয় দেশের আইন অনুসারেই শাস্তিযোগ্য হতে হবে। আবার চুক্তির ২(৪) অনুচ্ছেদ অনুসারে
যদি কেউ একটি প্রত্যর্পণযোগ্য অপরাধ সংঘটনে সহযোগী হিসেবে জড়িত থাকে বা
অপরাধে সহায়তা করে বা প্ররোচনা দেয় কিংবা অংশগ্রহণ করে তাহলেও প্রত্যর্পণের আবেদন
মঞ্জুর করা হবে।
২০১৬ সালে সংশোধনের
পর অনুচ্ছেদ ১০ (৩) অনুযায়ী অনুরোধকারী দেশের জন্য ফেরারি ব্যক্তিকে
এখন ফেরত চাওয়া আরো সহজ। কারণ এখন আর অপরাধের প্রমাণ সরবরাহ করা বাধ্যতামূলক
নয়; কেবল আদালত থেকে জারি করা গ্রেফতারি পরোয়ানা প্রত্যর্পণের
জন্য যথেষ্ট বলে বিবেচিত হবে। তাই অন্তত তাত্ত্বিকভাবে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ম্যাজিস্ট্রেট
আদালত কর্তৃক গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হলেই তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট
প্রমাণ
হাজির না করেও তাকে বাংলাদেশে হস্তান্তরের অনুরোধ করা যাবে।
তা সত্ত্বেও চুক্তির
অভ্যন্তরে বেশকিছু ব্যতিক্রম বিধান রয়েছে (অনুচ্ছেদ ৬-৮), যার বলে ভারত রাজনৈতিক প্রকৃতির
মামলা বা নিপীড়নের আশঙ্কা বা যদি অপরাধ সম্পূর্ণরূপে সামরিক
অপরাধ হয় তাহলে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের আবেদন প্রত্যাখ্যান করতে পারে। আবার চুক্তি অনুসারে
যে দেশে প্রত্যর্পণের অনুরোধ করা হয়েছে, সেই দেশে মামলা দায়ের করা হলে প্রত্যর্পণের
আবেদন প্রত্যাখ্যান করার সুযোগ রয়েছে। যদিও বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে
ভারতে আজ পর্যন্ত কোনো মামলা দায়ের হয়নি এবং শিগগিরই
তার বিরুদ্ধে মামলা করার কোনো যুক্তিসংগত
সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না।
তবে উল্লিখিত চুক্তির
৬(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, নিম্নলিখিত অপরাধসমূহকে রাজনৈতিক অপরাধ হিসাবে গণ্য করা
হবে না: (ক) যেকোনো কাজ বা কার্যবিরতি, যা বহুপাক্ষিক আন্তর্জাতিক চুক্তি
অনুসারে ফৌজদারি অপরাধ হিসাবে দণ্ডনীয় এবং উভয় চুক্তিকারী রাষ্ট্র যার পক্ষ; (খ)
হত্যা; (গ) নরহত্যা বা অপরাধমূলক হত্যা; (ঘ) প্রকৃত শারীরিক ক্ষতি, বা আঘাত ঘটানো,
উদ্দেশ্যমূলকভাবে কাউকে ক্ষতবিক্ষত করা বা গুরুতর শারীরিক ক্ষতিসাধনের জন্য হামলা,
তা অস্ত্র, বিপজ্জনক পদার্থ বা অন্য কোনোভাবে সংঘটন করা;
(ঙ) বিস্ফোরণের কারণে জীবন বিপন্ন হতে পারে বা সম্পত্তির মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে এমন
কোনো কাজ; (চ) কোনো ব্যক্তির দ্বারা
বিস্ফোরক পদার্থ তৈরি করা বা হেফাজতে রাখা, যার মাধ্যমে নিজের বা অন্য কোনো
ব্যক্তির
জীবনকে বিপন্ন করা বা সম্পত্তির গুরুতর ক্ষতি সাধন করা; (ছ) কোনো
ব্যক্তির
কাছে আগ্নেয়াস্ত্র বা গোলাবারুদ থাকা, যিনি নিজের বা অন্য ব্যক্তির জীবন বিপন্ন করতে
চান; (জ) নিজের বা অন্য ব্যক্তির গ্রেফতার বা আটক প্রতিরোধ বা প্রতিরোধ
করার উদ্দেশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার; (ঝ) জীবন বিপন্ন করার অভিপ্রায়ে বা অন্যের
জীবন বিপন্ন হবে কিনা সে বিষয়ে বেপরোয়া অবহেলা করে সম্পত্তির ক্ষতি করা; (ঞ) মনুষ্যহরণ,
অপহরণ, বেআইনি কারাদণ্ড বা বেআইনি আটক, জিম্মি করা; (ট) হত্যার প্ররোচনা; (ঠ) সন্ত্রাসের
সাথে সম্পর্কিত অন্য কোনো অপরাধ যা অনুরোধের সময়, অনুরোধ করা পক্ষের আইনের
অধীনে, রাজনৈতিক চরিত্রের অপরাধ হিসাবে বিবেচিত হবে না; (ড) পূর্বোক্ত অপরাধের যেকোনো
একটি করার চেষ্টা বা ষড়যন্ত্র বা এমন কোনো অপরাধ সংঘটন বা করার চেষ্টাকারী ব্যক্তির
সহযোগী হিসেবে অংশগ্রহণ।
লক্ষণীয়
বিষয় হলো, এখন পর্যন্ত শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের সবগুলোই
ওপরের কার্যক্রমগুলোর মধ্যে পড়ে; যা
চুক্তি অনুযায়ী রাজনৈতিক প্রকৃতির নয়। তা সত্ত্বেও চুক্তিবলে ভারত যদি মনে করে আনীত
অভিযোগ ন্যায়বিচারের স্বার্থে সরল বিশ্বাসে করা হয়নি, তাহলে প্রত্যর্পণের অনুরোধ
প্রত্যাখ্যান করতে পারে (অনুচ্ছেদ ৮(১)(৩))। তাছাড়া হাসিনার
সঙ্গে অমানবিক আচরণ বা ন্যায়বিচার নিশ্চিত না হওয়ার আশঙ্কা থাকলেও ভারত বাংলাদেশের
প্রত্যর্পণের অনুরোধ ফিরিয়ে দিতে পারে।
সম্প্রতি গ্রেফতারের
পর আদালতে হাজির করতে গেলে সাবেক সরকারের সমাজকল্যাণমন্ত্রী
দীপু মনি ও সাবেক যুব ও ক্রীড়া উপমন্ত্রী আরিফ খান জয়কে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হতে
দেখা গেছে। এরই মধ্যে সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রীর
বেসরকারি শিল্পবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানকে জনাকীর্ণ আদালতে বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের
দ্বারা লাঞ্ছিত করার ও ডিম ছুড়ে মারার অভিযোগ এসেছে। অন্যদিকে
আপিল বিভাগের সাবেক বিচারক এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিককেও সম্প্রতি গ্রেফতারের
পর সিলেটের আদালতে হাজির করার সময় বিএনপি সমর্থক ও জনতার দ্বারা মারাত্মক হামলার শিকার
হয়ে হাসপাতালে ঠাঁই নিতে হয়েছে। এ সময় তারা আদালতে
আইনজীবীর মাধ্যমে শুনানির সুযোগ পাননি বলে অভিযোগ রয়েছে। অধিকন্তু
তাদের কারো কারো বেলায় আদালত কর্তৃক দীর্ঘ রিমান্ড
মঞ্জুর
করায় কিছু মানবাধিকার কর্মী সমালোচনা করেছেন। ফলে
শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে এনে বিচারের বেলায়ও এ রকম নিরাপত্তা সংকট
এবং বিচার প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই যে কেউ প্রশ্ন তুলতে
পারে।
তাই অন্তর্বর্তীকালীন
সরকারকে অবশ্যই হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করতে হলে তার সম্পূর্ণ নিরাপত্তা,
সুরক্ষা, মানবাধিকার, আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ, আদালতে শুনানি ও প্রতিনিধিত্ব করার অধিকার,
সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ আচরণ, ন্যায়বিচার, তদন্ত ও বিচারে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য
না থাকা ইত্যাদি অবশ্যই আস্থাজনকভাবে ভারতের কাছে নিশ্চিত করতে হবে।
অন্যথায় ভারত এসব অভিযোগে তাকে ফিরিয়ে দেয়ার অনুরোধ অস্বীকৃতি জানাতে পারে। এছাড়া চুক্তির
অন্যান্য অনেক ফাঁকফোকর দিয়ে ভারত হাসিনাকে ফিরিয়ে দেয়ার প্রক্রিয়া দীর্ঘ সময়ের
জন্য বিলম্বিত করতে পারে।
এমনকি প্রত্যর্পণের
অনুরোধ ভারতের বিচার ব্যবস্থার মধ্য দিয়েও যেতে পারে। ভারতীয় আদালত যেখানে চুক্তির
শর্তাবলি এবং বাংলাদেশের সরবরাহকৃত প্রমাণের ভিত্তিতে প্রত্যর্পণের
অনুরোধের বৈধতা মূল্যায়ন ও যাচাই করে দেখতে পারে। এ বিচারিক প্রক্রিয়া অনেক দীর্ঘ
হতে পারে এবং অভিযোগের প্রকৃতি ও চুক্তি অনুসারে কোনো
ব্যতিক্রমের
প্রযোজ্যতা নিয়ে দীর্ঘ সময়ব্যাপী উল্লেখযোগ্য আইনি যুক্তিতর্কও চলতে পারে। এমনকি আদালত
প্রয়োজন মনে করলে প্রত্যর্পণের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করতে পারে, যদি সেখানে বিশ্বাস
করার মতো যথেষ্ট কারণ থাকে যে, সাবেক সরকারপ্রধান রাজনৈতিক নিপীড়ন,
অন্যায্য বিচার বা নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার পর অমানবিক আচরণের মুখোমুখি হতে পারেন। এটি
বিশেষভাবে আরো প্রাসঙ্গিক যদি যাকে ফেরত চাওয়া হচ্ছে সেই ব্যক্তি এ
আশঙ্কার ভিত্তিতে সে দেশে রাজনৈতিক আশ্রয়
বা শরণার্থী মর্যাদা দাবি করে বসে।
অতএব বর্তমান অস্থায়ী
সরকারকে শেখ হাসিনাকে ভারত থেকে প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুসারে দেশে ফেরত
নিয়ে এসে বিচার করতে চাইলে তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলোর বিস্তৃত এবং পরিপূর্ণ
সাক্ষ্য-প্রমাণ জোগাড় করে উপস্থাপন করতে হবে, আনীত অভিযোগ স্পষ্টতই আইনগতভাবে অপরাধমূলক
এবং নিছক রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নয় সেটি দৃঢ়ভাবে প্রমাণ করতে হবে। তখনই কেবল তার বিরুদ্ধে
রাজনৈতিক অভিযোগ আনার দাবি করা হলে সে দাবি অমূলক প্রমাণে যথাযথ
ভূমিকা রাখা যাবে।
সেই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে
আনীত অভিযোগগুলো রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে তার পক্ষ থেকে দাবি
করা হলে তার পাল্টা শক্তিশালী এবং যুক্তিযুক্ত আইনি ব্যাখ্যা হাজির করার
কিছু
আশু পদক্ষেপ অপরিহার্য। তার মধ্যে উল্লেখ্যোগ্য হলো বিশ্বাসযোগ্য, দক্ষ,
নিরপেক্ষ সংস্থা, যেমন জাতিসংঘের দ্বারা সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন
তদন্ত সম্পাদন, আইনি প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে নিরপেক্ষতা এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ,
ন্যায়বিচারের সব মানদণ্ডের শক্তিশালী প্রয়োগ, অভিযুক্তের সব অধিকার বাস্তবায়ন,
স্বনামধন্য আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার মাধ্যমে বিচারিক প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপ
পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা এবং তাদের সুপারিশ বাস্তবায়নের আশ্বাস প্রভৃতি। প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ার
প্রতিটি ধাপে অবশ্যই আন্তর্জাতিক আইনি মানদণ্ড মেনে চলতে হবে, যার মধ্যে অন্যতম অভিযুক্ত
ব্যক্তির নিগ্রহের হুমকি রয়েছে বা তাকে নির্যাতন করার, তার সঙ্গে অমানবিক আচরণ বা নিপীড়নের
মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে ওই ব্যক্তিকে সে দেশে প্রত্যার্পণ
না করার নীতির প্রতি পূর্ণ সম্মান প্রদর্শন এবং সে সম্পর্কে দৃঢ় ঘোষণা ও বাস্তবসম্মত
কার্য সম্পাদনের মাধ্যমে নিশ্চয়তা প্রদান।
ভারত ও বাংলাদেশের
মধ্যকার রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের টানাপড়েন, হাসিনার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিচার
হওয়ার আশঙ্কা, বিচার বিভাগের ওপর হস্তক্ষেপ, মানবাধিকার
লঙ্ঘন এবং ন্যায্য বিচারপ্রাপ্তি নিয়ে উদ্বেগ এসবই ভারত থেকে
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ না করার পেছনে উল্লেখযোগ্য বাধা সৃষ্টি
করতে পারে। তবে এ-সংক্রান্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আইনি যুক্তির চেয়ে কূটনৈতিক
আলোচনা এবং উভয় সরকারের রাজনৈতিক স্বদিচ্ছার ওপর বেশি নির্ভর করবে।
বর্তমান সরকারের
ভারত সরকারকে বিশ্বাসযোগ্যভাবে আশ্বস্ত করতে হবে যে, শেখ হাসিনা বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক
মানদণ্ড অনুসারে সম্পূর্ণ ন্যায়বিচার এবং মানবিক
আচরণ পাবেন। প্রয়োজনে ভারতকে এ-সংক্রান্ত গ্যারান্টি প্রদান
করতে হবে এবং তাদের পর্যবেক্ষণের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের এ কথা ভুলে গেলে চলবে
না যে উভয় দেশের মধ্যে বিদ্যমান একটি বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি
পারস্পরিক সহযোগিতার জন্য কেবল একটি আইনি কাঠামো প্রদান করে মাত্র। তবে তা সব ক্ষেত্রে
প্রত্যর্পণের নিশ্চয়তা প্রদান করতে পারে না। বিশেষত অভিযোগ যদি ওঠে কোনো
সাবেক
সরকারপ্রধানের বিরুদ্ধে; তখন এর রাজনৈতিক প্রকৃতি, মানবাধিকারের প্রাপ্যতা, অন্যায্য
আচরণের সম্ভাবনার প্রভৃতি মুখ্য হয়ে ওঠে। তখন উভয় রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায়
রাজনৈতিক স্বদিচ্ছা, পারস্পরিক আস্থা, বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, কার্যকর সহযোগিতা, গণতন্ত্র,
আন্তর্জাতিক আইন ও আইনের শাসনের প্রতি সম্মান, কূটনৈতিক আলোচনা ও জনগণের আকাঙ্ক্ষার
প্রতি শ্রদ্ধাই পারে সমস্যার প্রকৃত সমাধান করতে।
রাইসুল সৌরভ: আয়ারল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব গলওয়ের স্কুল অব লয়ে আইনবিষয়ক পিএইচডি
গবেষক, সহযোগী অধ্যাপক (শিক্ষা ছুটিতে), আইন বিভাগ, ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি