গ্লাসগোয় অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক সম্মেলন (কপ২৬) ঘিরে বিশ্বের অনেক মানুষই হতাশ হয়েছে। আমার মনে হয়, যা একটি বড় ধরনের অবমূল্যায়ন। বিশেষ করে উন্নত দেশগুলোর বিশ্বনেতারা এখন জলবায়ুবিষয়ক চ্যালেঞ্জগুলোর গুরুত্ব উপলব্ধি করতে ব্যর্থ। যদিও তারা তাদের প্রদত্ত ভাষণে এর তাত্পর্য ও প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছেন, তবে তাদের বেশির ভাগই স্বল্পমেয়াদি জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় মনোযোগী ছিলেন, তাই তারা শূন্য কার্বন নিঃসরণের বিষয়ে তাত্ক্ষণিক স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন প্রতিশ্রুতি প্রদানের বিপরীতে সুবিধাজনক দূরত্ব বজায় রেখেছেন।
পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়েছে ধনী দেশগুলোর নেতাদের দেয়া বক্তব্যের সূত্র ধরে। তারা যা বলেছেন তা প্রকৃত জলবায়ু কৌশল নির্ধারণ ও ব্যবস্থার সঙ্গে বিরোধপূর্ণ। কেননা সম্মেলনে জি৭ নেতারা ব্যস্ত ছিলেন জীবাশ্ম জ্বালানিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির মতো কার্যক্রমে অনুমতি দিতে, যা অচিরেই গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণের পরিমাণ আরো বাড়িয়ে তুলবে। তাই ভবিষ্যতের কয়েক দশকের জন্য শূন্য কার্বন নিঃসরণের বিপরীতে তারা শুধু হতাশাজনক প্রতিশ্রুতিই ব্যক্ত করেছেন।
উদাহরণস্বরূপ, মার্কিন প্রেসিডেন্ট কি নিজে থেকে শূন্য কার্বন নিঃসরণের জন্য প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করতে পারেন না? গ্লাসগোয় প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বলেন, জ্বালানির দাম ঘিরে বর্তমানে আমরা যে অস্থিরতা দেখতে পাচ্ছি, এটিকে সবুজ জ্বালানির লক্ষ্যগুলো পিছিয়ে দেয়ার কারণ হিসেবে না মনে করে বরং সবুজ জ্বালানির দিকে অগ্রসরের আহ্বান হিসেবে দেখতে হবে। প্রকৃতপক্ষে, জ্বালানির উচ্চমূল্য কেবল জ্বালানির উৎসগুলোর বৈচিত্র্যকরণের প্রয়োজনীয়তাকে শক্তিশালী করে, সবুজ জ্বালানির অবকাঠামো নির্মাণের দিকে জোর দেয় এবং প্রতিশ্রুতিশীল নতুন সবুজ জ্বালানি প্রযুক্তিকে উৎসাহিত করে।
তার এ বক্তব্যের মাত্র তিনদিন পর বাইডেন প্রশাসন দাবি করে যে ওপেকের সদস্যভুক্ত দেশগুলো তেল উৎপাদনের পরিমাণ বৃদ্ধি না করে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে বিপন্ন করছে। এমনকি তারা এটা বলেও হুমকি দিয়েছে যে তেলের মূল্য হ্রাস করতে যা করা প্রয়োজন বা যে ধরনের ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন, তা করতে প্রস্তুত রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
জলবায়ু প্রতিশ্রুতির বিপরীতে এটি উন্নত দেশের একজন নেতার ভণ্ডামির সাম্প্রতিকতম উদাহরণগুলোর মধ্যে একটি। এ ধরনের আরো অনেক উদাহরণ বিদ্যমান। এমনকি কপ২৬-এর কার্যক্রম ঘিরেও আমরা এ ধরনের দ্বিচারিতা দেখতে পাই। উন্নত দেশের নেতারা জনসম্মুখে বড় বড় প্রতিশ্রুতির আশ্বাস দিলেও উন্নয়নশীল দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠকে তারা নিজেদের যে ভিন্ন মূর্তি তুলে ধরেছেন, তাতে শেষমেশ সবাই হতবাকই হয়েছে।
আজ পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে বেশির ভাগ কার্বন নিঃসরণের দায় যেখানে ধনী দেশগুলোরই, তবুও তারা এখন উন্নয়নশীল দেশগুলোকে জলবায়ু অর্থায়নে দীর্ঘস্থায়ী প্রতিশ্রুতি প্রদানে দ্বিধান্বিত হচ্ছে। এমনকি তারা প্রস্তাবিত জলবায়ুসংক্রান্ত সংজ্ঞাও প্রত্যাখ্যান করেছে। যদিও এর মাধ্যমে তাদের জলবায়ু অর্থায়ন বাবদ ন্যায্য অর্থ প্রদানের বিষয়টিও এড়িয়ে যেতে সমর্থ হবে। আরো অবাক ব্যাপার হচ্ছে, এখনো তারা জলবায়ুর পরিবর্তনকে ভিন্ন কোনো বিষয় হিসেবে মনে করছে। আর এর প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোয় অর্থাৎ জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত ক্ষয়ক্ষতি, বিপর্যয় হ্রাস ও মোকাবেলার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়নের ব্যবস্থা করতেও তারা গররাজি।
কপ২৬ সম্মেলনে উন্নত বিশ্বের নেতাদের ব্যক্ত প্রতিশ্রুতি মূলত তাদের দ্বৈত চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ ২০টি দেশের একটি দল ২০২২ সালের শেষ নাগাদ কয়লাচালিত প্রকল্পগুলোসহ ‘জীবাশ্ম জ্বালানি’ প্রকল্পগুলোর জন্য সরকারি অর্থায়ন বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা শুধু আন্তর্জাতিক প্রকল্পের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, দেশীয় প্রকল্পগুলোর জন্য নয়। তাছাড়া ২৩টি দেশ, যেখানে আলাদা করে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে যে তারা তাদের দেশে বিদ্যমান কয়লাভিত্তিক প্রকল্পগুলো বন্ধ করার পাশাপাশি এ ধরনের নতুন কোনো প্রকল্পের দিকে অগ্রসর হবে না, সেখানে যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্য কয়েকটি দেশ তা স্বাক্ষর করা থেকে বিরত থেকেছে।
তাই গ্লাসগো সম্মেলনে দৃঢ় প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করার বিষয়টি পরবর্তী সময়ে ধনী দেশগুলো কতটা পূরণ করতে পারে তা দেখা জরুরি। এর আগেও তারা বিভিন্ন সময় জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় বড় বড় প্রতিশ্রুতি দিলেও তা পূরণ করেনি। এভাবে তারা একের পর এক উন্নয়নশীল দেশের জলবায়ুবিষয়ক সমস্যাগুলো উপেক্ষা করে যাচ্ছে। যদিও জলবায়ু পরিবর্তনে উন্নয়নশীল এ দেশগুলোর ভূমিকা সামান্যই। উন্নত অর্থনীতি কার্বন নির্গমন হ্রাসের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা তারা পালন করেনি। শুধু জলবায়ু অর্থায়ন নয়, প্রযুক্তি হস্তান্তর বিষয়েও উন্নয়নশীল দেশগুলোকে তারা যে আশ্বাস দিয়েছিল, তা প্রত্যাখ্যান করেছে।
জলবায়ু অর্থায়ন প্রতিশ্রুতি ১২ বছরের পুরনো। কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত কপ১৫ সম্মেলনে উন্নত অর্থনীতির দেশগুলো অঙ্গীকার করেছিল যে উন্নয়নশীল বিশ্বকে তারা জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবেলার জন্য প্রতি বছর ১০০ বিলিয়ন ডলার করে সহযোগিতা দেবে। এরপর ২০১৫ সালে প্যারিস চুক্তিতে বিষয়টি আরো স্পষ্ট করা হয় যে উন্নয়নশীল প্রতিটি দেশেরই এ সহযোগিতা প্রাপ্তির অধিকার রয়েছে। তবে ১০০ বিলিয়ন ডলার খুব একটা বেশি নয়, পরিমাণটি উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রকৃত প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য। জলবায়ু বিপর্যয় মোকাবেলায় তাদের প্রয়োজন ট্রিলিয়ন ডলার পরিমাণ অর্থ। যা কভিড-১৯ মহামারী চলাকালীন উন্নত দেশগুলো তাদের অর্থনীতি বাঁচাতে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করেছে, তার তুলনায়ও সামান্য।
কিন্তু উন্নত বিশ্ব ১০০ বিলিয়ন ডলার সাহায্যের ন্যূনতম অঙ্গীকারটিও পূরণ করেনি। ২০১৯ সালে উন্নয়নশীল দেশগুলোয় প্রদত্ত মোট অর্থায়নের পরিমাণ ছিল ৮০ বিলিয়ন ডলারেরও কম; কেননা ২০১৩ সাল থেকে প্রতি বছর গড়ে প্রয়োজন ছিল ৬৭ বিলিয়ন ডলার। পরিসংখ্যানটি উন্নত দেশের সরকারগুলোর প্রকৃত প্রবাহ স্পষ্টভাবে তুলে ধরে, জলবায়ুবিষয়ক দ্বিপক্ষীয় আর্থিক সহায়তা (প্যারিস চুক্তি অনুসারে উন্নয়নশীল বিশ্বকে যা সরবরাহ করা উচিত ছিল) তা থেকে গড়ে ২৭ বিলিয়ন ডলার কম। বাকি অর্থায়নটা এসেছে বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠান থেকে—উন্নয়ন ব্যাংক কিংবা ব্যক্তি খাত। হাস্যকর বিষয় হচ্ছে, ধনী দেশের সরকারগুলো এর কৃতিত্বও নিজেদের ঝুলিতে রাখতে চেয়েছিল। ধনী দেশগুলোর সামান্য অর্থায়নের বিপরীতে ২০১৭ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী জীবাশ্ম জ্বালানিতে ভর্তুকির পরিমাণ ছিল ৫৫৫ বিলিয়ন ডলার।
একইভাবে সবুজ প্রযুক্তি হস্তান্তরে ধনী বিশ্বের প্রতিশ্রুতির বিষয়টি নিছক মুখের কথায় পরিণত হয়েছে। এদিকে উন্নত দেশের সরকারগুলো দেশীয় কোম্পানিগুলোকে বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তির অধিকারকে নিজেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার অনুমতি দেয়, যা জলবায়ু প্রশমন ও অভিযোজনের জন্য প্রযুক্তি ও জ্ঞানের বিস্তার বাধাগ্রস্ত করে। চীন ও ভারতের মতো দেশগুলো যখন তাদের পুনর্নবায়নযোগ্য জ্বালানি শিল্পকে উৎসাহিত করার চেষ্টা করছে, তখন উন্নত কিছু দেশ, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র তাদের বিরুদ্ধে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার কাছে অভিযোগ করেছে।
আমাদের মনে রাখতে হবে অদূরদর্শী কৌশলগুলো শেষ পর্যন্ত কারোরই উপকারে আসবে না। কারণ এটি কেবলই পৃথিবী নামক গ্রহের ধ্বংস ও প্রকৃতির প্রতিশোধকে ত্বরান্বিত করে। বিশ্বনেতাদের অদূরদর্শী দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে গ্লাসগোয় শিক্ষার্থী ও সমাজকর্মীদের প্রতিবাদ মিছিল ছিল গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম। কিন্তু সম্মেলন শেষ, তাই বিশ্বনেতাদের আশপাশে এখন এমন কেউ নেই, যারা তাদের সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য চাপ প্রয়োগ করতে পারেন।
তাছাড়া সমস্যা হলো শক্তিশালী করপোরেট স্বার্থ স্পষ্টভাবে রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে জড়িত। তাই বিশ্বজুড়ে সবাইকে বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশের মানুষদের জলবায়ু পারিবর্তন মোকাবেলায় অর্থপূর্ণ পদক্ষেপ ও অর্থনৈতিক কৌশলের প্রকৃত পরিবর্তনের ওপর জোর দেয়ার জন্য আরো বেশি সোচ্চার হতে হবে এবং উদ্যোগগুলো দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে অন্যান্য স্থানে ছড়িয়ে দিতে হবে। শুধু এ-জাতীয় উদ্যোগই ধনী বিশ্বের জলবায়ুবিষয়ক কপটতা থেকে আমাদের রক্ষা করতে পারে।
[স্বত্ব:
প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
]
জয়তী ঘোষ: ভারতের জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক
ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইকোনমিকস অ্যাসোসিয়েটসের এক্সিকিউটিভ সেক্রেটারি ও ইনডিপেনডেন্ট কমিশন ফর দ্য রিফর্ম অব ইন্টারন্যাশনাল করপোরেট ট্যাক্সেশনের সদস্য
ভাষান্তর: রুহিনা ফেরদৌস