মক্কা যৌথপ্রতিরক্ষা চুক্তি বাংলাদেশের জন্য নতুন ভূ-অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার

২০২৬ সালের ৭ আগস্ট সৌদি আরবের মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি হলো সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি ত্রিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা চুক্তি। এটি ৭ আগস্ট ২০২৬ মক্কায় স্বাক্ষরিত হয়।

সাফা প্রাসাদে সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমান, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের উপস্থিতিতে স্বাক্ষরিত হয়েছে এ ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ (এমজেডিএ)।

বাহ্যিকভাবে এটি একটি সম্মিলিত সামরিক ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও এর অর্থনৈতিক ও ভূ-অর্থনৈতিক গুরুত্ব কোনো অংশে কম নয়। ন্যাটোর ‘আর্টিকেল ৫’-এর আদলে তৈরি এ চুক্তির মূল কথা হলো জোটভুক্ত যেকোনো একটি দেশের ওপর হামলা হলে তা সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচিত হবে। এ যুগান্তকারী চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর পরই আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক রাজনীতিতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে বাংলাদেশের নাম।

কয়েক দশক ধরে বিশ্ব অর্থনীতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা মূলত কয়েকটি বড় বলয়ের ভেতর সীমাবদ্ধ থেকেছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ায় এক ধরনের ‘মাল্টিপোলার’ বা বহুমুখী মেরুকরণ দেখা যাচ্ছে, যেখানে আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলো নিজেদের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সুরক্ষার জন্য পশ্চিমা প্রভাবমুক্ত বিকল্প জোট গঠনে আগ্রহী হয়ে উঠেছে মক্কা চুক্তি এ বাস্তবতারই সবচেয়ে বড় প্রমাণ

বাংলাদেশের নবনিযুক্ত পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির সম্প্রতি গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, বাংলাদেশ এ জোটে যোগ দেয়ার বিষয়টিকে অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে দেখছে এবং এ নিয়ে নীতিগত পর্যায়ে আলোচনা চলছে। এমন এক সময়ে এ আলোচনা উঠছে, যখন বাংলাদেশ তার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার পটভূমিতে একটি নতুন অর্থনৈতিক গতিপথ খুঁজছে। প্রশ্ন হচ্ছে, সম্পূর্ণ সামরিক কাঠামোর এ ‘মক্কা চুক্তি’ বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য কীভাবে একটি বড় ধরনের অর্থনৈতিক সিঁড়ি হয়ে উঠতে পারে?

কয়েক দশক ধরে বিশ্ব অর্থনীতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা মূলত কয়েকটি বড় বলয়ের ভেতর সীমাবদ্ধ থেকেছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ায় এক ধরনের ‘মাল্টিপোলার’ বা বহুমুখী মেরুকরণ দেখা যাচ্ছে, যেখানে আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলো নিজেদের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সুরক্ষার জন্য পশ্চিমা প্রভাবমুক্ত বিকল্প জোট গঠনে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। মক্কা চুক্তি এ বাস্তবতারই সবচেয়ে বড় প্রমাণ। ঐতিহাসিকভাবে দেখা গেছে, যেকোনো বড় নিরাপত্তা বা প্রতিরক্ষা জোটের পেছনে একটি গভীর অর্থনৈতিক এজেন্ডা কাজ করে। কোল্ড ওয়ারের সময় গঠিত ‘বাগদাদ প্যাক্ট’ কিংবা ইউরোপের ‘ন্যাটো’—প্রতিটি সামরিক জোটই পরবর্তী সময়ে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে অবাধ বাণিজ্য, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং বিশেষ অর্থনৈতিক সুবিধার দুয়ার খুলে দিয়েছিল। মক্কা চুক্তির তিন প্রধান অংশীদারকে লক্ষ করলে দেখা যায়, সৌদি আরবের রয়েছে বিপুল খনিজ সম্পদ ও মূলধন, তুরস্কের রয়েছে উন্নত শিল্প ও সামরিক প্রযুক্তি এবং পাকিস্তানের রয়েছে বিশাল মানবসম্পদ ও সমৃদ্ধ সামরিক অবকাঠামো। এ তিন শক্তির মেলবন্ধন কেবল সামরিক নয়, বরং একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক অক্ষ তৈরি করছে। বাংলাদেশ যদি এ অক্ষের অংশ হতে পারে, তবে তা দেশের ভঙ্গুর রিজার্ভ, বৈদেশিক বিনিয়োগের সংকট এবং রফতানি বাজারের বহুমুখীকরণে একটি অনন্য ভূমিকা পালন করবে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স। রেমিট্যান্সের সিংহভাগই আসে মধ্যপ্রাচ্য, বিশেষ করে সৌদি আরব থেকে। তবে দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে বাংলাদেশ মূলত অদক্ষ বা আধা-দক্ষ শ্রমিক প্রেরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। ফলে প্রতিযোগী দেশগুলোর (যেমন ভারত বা পাকিস্তান) তুলনায় আমাদের শ্রমিকদের গড় আয় অনেক কম। মক্কা চুক্তিতে যোগদানের মাধ্যমে বাংলাদেশ এ শ্রমবাজারে এক বিশাল গুণগত পরিবর্তন আনতে পারে।

দীর্ঘদিনের সংঘাতের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ এবং আফ্রিকার কিছু অঞ্চলে ব্যাপক অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও পুনর্গঠনের প্রয়োজন হবে। সড়ক, আবাসন, বিদ্যুৎ, বন্দর, শিল্পাঞ্চল এবং অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণে বিপুল ব্যবসায়িক সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। এ পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ কেবল শ্রমিক পাঠানোর দেশ হিসেবে নয়, বরং দক্ষ প্রকৌশলী, কারিগরি কর্মী, নির্মাণ প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন সেবা খাতের অংশীদার হিসেবে নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে পারে

পাকিস্তান এরই মধ্যে সৌদি আরবের সঙ্গে ২০২৫ সালের দ্বিপক্ষীয় পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় সৌদি আরবে প্রায় আট হাজার সৈন্য, জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান স্কোয়াড্রন, ড্রোন ও এইচকিউ-৯ এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম মোতায়েন করেছে। এ মোতায়েনকৃত সদস্যদের ন্যূনতম মাসিক বেতন বাংলাদেশী টাকায় কয়েক লাখ টাকা হবে। বাংলাদেশ বিশ্বজুড়ে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে দীর্ঘ সময় ধরে অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে কাজ করে আসছে। আমাদের নিরাপত্তা বাহিনীর এ বৈশ্বিক সুনামকে দ্বিপক্ষীয় বা বহুপক্ষীয় অর্থনৈতিক চুক্তির মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে কাজে লাগানো সম্ভব। মক্কা চুক্তির অংশীদার হিসেবে বাংলাদেশ যদি সৌদি আরব ও উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্থাপনাগুলোর সুরক্ষায় প্রশিক্ষিত জনবল বা নন-কমব্যাট কারিগরি কর্মী পাঠাতে পারে, তবে তা রেমিট্যান্স প্রবাহে এক অভূতপূর্ব জোয়ার সৃষ্টি করবে। এটি কেবল প্রচলিত অদক্ষ শ্রমিকের ওপর নির্ভরতা কমাবে না, বরং উচ্চ আয়ের এক নতুন পেশাদার শ্রমবাজারের দুয়ার উন্মোচন করবে, যা সরাসরি জিটুজি বা সরকারি পর্যায়ে নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য ও শোষণ থেকে মুক্ত থাকবে।

বর্তমানে বাংলাদেশ তীব্র বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, রিজার্ভের পতন এবং মূল্যস্ফীতির চাপে জর্জরিত। এ পরিস্থিতিতে দেশের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ এবং সহজ শর্তে ঋণের কোনো বিকল্প নেই। মক্কা চুক্তির আর্থিক চালিকাশক্তি হলো সৌদি আরব। এ চুক্তির কৌশলগত গুরুত্বের কারণে সৌদি আরব সম্প্রতি তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী পাকিস্তানকে ৩ বিলিয়ন ডলারের সরাসরি আর্থিক সহায়তা করেছে। বাংলাদেশ যদি এ প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত জোটে যোগ দেয়, তবে তা সৌদির সঙ্গে ঢাকাকে কেবল একটি ‘উন্নয়ন অংশীদার’ থেকে উন্নীত করে ‘কৌশলগত অংশীদার’-এ পরিণত করবে। ফলে বাংলাদেশ সৌদি ফান্ড ফর ডেভেলপমেন্ট, ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক এবং সৌদি পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড থেকে অনেক বড় অংকের তহবিল ও সহজ শর্তে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ পেতে পারে। এছাড়া তুরস্কের মতো উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তির সঙ্গে যৌথ শিল্প উদ্যোগ এবং বাংলাদেশে সরাসরি তুর্কি বিনিয়োগের হার বহুগুণ বাড়বে। বর্তমানের ডলার সংকট মোকাবেলায় সৌদি আরবের সঙ্গে কারেন্সি সোয়াপ বা দেরিতে মূল্য পরিশোধের শর্তে জ্বালানি তেল আমদানির মতো বড় সুযোগগুলোও এ চুক্তির মাধ্যমে সহজে আদায় করা সম্ভব হবে।

বাংলাদেশের জন্য রোহিঙ্গা সংকটও এ চুক্তির সম্ভাব্য কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব বাড়িয়ে দিতে পারে। রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলায় যেসব দেশ বাংলাদেশকে উল্লেখযোগ্য সহায়তা দিয়ে আসছে, তাদের মধ্যে সৌদি আরব ও তুরস্ক গুরুত্বপূর্ণ। এ দুই রাষ্ট্র যদি একই কৌশলগত জোটের অংশ হয় এবং বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক সহযোগিতা আরো গভীর হয়, তাহলে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও টেকসই প্রত্যাবাসনের প্রশ্নে নতুন কূটনৈতিক চাপ ও সমন্বয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে রাখাইন অঞ্চলে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা এবং বাংলাদেশের সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সৌদি আরব ও তুরস্কের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রভাব বাংলাদেশের জন্য কাজে লাগানোর সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনাগুলোর একটি হলো যুদ্ধ-পরবর্তী মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার পুনর্গঠন। দীর্ঘদিনের সংঘাতের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ এবং আফ্রিকার কিছু অঞ্চলে ব্যাপক অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও পুনর্গঠনের প্রয়োজন হবে। সড়ক, আবাসন, বিদ্যুৎ, বন্দর, শিল্পাঞ্চল এবং অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণে বিপুল ব্যবসায়িক সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। এ পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ কেবল শ্রমিক পাঠানোর দেশ হিসেবে নয়, বরং দক্ষ প্রকৌশলী, কারিগরি কর্মী, নির্মাণ প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন সেবা খাতের অংশীদার হিসেবে নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি দীর্ঘদিন ধরেই অস্থিতিশীল ছিল, তবে সাম্প্রতিক চুক্তিগুলোর মাধ্যমে এ অঞ্চলে একটি স্থায়ী শান্তির পরিবেশ তৈরির চেষ্টা চলছে। ইয়েমেন যুদ্ধ বন্ধ হওয়া বা সিরিয়া ও ইরাকের মতো যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলোর পুনর্গঠন প্রক্রিয়া এখন সময়ের দাবি। মক্কা চুক্তির অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হলো এ অঞ্চলে সম্মিলিতভাবে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, যা পরবর্তী সময়ে এক বিশাল নির্মাণ ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের জোয়ার সৃষ্টি করবে। সৌদি আরবের ‘ভিশন ২০৩০’ প্রকল্পের অধীনে ‘নিওম সিটি’ (এনইওএম) সহ ট্রিলিয়ন ডলারের মেগা প্রজেক্ট বাস্তবায়ন হচ্ছে। এ বিশাল অবকাঠামোগত পুনর্গঠনে তুরস্কের রয়েছে বিশ্বমানের নির্মাণ বা কনস্ট্রাকশন জায়ান্ট কোম্পানি এবং সৌদি আরবের রয়েছে অফুরন্ত অর্থ। বাংলাদেশ যদি এ জোটের অংশীদার হয়, তবে বাংলাদেশী বেসরকারি কনস্ট্রাকশন ফার্ম, প্রকৌশলী এবং রিয়েল এস্টেট কোম্পানিগুলো তুরস্ক ও সৌদি আরবের মেগা প্রজেক্টগুলোয় সাব-কন্ট্রাক্টিংয়ের মাধ্যমে কাজ করার সুযোগ পাবে। এটি কেবল আমাদের শ্রমিকদের জন্য কাজের সুযোগ তৈরি করবে না, বরং বাংলাদেশী করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর বৈশ্বিক সক্ষমতা ও মুনাফা বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। এটি আমাদের অর্থনীতিকে শ্রমনির্ভর থেকে জ্ঞান ও সেবানির্ভর অর্থনীতির দিকে ধাবিত করতে সাহায্য করবে।

একটি দেশের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব ধরে রাখার জন্য তার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন অত্যন্ত জরুরি। বাংলাদেশের ‘ফোর্সেস গোল’ অর্জনের জন্য অত্যাধুনিক সামরিক সরঞ্জাম ক্রয় করতে গিয়ে প্রতি বছর বিশাল অংকের বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করতে হয়। মক্কা চুক্তির আরেক অংশীদার তুরস্ক বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ সামরিক প্রযুক্তি উৎপাদনকারী দেশ। তাদের তৈরি বাইরাক্তার ড্রোন, কান (কেএএএন) ফাইটার জেট কিংবা আধুনিক নৌ-জাহাজ আজ বিশ্ববাজারে সমাদৃত। বাংলাদেশ যদি এ চুক্তিতে যোগ দেয়, তবে তা কেবল সমরাস্ত্র আমদানির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, অংশীদার দেশগুলোর মধ্যে প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং যৌথ অস্ত্র উৎপাদনের চমৎকার সুযোগ তৈরি হবে। বাংলাদেশে যদি তুর্কি প্রযুক্তির সহায়তায় যৌথভাবে হালকা অস্ত্র, ড্রোন বা আধুনিক সামরিক সরঞ্জাম তৈরির কারখানা স্থাপন করা সম্ভব হয়, তবে তা দেশের অভ্যন্তরে হাজার হাজার দক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে। একই সঙ্গে, প্রতিরক্ষা বাজেটের একটি বড় অংশ দেশের ভেতরেই আবর্তিত হবে এবং ভবিষ্যতে বাংলাদেশ এ সরঞ্জামগুলো অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশে রফতানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারবে।

মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদানের খবর আসার পর থেকেই প্রতিবেশী ভারতের কূটনৈতিক ও নীতিনির্ধারণী মহলে এক ধরনের অস্বস্তি লক্ষ করা যাচ্ছে। ভারতের অন্যতম প্রধান উদ্বেগের কারণ হলো এ জোটে পাকিস্তানের উপস্থিতি এবং বাংলাদেশের সঙ্গে ইসলামাবাদের নতুন করে নিরাপত্তা অংশীদারত্ব তৈরি হওয়া। তবে বাংলাদেশের জন্য এটি বুঝতে হবে, আমাদের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি হলো—‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়’। এ জোট কোনো নির্দিষ্ট তৃতীয় দেশের বিরুদ্ধে সামরিক অক্ষ নয়, বরং এটি একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ফ্রেমওয়ার্ক। ভারত বাংলাদেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও ভৌগোলিক অংশীদার এবং ঢাকা কখনই নয়াদিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করতে চাইবে না। কিন্তু একই সঙ্গে বাংলাদেশের সার্বভৌম অর্থনৈতিক স্বার্থের তাগিদে বৈশ্বিক মূলধন ও উন্নয়ন সহায়তার অন্য উৎসগুলোকে কাজে লাগাতে হবে। সৌদি আরব বা তুরস্কের মতো শক্তিশালী অর্থনৈতিক বলয়ের সঙ্গে যুক্ত হওয়া বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্যই অপরিহার্য। ঢাকা অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গ ভারতকে আশ্বস্ত করতে পারে যে, মক্কা চুক্তিতে অংশগ্রহণ কোনোভাবেই দ্বিপক্ষীয় ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলবে না। একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও স্বাধীন অর্থনৈতিক কূটনীতির মাধ্যমে বাংলাদেশ এ ভূরাজনৈতিক জট সফলভাবে খুলতে পারে।

মক্কা চুক্তির অর্থনৈতিক সম্ভাবনাগুলো যতই আকর্ষণীয় মনে হোক না কেন, বাংলাদেশকে এ জোটে প্রবেশের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্ক ও হিসেবি হতে হবে। অতীতে দেখা গেছে, বাংলাদেশ বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় বা বহুপক্ষীয় চুক্তিতে স্বাক্ষর করলেও নিজস্ব দরকষাকষির দুর্বলতার কারণে কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক সুবিধা আদায় করতে পারেনি। মক্কা চুক্তিতে যোগদানের পূর্বে আমাদের পররাষ্ট্র ও অর্থ মন্ত্রণালয়কে একটি সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক রোডম্যাপ বা ‘কৌশলগত খসড়া’ তৈরি করতে হবে। প্রথমত, আমাদের সুনির্দিষ্টভাবে দরকষাকষি করতে হবে যেন আমাদের শান্তিরক্ষী বা নিরাপত্তা কর্মীদের জন্য উচ্চ বেতনের কোটা নিশ্চিত করা হয়। দ্বিতীয়ত, সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগের (এফডিআই) গ্যারান্টি এবং শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধার বিষয়গুলো চুক্তির প্রোটোকলে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তৃতীয়ত, কোনো অবস্থায়ই বাংলাদেশ যেন মধ্যপ্রাচ্যের কোনো জটিল ও ক্ষতিকর প্রক্সি যুদ্ধে সরাসরি জড়িয়ে না পড়ে, সেই আইনি বা কৌশলগত ছাড় নিশ্চিত করতে হবে। সামরিক সহায়তার বিষয়টি যেন কেবল শান্তিরক্ষা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও যৌথ প্রশিক্ষণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।

বাংলাদেশকে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে, এ জোটের মাধ্যমে যেন কখনো ইরানের জনগণের ওপর কোনো অন্যায় না করা হয়। একই সঙ্গে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক শান্তি-মধ্যস্থতার ভূমিকা কাজে লাগানো জরুরি। ইরান–ইরাক যুদ্ধের সময় ১৯৮২ সালে শাইখুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হকসহ বাংলাদেশের একদল আলেম শান্তির বার্তা নিয়ে দুই দেশ সফর করেছিলেন। সেই ঐতিহ্য থেকেই মক্কা প্যাক্টে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা ও স্বাধীন ফিলিস্তিনের প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

পরিশেষে, ২০২৬ সালের মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি কেবল একটি সামরিক জোট নয়, এটি মূলত মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার এক নতুন ভূ-অর্থনৈতিক সংযোগসূত্র। বাংলাদেশ যদি তার রিজার্ভ সংকট দূর করতে চায়, প্রবাসী আয়কে বহুমুখী ও উচ্চ আয়ের খাতে রূপান্তর করতে চায় এবং বৈশ্বিক মূলধনের নতুন উৎসগুলোর সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত হতে চায়, তবে মক্কা চুক্তিতে অংশগ্রহণ হতে পারে এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত। প্রতিবেশী বা কোনো পরাশক্তির চাপে নিজের অর্থনৈতিক অগ্রগতির পথকে অবরুদ্ধ না করে, বাংলাদেশকে সাহসী ও দূরদর্শী কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এ সময়োপযোগী উদ্যোগ যদি সফলভাবে বাস্তবায়ন হয়, তবে তা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে। সঠিক দরকষাকষি ও জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি আমাদের অর্থনৈতিক মুক্তি ও সার্বভৌমত্বকে আরো সুদৃঢ় করবে, যা আজ সময়ের দাবিও বটে।

আকরাম হুসাইন: জাতীয় নাগরিক পার্টির রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য

আরও