পাঁচ মাসেও গঠন হয়নি নতুন নদী রক্ষা কমিশন

দেশের নদ-নদী রক্ষায় শক্তিশালী কমিশন গঠন করা দরকার

জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আইন প্রণীত হয় ২০১৩ সালে। এর পরের বছর ২০১৪ সালে উচ্চ আদালতের নির্দেশে গঠন হয় জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন (এনআরসিসি)।

জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আইন প্রণীত হয় ২০১৩ সালে। এর পরের বছর ২০১৪ সালে উচ্চ আদালতের নির্দেশে গঠন হয় জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন (এনআরসিসি)। এনআরসিসির কাজ হচ্ছে দেশের নদ-নদীর দখল-দূষণ রোধের পাশাপাশি স্বাভাবিক নাব্যতা বজায় রাখতে দায়িত্বশীল ও কার্যকর ভূমিকা রাখা। আইন অনুসারে একজন চেয়ারম্যান ও একজন নারী সদস্যসহ ন্যূনতম পাঁচজন নিয়ে কমিশন গঠন হবে। এছাড়া কমিশনকে সহযোগিতা করতে একজন সচিব, একজন পরিচালকসহ মোট ১৫ কর্মকর্তা থাকার কথা। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার গত বছরের মার্চে কমিশনের চেয়ার‍ম্যান হিসেবে একজনকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়। গণ-অভ্যুত্থানে বিগত সরকারের পতনের পর সেপ্টেম্বরের শুরুতে এ নিয়োগ বাতিলের ঘোষণা দেয় অন্তর্বর্তী সরকার। এর পর থেকে কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের পাশাপাশি সচিব, পরিচালক, হাইড্রোলজিস্ট, মরফোলজিস্ট ও সহকারী জীববিজ্ঞান কর্মকর্তার পদও শূন্য রয়েছে। সব মিলিয়ে বর্তমানে এনআরসিসি কার্যত অকার্যকর প্রতিষ্ঠানে রূপ নিয়েছে। বিগত সময়ে এ কমিশনকে নদী রক্ষায় দখলদার ও দূষণকারীদের বিরুদ্ধে তেমন কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। এমনকি নদ-নদীর সংখ্যাও সঠিকভাবে নিরূপণ করতে পারেনি। বর্তমান সরকারে পরিবেশ বিষয়ে সচেতন একাধিক উপদেষ্টা রয়েছেন। অনেকেই প্রত্যাশা করেছিলেন কমিশনকে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা হবে। নদী দখল ও দূষণের বিরুদ্ধে কঠোর ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো নতুন কমিশনই গঠন করতে পারেনি, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। কমিশন না থাকায় নদ-নদীগুলোকে দখলমুক্ত করাসহ এগুলোর সুরক্ষা কার্যক্রমে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটছে। দেশের নদ-নদীগুলোকে দখল, দূষণ ও নাব্য সংকট থেকে সুরক্ষা দিতে একটি নতুন শক্তিশালী কমিশন গঠনে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া উচিত সরকারের।

বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে নদীমাতৃক দেশ হিসেবে পরিচিত। আবহমানকাল থেকে এ দেশের কৃষি-মৎস্য খাত থেকে শুরু করে ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য যোগাযোগ ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে জালের মতো বিছিয়ে থাকা নদ-নদী। নদীকে কেন্দ্র করে আমাদের সভ্যতার বিকাশ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটলেও নদী সব সময়ই উপেক্ষিত থেকে গেছে। নিত্য দূষণ, দখল আর অপরিকল্পিত নগরায়ণের থাবায় নদী বারবার আক্রান্ত হয়েছে। বেশির ভাগই দখল-দূষণে আজ মৃতপ্রায় অবস্থায়। কতগুলো পরিণত হয়েছে ভাগাড়ে। আর কতগুলো বিলীন হয়ে গেছে তা বলা মুশকিল। আবার নদীর সঠিক সংখ্যা নিয়ে আজও কেউ বা কোনো প্রতিষ্ঠান ঐকমত্যে পৌঁছতে পারেনি। নদ-নদীর চূড়ান্ত সংখ্যা বের করার দায়িত্ব জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের হলেও বিগত সময়ে প্রতিষ্ঠানটির দেয়া তালিকা নির্ভুল নয় বলে দাবি অনেকের।

দেশে নদ-নদীর প্রকৃত সংখ্যা নিরূপণে ২০১৯ সালে তালিকা প্রণয়ন শুরু করে এনআরসিসি। প্রায় চার বছর কাজ শেষে ২০২৩ সালের আগস্টে সংস্থাটির ওয়েবসাইটে ৯০৭টি নদ-নদীর খসড়া তালিকা প্রকাশ হয়। এ সংখ্যা নিয়ে সে সময়ই প্রশ্ন তোলেন নদী গবেষকরা। এমনকি সরকারি-বেসরকারি অন্যান্য সংস্থার প্রকাশিত নদ-নদীর তথ্যের সঙ্গেও এনআরসিসির খসড়ার তথ্যের গরমিল ছিল। পরবর্তী সময়ে নদ-নদীর তালিকার ওপর মতামত ও আপত্তি আহ্বান করে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তিও দেয় কমিশন। ওইসব মতামত ও আপত্তি নিষ্পত্তি করে ১ হাজার আটটি নদীর তালিকা প্রাথমিকভাবে চূড়ান্ত করা হয়। তার পরও কিছু আপত্তি রয়েই যায়। বস্তুত দেশে নদ-নদীর সংখ্যা কত এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে। তবে নদী গবেষকদের দাবি, দেশে নদ-নদী রয়েছে ১ হাজার ৬০০-এর বেশি। 

দেশে নদ-নদী অবৈধ দখল ও দূষণ নতুন কিছু নয়। যুগের পর যুগ ধরে এক শ্রেণীর প্রভাবশালী এ কাজ করে আসছে। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দল সংশ্লিষ্ট ও এলাকার প্রভাবশালীরা এ কাজে জড়িত। নদীর অবৈধ দখল-দূষণে শত শত নদ-নদী দেশের মানচিত্র থেকে হারিয়ে গেছে। দেশের প্রধান নদী পদ্মা, মেঘনা, যমুনা ও ব্রহ্মপুত্রের অসংখ্য শাখা নদী জালের মতো ছড়িয়ে রয়েছে। এসব নদ-নদী বছরের পর বছর ধরে অবৈধ দখল ও দূষণের শিকার হচ্ছে। অবৈধ দখলের কারণে অনেক নদী বিলীন হয়ে গেছে। সেখানে জনবসতি গড়ে উঠেছে। বসতি গড়ে ওঠায় সেখানে যে এক সময় নদী ছিল, বোঝা যায় না। অথচ আমাদের দেশের ভৌগোলিক গঠন ও ধরন অনুযায়ী নদীই হচ্ছে প্রাণ ও সজীব রাখার মূল উৎস। নদীমাতৃক বাংলাদেশের অর্থনীতি ও কৃষিপণ্যের উৎপাদন-বিপণনের সঙ্গে নদীর সম্পর্ক ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একদিকে উজান থেকে ভারতের পানি প্রত্যাহার, অন্যদিকে দেশের প্রভাবশালীদের অবৈধ দখলের কারণে দেশের নদ-নদী একের পর এক বিলীন হয়ে যাচ্ছে। জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন পর্যায়ে নদী দখল ও দূষণের শিকার হচ্ছে। এতে যেমন দেশে পানি সংকট দেখা দিচ্ছে, তেমনি প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। দেশ সজীবতা হারাচ্ছে। এরই মধ্যে দেশের উত্তরাঞ্চলে মরুকরণ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। অবৈধ দখল ও দূষণে বহু নদী নাব্যতা হারিয়ে নালায় পরিণত হয়েছে। বিগত সরকারের আমলে নদী রক্ষায় সরকার জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন গঠন করলেও কমিশন রক্ষা করতে পারেনি। আর এখন তো কমিশনই অকার্যকর রয়েছে। নদীর অবৈধ দখল ও এর স্বাভাবিক গতি ব্যাহত করার ক্ষেত্রে আইন থাকলেও তার কোনো প্রয়োগ নেই। অবৈধ দখল ও দূষণকারীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে, এমন কোনো নজির নেই।

অস্বীকার করার উপায় নেই, নদ-নদী অবৈধ দখলের ক্ষেত্রে ক্ষমতাসংশ্লিষ্ট প্রভাবশালীরা জড়িয়ে রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গেলে নানা বাধার মুখে পড়তে হয়। নদ-নদী কারো ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয় যে তা দখল করে রাখবে। এগুলো রাষ্ট্রীয় সম্পদ। রাষ্ট্রীয় সম্পদ কেউ অবৈধভাবে দখল করে রাখবে এবং তার বিরুদ্ধে সরকার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে কুণ্ঠিত বা দ্বিধান্বিত হবে, তা হতে পারে না। বিগত সময়ে নদ-নদী অবৈধ দখলকারীদের যে তালিকা নদী কমিশন তৈরি করেছিল, সে অনুসারে ব্যবস্থা নিতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী ও কার্যকর নতুন জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন গঠন। এরপর অনতিবিলম্বে অবৈধ দখলকারী ও দূষণকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। অবৈধ দখলকারী যতই প্রভাবশালী হোক না কেন তাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স দেখাতে হবে। নদ-নদী কিছু লোকের অবৈধ দখল-দূষণের কবলে পড়ে মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে, প্রকৃতির অপূরণীয় ক্ষতি হবে তা কোনোভাবে মেনে নেয়া যায় না।

এখন প্রথমেই দরকার একটি শক্তিশালী ও কার্যকর জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন গঠন। এ সরকারের আমলে এই কমিশনের কাজ হবে যেসব নদ-নদী দখল-দূষণমুক্ত হয়েছে সেগুলোকে উদ্ধার করে পুনরায় পানিপ্রবাহের ব্যবস্থা করা। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি মেনে ড্রেজিংয়ের ব্যবস্থা করে নাব্যতা ফেরানো। নদ-নদীর সঠিক সংখ্যা নিরূপণ করা। নদ-নদী এ দেশের মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। নদী বাঁচলে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হবে।

আরও