কয়েক সপ্তাহ ধরে বাংলাদেশ থেকে আকাশপথে রফতানি পণ্য পরিবহনের চাহিদা নজিরবিহীনভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে পরিবহনের অপেক্ষায় থাকা পণ্যের বিশাল জট সৃষ্টি হয়েছে। কার্গো ভিলেজের সর্বত্র রফতানি পণ্যের স্তূপ এখন দৃশ্যমান। আসন্ন ক্রিসমাস ও শীতকালীন চাহিদা মেটাতে বাংলাদেশের গার্মেন্ট ক্রেতারা পণ্যসামগ্রী দ্রুত প্রেরণের জন্য এয়ার কার্গো পরিবহন ব্যবহার করলেও কেবল এটাই বর্তমান চাহিদা বৃদ্ধির কারণ নয়। কনটেইনারস্বল্পতার ফলে চট্টগ্রাম বন্দরে চলমান পণ্যজটের কারণেও ক্রেতাদের কাছে নির্ধারিত সময়ে পণ্য পৌঁছার জন্য অনেক রফতানিকারক সমুদ্র পরিবহনের পরিবর্তে আকাশ পরিবহন ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন। বন্দরের বর্তমান পরিস্থিতিতে অর্ডার বাতিলের ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য রফতানিকারকদের এর কোনো বিকল্প নেই।
শুধু এয়ারফ্রেইটের চাহিদা বেড়ে যাওয়া বর্তমান পণ্যজটের একমাত্র কারণ বলা যাবে না। থার্ড টার্মিনালের জন্য কার্গো ভিলেজ ও আশপাশে নির্মাণকাজের কারণে পণ্যবাহী ট্রাক চলাচলের সীমাবদ্ধতা, ট্রাক থেকে পণ্য নামানোর জায়গার অভাব এবং সেখানে কাজ করা একাধিক কর্তৃপক্ষের অবহেলা ও অব্যবস্থাপনাও বর্তমান অবস্থা সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখছে।
ফলে কার্গো ভিলেজে খালাসের জন্য যাওয়া ট্রাকের সারি দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। পণ্য খালাস করতে গড়ে একটি ট্রাকের দু-তিনদিন সময় লাগছে। ফরোয়ার্ডাররা কারখানা ও নিজস্ব ওয়্যারহাউজ থেকে শিপমেন্ট আনতে হিমশিম খাচ্ছে। পণ্য খালাসে দীর্ঘ সময় ব্যয় হওয়ার কারণে ট্রাকচালকরা উচ্চ পরিবহন ভাড়া এবং অলস সময়ের জন্য অর্থ দেয়া সত্ত্বেও বিমানবন্দরে আসতে অনিচ্ছুক।
কার্গো ভিলেজে রফতানি পণ্যের বাধ্যতামূলক স্ক্যানিং করাও একটি ব্যয়সাপেক্ষ ও পীড়াদায়ক বিষয়। রফতানি কার্গো ভিলেজে ছয়টি স্ক্যানিং মেশিন স্বাভাবিক সময়ের ভলিউমের জন্যও পর্যাপ্ত নয়। ইউএলডি স্ক্যানিং মেশিনের অনুপস্থিতিতে পৃথকভাবে প্রতিটি কার্টুন স্ক্যানিং করতে হয়। এভাবে একটি চালান সম্পূর্ণ করতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হয়। তাছাড়া ছয়টি স্ক্রিনিং মেশিনের মধ্যে তিন-চারটি প্রায়ই বিকল থাকে। ফলে স্ক্যানিং এলাকায় সবসময় পণ্যভর্তি ট্রলির দীর্ঘ সারি ও কার্গোর স্তূপ দেখা যায়। বেশির ভাগ সময় ইডিএস (এক্সপ্লোসিভ ডিটেকশন সিস্টেম) মেশিনগুলো বিকল থাকে। শুধু স্ক্রিনিং বিলম্বের কারণে মাঝে মাঝে এয়ারলাইনসে সময়মতো কার্গো হস্তান্তর করা সম্ভব হয় না। ফলে ফরোয়ার্ডাররা বুকিং মিস করছে, শিপাররা আগমনের সময়সীমা পূরণ করতে ব্যর্থ হওয়ায় ক্রয়াদেশ বাতিলের মুখোমুখি হচ্ছে, এয়ারলাইনস আয় হারাচ্ছে এবং দেশের রফতানি আয় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
আধুনিক যন্ত্রপাতি ও পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার অভাবে কার্গো ভিলেজে হ্যান্ডলিং ব্যবস্থা সময়সাপেক্ষ। পর্যাপ্ত লোডিং সরঞ্জামের অভাবে ও টো ডলির স্বল্পতায় সময়মতো বিমানে পণ্য পৌঁছাতে না পারায় প্রায়ই সক্ষমতার চেয়ে কম ওজন নিয়ে ফ্লাইট চলে যায়।
বর্তমানে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে চলাচলকারী এয়ারলাইনসগুলোয় দৈনিক ৮০০ টন কার্গো উড্ডয়নের ক্ষমতা রয়েছে। কার্গো ভিলেজে পণ্য নামিয়ে এয়ারলাইনসে হস্তান্তরের জন্য প্রস্তুত করার পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় পণ্যের জটলা সৃষ্টি হয় এবং প্রায়ই শিপমেন্ট বিলম্বিত হয়। স্পেস-স্বল্পতার কারণে ফরোয়ার্ডার ও শিপাররা যেখানে পণ্য পাঠাতে হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে সময়মতো এয়ারলাইনসের কাছে হস্তান্তর করতে না পারায় অনেক সময় বুকিং করা ফ্লাইটে ফরোয়ার্ডাররা শিপমেন্ট দিতে পারছে না। সে কারণে সক্ষমতার চেয়ে কম কার্গো নিয়ে ফ্লাইট ঊড্ডয়ন করছে। একবার ফ্লাইট মিস হয়ে গেলে তাত্ক্ষণিকভাবে এবং একই ভাড়ায় নতুন আরেকটি বুকিং পাওয়া সম্ভব হয় না। কখনো কখনো আরেকটি নতুন বুকিং পেতে ৮-১০ দিন অপেক্ষা করতে হয়।
বর্ধিত চাহিদা ও ব্যাকলগের প্রতিক্রিয়ায় এয়ারলাইনসগুলো পরিবহন ভাড়া বহুগুণ বাড়িয়েছে এবং প্রতিদিনই বাড়াচ্ছে। ইউরোপে বর্তমান ভাড়া প্রতি কেজি ৫ দশমিক ২৫ ডলার, উত্তর আমেরিকা ১২ ডলার এবং জাপান-কোরিয়া ৪ দশমিক ২৫ ডলার, যা কয়েক মাস আগেও ছিল যথাক্রমে প্রতি কিলোগ্রামে ২ দশমিক ৫০, ৪ ও ১ দশমিক ৬০ ডলার। এই বর্ধিত ভাড়ায়ও গন্তব্যে পণ্য পৌঁছাতে ১০-১৫ দিন সময় লাগছে। একই সময়ে কার্গো ভিলেজে হ্যান্ডলিং খরচ বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। আগে প্রতি কিলোগ্রামে যেখানে গড়ে শূন্য দশমিক শূন্য ৫ সেন্ট ছিল, বর্তমানে তা প্রতি কিলোগ্রামে সর্বনিম্ন শূন্য দশমিক ৫০ সেন্ট। হ্যান্ডলিং খরচ ও ভাড়া বৃদ্ধির এই বিশাল পরিমাণ খরচ শিপার ও ফরোয়ার্ডারদের ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলছে।
বাংলাদেশ থেকে বিমানে কার্গো পরিবহনে বিরাজমান বর্তমান সংকট ক্রমেই প্রলম্বিত হচ্ছে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে এ সংকট মোকাবেলা বা সমাধান করার যেন কেউ নেই। সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষ যেন একে অন্যের জন্য অপেক্ষা করছে, শেষ পর্যন্ত কেউ কিছু করছে না। এমনকি বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর সদস্য, যারা এ পরিস্থিতির তাত্ক্ষণিক ভুক্তভোগী, দৃশ্যত তারাও যথেষ্ট উদ্বেগ প্রকাশ বা কর্তৃপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে বলে মনে হয় না। রাষ্ট্রের কর্তাব্যক্তিরা রফতানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বর্তমান জটিল পরিস্থিতির প্রভাব অনুধাবন করা বা বোঝার চেষ্টা করছেন বলে মনে হয় না। ফরোয়ার্ডাররা অসহায়ভাবে পরিস্থিতি অতিক্রম করার চেষ্টা করছে।
এয়ারফ্রেইট আধুনিক ব্যবসা-বাণিজ্যে একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাপ্লাই চেইন উপাদান। দেশের রফতানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য একটি শক্তিশালী এয়ার কার্গো শিল্প অপরিহার্য। আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরিস্থিতি উপলব্ধি করার অপেক্ষায় আছি, যাতে এয়ারফ্রেইটের বর্তমান সংকট দূর করতে অবিলম্বে পদক্ষেপ নেয়া হয়। বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতি যদি দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে তাহলে দেশের রফতানি বৃদ্ধি এবং লক্ষ্যমাত্রা অর্জন ব্যাহত হতে পারে।
নুরুল আমিন: পরিচালক, বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরোয়ার্ডারস অ্যাসোসিয়েশন (বাফা) ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক, টাওয়ার ফ্রেইট লজিস্টিকস লিমিটেড, ঢাকা