বহু বছর আগে পত্রিকায় একটি তথ্য প্রকাশ হয়েছিল, মাথা কেটে নেয়ার পর তেলাপোকা কতদিন বাঁচতে পারে? উত্তরে লেখা হয়—নয় দিন। এ তথ্য পেয়ে অনেকেই তখন কীটটির মণ্ডুচ্ছেদে মেতে ওঠে। মানুষ যে মজ্জাগতভাবেই নিষ্ঠুর সত্তাকে বহন করে, পরীক্ষার এ নেশাতেই তা প্রকাশ পায়। ষাঁড় কিংবা মোরগ লড়াই, জাল্লিকাট্টু, টোপ দিয়ে পশু শিকার, বৈদ্যুতিক শকে বন্যপ্রাণী হত্যা; এমন হাজারো উল্লাসে লেখা আমাদের নিষ্ঠুরতার ধারাবাহিক ইতিহাস। বছর দুয়েক আগে ভারতে একটি মা হাতিকে বারুদ ঠাসা আনারস খাইয়ে যেভাবে হত্যা করা হয়েছিল, সেই সুপরিকল্পিত নৃশংসতা কেবল মানুষের পক্ষেই সম্ভব!
গৃহপালিত পশুপাখির প্রতি এ নিষ্ঠুরতা অবশ্য নতুন নয়। এখন হয়তো কেউ কেউ প্রশ্ন তুলবেন—বাঘ হরিণকে, সাপ ব্যাঙকে, বিড়াল ইঁদুরকে, পাখি মাছকেও তো হত্যা করে। আমি বলব, বিষয়টি নিয়ে নিজেই একটু ভাবুন, উত্তর পেয়ে যাবেন। খাদ্যের জন্য এ হত্যাকে নিষ্ঠুর বলবেন কী করে? তখন তো খাবারের অভাবে খাদকের প্রাণটাই হবে ওষ্ঠাগত। যাক খাদ্যশৃঙ্খল নিয়ে অন্য একদিন কথা হবে, আজকের আলোচনাটা মূলত নিপীড়ন নিয়েই হোক। অর্থাৎ পশুকে কষ্ট দেয়া কিংবা নিষ্ঠুরভাবে হত্যা প্রসঙ্গে। আমরা এটাও জানি, কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রবিশিষ্ট সপ প্রাণীরই কমবেশি যন্ত্রণার অনুভূতি আছে। আর উন্নততর প্রাণী হিসেবে একমাত্র মানুষেরই আছে অন্যের যন্ত্রণাকে অনুভব করার ক্ষমতা। সেখান থেকেই আসে দায়িত্ব, যাকে বলে এমপ্যাথি বা সহমর্মিতা। আবার নিষ্ঠুরতাও একটি বৈশিষ্ট্য, যা মানুষকে পশুর থেকে আলাদা করে।
মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, কোনো প্রাণীকে আঘাত বা হত্যা করলে মানুষের অবচেতনে বিভিন্ন মাত্রার অপরাধবোধ জন্ম নেয়। মশা-মাছির মতো ছোট্ট প্রাণীকে মারলে এ অনুভূতি সবচেয়ে কম, আর মানুষের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি। কিন্তু চারদিকে সারাক্ষণই দেখি, কারণে-অকারণে মানুষ মানুষকে যন্ত্রণা দিচ্ছে, মেরে ফেলছে। বেঁচে থাকার অংশ হিসেবে প্রতিদিনই আমরা নৃশংসতার পাঠ নিই। নায়ক মান্না যখন পুলিশ সেজে হেফাজতে থাকা সন্দেহভাজনকে নির্মম প্রহার করেন, প্রতিশোধ নিতে একের পর এক খুন করেন; আমরা সেটা উপভোগ করি। নিষ্ঠুরতা দিনে দিনে আমাদের কাছে এভাবেই স্বাভাবিক, অপরিহার্য, বৈধ, বীরত্বসূচক এমনকি উপভোগ্যও হয়ে উঠছে। শুধু পক্ষে গেলেই হলো, ব্যস সাত খুন মাপ!
সব সময়েই ট্রাকে গরু পরিবহন করার দৃশ্য চোখে পড়ে। তবে কোরবানি ঈদ ঘিরে চাহিদার সঙ্গে সেটাও বেড়ে যায়। এজন্য অবশ্য কয়েকজন ব্যবসায়ী মিলে একটি বা দুটি ট্রাক ভাড়া করে শহরমুখী হন পশু নিয়ে। আর খরচ কমাতে গাদাগাদি করে তাতে উঠানো হয় অনেক গরু। যাত্রাপথে সেগুলো যেন শুয়ে না পড়ে তাই চোখের ভেতর গুঁজে দেয়া হয় ভাঙা মরিচ, যাতে যন্ত্রণায় গরুগুলো ঘুমিয়ে না পড়ে দাঁড়িয়ে থাকে। মূলত দাঁড় করিয়ে রাখতে পারলে ট্রাকে দুটি গরু বেশি তোলা যায়। পশুর সঙ্গে মানুষের এমন জঘন্য আচরণ ও নিষ্ঠুরতা নিয়ে কথা বলতে গেলেই অবশ্য শুনতে হয়—গাছপালারও তো প্রাণ আছে, তা হলে তো আম-কাঁঠালও কেটে খাওয়া চলে না। কিন্তু উদ্ভিদের চেয়ে প্রাণিদেহের অঙ্গ ও কোষের গঠন, জন্ম-মৃত্যু কিংবা বেড়ে ওঠা, সাড়া দেয়া সবই যে অনেকটা আলাদা; সে কথা স্কুলের বিজ্ঞান ক্লাসে জেনেছি সবাই। সত্যি বলতে কী, নিষ্ঠুরতার অজুহাত দাঁড় করাতেই এসব অবান্তর কথা তোলা হয়। একমাত্র মানুষই অপ্রয়োজনে বা তুচ্ছ কারণে ভয়ংকরভাবে স্বজাতি ও পশুপাখিকে হত্যা করে। আর কোনো জীব তা করে না। এমনকি খুব বিষধর সাপও আগবাড়িয়ে মানুষকে আক্রমণ করে না। কখনো কখনো এসব বর্বরতাকেও স্বাভাবিক মনে করি এবং এক্ষেত্রে শিক্ষিত-অশিক্ষিত, ধনী-গরিবের কোনো পার্থক্য নেই।
আসলে মানবজাতি ভুলতে বসেছে পৃথিবী শুধু তাদেরই আবাসস্থল নয়। কোনো পশুর ওপর অবিচার, অনিয়ম কিংবা অকারণ নির্যাতনও দণ্ডনীয় অপরাধ। প্রাণী কল্যাণ বিল ২০১৯-এ বলা হয়েছে, মালিকবিহীন বা বেওয়ারিশ কোনো প্রাণীকে হত্যা করলে ১০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা ছয় মাসের জেল। পাশাপাশি কুকুরকে চলাফেরার সুযোগ না দিয়ে ২৪ ঘণ্টা বেঁধে রাখলেও তা নিষ্ঠুরতা হিসেবে গণ্য হবে এবং শাস্তি একই। সেই ১৯২০ সালে ইংরেজরাও পশু নির্যাতনের জন্য জরিমানা ধরেছিল ২০০ টাকা, যা বর্তমানের হিসাবে লাখ টাকার ওপরে।
রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার কাঁকড়ামারী বিলে চলতি বছরের ২১ ফেব্রুয়ারি রাতে ফাঁদ পেতে ছয় শতাধিক বাবুই পাখি শিকার করেন আবু বক্কর সিদ্দিক ও তার ছেলে ফিরোজ হোসেন। সকালে পাখিগুলো জবাই করে ব্যাগে ভরেন। যদিও তারা পার পাননি। পাখি হত্যার দায়ে এ দুই শিকারিকে এক বছর করে বিনাশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। গেল বছরও এমন এক ঘটনা ঘটেছিল পিরোজপুরের ইন্দুরকানী উপজেলার সদর ইউনিয়নের ভবানীপুর গ্রামে। ক্ষেতের বোরো ধান খেয়ে ফেলার অপরাধে প্রায় দেড় শতাধিক বাবুই পাখির ছানাকে হত্যা করেছিলেন এক কৃষক।
ঝড়, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস প্রভৃতি প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রাণিকুলের আবাসস্থল যখন বাসের উপযোগী থাকে না, তখন অনেক প্রাণী নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে লোকালয়ের কাছাকাছি চলে আসে। কিন্তু মানুষ যে তাদের জন্য আরো প্রাণঘাতী তা হয়তো বুঝে উঠতে পারে না। ফলে নিষ্ঠুরতার শিকার হয়। প্রায়ই দেখা যায়, কোনো পশুকে হত্যা করে তার ঝুলন্ত মরদেহ ঘিরে চলে উল্লাস। এমন খবর অবশ্য কালেভদ্রে জাতীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ হয়। যেসব পশু-পাখির মাংস মানুষের খাওয়ার যোগ্য, সেগুলো শিকারের পেছনে না হয় একটা যুক্তি পাওয়া যায়। কিন্তু যেগুলো মানুষ খায় না, চামড়া ও শরীরের কোনো অংশও ব্যবহার করে না, তাদের হত্যা করার পেছনে কোনো যুক্তিই খুঁজে পাওয়া যায় না।
সীমান্তঘেঁষা নাগর নদী পেরিয়ে ২০২১ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশে এসেছিল ছোট্ট একটি নীলগাই। ফসলের খেতে অপরিচিত প্রাণীটি দেখে পিছু নিয়েছিল গ্রামবাসী। তাদের ধাওয়ায় এদিক ওদিক ছুটতে থাকে পশুটি। একপর্যায়ে নির্মাণাধীন একটি বাড়ির ভেতর আশ্রয় নিয়েও রক্ষা পায়নি। সেখানেও তাড়া করে গ্রামবাসী। সেই ধাওয়ায় পালাতে গিয়ে সেটি মারা যায়। গেল বছরও ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈলে লোকালয়ে ছোটাছুটির সময় গ্রামবাসীর নজরে পড়ে একটি নীলগাই। এরপর শুরু হয় ধাওয়া। একপর্যায়ে ক্লান্ত হয়ে ধরা পড়ে বিলুপ্তপ্রায় বন্যপ্রাণীটি। একপর্যায়ে প্রাণীটি মাটিতে লুটিয়ে পড়ে পা ছোড়াছুড়ি করে। জনা দশেক গ্রামবাসী সেটিকে চেপে ধরে গলায় ছুরি চালিয়ে হত্যা করে। রাজবাড়ীতে একটি ঘোড়ার চার পা বেঁধে পায়ুপথে ও মূত্রনালিতে বাঁশের লাঠি ঢুকিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিল। মূলত শত্রুতা ছিল ঘোড়ার মালিকের সঙ্গে, কিন্তু মরতে হলো ঘোড়াটিকে।
মানুষ কেন পশুপাখির প্রতি নির্মম আচরণ করে, কেন তাদের নির্মমভাবে হত্যা করে, এর কোনো যুক্তি নেই। হত্যাকারী বুঝতেই পারে না যে তার এ নৃশংসতার কারণে নিজের বেঁচে থাকার পথকে ধ্বংস করছে। পশুর প্রতি নিষ্ঠুরতা যে একটা অপরাধ, তাও তারা জানে না। কারণ এ অপরাধে কাউকে তারা শাস্তি পেতে দেখে না। প্রাণী হত্যা ও তাদের আবাসস্থলের স্বাভাবিক নিরুপদ্রব পরিবেশ নষ্ট করার ফলে যে প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য ক্ষুণ্ন হয় এবং জীববৈচিত্র্য হ্রাস পায়, এ বিষয়েও আমাদের সমাজে জনসচেতনতার প্রকট অভাব। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই) অবশ্য একটা প্রতিবেদনে বলেছিল, তাদের দেশে অধিকাংশ সিরিয়াল কিলারদের অ্যানিমেল অ্যাবিউজ করার ব্যাকগ্রাউন্ড আছে। যদি কারো ছোটবেলা থেকে প্রাণীদের ওপর নির্যাতন করার প্রবণতা থাকে এবং কেউ যদি এ নিয়ে শিশুকে সাবধান না করে, তাহলে তারা বড় হয়ে মানুষের প্রতিও অমানবিক আচরণ করে।
বাংলাদেশে যখন পশু-পাখির ওপর নির্দয় আচরণ করা হয়, তখন কখনো দেখিনি রাষ্ট্র, ব্যবসায়ী, আমলা, রাজনীতিবিদ বা অন্য পেশাজীবীরা এ নিয়ে উদ্বেগ বা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। অপরাধীর বিচার চাইছেন। প্রত্যেকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনাতেই আমরা কষ্ট পাই, দোষীর শাস্তি চাই, কিন্তু পশুপাখিদের প্রতি ধারাবাহিক নিষ্ঠুরতায় বুজে থাকি চোখ। এখানেই আমাদের দ্বিচারিতা। হকারের হাতে হেঁটমণ্ডু হয়ে ঝুলে থাকা মুরগি, চোখের সামনেই উদাসীনভাবে তাদের ডানা ছেঁড়া, পা ভাঙা দেখি। তাছাড়া কুকুরের লেজে পটকা, বিড়ালের গায়ে গরম পানি, ইঁদুরকে আঠায় আটকিয়ে মৃত্যু উল্লাস—এদের অন্তিম আর্তনাদেও সেভাবে বিচলিত হই না। উল্টো জীবজন্তুদের অকারণে যন্ত্রণা দিতে যেন অসীম উদ্ভাবনী ক্ষমতা। আর যারা আমজনতা, নির্বিকার থাকাই তো আমাদের অভ্যাস। সমস্যাটা এখানেই। তবে সব রকম নিষ্ঠুরতাবিরোধী শিক্ষাই যদি আমাদের মধ্যে কাজ করতে শুরু করে, তখন এর প্রতিফলন সমাজে দেখা যাবে। সুফল পাবে পরবর্তী প্রজন্মও। প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসার পাঠটা আর নতুন করে শুরু করতে হবে না।
ওবায়দুল্লাহ সনি : জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক, বণিক বার্তা