দক্ষ জনশক্তি গড়তে কারিগরি শিক্ষার গুরুত্ব অনস্বীকার্য। অন্যদিকে শিল্পায়ন, প্রযুক্তির অগ্রগতি এবং স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে দক্ষ কর্মীর চাহিদা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। ফলে কারিগরি শিক্ষার গুরুত্বও বাড়ছে। এসব বিবেচনায় দেশে কারিগরি শিক্ষার সম্প্রসারণ হয়েছে বটে, তবে সেটিকে কাঠামোগত সম্প্রসারণ বলাই যথার্থ। কেননা কারিগরি শিক্ষার কাঙ্ক্ষিত গুণগত মান নিশ্চিত করা যায়নি। আবার শ্রমবাজারের সঙ্গেও এর সংযোগ দুর্বল। এতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি বা অর্থনীতিতে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির পরিবর্তে কারিগরি শিক্ষা শেষে অধিকাংশ শিক্ষার্থী বেকার থেকে যাচ্ছেন বা নামমাত্র মজুরির চাকরি করছেন। এমন পরিস্থিতিতে কারিগরি শিক্ষায় নির্ধারিত আসনের ৭১ শতাংশেরও বেশি আসন ফাঁকা থাকাটাই বরং স্বাভাবিক। শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করার মতো কারিগরি শিক্ষার অনুপস্থিতিরই চিত্র এটি। এদিকে জানা গেছে, কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষার্থী বাড়ানোর লক্ষ্যে বর্তমানে বেশ কয়েকটি প্রকল্প চলমান রয়েছে। এর মধ্যে নতুন প্রতিষ্ঠান স্থাপনের উদ্যোগও রয়েছে। গত ১৬ জুন জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন ‘১০০টি উপজেলায় একটি করে টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ স্থাপন (তৃতীয় সংশোধিত)’ প্রকল্প অনুমোদন দেয়া হয়েছে। অথচ বাস্তবতা হলো, কারিগরি শিক্ষার অবকাঠামো ও আসন সম্প্রসারণের প্রবণতা থেকে বেরিয়ে গুণগত মান, প্রাসঙ্গিকতা ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে সংযোগ নিশ্চিত করা না হলে ভবিষ্যতেও বিপুলসংখ্যক আসন ফাঁকাই থেকে যাবে, যা হবে অর্থের অপচয় ও অর্থনীতিতে বহুমুখী চাপের কারণ।
কারিগরি শিক্ষার সংকট মোকাবেলায় প্রথমেই প্রয়োজন শ্রমবাজারের চাহিদা ও শিক্ষার্থীদের আগ্রহের ভিত্তিতে বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা মূল্যায়ন। কোন শিক্ষাক্রমে কত শিক্ষার্থী ভর্তি হচ্ছে, কোন বিষয়ে আসন খালি থাকছে এবং কেন শিক্ষার্থীরা নির্দিষ্ট বিষয়ে আগ্রহ হারাচ্ছেন এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে আসন সংখ্যা পুনর্নির্ধারণ করতে হবে। চাহিদা যাচাই না করে নতুন প্রতিষ্ঠান স্থাপন কিংবা আসন বাড়ানোর উদ্যোগ বন্ধ রাখা প্রয়োজন, বরং বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষক স্বল্পতা, প্রশিক্ষণ সরঞ্জামের ঘাটতি ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দূর করার পাশাপাশি ব্যবহারিক শিক্ষার মান উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
কারিগরি শিক্ষার সঙ্গে কর্মক্ষেত্রের সংযোগ প্রতিষ্ঠা এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও নিয়োগদাতাদের সম্পৃক্ত করে শিক্ষাক্রম প্রণয়ন, নিয়মিত হালনাগাদ এবং প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। কোন খাতে কী ধরনের দক্ষ কর্মীর চাহিদা রয়েছে, প্রযুক্তির পরিবর্তনে কোন পেশার গুরুত্ব বাড়ছে এবং দেশীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে কী ধরনের দক্ষতা প্রয়োজন—এসব বিবেচনায় নিয়ে শিক্ষাক্রম সাজানো জরুরি। প্রশিক্ষণার্থীদের শিল্পপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষানবিশ হিসেবে যুক্ত হওয়ার সুযোগ এবং প্রশিক্ষণ শেষে কর্মসংস্থানে প্রবেশের সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে এ শিক্ষার প্রতি আগ্রহ ও আস্থা বাড়বে। একই সঙ্গে উদ্যোক্তা হওয়ার উপযোগী দক্ষতা অর্জনের সুযোগও তৈরি করতে হবে, যাতে কারিগরি শিক্ষা কেবল চাকরিপ্রার্থী তৈরি না করে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও ভূমিকা রাখতে পারে।
কারিগরি শিক্ষার মান নিশ্চিত করতে প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিও বাড়াতে হবে। পর্যাপ্ত শিক্ষক, প্রশিক্ষণ সরঞ্জাম ও ব্যবহারিক শিক্ষার ব্যবস্থা ছাড়া শুধু অনুমোদন নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা না করা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। শিক্ষার্থীর সংখ্যা বা সনদ প্রদানের হার দিয়ে প্রতিষ্ঠানের সাফল্য মূল্যায়ন না করে প্রশিক্ষণ শেষে শিক্ষার্থীরা কতটা দক্ষ হচ্ছেন, কতজন কর্মসংস্থানে যুক্ত হচ্ছেন এবং অর্জিত দক্ষতা অনুযায়ী আয় করতে পারছেন কিনা, তা বিবেচনায় নিতে হবে। এজন্য নিয়মিতভাবে শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থানের তথ্য সংগ্রহ এবং নিয়োগদাতাদের মতামত মূল্যায়নের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। এর বাইরে জরুরি হলো কারিগরি শিক্ষার প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনেও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
মাধ্যমিক পর্যায় থেকেই শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন পেশা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও কারিগরি শিক্ষার সম্ভাবনা সম্পর্কে ধারণা দেয়া জরুরি। শুধু প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে এ শিক্ষার প্রতি আগ্রহ তৈরি করা সম্ভব নয়; প্রশিক্ষণের মান ও কর্মসংস্থানের বাস্তব সুযোগের মাধ্যমে এর কার্যকারিতা প্রমাণ করতে হবে। কারিগরি শিক্ষায় অর্জিত যোগ্যতা নিয়ে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ এবং পেশাগতভাবে উন্নতির সুযোগও বিস্তৃত করা প্রয়োজন। এতে সাধারণ শিক্ষার তুলনায় কারিগরি শিক্ষাকে কম মর্যাদার বিকল্প হিসেবে দেখার প্রবণতা কমবে।
কারিগরি শিক্ষায় সরকারি বিনিয়োগের অগ্রাধিকারও পুনর্বিন্যাস করা দরকার। নতুন অবকাঠামো নির্মাণের পরিবর্তে যেখানে প্রয়োজন, সেখানে শিক্ষক প্রশিক্ষণ, আধুনিক যন্ত্রপাতি, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারত্ব এবং শিক্ষাক্রম উন্নয়নে অর্থ ব্যয় করা অধিক ফলপ্রসূ হতে পারে। যেসব শিক্ষাক্রমে দীর্ঘদিন ধরে আসন শূন্য থাকছে, সেগুলোর কার্যকারিতা পর্যালোচনা করে প্রয়োজন অনুযায়ী সংস্কার, পুনর্বিন্যাস কিংবা বিকল্প প্রশিক্ষণ চালুর সিদ্ধান্ত নিতে হবে। একই সঙ্গে অঞ্চলভিত্তিক শিল্প ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে প্রশিক্ষণের বিষয় নির্ধারণ করা উচিত। এগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে তবেই হয়তো দেশে কারিগরি শিক্ষার সম্প্রসারণের প্রকৃত লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হবে। অন্যথায় বিপুলসংখ্যক আসন শূন্য থাকার পাশাপাশি বিনিয়োগের অপচয় এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরির ঘাটতি—দুই সংকটই অব্যাহত থাকবে।