ধরা যাক, আপনি একটি জাহাজে করে ঘন কুয়াশার ভেতর দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন, সামনে কোথাও উপকূল আছে কিনা তা খুঁজে দেখছেন। হঠাৎ আপনার নজরে পড়ল কিছু সামুদ্রিক পাখি—যারা সাধারণত তটরেখার কাছাকাছি দেখা যায়। এতে অনুমান করা যায় যে উপকূল বেশি দূরে নয়। কিন্তু নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়, যতক্ষণ না সরাসরি তীর চোখে পড়ে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সম্ভাব্য মন্দা যেন ঠিক সেই তীরভূমির মতো—এখনো চোখে পড়েনি, কিন্তু তার পূর্বাভাসস্বরূপ ‘পাখিরা’ আকাশে ভেসে বেড়াচ্ছে। এসব লক্ষণ নিশ্চিত কিছু নয়, তবে ভবিষ্যতের সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়।
যখন দীর্ঘমেয়াদি সুদের হার কমে গিয়ে স্বল্পমেয়াদি হারের সমান বা তার নিচে নেমে আসে, তখন সেই পরিস্থিতিকে অর্থনীতির ভাষায় বলা হয় ইনভার্টেড ইল্ড কার্ভ। সাধারণভাবে এটিকে সম্ভাব্য মন্দার পূর্বাভাস হিসেবে ধরা হয়। চলতি বছরের মার্চে যুক্তরাষ্ট্রে ১০ বছরের সরকারি বন্ডের সুদের হার তিন মাসের ট্রেজারি বিলের সুদের হারের নিচে নেমে গিয়েছিল। যদিও বর্তমানে দুটির হার প্রায় সমান, এটি বাজারে উদ্বেগের ইঙ্গিত দিয়েছিল। তবে বিশ্লেষকদের মতে, ইল্ড কার্ভ নিজে খুব বেশি কিছু বলে না। এটি মূলত বাজারের প্রত্যাশাকে প্রতিফলিত করে। বিশেষ করে যদি বিনিয়োগকারীরা মনে করেন যে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ভবিষ্যতে স্বল্পমেয়াদি সুদের হার কমাতে পারে। আর এ প্রত্যাশা আবার গড়ে ওঠে ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কা থেকে।
ভোক্তার আস্থা সরাসরি অর্থনীতির প্রাণ এবং ভোক্তার চাহিদা অনুমান করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয় ও কনফারেন্স বোর্ড পরিচালিত দুটি ভোক্তা আস্থা জরিপ গত মার্চে আশঙ্কাজনক হারে নিম্নমুখী হয়। বিশেষ করে মার্চে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন শুল্ক আরোপের হুমকি বাস্তবায়ন করতে শুরু করেন, তখনই এ পতন প্রকট হয়ে ওঠে। মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয় প্রণীত ভোক্তা আস্থা সূচক (সিএসআই) বছরের শুরু থেকেই নিম্নমুখী। গত ১১ এপ্রিল তা আরো ১১ শতাংশ পতন ঘটে, যা শুধু আগের মন্দার গড় মানের চেয়েই কম নয়, বরং ১৯৫২ সাল থেকে রেকর্ডকৃত তথ্য অনুযায়ী এটি দ্বিতীয় সর্বনিম্ন স্তর। বিশ্লেষকদের মতে, ভোক্তাদের মধ্যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য এমন হতাশা বড় ধরনের হুমকি। কারণ ব্যক্তিগত ব্যয় ও ভোগই যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি।
নিউইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের ভোক্তা প্রত্যাশাবিষয়ক জরিপ অনুযায়ী, মার্চে যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ পরিবারগুলো তাদের আগামী এক বছরের আর্থিক অবস্থা নিয়ে আগের চেয়ে অনেক বেশি হতাশ হয়ে পড়েছে। শুধু ভোক্তাই নয়, ব্যবসা খাতেও আস্থার গুরুতর সংকট তৈরি হয়েছে। গত ৪ এপ্রিল প্রকাশিত এক আন্তর্জাতিক জরিপে দেখা যায়, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘পাল্টা শুল্ক’ নীতির কারণে শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই নয়, বিশ্বব্যাপী ব্যবসায়িক আস্থা কার্যত ধসে পড়ে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এমন অনিশ্চয়তা প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়োগ ও বিনিয়োগ সিদ্ধান্তকে সরাসরি প্রভাবিত করে, যা সামগ্রিক অর্থনীতিতে মন্দার ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে।
আসন্ন মন্দা নিয়ে নিশ্চিত ধারণা পেতে অনেকেই পূর্বাভাসের দিকে নজর দেন। এ ধরনের প্রায় ৫০টি পূর্বাভাস একত্রে উপস্থাপন করে ব্লু চিপ ফাইন্যান্সিয়াল ফোরকাস্টস। এছাড়া পূর্বাভাসসংক্রান্ত তথ্য দেয় সার্ভে অব প্রফেশনাল ফোরকাস্টার্স (এসপিএফ) ও ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল। গত ১৭ এপ্রিল মার্কিন সংবাদমাধ্যমটির প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৫ সালের প্রথম প্রান্তিকের জন্য বার্ষিক গড় প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস মাত্র দশমিক ৪৪ শতাংশ। একই সঙ্গে বছরের শুরুতে যেখানে মন্দার সম্ভাবনা কম ধরা হয়েছিল, এখন তা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে। তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো এ পূর্বাভাসগুলো ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে প্রকাশ হয়, ফলে দ্রুতই তা পুরনো হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। অর্থনীতির গতিপথ হঠাৎ পরিবর্তন হলে এ তথ্য দিয়ে পরিস্থিতি পুরোপুরি মূল্যায়ন করা কঠিন হয়ে পড়ে।
শেষ পর্যন্ত মানুষ কী বলছে তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ তারা তাদের টাকা কোথায় রাখছে। অর্থাৎ কথার চেয়ে কার্যকলাপই বেশি নির্ভরযোগ্য সংকেত দেয়। পূর্বাভাসভিত্তিক বিনিয়োগ প্লাটফর্মগুলো মার্চ ও এপ্রিলে মন্দার সম্ভাবনা অনেক গুণ বাড়িয়ে ধরে। গত ৩ মার্চ যুক্তরাষ্ট্র যখন কানাডা ও মেক্সিকোর ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে এবং গত ২ এপ্রিল প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার তথাকথিত ‘পাল্টা শুল্ক’ ঘোষণা দেন, তখন থেকেই মন্দার আশঙ্কা তিন গুণ বেড়ে যায়। গত ১৯ এপ্রিল পর্যন্ত পূর্বাভাসভিত্তিক প্লাটফর্ম পলিমার্কেট পরবর্তী এক বছরের মধ্যে মন্দার সম্ভাবনা ৫৭ শতাংশ দেখিয়েছে। আর কালশি (Kalshi) পূর্বাভাস দিয়েছে ৫৯ শতাংশ, যা সাধারণ বছরে এ হার যেখানে গড়ে ১৫ শতাংশ, তার প্রায় চার গুণ। যদি একটিমাত্র সূত্রের ওপর নির্ভর করতে হতো তাহলে এসব পূর্বাভাস প্লাটফর্মগুলোকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হতো।
সম্ভাব্য মন্দার পূর্বাভাস দেয়া একটি বিষয়, কিন্তু মন্দা এরই মধ্যে শুরু হয়েছে কিনা তা শনাক্ত করা আরো জটিল কাজ। এ কাজে ব্যবহৃত সাহম রুল রিসেশন ইন্ডিকেটর বলছে—যদি বেকারত্ব হারের তিন মাসের গড় মান আগের ১২ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন স্তরের তুলনায় অন্তত দশমিক ৫ শতাংশীয় পয়েন্ট বেড়ে যায়, তখন ধরে নেয়া যায় যে অর্থনীতি মন্দার মধ্যে রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত এ সূচক মন্দার কোনো সংকেত দিচ্ছে না। কারণ ঐতিহাসিক মানদণ্ডে বেকারত্ব এখনো কম। তবু বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন—ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক সময় হঠাৎ কর্মী ছাঁটাই না করে প্রথমে উৎপাদন কমিয়ে দেয়, কর্মীদের সাপ্তাহিক কর্মঘণ্টা কমিয়ে ফেলে কিংবা অবিক্রীত পণ্য জমতে দেয়। বিশেষ করে যখন বাজারে অনিশ্চয়তা বেশি থাকে, তখন তারা কর্মী ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত নিতে সময় নেয়।
প্রকৃত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কিছু প্রাথমিক সূচক থেকেও মন্দা শনাক্ত করার উপায় রয়েছে। এর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো পারচেজিং ম্যানেজারস ইনডেক্স বা পিএমআই, যা বেসরকারি খাতের প্রতিষ্ঠানে জরিপ চালিয়ে জানতে চায়। গত এক মাসে তাদের নতুন অর্ডার বেড়েছে নাকি কমেছে। এ সূচক পরিচালনা করে ইনস্টিটিউট ফর সাপ্লাই ম্যানেজমেন্ট (আইএসএম)। তাদের তথ্যমতে, মার্চে যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদন খাতের পিএমআই নেমে আসে ৪৯-এ। উল্লেখযোগ্যভাবে, এ সূচক যদি ৫০-এর নিচে নামে, তাহলে তা সংশ্লিষ্ট খাতে সংকোচনের ইঙ্গিত দেয়। অর্থাৎ উৎপাদন খাতে এমন পতন অর্থনীতিতে মন্দার প্রবণতা শুরু হয়ে যাওয়ার একটি সম্ভাব্য প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্সাস ব্যুরো কর্তৃক প্রকাশিত খুচরা বিক্রির তথ্য, যা ভোক্তার ভোগব্যয় সম্পর্কিত প্রথমত, প্রকাশিত ডাটা, অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ দিক প্রকাশ করে। কারণ বেসরকারি ভোক্তা ব্যয় যুক্তরাষ্ট্রের মোট জিডিপির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। মার্চের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভোক্তা ব্যয়ে অব্যাহত বৃদ্ধি দেখা গেছে, যদিও এ বৃদ্ধি মূলত ছিল গাড়ি বিক্রির ওপর নির্ভরশীল—যেখানে অনেক ভোক্তা শুল্ক আরোপের আগেই গাড়ি কেনার চেষ্টা করেছিলেন।
অবশ্যই মন্দা নির্ধারণের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সূচক হলো জিডিপির শ্লথগতি। বেশির ভাগ দেশে টানা দুই প্রান্তিক প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক থাকলে সেটাকে মন্দা হিসেবে ধরা হয়। তবে জিডিপি প্রতি ত্রৈমাসিকে প্রকাশ হয় এবং এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সময়ক্ষেপণ ঘটে (এবং প্রাথমিক ডাটা পরবর্তী সময়ে সংশোধিত হয়)। এ কারণে অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে দ্রুত ধারণা পেতে নাউকাস্টস প্রবর্তিত হয়েছে, যা কোনো দেশের অর্থনীতির সর্বশেষ বা অতি সাম্প্রতিক পরিস্থিতি বুঝাতে ব্যবহৃত হয়। শিল্প উৎপাদন এবং খুচরা বিক্রির ওপর ভিত্তি করে জিডিপির পূর্বাভাস দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি পরিচিত পূর্বাভাস দানকারী সংস্থা আটলান্টা ফেডের জিডিপিনাউ। তাদের গত ফেব্রুয়ারির প্রবৃদ্ধি পূর্বাভাস ২ শতাংশ সম্প্রসারণ থেকে ২ শতাংশ সংকোচনে নেমে আসে। স্বর্ণ আমদানির অস্বাভাবিক বৃদ্ধির বিষয়টি আমলে নেয়ার পরও জিডিপিনাউয়ের উপাত্তে দেখা গেছে, গত এপ্রিলে প্রবৃদ্ধি শূন্য রেখার কিঞ্চিত নিচে অবস্থান করছে।
আবার এটাও মনে রাখতে হবে, যে সংস্থাগুলো মন্দার পূর্বাভাস দেয় তারা নিশ্চিত গ্যারান্টি দিতে পারে না, কখন-কীভাবে আসবে। হালকা আভাস দেয়া যায় কেবল। কোথাও বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্ত পাথরখণ্ড দেখে যেমন আশপাশে কোনো পুরনো স্থাপনার ইঙ্গিত পাওয়া যায় অনেকটা তেমন। হয়তো এমনও হতে পারে এ পাথরখণ্ডগুলো বড় কোনো স্থাপনার অংশই নয়। মন্দার সময়ও আমরা পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারি না যে এটি আদতেই মন্দা কিনা।
যুক্তরাষ্ট্রে মন্দা নির্ধারণের সরকারি প্রতিষ্ঠান হলো ন্যাশনাল ব্যুরো অব ইকোনমিক রিসার্সের (এনবিইআর) বিজনেস সাইকেল ডেটিং কমিটি, যা অর্থনীতির বিভিন্ন সূচক পর্যালোচনা করে মন্দার সময় নির্ধারণ করে। এ কমিটি জিডিপি, প্রকৃত ব্যক্তিগত আয় (সামাজিক সহায়তা বাদে), কৃষিবহির্ভূত কর্মসংস্থান, প্রকৃত ব্যক্তিগত ভোক্তা ব্যয়, উৎপাদন ও বাণিজ্য (মূল্য পরিবর্তন অনুযায়ী সমন্বিত) এবং শিল্প উৎপাদন—এমন সূচকগুলো বিশ্লেষণ করে। এসব তথ্য একত্র হওয়ার পর সাধারণত এক বছর বা তারও বেশি সময় পর কমিটি কোনো পরিবর্তন বা মন্দার সূচনা ঘোষণা করে।
তবে ধোঁয়াশাচ্ছন্ন সময়ে এ উপাত্তগুলো মন্দা বোঝার জন্য যথেষ্ট নয়। বর্তমান তথ্যের ভিত্তিতে, আমি যুক্তরাষ্ট্রে আগামী বছরের জন্য মন্দার সম্ভাবনা ৬০ শতাংশ হিসাবে ধরে নেব। এটি পূর্বাভাস প্লাটফর্মগুলোর পূর্বাভাসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। পরবর্তী চার বছরের জন্য এ সম্ভাবনা আরো বেশি হতে পারে। যদিও কিছুই নিশ্চিত নয়। যদি আমরা কোনো অপ্রত্যাশিত ধাক্কা খাই, তবে সেটি খুবই অবাক করার মতো কিছু হবে না।
[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট-২০২৫]
জেফ্রি ফ্রাংকেল: হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাপিটাল ফর্মেশন অ্যান্ড গ্রোথ বিষয়ের অধ্যাপক। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ছিলেন। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ব্যুরো অব ইকোনমিক রিসার্চের গবেষণা সহযোগী
ভাষান্তর: দিদারুল হক