লোকসানি কোনো কারখানা, সে যেকোনো শিল্পেই হোক না কেন, সময়ে সময়ে শ্রমিক ছাঁটাই করতে বাধ্য হয়। এমনকি লোকসান থেকে উত্তরণের সম্ভাবনা খুব কম হলে মালিকপক্ষ কারখানা বন্ধও করে দেয়। সম্প্রতি বাংলাদেশে সরকারি মালিকানাধীন ২৫টি পাটকল বন্ধ এবং সেগুলোর শ্রমিকদের বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। অবশ্য সরকারের তরফ থেকে শ্রমিকদের সুবিধাদি নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছে।
নিম্নস্তর মজুরি কাঠামোয় তৈরি পোশাক শিল্প বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় কর্মসংস্থান খাত। এ শিল্পে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত শ্রমিকের সংখ্যা ৪০ লাখ বলে দাবি করা হয়। এই ৪০ লাখ শ্রমিক কম করে হলেও প্রায় দুই কোটি মানুষের ভরণপোষণের সঙ্গে জড়িত। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে এ শিল্প কর্মসংস্থানসহ আরো অনেক সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক খাতে ভূমিকা রেখে চলেছে।
বর্তমানে তৈরি পোশাক শিল্পে যথেষ্ট অস্থির পরিবেশ বিরাজমান। রফতানিমুখী এই শিল্প মূলত ইউরোপ, আমেরিকার বাজারের চাহিদার ওপর নির্ভরশীল। অর্থনীতিতে করোনার প্রভাব জেঁকে বসায় বিভিন্ন দেশে ক্রয়ক্ষমতা ও চাহিদা পড়ে যায়। আর এর প্রভাব এসে পড়ে আমাদের দেশসহ আরো বেশকিছু দেশের রফতানি বাণিজ্যে। প্রথমে সরকারি প্রণোদনা সুবিধা দিয়ে কারখানাগুলোকে স্বল্পমেয়াদি সহায়তা দেয়া হয়। দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে হলে স্ব-স্ব কারখানাকেই উপায় খুঁজতে হবে যে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে তারা টিকতে পারবে কিনা। সেই পর্যায়ে যেতে আমাদের আরো কিছুদিন অপেক্ষা করা লাগতে পারে।
প্রশ্ন হলো, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের স্বার্থ কীভাবে রক্ষা করা যায়? স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে একজন শ্রমিক তার মাসিক বেতন, কিছু ভাতা আর বার্ষিক দু-একটি বোনাস ছাড়া আর কিছুই পায় না। যে প্রতিষ্ঠানের জন্য এই শ্রমিকরা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে দিন-রাত পরিশ্রম করেন, সময়ের পরিক্রমায় তারাই হয়ে পড়েন অপাঙেক্তয়। তৈরি পোশাক শিল্প শ্রমিকদের স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি স্থায়ী কোনো সুযোগ-সুবিধার কথা সেভাবে ভাবা হয়নি অথবা ভাবলেও বাস্তবায়ন হয়নি। স্বল্পমেয়াদে শ্রমিকদের খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা বা বাসস্থানের কথা এবং জীবনমান বিবেচনায় সময়ে সময়ে মজুরি বৃদ্ধি হয়েছে বটে, কিন্তু তাদের ভবিষ্যৎ চাহিদার কথা অবিবেচনাতেই রয়ে গেছে।
তৈরি পোশাক শিল্প খাতের শ্রমিকদের দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়টি ভাবতে হবে। অতিভোরে কারখানায় সার বেঁধে ছুটে চলা আর সন্ধ্যা রাতে বাড়ি ফেরা শ্রমিকদেরও মা-বাবা পরিবার-পরিজন আছে। শ্রমিকদের ছেলেমেয়েরা স্কুলে যায়। তাদের খাতা-কলম, পেন্সিল থেকে শুরু করে যাবতীয় ব্যয় মেটাতে হয় তাদের অর্জিত স্বল্প মজুরি থেকেই। অনেকে আবার আশেপাশের নির্ভরশীল আত্মীয়স্বজনদেরও ভার নেন।
কথা হলো, যদি কোনো কারণে কারখানায় শ্রমিক ছাঁটাই হয় অথবা কারখানা বন্ধ হয়ে যায়, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরি হিসেবে শ্রমিক-কর্মচারীরা কোনো পেনশন পান না। সেক্ষেত্রে ছাঁটাই হওয়া শ্রমিক নিজে এবং তার পরিবার-পরিজনরা অবর্ণনীয় জীবন ও জীবিকা ঝুঁকির মধ্যে পড়েন। শুমারি করলে দেখা যাবে, কর্মরত প্রতিটি শ্রমিক-কর্মচারী এ বিষয় নিয়ে সার্বক্ষণিক চিন্তায় থাকেন যে কখন কোন অবস্থায় তার চাকরি চলে যায়। বর্তমান সময়ে যে এই দুশ্চিন্তার পরিমাণ অনেক বেশি, তা সহজেই বোঝা যায় এবং দেখা যায় এই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত শ্রমিকরা তাদের কাজে শতভাগ মনোযোগ দিতে পারেন না, তাতে কারখানা কাম্য উৎপাদনে পিছিয়ে পড়ে।
শ্রমিকদের বর্তমান ও দীর্ঘমেয়াদে সুবিধা দেয়ার জন্য এমপ্লয়ি স্টক অপশন প্ল্যান ও এমপ্লয়ি স্টক অপশন ট্রাস্টের কথা ভাবা যেতে পারে। এমপ্লয়ি স্টক অপশন প্ল্যান অনুযায়ী কারখানায় কর্মরত শ্রমিক-কর্মচারী-কর্মকর্তাদের কারখানার মালিকানার অংশ নিশ্চিত করা হয়। যেমন একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত কোনো কারখানায় কর্মরত থাকলে এবং সন্তোষজনক দক্ষতা দেখালে কোনো শ্রমিক-কর্মচারী মালিকানার একটি নির্দিষ্ট শেয়ার পাবেন। সুতরাং পরিস্থিতি বিবেচনায় সেই শ্রমিক বা শ্রমিক দল ছাঁটাই বা অবসরে গেলেও তারা কারখানাসংশ্লিষ্টই থেকে গেলেন। আগে তারা পেতেন মজুরি কিন্তু পরবর্তী সময়ে শেয়ার থেকে কোম্পানির মুনাফার অংশ পাবেন।
আর এমপ্লয়ি স্টক অপশন ট্রাস্ট অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শ্রমিক কর্মকর্তা সবারই ভবিষ্যৎ প্রয়োজন এবং সামাজিক নিরাপত্তার কথা ভেবে প্রতিষ্ঠানের আয়ের ওপর ভিত্তি করে এক বা একাধিক ট্রাস্ট গঠন করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, কোনো প্রতিষ্ঠানের কর্মরতদের ছেলেমেয়েদের জন্য শিক্ষা সহায়ক কল্যাণ ট্রাস্ট অথবা চিকিৎসা কল্যাণ ট্রাস্ট। প্রতিষ্ঠান তার প্রতি বছরের মুনাফা থেকে একটি অংশ এই ট্রাস্টে জমাদান করবে। ট্রাস্ট ওই তহবিল থেকে শ্রমিক-কর্মচারীদের প্রয়োজন বিবেচনায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সহায়তা দেবে। অনেক দেশেই এমপ্লয়ি স্টক অপশন প্ল্যান ও এমপ্লয়ি স্টক অপশন ট্রাস্ট গঠন করা হয় প্রতিষ্ঠানের বর্তমানে কর্মরত সবার ভবিষ্যৎ চাহিদা বিবেচনায়।
আমাদের দেশে বর্তমানে বিশেষত তৈরি পোশাক শিল্পে নিয়োজিত লাখ লাখ শ্রমিক ও তাদের পরিবার চোখে অন্ধকার দেখছে। মালিকপক্ষও মানবিক বিবেচনায় নেতিবাচক সিদ্ধান্ত নিতে হয়তো একাধিকবার ভাবছে। তবে এটাও ঠিক, বর্তমানের স্থবির অবস্থা একসময় কেটে যাবে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি বিবেচনায় তৈরি পোশাক শিল্পে এমপ্লয়ি স্টক অপশন প্ল্যান ও এমপ্লয়ি স্টক অপশন ট্রাস্ট অত্যন্ত সময়োপযোগী দাবি।
আলোচিত এমপ্লয়ি স্টক অপশন প্ল্যান ও এমপ্লয়ি স্টক অপশন ট্রাস্ট বাস্তবায়ন করা গেলে আমাদের দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের মালিক ও শ্রমিক উভয় পক্ষই লাভবান হবে। মালিকপক্ষ একটি সুদক্ষ ও মোটিভেটেট শ্রমিক বাহিনী পাবে, যারা তাদের নিজেদের তাড়না থেকেই সংগঠনের অধিক মুনাফা অর্জনের জন্য কাজ করবেন। কারণ তারা জানবেন যে অধিক মুনাফার একটি অংশ স্টক অপশন প্ল্যান অথবা ট্রাস্টের মাধ্যমে তারাই প্রাপ্ত হবেন। মালিকপক্ষেরও তাই মুনাফা বাড়বে বৈ কমবে না।
শ্রমিকরা লাভবান হবেন বহুবিধভাবে। প্রথমেই তারা দুশ্চিন্তামুক্ত থাকবেন, কারণ ছাঁটাই বা বন্ধের ঝুঁকি থাকলেও তাদের আর্থিক ঝুঁকি কমে আসবে। ছাঁটাই হলেও ছাঁটাই-পরবর্তী সময়ে স্টক অপশন প্ল্যানের আওতায় তারা মুনাফার ভাগ পাবেন। অন্যদিকে ট্রাস্টের আওতায় তাদের ছেলেমেয়েদের শিক্ষায় বৃত্তি ও বিভিন্ন বরাদ্দ থাকবে। এই শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা বিবেচনায় ট্রাস্টের মাধ্যমে তাদের নিজস্ব বা চুক্তিবদ্ধ হাসপাতালে সুচিকিৎসার ব্যবস্থা থাকবে। এতসব সুবিধা বিবেচনায় তারা কাজে অত্যধিক মনযোগী থাকবেন। আর তাই তাদের উৎপাদনশীলতা ও দক্ষতা উভয়ই বৃদ্ধি পাবে।
সরকারের উচিত হবে কারখানার মালিকদের প্রণোদনা বা অন্যান্য স্বল্পমেয়াদি সুবিধা কমিয়ে দেয়া বা ক্ষেত্রবিশেষে স্থগিত করে দেয়া। বরং সরকার যদি সত্যিই শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষা করতে চায়, তবে শুরুর দিকে এমপ্লয়ি স্টক অপশন প্ল্যান ও এমপ্লয়ি স্টক অপশন ট্রাস্টে বিনিয়োগ করতে পারে। সরকারি অর্থায়নের এটি যথোপযুক্ত বিনিয়োগ হবে, কারণ এর সুফল পাবেন তৈরি পোশাক শিল্পের মালিক-শ্রমিক থেকে শুরু করে তাদের পরিবার-পরিজন তথা অর্থনীতির সুপরিসর এক জনগোষ্ঠী।
শহীদুল জাহীদ: সহযোগী অধ্যাপক
ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়