খাদ্য আমদানি প্রয়োজন প্রায় ৮০ লাখ টন, হয়েছে ৪৮ লাখ

সঠিক সময়ে আমদানি করে সরবরাহ শৃঙ্খল নির্বিঘ্ন রাখতে হবে

প্রতিনিয়ত চালের দাম বাড়ছে। আমদানি ও উৎপাদনও কম। সরকারি মজুদও তুলনামূলক কম। এ অবস্থায় মানুষ ভবিষ্যতের কথা ভেবে রীতিমতো শঙ্কিত। চাল দেশের মানুষের প্রধান খাদ্যশস্য আর দ্বিতীয় গম।

প্রতিনিয়ত চালের দাম বাড়ছে। আমদানি ও উৎপাদনও কম। সরকারি মজুদও তুলনামূলক কম। এ অবস্থায় মানুষ ভবিষ্যতের কথা ভেবে রীতিমতো শঙ্কিত। চাল দেশের মানুষের প্রধান খাদ্যশস্য আর দ্বিতীয় গম। চাল ও গমের দাম সর্বস্তরের মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকা উচিত। বাস্তবতা হলো চালের সরকারি মজুদ যদি পর্যাপ্ত না থাকে তাহলে চালের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। আবার একই সঙ্গে অসাধু ব্যবসায়ী ও অবৈধ মজুদদারদের অতিমুনাফার লোভ বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে পরিস্থিতি আরো অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে অন্তত ৬৮ লাখ টন গম আমদানির প্রয়োজন পড়বে বলে মার্কিন কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) সর্বশেষ পূর্বাভাসে বলা হয়েছে। এছাড়া পরপর দুটি বন্যায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় দেশে চাল উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কমপক্ষে ১৫ লাখ টন। সে হিসেবে রক্ষণশীলভাবে হিসাব করলেও চলতি অর্থবছরে মোট চাল ও গম আমদানির প্রয়োজন পড়ে ৮০ লাখ টনের বেশি। ১৭ মার্চ পর্যন্ত দেশে খাদ্যশস্য দুটি আমদানির পরিমাণ ছিল ৪৮ লাখ টনের বেশি। এ অনুযায়ী বাকি তিন মাসে আমদানি করতে হবে ৩২ লাখ টন। ইউএসডিএর পরিসংখ্যানকে আমলে নিয়ে অত্যন্ত রক্ষণশীলভাবে হিসাব করতে গেলেও অর্থবছরের বাকি সময়ে প্রতি মাসে গড়ে ১০ লাখ টনের বেশি খাদ্যশস্য আমদানি করতে হবে। বন্যায় উৎপাদন হ্রাসের প্রেক্ষাপটে বাজার স্থিতিশীল রাখা এবং খোলাবাজারে চাল বিক্রিসহ সরকারের খাদ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলো নির্বিঘ্ন রাখতে এ পরিমাণ আমদানির বিকল্প নেই। বাজারে এ দুটি পণ্যের দাম সর্বস্তরের মানুষের ক্রয়সীমার মধ্যে রাখতে সঠিক সময়ে আমদানি করে সরবরাহ শৃঙ্খল নির্বিঘ্ন রাখা উচিত।

  • দেশের কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য মজুদ সম্পর্কে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর যথাসময়ে নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান সরবরাহ করা উচিত। সঠিক নীতি ও পরিসংখ্যানের অভাবে চালের বাজার যেকোনো সময় অস্থিতিশীল হতে পারে। কিন্তু যথাসময়ে নির্ভুল পরিসংখ্যান প্রকাশে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে অনেক ঘাটতি রয়েছে। যেমন চালের মোট উৎপাদনের কথা বলা যায়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে চালের মোট উৎপাদন ধরা হয়েছে ৪ কোটি ৭ লাখ ৫০ হাজার টন। তাতে গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত চালের সরবরাহ সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির কোনো আশঙ্কা ছিল না। কিন্তু বাস্তবে তা-ই হয়েছে। অনেকে মনে করেন, এ পরিসংখ্যান অতিমূল্যায়িত, স্ফীত। সরকারি পরিসংখ্যানের প্রতি জনগণের আস্থা কম। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, দেশে এবার আমন মৌসুমে ফলন হয়েছে ১ কোটি ৭১ লাখ টন। চলতি আমন মৌসুমে আবাদি জমির পরিমাণ ছিল ৫৬ লাখ হেক্টর। দেশে গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরের আমন মৌসুমে রেকর্ড ১ কোটি ৬৬ লাখ টন ধান উৎপাদন হয়েছিল। এবার সে রেকর্ড অতিক্রম করেছে বলে দাবি করছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। যদিও বিশ্লেষকরা বলছেন, আমন উৎপাদন কোনোভাবেই দেড় কোটি টন ছাড়ানো সম্ভব না। কেননা এবারের বন্যায় আমন উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। অন্যদিকে সরকারি পরিসংখ্যান বিভাগ কৃষি উৎপাদনের হালনাগাদ তথ্য দিতে প্রায়ই বেশি সময়ক্ষেপণ করে। যেমন গত বছরের মে মাসে বোরো ধান উৎপাদনের কাজ শেষ হয়েছে। তার পরিসংখ্যান এসেছে সেপ্টেম্বরের শেষ প্রান্তে। যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণে নির্ভুল ও হালনাগাদ পরিসংখ্যান প্রকাশ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়ে যথাসময়ে নির্ভুল পরিসংখ্যান প্রকাশে প্রতিষ্ঠানগুলোর আরো দায়িত্বশীল হওয়া উচিত।
  • আমনের মৌসুম শেষ হতে না হতেই চালের দাম ঊর্ধ্বমুখী। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারের চালের বর্তমান মজুদ পর্যাপ্ত নয়। আমদানির পরিমাণও প্রয়োজনের তুলনায় কম। তাছাড়া আমন ও বোরো মৌসুমের মাঝামাঝি এ সময়ে খাদ্যশস্যের এমনিতেও দাম কিছুটা বেড়ে যায়। বর্তমানে কম উৎপাদন ও আমদানির সুযোগ নিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। বড় মিলারদের বিরুদ্ধে বাজারে চালের কৃত্রিম সংকট তৈরির মাধ্যমে দর অস্থিতিশীল করে তোলার অভিযোগ উঠছে। এ অবস্থায় আমদানি না বাড়ালে চালের দাম আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, চালের বাজারে কৃত্রিম সংকটও চালের বাজার ঊর্ধ্বমুখিতায় কাজ করছে। উৎপাদন মৌসুম শেষে চাল আমদানির পরও চালের বাজার এতটা বেড়ে যাওয়া অস্বাভাবিক। বাজারে সরবরাহের ক্ষেত্রে কোনো প্রতিবন্ধকতা আছে কিনা সে বিষয়ে জোরালো নজরদারি করা উচিত।
  • প্রধান খাদ্যশস্য চালের পেছনে দরিদ্র মানুষের খাদ্য ব্যয়ের একটি বড় অংশ যায়। আমন চাল উৎপাদনের দ্বিতীয় প্রধান মৌসুম। দেশে আমনের মৌসুম সবে শেষ হয়েছে। ভরা মৌসুমে যেকোনো পণ্য সরবরাহ বাড়ে এবং পণ্যের দাম কমে। কিন্তু চালের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। আমনের ভরা মৌসুমেও পাইকারিতে চালের দাম বেড়েছিল। মৌসুম শেষ হতে না হতেই আবার চালের দাম বেড়েছে। দেশের চাহিদা ও আমনের উৎপাদনের বিষয়টি মাথায় রেখে চাল আমদানি যথাসময়ে করা না গেলে চালের বাজার অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে। তাই আগেই সঠিক পদক্ষেপ নেয়া উচিত। তা না হলে আপৎকালীন পরিস্থিতি সামাল দেয়া যেমন কঠিন হবে, বাজার অস্থিতিশীলতা রোধ করাও সম্ভব হবে না।
  • কয়েক বছর ধরেই সরকারের ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা অর্ধেকও অর্জন করা সম্ভব হচ্ছে না। এবার যেহেতু আমনের ফলন কম হয়েছে তাই সরকারের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করাও কঠিন। চালের বাজারের অস্থিতিশীলতা কমাতে সরকারকে আমদানির মাধ্যমে সরকারি মজুদের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হবে। তাছাড়া ফলন কম হওয়ায় কৃষকও চাল মজুদ করেছেন। পাশাপাশি আড়তদার ও মিল মালিকরাও চালের মজুদ করেছেন। এতে বাজারে চালের সরবরাহ সংকট প্রকট হওয়ার কথা। তাই আগের ব্যর্থতা পর্যালোচনা করে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী সরকারকে আমদানির মাধ্যমে চাল ও গমের মজুদ বাড়াতে হবে। উল্লেখ করা দরকার যে বাজার নিয়ন্ত্রণ ও খাদ্যসম্পর্কিত নীতি প্রণয়নে যথাযথ তথ্য-উপাত্ত খুব গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি মজুদের পরিমাণ জানা গেলেও বেসরকারি খাতে চালের মজুদ কত আছে তার পরিসংখ্যান জানা নেই। এ-সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহ প্রথমে করতে হবে। সঠিক তথ্যের মাধ্যমে ঘাটতি নির্ণয়পূর্বক আমদানি করতে হবে। সরকারিভাবে এখন পর্যন্ত যে পরিমাণ চাল আমদানি হয়েছে তা দিয়ে বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা কঠিন। বাজারে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনতে ঠিক কী পরিমাণ চাল আমদানি করা প্রয়োজন তা নিরূপণ করা জরুরি। তাছাড়া চালের মূল্যবৃদ্ধিকেই এখন খাদ্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না আসার জন্য দায়ী করা হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের নিচে নামছে না।
  • অনেক সময় মজুদ সন্তোষজনক থাকলেও বাজারে কারসাজি ঘটে। মূলত বাজারকে অস্থির করে বিপুল মুনাফা হাতিয়ে নেয়ার জন্য একশ্রেণীর ব্যবসায়ী এমনটি করেন। বাজার ব্যবস্থাপনায় আরো মনোযোগ দিতে হবে। কাজেই নিয়মিত বাজার নজরদারিও বাড়াতে হবে। চালের বাজারে অস্থিতিশীলতা দূর করার দায়িত্ব সরকারের। সেজন্য প্রয়োজন সার্বক্ষণিক তদারকি ও সরকারি মজুদ বাড়ানো। মজুদের পাশাপাশি সরবরাহ শৃঙ্খলও স্বাভাবিক রাখতে হবে। বিশ্ববাজার ও স্থানীয় পরিস্থিতি বিবেচনায় আমদানির মাধ্যমে চালের মজুদ বাড়ানোর পাশাপাশি বাজার অস্থিরতা রোধে কর্তৃপক্ষ দ্রুত পদক্ষেপ নেবে—এটিই প্রত্যাশা।

আরও