পর্যালোচনা

জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হবে কী?

প্রতি বছরের মতো এবারো জাতীয় সংসদে বাজেট পেশ হয়েছে। জুনের ৩ তারিখ বৃহস্পতিবার সরকারের অর্থমন্ত্রী স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের ৫০তম বাজেট উপস্থাপন করেন। ২০২১-২২ সালের জন্য প্রস্তাবিত এ বাজেট জাতীয় দৃষ্টিকোণ থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৭১ সালে অর্জিত মহান স্বাধীনতার ৫০তম বর্ষপূর্তি বা সুবর্ণজয়ন্তীর বছর হচ্ছে ২০২১ সাল। রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত

প্রতি বছরের মতো এবারো জাতীয় সংসদে বাজেট পেশ হয়েছে। জুনের তারিখ বৃহস্পতিবার সরকারের অর্থমন্ত্রী স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের ৫০তম বাজেট উপস্থাপন করেন। ২০২১-২২ সালের জন্য প্রস্তাবিত বাজেট জাতীয় দৃষ্টিকোণ থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৭১ সালে অর্জিত মহান স্বাধীনতার ৫০তম বর্ষপূর্তি বা সুবর্ণজয়ন্তীর বছর হচ্ছে ২০২১ সাল। রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতার পর থেকে স্বাধীন-সার্বভৌম দেশ হিসেবে অনেক চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও আমাদের অর্জন নেহাত কম নয়। বৈদেশিক সাহায্যনির্ভর কথিত বাস্কেট কেস থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে উদীয়মান উন্নয়নশীল দেশে রূপান্তরিত হয়েছে দেশের অর্থনীতি। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ অনেক উন্নয়নশীল দেশের কাছেই ঈর্ষার বিষয়। ভারত-পাকিস্তানের চেয়েও আমাদের মাথাপিছু জাতীয় আয় বেশি। 

অন্যদিকে সারা বিশ্বের ন্যায় বাংলাদেশও করোনা মহামারী অতিক্রম করছে। কভিড-১৯ ভাইরাস-সৃষ্ট করোনা মহামারী কবে শেষ হবে এবং তার  অভিঘাত কোথায় গিয়ে ঠেকবে তা কেউই বলতে পারছে না। মানুষের জীবন-জীবিকা দুটোই আজ হুমকির মুখে। শহর-গ্রাম, উচ্চ, মধ্য বা নিম্নবিত্ত, মালিক থেকে শ্রমিক, শিল্প-ব্যবসাসহ অর্থনীতির প্রতিটি খাত ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, পরিবহন যোগাযোগ, উৎপাদন, বিতরণসব অঙ্গকাঠামো সংকোচন পর্যায়ে রয়েছে। অনেক মানুষ বেকারত্বের অভিশাপে ধুঁকছে। করোনার কারণে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। আন্তর্জাতিক টিকা নীতি বা কূটনীতির দোলাচলে দুলছে আমাদের করোনার টিকা পাওয়ার ভূত-ভবিষ্যৎ। সবচেয়ে ভয়ের কথা হচ্ছে, টাকা দিয়েও টিকা পাওয়া যাচ্ছে না। রকম বাস্তবতায় জাতীয় বাজেট ২০২১-২২ থেকে জনগণের প্রত্যাশা অনেক বেশি।

১৯৭১ সালে আমাদের জাতীয় বাজেটের আকার ছিল মাত্র ৭৮৬ কোটি টাকা। সেখানে বর্তমানে ২০২১-২২ সালের প্রস্তাবিত বাজেটের আকার হচ্ছে লাখ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা। ১৯৭১ সালের বাজেটের তুলনায় ২০২১-২২ সালের বাজেটের আকার প্রায় ৭৬৭ গুণ বেশি। প্রস্তাবিত বাজেটে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপিতে বরাদ্দ লাখ ২৫ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা। রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। ২০২১-২২ সালের বাজেটের আরো উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে, বাজেটে ঘাটতির পরিমাণ লাখ ১৪ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। বাজেটে জাতীয় প্রবৃদ্ধি প্রক্ষেপণ দশমিক শতাংশ এবং অনুমিত মুদ্রাস্ফীতি হচ্ছে দশমিক শতাংশ।

প্রশ্ন হলো, জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ২০২১-২২ সালের প্রস্তাবিত বাজেট কতটুকু সহায়ক হবে অথবা বাজেট কতটা গণমুখী? প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে প্রথমেই দেখা উচিত জনগণের প্রত্যাশা কী কী? বর্তমানে দেশের দল-মত নির্বিশেষে আপামর জনসাধারণের প্রথম চাওয়া হচ্ছে করোনার প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষ অভিঘাত থেকে মুক্তি। মানুষ করোনার ভয়াবহতা থেকে মুক্তি চায়। স্বাভাবিক জীবন জীবিকায় ফিরতে চায়। কর্মহীন মানুষ কর্মের সংস্থান চায়। করোনাসহ অন্যান্য চিকিৎসায় জনগণ হাসপাতালে উন্নত স্বাস্থ্যসেবা চায়। হতদরিদ্র মানুষ খাবার চায়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বাভাবিক শিক্ষার পরিবেশ, কল-কারখানায় স্বাভাবিক উৎপাদন ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সবারই চাওয়া।

দেখতে হবে মানুষের এতসব চাওয়ার ভিড়ে জাতীয় বাজেটের লক্ষ্যমাত্রা কী? জাতীয় বাজেটে কোন কোন খাত অগ্রাধিকার পেয়েছে? বাজেট বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রস্তাবিত ২০২১-২২ সালের জাতীয় বাজেট গতানুগতিক ধারার ঊর্ধ্বে উঠতে পারেনি। অর্থমন্ত্রী নিজেই বলেছেন যে এবারের বাজেট পুরোটাই ব্যবসাবান্ধব। বাজেটে ব্যবসায়ীদের কর ছাড় দেয়া হয়েছে। কমানো হয়েছে করপোরেট ট্যাক্স। টেকসই পুঁজিবাজারের জন্যও আছে বরাদ্দ। ব্যাংকের মাধ্যমে গত বছরের ন্যায় প্রণোদনার সুযোগ রয়েছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য রয়েছে গৃহায়ণ অন্যান্য বাড়তি সুযোগ-সুবিধা। বাজেট থেকে মেগা প্রকল্পগুলোর জন্য রয়েছে আলাদা বরাদ্দ। কালো টাকা সাদা করার সুযোগ থাকবে কিনা, সে ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব না থাকলেও অর্থমন্ত্রী বলেছেন, বাজেট পাসের আগে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত আসবে।

এবারের বাজেটও গতানুগতিক, কারণ বরাদ্দের ধরন আমাদের সেই ট্রিকল ডাউন বা চুইয়ে পড়া অর্থনীতির কথাই মনে করিয়ে দেয়। ট্রিকল ডাউন অর্থনীতির একটি উদাহরণ রকম, কোনো পিরামিডের শীর্ষে পানি ঢালার পরে পিরামিডের গা বেয়ে পানি নিচে নামা। পিরামিডের প্রতিটি ধাপকে অর্থনীতির একেক স্তরের সঙ্গে তুলনা করা যায়। একেবারে উপরের ধাপে শিল্প-বাণিজ্য, করপোরেশন বা ক্ষমতা কাঠামোর কাছাকাছি সংগঠন এবং মানুষদের অবস্থান। পর্যায়ক্রমে শেষের দিকে সাধারণ ব্যবসায়ী এবং সাধারণ জনগণের অবস্থান কল্পনা করা যায়, যাদের সংখ্যাই অবশ্য বেশি। একেবারের ওপরের ধাপ থেকে পানি কত নিচে নামবে তা নির্ভর করে পিরামিডের ঢাল এবং পরিবেশ পরিস্থিতির ওপর। যেমন বর্ষা মৌসুমে সামান্য পানিও ঢাল বেয়ে নিচে নামতে পারে, সেখানে শুষ্ক মৌসুমে অনেক বেশি পানিও পিরামিডের ওপরের দিকেই শুষে নেয়ার সম্ভাবনা বেশি এবং নিচের দিকে পানি নামার সম্ভাবনা খুবই কম থাকে।

বর্তমানে অর্থনীতির প্রতিটি স্তরেরই শুষ্ক বা সংকোচনশীল অবস্থা বিরাজমান। তাই কর ছাড়ের সুফল শিল্পপতি, বড় ব্যবসায়ী, আড়তদার মুনাফাখোরদের প্রত্যাশা ভেদ করে সাধারণ কৃষক, শিল্প, পরিবহন, পোশাক শ্রমিক, হতদরিদ্রের কাছে পৌঁছানো বেশ কঠিন হয়ে যাবে। যেমন একটি উদাহরণ দেয়া যাক, কর ছাড়ের কারণে সিমেন্টের প্রতি ব্যাগে দাম কমবে টাকার মতো, কিন্তু সিমেন্ট উৎপাদনকারীরা বাজেটের আগেই ব্যাগপ্রতি দাম বাড়িয়ে রেখেছেন ৫০ টাকার ওপর। পোশাক রফতানি শিল্পে কোনো সুবিধা না কমানো এবং রফতানি আয় মোটামুটি স্বাভাবিক থাকার পরও তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ অতিরিক্ত সুবিধা চেয়েছে, কিন্তু নানা সমীক্ষা বলছে যে গত বছর থেকে পোশাক শিল্প-কারখানায় শ্রমিকদের বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি বা ইনক্রিমেন্ট বন্ধ রয়েছে। শুধু নিম্নস্তর মজুরি কাঠামোই নয়, যারা ব্যাংক-বীমার মতো প্রমিত এবং উচ্চমজুরি কাঠামোয় কাজ করেন, তাদেরও অনেকের বেতন বা অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি হয়নি।

বাজেটের আরেকটি দিক হচ্ছে ঘাটতি পূরণে দেশী এবং বিদেশী ঋণ নির্ভরতা। প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ঘাটতি পূরণে সরকার লাখ ১৩ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা বৈদেশিক ঋণ থেকে এবং বাকি লাখ ১৩ হাজার ৪৫৩ কোটি টাকা অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণের প্রস্তাব করেছে। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, আমাদের ঋণ-জিডিপির অনুপাত চীন-জাপানের তুলনায় কম। চীন-জাপানের ঋণ-জিডিপির অনুপাত যেখানে প্রায় ১০০, সেখানে বাংলাদেশে তা ৪০ শতাংশের মতো। পরিসংখ্যান ঠিক থাকলেও বাংলাদেশের তুলনায় চীন জাপানের অর্থনীতির গভীরতা এবং তাদের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা বিবেচনায় নেয়া উচিত। উল্লেখ্য, প্রস্তাবিত বাজেট ২০২১-২২- তৃতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ কিন্তু ঋণের সুদ পরিশোধ খাতে। দেশীয় খাত থেকে বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকারের নেয়া ঋণ অর্থনীতিতে ক্রাউডিং আউট ইফেক্ট বা সামাজিক খরচ বাড়িয়ে দেবে। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যাবে। বেসরকারি বিনিয়োগ কমে গেলে উৎপাদন সম্ভাবনাও কমে যাবে। তখন কর্মসংস্থান কমে অর্থনীতি আরো সংকোচনের মুখে পড়তে পারে। 

দশমিক শতাংশ প্রবৃদ্ধির উচ্চ লক্ষ্যমাত্রা করোনাকালে অর্জিত না- হতে পারে। সে অর্থে বাজেট উচ্চাভিলাষী। ঝুঁকিপূর্ণ রফতানি খাত, শ্রম রফতানিতে নতুন বাজার না পাওয়া এবং পুরনো বাজার সংকোচন বৈদেশিক মুদ্রার স্থায়ী প্রবাহে বিঘ্ন ঘটাতে পারে। দেশীয় সেবা খাত যেমন হোটেল-মোটেল, রেস্টুরেন্ট, পর্যটনসহ অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। দেশের মানুষের হাতে নগদ টাকার প্রবাহ কম থাকায় শিল্প উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা গেলেও চাহিদা কম থাকবে। সামাজিক সুরক্ষা খাতে পেনশন যুক্ত থাকায় ঠিক কত পরিমাণ সাধারণ জনগণের কাছে পৌঁছবে, তা- অনিশ্চিত। আবার ৮০ শতাংশ মানুষকে করোনা টিকা দেয়ার যে আকাঙ্ক্ষা বাজেটে ব্যক্ত হয়েছে, তাও দুরূহ হতে পারে। বর্তমানে একদিকে যেমন টিকা পাওয়া দুষ্কর, তেমনি গুণগত মান ঠিক রেখে ঠিক কত মানুষকে টিকা দেয়া যাবে তার রোড ম্যাপ থাকতে পারে। যেমন টিকাপ্রাপ্তি সাপেক্ষে প্রতি মাসে ২০ লাখ মানুষকে টিকা দেয়া গেলেও প্রায় ১৬-১৭ কোটি মানুষকে টিকা দিতে এক দশকের মতো সময় লাগতে পারে। সুতরাং করোনা টিকার জন্য বাজেটে বরাদ্দ রাখাই শেষ কথা নয়, বিজ্ঞানসম্মত রোডম্যাপ তৈরি এবং সে লক্ষ্য অর্জনও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দেবে। 

এবারের ঢাউস বাজেট বাস্তবায়নও সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জই বটে। অতীত ইতিহাস বলে, স্বাধীনতার পর থেকে যত বাজেটই দেয়া হয়েছে, তার গড়ে ২০ শতাংশ বাস্তবায়ন হয়নি। দেখা যাক, করোনা মহামারীতে বিশাল বাজেট বাস্তবায়ন এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারে কিনা।

 

. শহীদুল জাহীদ: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক

আরও