বিদেশে যেমন কেউ গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছে, তাকে কোথাও থামতে হবে না। সে টোল দিয়েছে, কিন্তু রিসিটের জন্য তাকে ঘুরতে হচ্ছে না, আবার টোলের টাকা সরকারের কোষাগারে পৌঁছানো নিয়ে অনিশ্চয়তায় তাকে ভুগতে হচ্ছে না। কিংবা টোল স্টেশনের ইজারা নেয়া নিয়ে গণ্ডগোলও নেই। গাড়ির মালিকদের চিপস সরবরাহ করা হয়েছে যার মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে টোলের অর্থটা তার ব্যাংক হিসাব থেকে কেটে নেয়া হয়। সম্প্রতিক একটি সংস্কারের কথা—যেমন প্রতিটি প্রতিষ্ঠানেরই অডিট রিপোর্টের একটি কপি জয়েন্ট স্টক রেজিস্ট্রারের অফিসে (আরজেএসসি) জমা দেয়ার কথা। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটিতে সব প্রতিবেদন পরীক্ষা করার সময় ও লোকবল তেমন নেই। ফলে ভুয়া প্রতিবেদন দাখিলের চল চালু হয়েছে। ফলে অনেকে এনবিআরে এক ধরনের প্রতিবেদন, ব্যাংকে অন্য ধরনের প্রতিবেদন দেয়। এটা নিয়েই বহু ফাঁকির ঘটনা ঘটে। এজন্য ইদানীং আইসিএবি, আরজেএসসি, এফআরসি, এনবিআর, বাংলাদেশ ব্যাংকে একই অডিট রিপোর্ট দেয়ার নির্দেশনা রয়েছে, তা সব সমন্বয় করে একীভূত ব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে। প্রতিবেদনে গরমিল থাকলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না। এ ধরনের সৃজনশীল সংস্কারের কাজ করতে হবে।
কর ফাঁকি দেয়া মানে নিজেকেই ফাঁকি দিচ্ছি—সবার মধ্যে এ বোধটা তৈরি করা জরুরি। এ সামাজিক উপলব্ধিতে সবাইকে আসতে হবে। আসার জন্য অ্যানাবলিং এনভায়রনমেন্ট তৈরি করতে হবে। বছর দুই আগে থেকে কোম্পানি ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাধ্যবাধতা জুড়ে দেয়ায় চাকরিজীবীরা সবাই কিন্তু করের আওতায় এসে গেছেন। তেমনি ট্রেড বডি সমিতি, বাড়ির মালিক সমিতির ওপর সদস্যদের কর দেয়ার দেখভালের দায়িত্ব নিতে হবে। একজন কর পরিদর্শক সুনির্দিষ্ট এলাকার নির্দিষ্টসংখ্যক বাড়ি বা প্রতিষ্ঠানের তথ্য তলব করতে পারেন। পুলিশ বিভাগ বাড়িওয়ালা থেকে ভাড়াটে সবার তথ্য, কার বাড়িতে কারা থাকে, কয়জন থাকে, সবার তথ্য নিচ্ছে। এগুলো এখন স্থানীয় থানা নিচ্ছে। কর প্রশাসনও সহজেই এ ধরনের উদ্যোগ নিতে পারে। এভাবে তথ্য সংগ্রহ করেই এনফোর্স করতে হবে। এনফোর্স করার দুর্বলতাতেই কিন্তু মানুষ ফাঁকি দেয়ার ফুরসত পায়।
আরেকটা বিষয় হলো করের হার যৌক্তিক হওয়া উচিত। করের ভার যাতে সহনীয় থাকে, সেজন্য করহার কমাতে হবে। যাতে মানুষ কর দিতে উৎসাহিত হয়। করের হার সুষম করে করের আওতা বাড়ানো যায়। এখন কড়াকড়ি করা হয় তাদের ওপর যারা কর দিচ্ছেন। যারা দিচ্ছেন না তাদের ওপর নজরদারি নেই। কারো কারো কর দেয়াটা অনেকটা পিকিউনারি পানিশমেন্টের (আর্থিক শাস্তি বা জরিমানা) মতো হওয়া ঠিক নয়।
উদ্বেগের বিষয় হলো আনুষ্ঠানিক রাজস্ব পরিশোধের বাইরে অনানুষ্ঠানিক লেনদেন বেশি হওয়ার পরিবেশে কস্ট অব ডুয়িং বিজনেস এবং করভার বেশি হয়। এর বিপরীতে সেই অনুপাতে সেবা পায় না মানুষ। আমরা শুধু ইনফরমাল ট্রেড শব্দটি শুনেছি, অর্থনীতিতে ইনফরমাল রেভিনিউ নামে একটা শব্দ বেশ মোটাতাজা হচ্ছে। ইন্দোনেশিয়ায় বাড়তি খাই খরচের রিসিট দেয়া হয়। স্পিড মানি বা অন্য কোনো নাম দিয়ে বলা হয়, শুল্ক যে দিয়েছেন তা ঠিক আছে—কাজটা আরেকটু গতিশীল করার জন্য কিছু অর্থ দিতে হবে। তার জন্য বিশেষ রঙের একটা স্লিপ আলাদাভাবে দেয়া হচ্ছে। ফলে সেখানে হিসাব থাকছে সবকিছুর। এ দেশে প্রায় ক্ষেত্রেই নির্ধারিত হারের বাইরে আলাদাভাবে যে বাড়তি অর্থ লেনদেন হয় তার কোনো হিসাবায়ন নেই। এ ধরনের অস্বচ্ছতা দূর করতে রাজস্ব প্রশাসনে অটোমেশন নিশ্চিত হওয়া জরুরি। এক্ষেত্রে অনেক সময় নিয়ে কিছুটা উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বা হচ্ছে। দেশে এবং খোদ রাজস্ব বিভাগে অটোমেশন করার মতো দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও বিদেশী কনসালট্যান্ট ও ভেন্ডরের দ্বারস্থ হওয়ার জন্য কড়া শর্তেও ঋণ নেয়ার বেড়াজালে বিলম্ব করা হচ্ছে কিনা তা বিবেচনা করা আবশ্যক। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ থেকে শর্তযুক্ত ঋণের কিস্তি ছাড়ানোর জন্য রাজস্ব ব্যবস্থাপনা ও নীতি পৃথককরণের সর্বজনীন ও অনিবার্য সংস্কারকে ঝুলিয়ে রাখা সমীচীন কিনা সবার স্বার্থে তা উপলব্ধিতে আনা জরুরি। অটোমেশন ও নীতি পদ্ধতির সংস্কারকে বেগবান করা এখন সময়ের দাবি।
সাধারণ করদাতার অভিযোগ জানানোর জন্য, এমনকি রাষ্ট্রীয়ভাবে কর ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠায় অনেক কিছু করার জন্য যে প্রতিষ্ঠান গড়া হয়েছিল, থাকা উচিত ছিল, সেটি হলো কর ন্যায়পাল অফিস, যা ১৬৬টি দেশে আছে। ২০০৫ সালে এই অফিস যে উদ্দেশ্যকে সামনে নিয়ে গঠিত হয়েছিল, তা অর্জনের সুযোগ না দিয়ে ২০১১ সালে এসে পুরো অফিসটাই বিলোপ করা হয়। ২০০৫ সালে কর ন্যায়পাল অফিস গঠনের সময় বলা হয়েছিল, এখানে মানুষ করসংক্রান্ত হয়রানি ও বিরোধের বিচার পাবে। মাত্র ছয় বছরের মাথায় ২০১১ সালে বলা হলো, ‘করদাতার সঙ্গে ভালো আচরণ করলে, সেবা দিলে, ন্যায়বিচার করলে, কর দেয়ার পদ্ধতি সহজ করলে এ অফিস লাগবে কেন’। আরো বলা হলো, ‘কর আইন, শুল্ক ও ভ্যাট আইনের মধ্যে কর ন্যায়পালের প্রভিশন নেই, তাই সেটিকে বিলোপ করতে হবে’। ন্যায়পাল অফিস কর আইনের সঙ্গে সংযুক্ত না হলে আইন সংশোধন করে সংযুক্ত করে নিতে হবে। করদাতাদের আস্থায় আনতেই তো আইন করে কর ন্যায়পাল অফিস প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
মোদ্দা কথা হলো, কর ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা না করলে করজাল বৃদ্ধি তথা কর আহরণে উন্নতি আসবে না। কর-জিডিপি অনুপাতে বাংলাদেশ যে তলানিতে, তার কারণটাই হলো নানাভাবে এ সমাজে কর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ দেয়া হয়েছে। মানে কাউকে ট্যাক্স দিতে বাধ্য করা হচ্ছে না বলেই এমনটি হচ্ছে। দুর্নীতিজাত অর্থ অর্থনীতির মূল ধারায় আনার উদ্যোগ ইতিবাচক হবে না যদি বিশেষ হ্রাসকৃত হারে কর দিয়ে, উপার্জিত অর্থের উৎস নিয়ে প্রশ্ন না উঠালে। দুর্নীতি দূর তথা সম্পদ বণ্টনবৈষম্য দূর করা কঠিন হবে। এর ফলে বরং বৈষম্য উসকে দেয়া হবে, যদি টাকা কীভাবে উপার্জিত হচ্ছে তা নিয়ে কোনো ব্যাখ্যা বা প্রশ্নের মাধ্যমে বাধা না দেয়া হয়, তাহলে তা হবে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিকে নিরুৎসাহিত করার শামিল। দেখা যাচ্ছে, ২০১০ সালের পর থেকে দেশ ও সমাজে সম্পদের একটা বিরাট বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে। জিডিপির সংখ্যাভিত্তিক পরিমাণ বেড়েছে এবং সেভাবে পার ক্যাপিটা জিডিপিও বেড়েছে বলে দেখানো হচ্ছে, কিন্তু বাস্তবতায় ‘গরুর হিসাব শুধু কাজির খাতায়, গোয়ালে তেমন গরু নেই’ পরিস্থিতি। ২০১৭ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশে দ্রুত ধনীর সংখ্যা বাড়ছিল।
কর সংস্কৃতির বিকাশ প্রত্যাশা করে ২০০৮ সালেই প্রথম তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেয়া হয়—১৫ সেপ্টেম্বরকে জাতীয় আয়কর দিবস ঘোষণা, করমেলার আয়োজন এবং সেরা করদাতার সম্মাননা প্রবর্তন। অর্থবছর শেষ হওয়ার তিন মাসের মধ্যে ব্যক্তি আয়কর পরিশোধের বিধান ছিল বলে ১ সেপ্টেম্বরকে জাতীয় আয়কর দিবস ঘোষণার সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার সময় জানা গেল, তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা ১৫ সেপ্টেম্বরের আগে উদ্বোধন করতে পারবেন না। তাই ১৫ সেপ্টেম্বর জাতীয় আয়কর দিবস হলো। পরবর্তীকালে ৩০ নভেম্বরকে জাতীয় আয়কর ঘোষণা করে কর আহরণের সময়ানুবর্তিতা ও কার্যকারিতাকে দুর্বল ও দীর্ঘসূত্রতার দখলে দেয়া হয়েছে।
২০০৮ সালে আয়কর মেলা আয়োজনটি ছিল নিঃসন্দেহে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। করদাতাকে আগ্রহী করে তোলা, কর এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা প্রশমন, আইনগত ও পদ্ধতিগত জটিলতা সহজীকরণ করমেলা আয়োজনের মাধ্যম যদি করদাতাদের সহজে জানানোর ব্যবস্থা করা হয়, তাহলে মানুষের মধ্যে কর প্রদানের সচেতনতা যেমন বৃদ্ধি পায় তেমনি তারা কর দেয়ার ক্ষেত্রে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতে পারে। ফলে করদাতা ও কর আহরণকারীর মধ্যকার দূরত্বও কমে আসবে। ২০০৮ সালে যে মৌলিক বিষয়গুলোর দিকে লক্ষ রেখে করমেলা আয়োজনের উদ্যোগ নেয়া হয় তা ছিল দূরবর্তী অঞ্চলের করদাতারা যারা কর অফিসে আসতে পারেন না বা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না তাদের কথা বিবেচনা করে দূরবর্তী অঞ্চলে অর্থাৎ উপজেলা পর্যায়ে যে করদাতা রয়েছেন তাদের জন্য একটি নির্দিষ্ট তারিখ ঠিক করার মাধ্যমে কর অফিসের কর্মকর্তারা সেখানে উপস্থিত হয়ে কর সম্পর্কে তাদের বিভিন্ন তথ্য জানাবেন। উদ্দেশ্য, তারা যেন উৎসবমুখর পরিবেশে স্বাচ্ছন্দ্যে কর প্রদান করতে পারেন। লক্ষণীয় যে করমেলা করা হয় বিভিন্ন ব্যক্তিশ্রেণীর করদাতার (যারা মোট করদাতার মাত্র ৩০ শতাংশ) জন্য, এখানে করপোরেট এবং কোম্পানির কর প্রদান ব্যবস্থা নেই। অভিযোগ উঠেছে করমেলায় কর প্রদানের পরও পরবর্তী সময়ে করদাতাকে আবার কর অফিসে ডেকে পাঠানো হয়েছে। তাকে নতুন করে আসতে বলা হচ্ছে। করমেলায় বেশি ভিড় হওয়ার নেপথ্যে কিন্তু এটাও একটা কারণ যে কর প্রদানে আগ্রহীরা কর অফিসে গিয়ে কর দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। এটা থেকেও শিক্ষা নেয়ার রয়েছে। প্রতিটি কর অঞ্চলে তথ্য ও সেবা কেন্দ্র খোলা আছে।
কর দেয়ার পদ্ধতিটাকে সহনশীল ও টেকসই করতে হলে ঘোষিত নীতিপদ্ধতির মধ্যে কনসিসট্যান্সি রাখতে তা ঘন ঘন পরিবর্তন করা ঠিক নয়। কর প্রদানের ক্ষেত্রে প্রতি বছরই নতুন নতুন পরিবর্তন আনা হলে বাস্তবায়নে জটিলতা বাড়ে। একটা আর্থিক আইন জারি করলে সর্বনিম্ন চার-পাঁচ বছর তা বহাল থাকা উচিত। তাহলে সবাই আইনটি সম্পর্কে অবগত থাকবেন। প্রতি বছর যদি বিধিবিধানের পরিবর্তন করা হয়, তাহলে অনুসরণে সমস্যা হয়।
সরকারকে রাজস্বের ইনফ্লেটেড ফিগার দেখানোর সমস্যা হলো—উল্লেখিত আয়ের অংককে ধরে অন্য খাতে ব্যয়ের কর্মসূচি ঠিক করা হয়, তাই জোর দেয়া উচিত প্রকৃত ও নেট ফিগারের দিকে। ভুল ফিগারকে সঠিক ধরে ব্যয়ের বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হলে সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে বাধ্য। এক্ষেত্রে কর আহরণের প্রকৃতি এবং বাজেট প্রণয়ন ও ব্যবস্থাপনায় সংস্কার আনা প্রয়োজন। বাজেটপূর্ব আলোচনায় সবাই এমন এক সময় নিজেদের দাবি ও সুপারিশ উত্থাপন করেন যখন বাজেট প্রস্তাব সংশোধনের কোনো সুযোগ থাকে না। এক্ষেত্রে আলোচনা ও দাবি-দাওয়া পেশ করার সময়ও পাওয়া যায় না ঠিকমতো। ফলে যে দাবি ও সুপারিশ আসছে তার বিবেচনায় কোনো ভিত্তি হয়ে ওঠে না। ফলে দাবি ও সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন বা পূরণ করা সম্ভব হয় না ঠিকমতো।
রাজস্ব আহরণ কার্যক্রমে ও পদ্ধতি প্রক্রিয়ায় আইনসংগত স্বচ্ছতার আলোকে গতিশীলকরণের স্বার্থে ভিন্ন প্রেক্ষাপটে আইন ও প্রক্রিয়ার যৌক্তিকতা যথা বিশ্লেষণ হওয়া উচিত। বিশেষ করে কর আহরণ প্রক্রিয়ার যেসব আইনি জটিলতা সেটা ঠিকমতো সংস্কারের মাধ্যমে স্পষ্ট করা না গেলে সমস্যা থেকেই যাবে। অন্তত এ অবস্থায় রেখে ব্যাপক কর আদায়ের যে কথা চিন্তা করা হয়ে থাকে তা অর্জন স্বতঃস্ফূর্তভাবে সম্ভব হয় না। এক্ষেত্রে আইনের আর্থ-প্রশাসনিক প্রয়োগের ক্ষেত্রে যদি আরো কিছু অসম্পূর্ণতা ও ফাঁকফোকর থেকে থাকে, তা সংশোধন করা না গেলে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এনবিআর কর্তৃপক্ষের নেতৃত্ব দেয়া কঠিন হয়ে যাওয়াটাই স্বাভাবিক।
ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ: সাবেক সচিব ও এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান