পলিসি কনক্লেভ

ভোক্তার স্বার্থ সংরক্ষণে প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে

আমিও যোগদান করেছি চার মাসের মতো হয়েছে। যোগদান করে প্রথমেই দেখলাম ডিম অত্যন্ত উচ্চমূল্যে বাজারে বিক্রি হচ্ছে। পরদিন সভা করলাম।

আমিও যোগদান করেছি চার মাসের মতো হয়েছে। যোগদান করে প্রথমেই দেখলাম ডিম অত্যন্ত উচ্চমূল্যে বাজারে বিক্রি হচ্ছে। পরদিন সভা করলাম। পরে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে জানতে পারলাম, বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমানো গেলে ডিমের দাম কমানো সম্ভব। উৎপাদকরা যদি সরাসরি পাইকারদের কাছে পৌঁছে দিতে পারে, তাহলে দাম কমানো সম্ভব। সবার সহযোগিতায় পরদিন ডজনে ৩০ টাকা কমেছে। এর অর্থ মধ্যস্বত্বের অস্তিত্ব আছে। আমি জানি না, মধ্যস্বত্বকে দুভাবে বলা হচ্ছে। যারা মধ্যস্বত্ব হিসেবে ব্যবসা করেন তাদের আমরা মধ্যস্বত্ব বলছি না। কোনো বিনিয়োগ ও শ্রম ছাড়া যারা কেবল উপস্থিতি দিয়ে হাতবদল করে লাভটি নিয়ে নিচ্ছেন এবং ভোক্তার কাছে বেশি মূল্যে বিক্রি করছেন। এ রকম ভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতা আছে। যেমন আলুর ক্ষেত্রে যখন দাম বাড়ে এবং সামনে আরো বাড়ার সম্ভাবনা আছে। তখন কোনো একটি সভায় এ বিষয়টি আলোচনা করি, তখন একজন দায়িত্ববাদ ব্যক্তি বলতে চেষ্টা করলেন কোল্ড স্টোরেজে বীজ আলুও আছে। তাই এটি বের করা সেনসেটিভ। তখন আমরা মনে হয়নি এই উত্তরটি একটি সন্তোষজনক উত্তর। আমরা সরকারি কর্মচারী এবং আমাদের বেতন-ভাতা হয় জনগণের করের টাকায়। সেই জনগণকে যদি রিটার্ন না দিতে পারি এবং মাঝখানে এ ধরনের নেতিবাচক কাজের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করে ফেলি, তাহলে বাজারে সমস্যা হবেই। একই সঙ্গে পরবর্তী সময়ে আইন অনুসারে, তল্লাশি, ওয়ারেন্ট দেয়া এবং কোনো ব্যবসায়িক স্থানকে সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা যায়। এক্ষেত্রে যদি প্রতীয়মান হয় যে কোনো প্রতিষ্ঠান কোনোভাবে ভোক্তাদের অধিকার ক্ষুণ্ন করতে তৎপর রয়েছে, তাহলে ওই ব্যবস্থাগুলো নেয়া যায়। ভোক্তা অধিকার আইনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত রয়েছে জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসন।

অফ সিজনে আলু থাকে কোল্ড স্টোরেজে। কোনো পণ্য কোল্ড স্টোরেজে রাখার একটি নির্দিষ্ট সময় আছে। কোল্ড স্টোরেজ থেকে আলু বের না হয় এবং এ কারণে বাজারে আলুর দাম বেড়ে গেলে তখন স্থানীয় প্রশাসনের দায়িত্ব থাকে। রংপুর, মুন্সিগঞ্জ, জয়পুরহাট, বগুড়া, রাজশাহী জেলা প্রশাসকের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করলাম। এতে রংপুরে সাড়া পেলাম। রাজশাহীর পবা উপজেলা নির্বাহী অফিসারের সাড়া পেলাম। তবে মুন্সিগঞ্জে ও গোটা রাজশাহীতে সাড়া পেয়েছি তা বলতে পারছি না। এখন ভোক্তা অধিকার আইনের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করে তাহলে ভোক্তাদের অধিকার সংরক্ষণ করা সম্ভব। এই যে চেইন সেটিকে যদি কার্যকর করতে হয় এবং ভোক্তাদের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে হয়—তাহলে সবাইকে নিয়ে বোঝাপড়ার ভিত্তিতে সঠিক সময়ে কাজ করতে হবে।

উল্টো আরেকটি চিত্র দেখেছি। এক মাস আগে পবায় উপজেলা নির্বাহী অফিসার কেজিপ্রতি ৩৯ টাকা দামে আলু বিক্রি করতে পেরেছিলেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো কোল্ড স্টোরেজ থেকে বের হওয়ার পরে ব্যবসায়ী ট্রাকে করে ঢাকায় এসে ঠিকই উচ্চ দামে বিক্রি করেছেন। আরেকটি বাস্তবতা হলো কোনো একটি কোম্পানির একটি ওষুধ এক মাস আগে যে দাম ছিল, সেটি ঠিক এক মাস পর প্রায় ৬০ শতাংশ বেশি দামে বিক্রি হয়েছে। ওষুধ মানুষের জীবন ও বেঁচে থাকার সঙ্গে সম্পর্কিত। ওষুধের প্রিন্টেড দাম এত বেশি, কিন্তু ওষুধ উৎপাদকদের একটি নৈতিক বিষয় বিবেচনা করা উচিত বলে মনে করি। সেখানে আসে আমাদের পরিবর্তনের বিষয়টি।

গত ৫ আগস্ট যে পরিবর্তন হয়েছে—তার আগের এবং পরের পরিবর্তনটি বুঝতে হবে। সেই পরিবর্তনে আমাদের ছোট ভাই-বোনদের জীবনহানি ঘটেছে। সেই পরিবর্তনে অনেকের অঙ্গহানি হয়েছে। তাদের বিনিময়ে এ পরিবর্তন হয়েছে। তাদের বিনিময়ে বর্তমান সরকার। তাহলে এ পরিবর্তন কেন হলো? এটা আমাদের উপলব্ধি করতে হবে। নিশ্চয় এর পেছনে এমন কিছু বিষয় ছিল, যা নৈতিক মানদণ্ডে কোনোভাবেই গ্রহণ করা যায় না। বর্তমানে যেহেতু বাজার পরিস্থিতি বা খাদ্যমূল্যের কথা বলছি, যদি এ নৈতিক বিষয়টিকে এড়িয়ে যাই বা ভুলে যাই তাহলে সঠিক পথের সন্ধান পাব বলে মনে হয় না। আমরা কি সুশাসিত ছিলাম? আমরা যারা সরকারি কর্মচারী তারা সুশাসনের চেতনাকে ধারণ করে এ রাষ্ট্রকে চালিয়েছি কিংবা বেতন নিয়েছি? তারপর পরিবর্তনের পর আমরা কি সুশাসনের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ? আমরা কি চাই এ দেশের সংবিধান যাদের মালিকানা দিয়েছে তার মালিকানাকে প্রতিষ্ঠা করব? দায়িত্ব পালনে বা বেতন গ্রহণে বা সেবা দেয়ার অঙ্গীকারে সংবিধানের সঙ্গে সম্পর্ক না থাকে তাহলে যে বিপর্যয়গুলো আগে দেখেছি সেগুলো সামনেও দেখতে হতে পারে। আমি মনে করি, সবার আগে নিজেকে পরিবর্তন করতে হবে।

মোহাম্মদ আলীম আখতার খান: মহাপরিচালক, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর

[বণিক বার্তা আয়োজিত ‘‌খাদ্যপণ্যের যৌক্তিক দাম: বাজার তত্ত্বাবধানের কৌশল অনুসন্ধান’ শীর্ষক পলিসি কনক্লেভে প্যানেল আলোচকের বক্তব্যে]

আরও