স্মৃতিচারণ পর্ব-৫

আমাদের কালের বিশ্ববিদ্যালয় জীবন

পরীক্ষা পেছানোর কথা এখানেই শেষ নয়, আরো আছে। খুব সম্ভব ১৯৭৬ সালের ঘটনা। আমরা তখন অনার্স ফাইনাল ইয়ারের শেষ দিকে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে পার্ট থ্রি সমাপনী পরীক্ষা নজদিক। পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য আমরা আরো কিছু সময় চাইছি কিন্তু কর্তৃপক্ষ রাজি নয়। আমরা আন্দোলন শুরু করেছি। আন্দোলন যখন তুঙ্গে, ওই সময় ছাত্র প্রতিনিধি দলের সঙ্গে আমিও উপাচার্যের সঙ্গে দেখা করতে

পরীক্ষা পেছানোর কথা এখানেই শেষ নয়, আরো আছে। খুব সম্ভব ১৯৭৬ সালের ঘটনা। আমরা তখন অনার্স ফাইনাল ইয়ারের শেষ দিকে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে পার্ট থ্রি সমাপনী পরীক্ষা নজদিক। পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য আমরা আরো কিছু সময় চাইছি কিন্তু কর্তৃপক্ষ রাজি নয়। আমরা আন্দোলন শুরু করেছি। আন্দোলন যখন তুঙ্গে, ওই সময় ছাত্র প্রতিনিধি দলের সঙ্গে আমিও উপাচার্যের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছি। তখন . মুহাম্মদ এনামুল হক আমাদের উপাচার্য। আমরা যখন তার অফিসে ঢোকার অনুমতি পেলাম তখন সেখানে বসা ছিলেন প্রকৃতিবিজ্ঞান (Physics) বিভাগের প্রধান . আব্দুর রকিব। উপাচার্য আমাদের আবদার মানতে একেবারেই রাজি নন। তিনি বললেন, আন্দোলন বন্ধ করে পড়ায় মন দাও। সময় মতোই পরীক্ষা হবে। আমরা বললাম, পরীক্ষা দেব না। তিনি বললেন, আমি ভাইংব তবু মইচকাব না। . এনামুল হক বাংলা ভাষার একজন বড় পণ্ডিত ছিলেন কিন্তু তার উচ্চারণে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার প্রভাব ছিল প্রবল। ভিসির সঙ্গে আমাদের কথাবার্তা ওখানেই শেষ।

তারপর অন্য প্রসঙ্গে আমাদেরই এক বন্ধু বলল, স্যার, আমরা ক্যাম্পাসে একটা মসজিদ চাই। ভিসি উত্তর দেয়ার আগে . রকিব বললেন, মসজিদ চাও, একটা মসজিদ বানাতে কতটা ইট লাগে তা জানো? আমাদের বন্ধুটি মুখের ওপর স্যারকে বলে দিল, আপনি  বলতে পারবেন? রকিব স্যার বিব্রত বোধ করলেন কিন্তু কথা আর বাড়ালেন না।

ঘটনার কিছুদিন পর . মুহাম্মদ এনামুল হকের সঙ্গে আরেক বাহাস হয়েছিল আমাদেরই ক্লাসমেট বাংলা বিভাগের আব্দুল হামিদের। হামিদ ভাই আমাদের সঙ্গে ভর্তি হলেও তিনি আমাদের চেয়ে বয়সে বেশ বড় এবং পরিণত বুদ্ধির মানুষ ছিলেন। তিনি ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসা থেকে টাইটেল পাস আলেম ছিলেন। ঘটনাটা ঘটেছিল ঈদে মিলাদুন্নবীর অনুষ্ঠানে। ওইদিন প্রধান অতিথি ছিলেন উপাচার্য মহোদয়। মোনাজাত মিষ্টি বিতরণের আগে শেষ বক্তৃতায় আয়োজকদের তুলোধুনো করে প্রধান অতিথি বলেছিলেন, মুসলমানদের দুই ঈদ, তোমরা নতুন ঈদ কোত্থেকে আমদানি করলে? হামিদ ভাই মোনাজাতের আগে ফ্লোর নিয়ে ভিসি সাহেবের উদ্দেশে এক সংক্ষিপ্ত বয়ান রাখলেন। বললেন, ঈদ সে ঈদ নয়। ঈদ মানে আনন্দ, নবীর জন্মদিনে তাকে স্মরণ করে দরুদ পাঠে একটু আনন্দ করলে দোষের কিছু হয় না।

বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে বিশেষ বিশেষ দিবস উদযাপনে এবং বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠান পালনে আমরা যেমন অনাবিল আনন্দ কুড়াতাম, তেমনি আমাদের ক্যাম্পাসের প্রকৃতি পরিবেশের সঙ্গে মিলেমিশেও আমরা অনেক মজা করেছি। আমাদের কাছে জাবিজীবনের একটা বিশেষ উপজীব্য বিষয় ছিল বৈকালিক ভ্রমণ। আমরা দু-তিন বন্ধু মিলে আড্ডায় আড্ডায় অনেক দূর পর্যন্ত হেঁটে বেড়াতাম। কাজে ক্যাম্পাসের ভেতর বাইরের মধ্যে কোনো পার্থক্য ছিল না। ভেতরে বনে-জঙ্গলে এলোপাতাড়ি সব দিকেই ছিল আমাদের অবাধ বিচরণ। হাঁটতাম, বাইরেওরাস্তার ওপারে ডেইরি ফার্মে, উত্তর দিকে বিশমাইল-এর পর রক্ষীবাহিনীর ক্যাম্প ছাড়িয়ে জাতীয় স্মৃতিসৌধ পর্যন্ত ছিল আমাদের যাতায়াত। পুব দিকে লাল মাটির সিঅ্যান্ডবির কাঁচা রাস্তা দিয়ে ধুলো উড়িয়ে বাসাইদ/দোসাইদ বাজার পর্যন্ত যেতাম। দক্ষিণ দিকে মিলিটারি খামার পর্যন্ত ছিল আমাদের সীমানা। পশ্চিম দিকে যেতাম ক্যাম্পাস লাগোয়া গ্রামে (ওই গ্রামের নামটা এখন মনে করতে পারছি নাসম্ভবত পাথালিয়া)

বিকালে বেড়াতে বেরোলে সর্পদর্শন ছিল এক অবশ্যম্ভাবী অনুষঙ্গ। এখন আছে কিনা জানি না, তবে ১৯৭০-এর দশকে ক্যাম্পাসে ঢোঁড়া সাপের উপদ্রব ছিল প্রকট। আমাদের বিকালবেলার পদযাত্রায় সাপ মারা ছিল এক বিশেষ উত্তেজনাকর রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা। বিশেষ করে গরমকালে চলতে ফিরতে যত্রতত্র ঢোঁড়ার সঙ্গে আমাদের মোলাকাত হয়ে যেত। দেখলেই আমরা রাস্তা থেকে ইট তুলে সাপের মাথাটা থেঁতলে শিল-নোড়ায় মরিচ পিষার মতো করে ফেলতাম। সাপের বাকি ধড় রাস্তায়ই পড়ে থাকত, বৃষ্টি হলে পচে গলে ধুয়ে মুছে যেত, খরা হলে শুকিয়ে শুঁটকি হয়ে থাকত। যেগুলো রাস্তা থেকে ছুড়ে ফেলে দিতাম সেগুলো চিল ছোঁ মেরে নিয়ে গিয়ে গাছের মগডালে বসে মজা করে খেত। 

ওই সময়ে বৃক্ষরোপণ পক্ষের আগে বা পরে ক্যাম্পাসে আরেকটা কাজ চলত। কিছু জায়গায় আগাছার বাড়বাড়ন্ত এতটা তীব্র ছিল যে একজন মানুষ ঢুকলে ঘাড়ের ওপর ছাড়া নিচ দিক দেখাই যেত না। সেই জঙ্গল তখন হয়ে উঠত শিয়াল, নেউল আর সাপের অভয়ারণ্য। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ প্রতি বছর জুন-জুলাইয়ে আগাছা কেটে সাফ করার জন্য ঠিকা কাজ দিয়ে দিতেন। ঠিকাদাররা গ্রাম থেকে একসঙ্গে দু-তিন ডজন দিনমজুর নিয়ে আসতেন।  শ্রমিকরা যখন সকালবেলা লাইন ধরে কাজে আসতেন, তাদের এক হাতে থাকত লম্বা ধারালো দা, আরেক হাতে পোঁটলা। পোঁটলায় থাকত যার যার দুপুরের খাবার। কাজের লোকদের যাওয়া-আসা আর বন কাটাকাটি যখন চলত তখন বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে উঠত শিক্ষার্থীদের বিদ্যার্জন এবং শ্রমিকদের কর্মচাঞ্চল্যের এক অপূর্ব মিলনমেলা!

গরমকাল গত হলে ঘটত শীতের আগমন। মৌসুমে অর্থাৎ ডিসেম্বর-জানুয়ারি এলেই গোটা ক্যাম্পাস মেতে উঠত এক ভিন্নধর্মী উৎসব-আমেজে। একেক সপ্তাহে একেক বিভাগের পিকনিক যাত্রা। কেউ যাচ্ছে মধুপুর, কেউ যাচ্ছে ময়নামতি, কেউ যাচ্ছে সোনারগাঁ, কেউবা আবার চন্দ্রা। তখন এগুলোই ছিল সবচেয়ে পছন্দের গন্তব্য। রোববারে পিকনিক হলে শনিবার বিকাল থেকেই শুরু হয়ে যেত সাজ সাজ আয়োজন, সারা ক্যাম্পাসে হইহই রইরই ভাব। মনে রাখবেন, তখনকার ক্যাম্পাস মানেই আল-বেরুনী হলসংলগ্ন পুরনো ক্যাম্পাস। সন্ধ্যা থেকেই বাস এসে দাঁড়িয়ে থাকত হলের সামনে, বাসে জিনিসপত্র তোলা হচ্ছে, আর চড়া ভলিউমে রেকর্ডে সন্ধ্যা মুখার্জির গান বাজানো হচ্ছে—‘চন্দন পালঙ্কে শুয়ে একা একা কী হবে,

জীবনে তোমায় যদি পেলাম না...

দূরের যাত্রা হলে রাত ২টা-৩টার দিকেই বাস ছেড়ে দিত। আমার মনে আছে, আমরা একবার পিকনিকে গিয়েছিলাম টাঙ্গাইলের মধুপুর বাস এত আগে ক্যাম্পাস ছেড়ে গিয়েছিল যে টাঙ্গাইল শহর পার হওয়ার পরও ভোরের আলো ফোটেনি। যাত্রাপথে বাসের ভেতরে আনন্দ, ফুর্তি আর ফুর্তির ফোয়ারা বয়ে যেত। চলত গান, কৌতুকাভিনয়, আরো কত কিছু। পিকনিক স্পটে পৌঁছার পরই একদফা খাবার দেয়া হতো। বিস্কুট, কলা, বাদাম, চানাচুর ইত্যাদি। সে যুগে বোতল-পানির কোনো কারবার ছিল না। উৎস থেকে বালতি দিয়ে খাবার পানি বয়ে আনতে হতো। পানির কাছেই পিকনিকের মূল ঘাঁটি গাড়া হতো। তারপর যার যেদিকে মন চায়, সবুজ-শ্যামল গাছপালার ফাঁকে ফাঁকে ছোটাছুটি, হাঁটাহাঁটি করত এবং গল্প-আড্ডা ইত্যাদিতে মজে থাকত। সেবার আমরা কয়েক বন্ধু হাঁটতে হাঁটতে গারো পল্লীতে গিয়ে হাজির হয়েছিলাম, উপজাতি লোকদের বাড়িঘর, জীবনযাত্রা, চলাফেরা, মিশনারিদের বানানো সুন্দর স্কুল ইত্যাদি দেখে খুব ভালো লেগেছিল, কিন্তু আমি বেশিক্ষণ বাইরে না থেকে ফের চলে এলাম আমাদের আস্তানায়। চুলার এক পাশে বিছানা-চাদর বিছিয়ে ভাবীরা বসে চা খাচ্ছেন, আড্ডা দিচ্ছেন, আরেক পাশে স্যাররা তাসে মশগুল। আমি চুলার পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছি বাবুর্চির কাণ্ডকারখানা। কীভাবে মুরগির রোস্ট, খাসির রেজালা পোলাও রান্না হচ্ছে, তার প্রতি গভীর মনোযোগের সঙ্গে চোখ রাখছি। রান্নার প্রতি আমার আসক্তি আজও অটুট আছে।

শীত-গ্রীষ্ম ১২ মাসই ক্যাম্পাসে অনুষ্ঠিত হতো বিভিন্ন ধরনের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড। মাত্র দু-একজন ছাড়া আমাদের নিজস্ব শিল্পী ছিল না বললেই চলে। ছোটখাটো অনুষ্ঠানেও ঢাকা থেকে গায়ক-গায়িকাদের ভাড়া করে আনতে হতো। যারা আসতেন তাদের মধ্যে আজ নাম মনে পড়ছে আব্দুল লতিফ, ফেরদৌস ওয়াহিদ, ফকির আলমগীর, ফিরোজ সাঁই, আজম খান, পিলু মমতাজ, আবিদা সুলতানা, নাদিরা বেগম আরো অনেকে। এদের মাঝে কেউ কেউ এরই মধ্যে দুনিয়া ছেড়ে চলেও গেছেন।

সেলিম আল দীন বাংলা বিভাগে যোগ দেয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যজীবনে প্রাণসঞ্চার হয়। আর হুমায়ুন ফরীদি আসার পর এটা পূর্ণতার দিকে এগিয়ে যায়। আমরা যখন মাস্টার্স ক্লাসে তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে একবার নাট্য উৎসব হয়েছিল। সেটাই ছিল ক্যাম্পাসে -জাতীয় প্রথম  উৎসব। এটা ছিল খুবই বর্ণিল, রমরমা জমজমাট। ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে অনেক গ্রুপ নিজেদের লেখা নাটক মঞ্চস্থ করেছিল। আমাদের বন্ধু আবুল কাশেমও একটা নাটক লিখেছিল। অভিনেতাদের মধ্যে যে কয়েকজনের নাম মনে পড়ে তারা হলেন ফরীদি, আশরাফ, হাসি, রঞ্জু, রেজা আরো অনেকে। যাদের নাম এখন স্মরণে আসছে না, তাদের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। ওই নাট্যপ্রতিযোগিতায় ফরীদির আত্মস্থ আগুন হিরণ্ময়ীদের বৃত্তান্ত প্রথম পুরস্কার পেয়েছিল, সেকথা আজও আমার মনে আছে।

নাট্য উৎসবের পরের ফেব্রুয়ারিতেই নম্বর হল থেকে একটা ম্যাগাজিন বের করার সিদ্ধান্ত হলো। তবে কী করে জানি না, সম্পাদনা প্রকাশনার দায়িত্ব পড়ল বন্ধু রায়হান শরীফ আমার ওপর। লেখালেখি ছাপার ব্যাপারে আমি ছিলাম একদম আনাড়ি, বলতে পারেন মাসুম বাচ্চা! রায়হানের ওপর ভরসা করে প্রভোস্ট কলিমউল্যা স্যারের প্রস্তাবে আমি রাজি হয়ে গেলাম। ছোটবেলা থেকেই রায়হান প্রিন্টিং শিল্পের সঙ্গে জড়িত, তার বাবা তার নামেই করেছিলেন দিনাজপুরের বিখ্যাত মুকুল প্রেস লেখা জমা পড়ার পর যাচাই-বাছাই সেরে পাণ্ডুলিপি বগলদাবা করে দুই বন্ধু গেলাম ঢাকা। অনেক ঘোরাঘুরির পর পুরান ঢাকার এক প্রেসের সঙ্গে কথা পাকাপাকি হলো। কম্পিউটার, সফটওয়্যারের কোনো হদিস নেই, সে সময় ছিল গুটেনবার্গের ব্লক প্রিন্টিংয়ের যুগ। শুরু হলো ব্লক কম্পোজিশন, শেষ হতে হতে বেশ রাত হয়ে গেল। তারপর চলল প্রিন্টিংয়ের কাজ। একদিকে ছাপা হচ্ছে, আরেক দিকে আমরা প্রুফ দেখে দিচ্ছি, মেশিন চলছে অনবরত। প্রুফের কাজ শেষ হওয়ার পর মেশিন ঘরের পেছনের কক্ষে পাটি বিছানো মেঝেতে আমরা দুজন গিয়ে একটু ঘুমানোর চেষ্টা করলাম।

মশার জ্বালায় ঘুমোতে না পেরে গভীর রাতে ঘরের বাইরে গেলাম, গিয়ে দেখি সামনে প্রেসের মালিকের গাড়ি পার্ক করা। ভাগ্যক্রমে দরজা আনলকড ছিল। বিসমিল্লাহ্ বলে একটু ঘুমের আশায় দুজন গাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়লাম। হায়রে আল্লাহ্! ঘুমাই কেমনে! যেমন ভেতর, তেমন বাহির! একটায় কামড় দেয় তো তিনটায় ভনভন করে ওঠে, আরেকটা নাকে-মুখে ঢুকে যেতে চায়। মিনিটের মধ্যে নিদ্রা যাওয়ার সব আশা ছেড়ে জান নিয়ে গাড়ি থেকে বেরিয়ে এলাম। বুঝলাম গাড়ির দরজা কেন তালা ছাড়াই ছিল, কারণ মালিকপক্ষ জানত, ইগনিশনের চাবি হাতে পেলেও ওই জায়গা থেকে রাতের বেলা কেউ গাড়ি চুরি করতে পারবে না। নমরুদের যমদূতরা মালিকের বরকন্দাজ, সর্বদা সতর্ক এবং জাগ্রত। এভাবে নিদ্রাহারা রাত কাটিয়ে পরদিন ছাপানো ম্যাগাজিন নিয়ে ঘুম ঢুলুঢুলু চোখে রায়হান আর আমি ক্যাম্পাসে ফিরে এলাম।

এভাবে বলতে গেলে ঘুমের ঘোরেই কাটিয়ে দিলাম ছাত্রজীবন। পরীক্ষা শেষে কয়েক মাস এদিক-ওদিক চাকরি করে আবার আমার প্রিয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে এলাম। ১৯৭৮ সালের জুলাই অথবা আগস্টে প্রভাষক হিসেবে অর্থনীতি বিভাগে যোগ দিলাম। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে উপাচার্যের স্থায়ী ভবনের নির্মাণকাজ মাত্র শেষ হয়েছে। উপাচার্য বাড়িতে ওঠার আগে নতুন বাড়িতে এক দোয়া মিলাদের আয়োজন করেছেন। দাওয়াত দিয়েছেন শুধু শিক্ষক অফিসারদের। আমি সেদিন ঢাকায় ছিলাম বলে দোয়া মাহফিলে থাকতে পারিনি। পরে শুনেছি সেটা নাকি খুব শানশওকতের সঙ্গেই হয়েছিল। সেদিনকার বিরিয়ানি নাকি স্বাদে-গন্ধে অপূর্ব হয়েছিল।

তারপর চলে গেছে কয়েক সপ্তাহ। তত দিনে উপাচার্য মহোদয় ক্যাম্পাসের বাসিন্দা। আমি আল-বেরুনী হলের অ্যাসিস্ট্যান্ট হাউজ টিউটর। আমাদের প্রভোস্ট . আজিজুল হক কোনো এক কাজে ভিসির বাসায় যাচ্ছেন, পথে আমার সাথে দেখা। তিনি আমাকে বললেন, ওয়াহিদ, চলো আমার সঙ্গে। তখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে। ভিসির বাসায় গিয়ে দেখি ছাত্রদের একটা দল বসে আছে। তাদের অভিযোগ ভিসির বাড়ির মিলাদে কেন তাদেরকে দাওয়াত করা হলো না। ভিসি স্যার তাদের বোঝানোর চেষ্টা করছেন। বলছেন, তোমাদেরও অনেক অনুষ্ঠান হয়, সেখানে আমি টাকা দিই। তোমাদের অনুষ্ঠানে যেমন শিক্ষক-কর্মচারীদের থাকার বাধ্যবাধকতা থাকে না, তেমনি এটাও ছিল শিক্ষক-অফিসারদের একটি অনুষ্ঠান। এখানেও তোমাদের থাকা জরুরি ছিল না। তার পরও একজন ছাত্র স্যারের সঙ্গে কুতর্ক শুরু করেছে, এমন সময় তিনি একটু রেগে গিয়ে বললেন, তোমরা আমার কাছে মিলাদের দাওয়াতের অভিযোগ নিয়ে এসেছ, তর্কাতর্কি করছ। তোমাদের মতো আমিও একসময় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম। ভিসির সঙ্গে সামনাসামনি তর্ক করা তো দূরে থাক, আমরা তার দেখাই পেতাম না। গোটা বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে হাতেগোনা কয়েক দিন ভিসিকে দেখেছি, তাও দূর থেকে।

 

আবু এন এম ওয়াহিদ: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, টেনেসি স্টেট ইউনিভার্সিটি

এডিটর, জার্নাল অব ডেভেলপিং এরিয়াজ

[email protected]

আরও