দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ছে, যুক্ত হচ্ছে নতুন প্রযুক্তি ও জ্বালানির উৎস। ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার ৪৫০ মেগাওয়াট অতিরিক্ত নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা কমানো ও জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে এসব উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। তবে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর সঙ্গে তাল মিলিয়ে গ্রিডের স্থিতিশীলতা ও সঞ্চালন-বিতরণ সক্ষমতা নিশ্চিত করা না গেলে নতুন বিদ্যুৎই ব্যবস্থাপনার জন্য বাড়তি ঝুঁকি হয়ে উঠতে পারে। তাই বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্প্রসারণের পাশাপাশি গ্রিড আধুনিকায়ন, পর্যাপ্ত স্পিনিং রিজার্ভ ও ব্যাটারি স্টোরেজ গড়ে তোলাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
সম্প্রতি শ্রীলংকায় জাতীয় গ্রিড বিপর্যয়ের ঘটনা এ বিষয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছে। দেশটিতে বিপর্যয়ের সুনির্দিষ্ট কারণ নিশ্চিত না হলেও সৌরবিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান সংযুক্তি ও গ্রিডের স্থিতিশীলতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বাংলাদেশের জন্যও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন দিনের আলো ও আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল। দিনের বেলায় উৎপাদন বাড়লেও সন্ধ্যায় তা কমে যায়, অথচ তখন বিদ্যুতের চাহিদা বেশি থাকতে পারে। এ ব্যবধান পূরণে বিকল্প উৎপাদন সক্ষমতা ও বিদ্যুৎ সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকলে সরবরাহ-চাহিদার ভারসাম্য রক্ষা কঠিন হবে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রস্তুতি জরুরি। কেন্দ্রটির প্রতিটি ইউনিটের উৎপাদন সক্ষমতা ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। কোনো কারণে একটি ইউনিট হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলে তাৎক্ষণিকভাবে বিকল্প উৎস থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে গ্রিডের ফ্রিকোয়েন্সি ও স্থিতিশীলতার ওপর বড় চাপ তৈরি হতে পারে। এ ঝুঁকি মোকাবেলায় স্পিনিং রিজার্ভ—অর্থাৎ প্রয়োজনের মুহূর্তে দ্রুত কাজে লাগানো যায় এমন অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। অথচ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে এ সক্ষমতা নিশ্চিত করা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্র গ্রিডে যুক্ত করার আগেই এ ঘাটতি দূর করতে হবে।
দেশে অতীতেও একাধিকবার গ্রিড বিপর্যয় ঘটেছে। উৎপাদন ও চাহিদার ভারসাম্যহীনতা, সঞ্চালন লাইনের ত্রুটি, পুরনো সাব-স্টেশনের সীমাবদ্ধতা এবং একটি অংশের বিপর্যয় থেকে ধারাবাহিকভাবে অন্য অংশ বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা এর ঝুঁকি বাড়ায়। গত কয়েক বছরে নতুন সঞ্চালন লাইন ও সাব-স্টেশন নির্মাণে অগ্রগতি হলেও শুধু অবকাঠামো সম্প্রসারণ যথেষ্ট নয়। উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ—তিন পর্যায়ের সক্ষমতা, রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালন ব্যবস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে সঞ্চালন অবকাঠামোর আধুনিকায়নের পাশাপাশি বিতরণ ব্যবস্থার দুর্বলতাও চিহ্নিত করে বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন।
এক্ষেত্রে প্রথম করণীয় হওয়া উচিত জাতীয় গ্রিডের সক্ষমতা ও ঝুঁকি নিয়ে সমন্বিত কারিগরি মূল্যায়ন। পারমাণবিক ও নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ যুক্ত হলে কোন অঞ্চলে কতটা চাপ তৈরি হবে, কোনো বড় ইউনিট বন্ধ হলে বিকল্প সরবরাহের ব্যবস্থা কী হবে এবং কোন সঞ্চালন লাইন বা সাব-স্টেশনে আধুনিকায়ন প্রয়োজন—এসব নির্ধারণ করে সময়বদ্ধ কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ, বিপিডিবি ও বিতরণ কোম্পানিগুলোর মধ্যে নিয়মিত তথ্য বিনিময় এবং যৌথ সিদ্ধান্ত গ্রহণের কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে। নতুন কেন্দ্র চালুর আগে গ্রিডের প্রস্তুতি যাচাই ও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলার মহড়াও বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন।
দ্বিতীয়ত, সৌরবিদ্যুতের সম্ভাব্য ওঠানামা সামাল দিতে ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেমে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। উৎপাদন বেশি থাকার সময়ে বিদ্যুৎ সংরক্ষণ করে চাহিদার সময় তা ব্যবহার করা গেলে সরবরাহের ভারসাম্য রক্ষা সহজ হবে। এ বিনিয়োগ যেন অপরিকল্পিত না হয়, সেজন্য সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের ভিত্তিতে উপযুক্ত স্থান ও সক্ষমতা নির্ধারণ করতে হবে। পরীক্ষামূলক প্রকল্পের ফলাফল মূল্যায়ন করে পর্যায়ক্রমে স্টোরেজ সক্ষমতা বাড়ানো যেতে পারে। একই সঙ্গে উন্নত গ্রিড নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি, স্বয়ংক্রিয় ত্রুটি শনাক্তকরণ এবং বিদ্যুতের চাহিদা ও সৌর উৎপাদনের পূর্বাভাস ব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি।
তৃতীয়ত, আঞ্চলিক বিদ্যুৎ সহযোগিতা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিতে হবে। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে কার্যকর আন্তঃসীমান্ত সঞ্চালন সংযোগ থাকলে প্রয়োজনের সময় বিদ্যুৎ আমদানি করে সরবরাহের ঘাটতি সামাল দেয়া সম্ভব। তবে আঞ্চলিক সংযোগ দেশের নিজস্ব গ্রিডের দুর্বলতা দূর করার বিকল্প নয়; অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি এটি জ্বালানি নিরাপত্তার সহায়ক হতে পারে।
বিদ্যুৎ খাতের অগ্রগতি শুধু স্থাপিত উৎপাদন সক্ষমতা দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ, গ্রিডের নির্ভরযোগ্যতা এবং আকস্মিক বিপর্যয় মোকাবেলার সক্ষমতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। নবায়নযোগ্য ও পারমাণবিক বিদ্যুৎ দেশের জ্বালানি ব্যবস্থায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ছাড়া এ সম্ভাবনার পূর্ণ সুফল পাওয়া যাবে না। তাই উৎপাদন সম্প্রসারণের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে গ্রিড আধুনিকায়ন, স্পিনিং রিজার্ভ নিশ্চিতকরণ, ব্যাটারি স্টোরেজে বিনিয়োগ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। গ্রিডের সক্ষমতা নিশ্চিত না করে উৎপাদন বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় নামলে বিদ্যুৎ খাতের ঝুঁকিই বাড়বে।