বিশ্ব অর্থনীতি

অর্থনীতির আকারের তুলনায় গলদ হচ্ছে যেখানে

পিপিপির ভিত্তিতে তুলনার পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে ক্রুগম্যান বাজার বিনিময় হারের অস্থিরতার কথা উল্লেখ করেন। তার ভাষায়, ‘এখন কেউ প্রশ্ন করতে পারেন, ডলারের অংক ব্যবহার করা হবে না কেন? মূলত এর কারণ অস্থিতিশীলতা।

গত মাসে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ পল ক্রুগম্যান ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের (ইসিবি) বার্ষিক গবেষণা সম্মেলনে একটি বক্তৃতা দেন। সম্মেলনের মূল আলোচ্য বিষয় ছিল ভূ-অর্থনীতি। ভূ-অর্থনীতি বলতে ভূরাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে অর্থনৈতিক সম্পর্ক ও পারস্পরিক নির্ভরশীলতাকে কাজে লাগানোর সক্ষমতাকে বোঝায়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, চীন তার বিরল মৃত্তিকা খনিজের রফতানি বন্ধ করে বাণিজ্যিক অংশীদারদের ওপর চাপ সৃষ্টির হুমকি দিতে পারে।

‘অর্থনীতির আকার ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা’ শীর্ষক বক্তৃতায় ক্রুগম্যান যথার্থভাবেই বলেছেন, ভূ-অর্থনীতিতে অর্থনীতির আকার গুরুত্বপূর্ণ। যেমন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন হলে কানাডার ক্ষতি তুলনামূলকভাবে বেশি হবে। অর্থনৈতিকভাবে ছোট প্রতিবেশীকে চাপে ফেলতে যুক্তরাষ্ট্র তার বৃহত্তর অর্থনীতির সুবিধা কাজে লাগাতে পারে। তবে বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক ক্ষমতা তুলনা করার ক্ষেত্রে ক্রুগম্যানের পদ্ধতির সঙ্গে আমি একমত নই।

যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও চীন তাদের নিজস্ব মুদ্রায় মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) পরিমাপ করে। ফলে এসব অর্থনীতির আকার তুলনা করতে হলে পরিসংখ্যানগুলোকে একটি অভিন্ন মুদ্রায় রূপান্তর করতে হয়। এক্ষেত্রে সমসাময়িক বিনিময় হার ব্যবহার করাই সবচেয়ে স্বাভাবিক পদ্ধতি। তবে বিকল্প একটি পদ্ধতিও রয়েছে। সেটি হলো ক্রয়ক্ষমতার সমতা বা পারচেজিং পাওয়ার প্যারিটি (পিপিপি) সমন্বিত প্রকৃত বিনিময় হার ব্যবহার করা। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউর তুলনায় চীনে পণ্য ও সেবার দাম কম হওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নেয়া হয়।

জীবনযাত্রার মান তুলনা করার ক্ষেত্রে পিপিপি অনুযায়ী জিডিপি পরিমাপ করাই যথাযথ। কিন্তু অর্থনৈতিক ক্ষমতা নির্ধারণের বিষয়টি ভিন্ন। বাণিজ্য ও আর্থিক নিষেধাজ্ঞা, বৈশ্বিক বাণিজ্য আলোচনায় দরকষাকষির ক্ষমতা, আন্তর্জাতিক সংস্থায় প্রভাব বিস্তার কিংবা প্রশান্ত মহাসাগরের কোনো ছোট দ্বীপরাষ্ট্রে নৌঘাঁটি স্থাপনের সক্ষমতার মতো অর্থনৈতিক পারস্পরিক নির্ভরশীলতাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের উদাহরণ বিবেচনা করা যাক। এসব ক্ষেত্রে নিজ নিজ দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে ডলার বা ইউয়ানের ক্রয়ক্ষমতার চেয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরে ওই মুদ্রা দিয়ে কী কেনা যায়, তা কি বেশি প্রাসঙ্গিক নয়?

বিষয়টিকে নিছক কারিগরি পার্থক্য মনে হতে পারে, কিন্তু এর ফলে সিদ্ধান্ত বদলে যায়। পিপিপিভিত্তিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৭ সালেই কি চীন অর্থনীতির আকারে যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল? নাকি বিনিময় হার অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি চীনের চেয়ে বিপুল ব্যবধানে—৫০ শতাংশেরও বেশি—বড় ছিল? আমি দ্বিতীয় সিদ্ধান্তটিকেই সঠিক মনে করি। কিন্তু ক্রুগম্যান প্রথমটির পক্ষে, যার অর্থ দাঁড়ায়, বর্তমানে চীনই বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি।

চীন অর্থনীতির আকারে যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে গেছে—এমন ঘোষণা বারবার দেয়া হলেও এখন মনে হচ্ছে, বাজার বিনিময় হার অনুযায়ী হিসাব করলে আগামী বহু দশকেও চীন হয়তো যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে যেতে পারবে না। এমনকি জনসংখ্যার অবনতি ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির গতি কমে যাওয়ায় দেশটি কখনই যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে যেতে না-ও পারে। চীনের প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান অতিরঞ্জিত—এমন ধারণা থাকলে এ যুক্তি আরো জোরালো হয়।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউর অর্থনীতির তুলনার ক্ষেত্রে একই ধরনের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব না থাকলেও ক্রুগম্যান মনে করেন, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির হার নির্ধারণে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। অনেকের ধারণা, ইউরোপের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদনশীলতা দ্রুত বেড়েছে। প্রচলিত পরিমাপ অনুযায়ী, ২০০০ সালের পর থেকে ইইউর তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদনশীলতা অনেক বেশি বেড়েছে। অনেকেই এর ব্যাখ্যা হিসেবে মনে করেন, ইউরোপের শক্তিশালী সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা ও নিয়ন্ত্রণমূলক নীতিমালা এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতির শীর্ষ পর্যায়ে প্রতিযোগিতা করতে ব্যর্থতা দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করেছে। তবে বাজার বিনিময় হারের পরিবর্তে পিপিপির ভিত্তিতে তুলনা করলে চিত্রটি বদলে যায়।

ক্রুগম্যানের হিসাব অনুযায়ী, পিপিপি সমন্বয়ের পর ইইউর উৎপাদনশীলতার অগ্রগতি প্রথম দৃষ্টিতে যতটা দুর্বল মনে হয়, বাস্তবে তা তার চেয়ে অনেক ভালো। এতে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক মডেল যে ইউরোপের চেয়ে শ্রেয়—এমন সিদ্ধান্তও প্রশ্নের মুখে পড়ে।

পিপিপির ভিত্তিতে তুলনার পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে ক্রুগম্যান বাজার বিনিময় হারের অস্থিরতার কথা উল্লেখ করেন। তার ভাষায়, ‘এখন কেউ প্রশ্ন করতে পারেন, ডলারের অংক ব্যবহার করা হবে না কেন? মূলত এর কারণ অস্থিতিশীলতা। তাই অস্থিরতা কমিয়ে আনার জন্য পিপিপির মতো কোনো পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে।’ এ যুক্তির কিছু সত্যতা রয়েছে। কিন্তু পিপিপির ভিত্তিতে দেশগুলোর অর্থনৈতিক অবস্থান নির্ধারণের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সমালোচনা প্রযোজ্য।

পিপিপির হিসাব তৈরির জন্য বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক তুলনা কর্মসূচি (আইসিপি) বিভিন্ন পণ্য ও সেবার ঝুড়ির দাম সংগ্রহ করে। এ জরিপ কয়েক বছর পরপর পরিচালিত হয় এবং সাধারণত তথ্য প্রকাশে তিন বছরের ব্যবধান থাকে। এর আগে ১৯৯৩, ২০০৫, ২০১১ ও ২০১৭ সালের জন্য তুলনামূলক ভিত্তি-তথ্য প্রকাশ করা হয়েছিল। দুটি জরিপের মধ্যবর্তী সময়ে সরকারগুলোর জিডিপি পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে হিসাব সম্প্রসারণ করে বিশ্বব্যাংক বার্ষিক প্রাক্কলন তৈরি করে। সর্বশেষ ভিত্তি-জরিপটি ২০২১ সালের। এর ভিত্তিতে আইসিপি ২০২৩ সাল পর্যন্ত বার্ষিক প্রাক্কলন প্রকাশ করেছে।

চলতি শতকের শুরুর দিকে চীনের অর্থনীতি দ্রুত বেড়েছিল। কিন্তু ২০০৫ সালের জিডিপির পিপিপিভিত্তিক প্রাক্কলন পরবর্তী ছয় বছর সরকারি জিডিপি পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে সম্প্রসারণ করার পর ২০১১ সালের নতুন জরিপে বড় ধরনের ধাক্কা খায়। নতুন হিসাব অনুযায়ী, ২০০৫ সালের জিডিপি ৪০ শতাংশ কমিয়ে সংশোধন করা হয়।

এরপর ২০১১ সালের জরিপের ভিত্তিতে তৈরি প্রাক্কলন প্রথম প্রকাশের সময় থেকে ২০১৭ সালের পরবর্তী জরিপ পর্যন্ত ২১ শতাংশ ঊর্ধ্বমুখী সংশোধন করা হয়। পরবর্তী সময়ে ২০১৭ সালের ভিত্তি-তথ্য অনুযায়ী হিসাব ১৬ শতাংশ কমানো হয়। সবশেষে ২০২১ সালের ভিত্তিতে তৈরি হিসাব আবার ৫ শতাংশ বাড়ানো হয়। এসব সংশোধনের পরিমাণ বাজার বিনিময় হারের বার্ষিক ওঠানামা কিংবা সেই হারের ভিত্তিতে করা জিডিপির তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

আরো উদ্বেগের বিষয় হলো, জরিপের ভিত্তি-পরিসংখ্যানও কখনো কখনো সংশোধন করা হয়। ২০০৫ সালে চীনের পিপিপি বিনিময় হার প্রথম প্রকাশের সময় প্রতি ডলারের বিপরীতে ৩ দশমিক ৪৫ ইউয়ান নির্ধারণ করা হয়েছিল। ২০১১ সালের আইসিপি প্রকাশের সময় তা সংশোধন করে ২ দশমিক ৮৬ ইউয়ান করা হয়। এর ফলে পিপিপি অনুযায়ী চীনের ২০০৫ সালের জিডিপি ২০ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে যায়। বর্তমানে ব্যবহৃত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, তা মূল হিসাবের তুলনায় ২১ দশমিক ৮ শতাংশ বেশি।

অন্যান্য উদীয়মান অর্থনীতির ক্ষেত্রেও আইসিপির হিসাব একই রকম অস্থির। থাইল্যান্ডের পিপিপিভিত্তিক জিডিপি ২০১১ সালের জরিপে ২০ শতাংশ কমানো হয়, ২০১৭ সালের জরিপে ৪৩ শতাংশ বাড়ানো হয় এবং ২০২১ সালের জরিপে আবার ৩ শতাংশ কমানো হয়। উন্নত অর্থনীতিগুলোর ক্ষেত্রে সংশোধনের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম। ইইউর সদস্যদেশগুলোর ক্ষেত্রে ইউরোস্ট্যাট ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা (ওইসিডি) এখন প্রতি তিন বছর পরপর নতুন জরিপ পরিচালনা করে। ফলে এসব দেশের হিসাব সংশোধনের মাত্রাও কম।

অতএব জাতীয় জিডিপির তুলনায় বিনিময় হারের অস্থিরতাকে অজুহাত হিসেবে দেখিয়ে বাজার বিনিময় হারের তথ্য বাদ দিয়ে আইসিপির পিপিপিভিত্তিক তথ্য ব্যবহার করার যথেষ্ট যুক্তি নেই। কারণ পিপিপির হিসাব বরং আরো বেশি ওঠানামার শিকার হয়।

এ বাস্তবতা ইউরোপীয় ইউনিয়নে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির হার যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে বেশি—এমন যুক্তিকে দুর্বল করে দেয়। একই সঙ্গে এর অর্থ হলো অর্থনৈতিক ক্ষমতার বিচারে চীন এখনো যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে পিছিয়ে। এমনকি ট্রাম্প প্রশাসনের গভীর রাজনৈতিক অব্যবস্থাপনাও এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের স্বাভাবিক অর্থনৈতিক সুবিধাগুলো পুরোপুরি মুছে দিতে পারেনি।

[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]

জেফ্রি ফ্রাংকেল: হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য

আরও