ড. সেলিম রায়হান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক। বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক। দেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান পরিস্থিতি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ক্রমবর্ধমান দরিদ্রতা, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি, সরকারের আয়-ব্যয়সহ নানা প্রসঙ্গে সম্প্রতি কথা বলেছেন বণিক বার্তায়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাবরিনা স্বর্ণা
এক সাক্ষাৎকারে আপনি বলেছিলেন, দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় সংকট হলো অনিশ্চয়তা। বর্তমান পরিস্থিতি কেমন দেখছেন; অনিশ্চয়তা কতটা কাটল?
রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার একটি অংশ অবশ্যই কমেছে। নির্বাচন হয়েছে, একটি নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। ফলে রাজনৈতিক ক্ষমতার কাঠামো নিয়ে আগে যে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা ছিল, সেটি এখন আর আগের জায়গায় নেই। এটাকে ইতিবাচকভাবে দেখতে হবে। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা পুরোপুরি কেটে গেছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিভিন্ন ধরনের সংঘাত, মব সংস্কৃতির বিস্তার এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ এখনো আছে। এগুলো শুধু রাজনৈতিক সমস্যা নয়, অর্থনীতির ওপরও সরাসরি প্রভাব ফেলে।
একজন বিনিয়োগকারী যখন সিদ্ধান্ত নেন, তিনি শুধু দেখেন না দেশে একটি নির্বাচিত সরকার আছে কিনা। তিনি দেখেন তার কারখানা ও ব্যবসা নিরাপদ থাকবে কিনা, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকবে কিনা, আগামী দুই-তিন বছরে জ্বালানি পাবে কিনা, সুদের হার কোথায় যাবে, বিনিময় হার কতটা স্থিতিশীল থাকবে, কর ও শুল্কনীতিতে কী পরিবর্তন আসবে, ব্যাংক থেকে অর্থায়ন পাওয়া যাবে কিনা এবং নীতির ধারাবাহিকতা থাকবে কিনা। এ জায়গাগুলোতে এখনো যথেষ্ট অনিশ্চয়তা আছে। ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, জ্বালানি সরবরাহের সমস্যা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল রাজস্ব আহরণ এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির নতুন ঝুঁকিও সেই অনিশ্চয়তাকে বাড়াচ্ছে।
তাই আমি বলব, আমরা রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার একটি পর্যায় অতিক্রম করেছি, কিন্তু রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা কোনোটিই পুরোপুরি কাটেনি। সরকারের জন্য এখন বড় কাজ হচ্ছে বিশ্বাসযোগ্যতা ও স্থিতিশীলতা তৈরি করা। ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষকে বিশ্বাস করাতে হবে যে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করা হবে, নীতির একটি পরিষ্কার দিক থাকবে, কঠিন সিদ্ধান্তগুলো পিছিয়ে দেয়া হবে না এবং আজ যে সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছে ছয় মাস পর সেটি উল্টে যাবে না। অর্থনীতিতে আস্থা ফিরিয়ে আনতে এ বিশ্বাসযোগ্যতা খুবই জরুরি।
দেশে দরিদ্রের সংখ্যা বাড়ছে। জ্বালানি সংকট তীব্র। শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধি নিম্নমুখী, কর্মসংস্থান সম্প্রসারণও লক্ষণীয় নয়। এগুলো কি অতীত সংকটেরই চলমান প্রবণতা, নাকি বর্তমান সরকারের কাছে কিছু সংকট হ্রাস বা এড়ানোর সুযোগ ছিল?
দুটোই সত্য। বর্তমান সরকার একটি স্বাভাবিক অর্থনীতি উত্তরাধিকার সূত্রে পায়নি। ব্যাংক খাতের গভীর সমস্যা, রাজস্বের দুর্বলতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি খাতের দায়, বিনিয়োগের স্থবিরতা এবং কর্মসংস্থানের সংকট অনেক দিনের। এর সঙ্গে গত কয়েক বছরে সামষ্টিক অর্থনীতির ভারসাম্যহীনতা যুক্ত হয়েছে। ফলে বর্তমান পরিস্থিতির পুরো দায় নতুন সরকারের ওপর চাপানো ঠিক হবে না।
কিন্তু এটাও বলা যাবে না যে সরকার শুধু অতীতের সমস্যার শিকার। দায়িত্ব নেয়ার পর সরকারের হাতে কিছু নীতিগত সুযোগ ছিল এবং এখনো আছে। বিশেষ করে অগ্রাধিকার নির্ধারণ, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, কর ব্যবস্থার সংস্কার, ব্যাংক খাতের সংস্কার, সামাজিক সুরক্ষা এবং ব্যবসার আস্থা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে আরো দ্রুত ও দৃশ্যমান অগ্রগতি প্রয়োজন ছিল।
জ্বালানির বিষয়টি এখানে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই, কিন্তু আমদানির পর্যায়ে জ্বালানির ওপর কর ও শুল্কের কাঠামো আমাদের নীতিনির্ধারকদের হাতে। এমন সময়ে যখন শিল্প খাত দুর্বল, উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে এবং সাধারণ মানুষ দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ বহন করছে, তখন জ্বালানি আমদানির ওপর করের কাঠামো পুনর্বিবেচনা করে দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখার সুযোগ ছিল। রাজস্বের প্রয়োজন অবশ্যই আছে, কিন্তু জ্বালানি থেকে রাজস্ব আদায়ের সঙ্গে উৎপাদন, পরিবহন ব্যয়, মূল্যস্ফীতি ও মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের সম্পর্কটিও বিবেচনায় নিতে হবে।
আমার বড় উদ্বেগ হচ্ছে কর্মসংস্থান নিয়ে। প্রবৃদ্ধি কমে গেলে সেটি একটি সমস্যা, কিন্তু প্রবৃদ্ধির সঙ্গে যদি কর্মসংস্থানও স্থবির হয়ে পড়ে, তাহলে তার সামাজিক অভিঘাত অনেক বেশি। তখন একই সঙ্গে আয় কমে, দারিদ্র্য বাড়ে এবং তরুণদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়। বাংলাদেশে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করেন। তাদের জন্য যথেষ্ট মানসম্পন্ন কাজ তৈরি না হলে শুধু কয়েকটি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেয়া সম্ভব নয়।
অতএব অতীতের উত্তরাধিকারকে স্বীকার করতে হবে। কিন্তু সেটিকে বর্তমানের নিষ্ক্রিয়তার ব্যাখ্যা হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। সরকারের কাজ হচ্ছে সেই সংকটের উত্তরাধিকার থেকে অর্থনীতিকে বের করে আনা।
প্রায় চার বছর ধরে দেশে মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী। যেখানে প্রায় দেউলিয়া হয়ে যাওয়া দেশ শ্রীলংকাও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করেছে, আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে রয়ে গেল আজও। এতদিন পেরিয়ে এসে এ সংকটের জন্য কোনটা দায়ী বলে মনে হয়—কাঠামো নাকি রাজনৈতিক সদিচ্ছা?
আমি কাঠামো ও রাজনৈতিক সদিচ্ছাকে আলাদা করে দেখতে চাই না। বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রে সরবরাহজনিত ও আন্তর্জাতিক কারণ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা অনেক প্রয়োজনীয় পণ্য, জ্বালানি ও কাঁচামালের জন্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে কিংবা সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটলে তার প্রভাব দেশে পড়ে। বিনিময় হারের অবমূল্যায়নও আমদানির খরচ বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি করেছে।
কিন্তু বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতিকে শুধু এসব কারণ দিয়ে ব্যাখ্যা করলে সমস্যার একটি বড় অংশ বাদ পড়ে যায়। এর একটি শক্তিশালী কাঠামোগত দিকও আছে। বাজারে প্রতিযোগিতার ঘাটতি, কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানের বাজারক্ষমতা, সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা, পরিবহন ও জ্বালানির উচ্চ ব্যয়, ব্যাংক খাতের সমস্যা এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা দীর্ঘদিনের। এ কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে কোনো ধাক্কা এলে সেটির প্রভাব এখানে তুলনামূলক বেশি হয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও দেশে তার প্রতিফলন দ্রুত দেখা যায় না।
এখানেই রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রশ্নটি আসে। বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ানো, প্রভাবশালী গোষ্ঠীর বাজারক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা আনা, রাজস্ব ব্যবস্থা সংস্কার, সরকারি ব্যয়ের মান বাড়ানো এবং মুদ্রা ও রাজস্ব নীতির মধ্যে প্রয়োজনীয় সমন্বয় করা শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। কাঠামোগত সমস্যা নিজে নিজে তৈরি হয়নি, আবার নিজে নিজে দূরও হবে না।
এখন জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় এবং নতুন পে-স্কেলের সম্ভাব্য চাহিদাজনিত প্রভাব মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে লড়াইকে আরো কঠিন করে তুলতে পারে। ফলে মুদ্রানীতির পাশাপাশি রাজস্ব নীতি, বাজার ব্যবস্থাপনা এবং জ্বালানি নীতির মধ্যে সমন্বয় আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
শ্রীলংকার সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনীতির সরাসরি তুলনা সব ক্ষেত্রে ঠিক হবে না। কিন্তু শ্রীলংকার অভিজ্ঞতা একটি বিষয় দেখিয়েছে: গভীর সংকটের মধ্যেও কঠিন ও সমন্বিত নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়া হলে মূল্যস্ফীতি দ্রুত কমিয়ে আনা সম্ভব। বাংলাদেশে সেই ধরনের ধারাবাহিক নীতিগত সমন্বয় অনেক সময় দেখা যায়নি। তাই চার বছর পরও যদি আমরা শুধু আন্তর্জাতিক বাজার বা সরবরাহের সমস্যাকে দায়ী করি, তাহলে রাজনৈতিক অর্থনীতির মূল প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়া হবে। কাঠামো সমস্যা তৈরি ও দীর্ঘস্থায়ী করতে পারে, কিন্তু সেই কাঠামো পরিবর্তনের দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত রাজনীতির।
সামাজিক সুরক্ষার অংশ হিসেবে সরকার ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড বিতরণসহ নানা উদ্যোগ নিয়েছে। আগামীতে এগুলোর পরিসর আরো বাড়বে বলেই আমরা জানি। কিন্তু দেশের ক্রমবর্ধমান দরিদ্র মানুষের সুরক্ষা বা তাদেরকে এভাবে কতটা স্বস্তি দেয়া যাবে?
ফ্যামিলি কার্ড বা কৃষক কার্ডের ধারণা ভালো উদ্যোগ। সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে এগুলো সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে আরো লক্ষ্যভিত্তিক ও কার্যকর করতে পারে। বিশেষ করে একটি নির্ভরযোগ্য সামাজিক রেজিস্ট্রি তৈরি করা, একই ব্যক্তি একাধিক সুবিধা নেয়া বন্ধ করা এবং প্রকৃত দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারকে চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে এ ধরনের ব্যবস্থা কাজে আসতে পারে।
কিন্তু কার্ড নিজে সামাজিক সুরক্ষার নিশ্চয়তা দেয় না। আসল প্রশ্ন হচ্ছে, কার্ডের মাধ্যমে কী সুবিধা দেয়া হচ্ছে, কত মানুষ সেই সুবিধা পাচ্ছেন, সুবিধার প্রকৃত মূল্য কত এবং যার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তিনি সেটি পাচ্ছেন কিনা।
এখানে বাংলাদেশের পুরনো সমস্যাগুলো গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক সুরক্ষায় অনেক কর্মসূচি আছে, কিন্তু সেগুলো খণ্ডিত। অন্তর্ভুক্তি ও বাদ পড়ার সমস্যা আছে। এমন অনেক মানুষ সুবিধা পায় যাদের হয়তো সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন নেই, আবার অনেক দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবার ব্যবস্থার বাইরে থেকে যায়। মূল্যস্ফীতি বেশি হলে নির্দিষ্ট অংকের নগদ সহায়তার প্রকৃত মূল্যও দ্রুত কমে যায়। একজন দরিদ্র মানুষ মাসে কিছু নগদ সহায়তা পেল, কিন্তু একই সময়ে খাদ্য, বাসা ভাড়া, পরিবহন, চিকিৎসা ও শিক্ষার ব্যয় দ্রুত বাড়ল—তাহলে তার প্রকৃত স্বস্তি খুব সীমিত হবে।
আরো মৌলিক বিষয় হচ্ছে, সামাজিক সুরক্ষা দারিদ্র্যের অভিঘাত কমাতে পারে; কিন্তু কর্মসংস্থানের বিকল্প হতে পারে না। মানুষকে স্থায়ীভাবে দারিদ্র্য থেকে বের করতে হলে উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান, প্রকৃত মজুরি বৃদ্ধি এবং আয় করার সুযোগ তৈরি করতে হবে। সামাজিক সুরক্ষা মানুষকে বিপদে ধরে রাখবে, আর কর্মসংস্থান তাকে সেই অবস্থা থেকে বের হওয়ার পথ দেবে। আমাদের নীতিতে এ দুটির মধ্যে ভারসাম্য দরকার।
এক্ষেত্রে বিদ্যমান ভর্তুকি কাঠামো বা যে পরিমাণ ভর্তুকি দেয়া হয় তা কতটা কার্যকর?
বাংলাদেশের ভর্তুকি ব্যবস্থার মূল সমস্যা শুধু ভর্তুকির পরিমাণ নয়, এর বণ্টন ও কার্যকারিতা। অনেক ক্ষেত্রেই আমরা জানি না প্রতি ১ টাকা ভর্তুকির কত অংশ প্রকৃত লক্ষ্যভুক্ত মানুষের কাছে যাচ্ছে এবং কতটা অন্য জায়গায় চলে যাচ্ছে।
সব ভর্তুকি খারাপ, এমন ধারণাও ঠিক নয়। কৃষি, খাদ্য ও কিছু সামাজিক খাতে ভর্তুকির শক্তিশালী অর্থনৈতিক ও সামাজিক যুক্তি আছে। আবার জ্বালানির ক্ষেত্রেও হঠাৎ মূল্যবৃদ্ধি দরিদ্র মানুষের পাশাপাশি উৎপাদন খাতকে বড় ধাক্কা দিতে পারে। কাজেই ভর্তুকি তুলে দেয়াই সংস্কার নয়।
আমাদের বর্তমান রাজস্ব পরিস্থিতিতে আরেকটি বাস্তবতা স্বীকার করতে হবে। সরকারের রাজস্ব পরিসর অত্যন্ত সীমিত। এ অবস্থায় দীর্ঘ সময় ধরে বিপুল পরিমাণ সাধারণ ভর্তুকি বহন করার আর্থিক সক্ষমতা সরকারের নেই। বড় অংকের ভর্তুকি অব্যাহত রাখতে গেলে হয় অন্য গুরুত্বপূর্ণ খাতের ব্যয় কমাতে হবে, নয়তো ঋণ বাড়াতে হবে। দুটিরই অর্থনৈতিক মূল্য আছে।
তাই প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কাকে এবং কীভাবে ভর্তুকি দিচ্ছি। একটি ব্যবস্থায় যদি দরিদ্র ও ধনী একই হারে সুবিধা পান, তাহলে সেটি খুব ব্যয়বহুল এবং অদক্ষ পদ্ধতি। আমার মতে, ধীরে ধীরে সাধারণ ভর্তুকির পরিবর্তে আয় ও প্রয়োজনভিত্তিক লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তার দিকে যেতে হবে। তবে জ্বালানির মতো ক্ষেত্রে এ পরিবর্তন খুব সতর্কতার সঙ্গে করতে হবে, কারণ জ্বালানির মূল্য বাড়লে তার প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ে।
আরেকটি বিষয় মনে রাখতে হবে। ভর্তুকি রাজনৈতিকভাবে সহজ, সংস্কার রাজনৈতিকভাবে কঠিন। বিদ্যুৎ বা জ্বালানি খাতে অদক্ষতা রেখে শুধু ভর্তুকি বাড়ালে করদাতার অর্থ দিয়ে সেই অদক্ষতার মূল্য দেয়া হয়। তাই ভর্তুকি সংস্কারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট খাতের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারও করতে হবে।
অপ্রতুল রাজস্ব দেশের অর্থনীতির দীর্ঘদিনের প্রতিবন্ধকতা। আবার অর্থনীতিসহ শিক্ষা, স্বাস্থ্যের মতো মৌলিক খাতগুলোর অবস্থাও ভঙ্গুর। দক্ষ জনবলের ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে সরকার বোয়িং কিনছে, ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব চালু, ডিজিটাল হেলথ কার্ড চালুর মতো উদ্যোগ নেয়ার কথা বলছে। দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত সরকারের সামগ্রিক ব্যয় নিয়ে পর্যবেক্ষণ কী?
আমার কাছে এখানে মূল প্রশ্নটি হচ্ছে অগ্রাধিকারের। বাংলাদেশের রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত অত্যন্ত কম। সরকারের হাতে ব্যয় করার মতো অর্থ সীমিত। একই সঙ্গে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, জ্বালানি, অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে বড় ঘাটতি আছে। এ অবস্থায় প্রতিটি বড় সরকারি ব্যয়ের ক্ষেত্রে বিকল্প ব্যয়ের প্রশ্নটি খুব গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। এক খাতে ১ টাকা ব্যয় করার অর্থ হচ্ছে সেই টাকা অন্য একটি জরুরি খাতে ব্যয় করা যাচ্ছে না।
ধরা যাক, শিক্ষকদের ট্যাব দেয়া হলো। প্রযুক্তি ব্যবহার করে শিক্ষার মান বাড়ানো অবশ্যই ভালো উদ্দেশ্য। কিন্তু শিক্ষক প্রশিক্ষণ দুর্বল, অনেক প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নেই, শিক্ষার্থীদের শেখার ঘাটতি বড় এবং শিক্ষার মান পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা দুর্বল থাকলে শুধু ট্যাব বিতরণ করে খুব বেশি ফল পাওয়া যাবে না। একই কথা ডিজিটাল হেলথ কার্ডের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কার্ড থাকল, কিন্তু হাসপাতালে চিকিৎসক নেই, নার্স নেই, প্রয়োজনীয় ওষুধ নেই—তাহলে ডিজিটাল ব্যবস্থা স্বাস্থ্যসেবার মূল সংকটের সমাধান করবে না।
বিমান কেনার ক্ষেত্রেও একটি পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক মূল্যায়ন দরকার। নতুন উড়োজাহাজ কেনা অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হতে পারে, যদি রুট, যাত্রী চাহিদা, বহরের ব্যবহার, অর্থায়নের খরচ এবং বিমানের সামগ্রিক ব্যবসায়িক পরিকল্পনা সেটিকে সমর্থন করে। কিন্তু কেবল কূটনৈতিক বা রাজনৈতিক বিবেচনায় বড় আর্থিক দায় তৈরি করা হলে প্রশ্ন উঠবেই।
আমার উদ্বেগ হচ্ছে, আমরা অনেক সময় দৃশ্যমান প্রকল্পকে বেশি গুরুত্ব দিই, কিন্তু শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ভেতরের অদৃশ্য সংস্কারকে কম গুরুত্ব দিই। একটি ট্যাব বা কার্ড দেখানো যায়। কিন্তু শিক্ষকের দক্ষতা বাড়ানো, হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা ঠিক করা কিংবা সরকারি প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত করা অনেক কঠিন। অথচ দীর্ঘমেয়াদে দ্বিতীয় ধরনের বিনিয়োগের ফলই বেশি।
সীমিত রাজস্বের দেশে সরকারকে তাই খুব কঠোরভাবে অগ্রাধিকার ঠিক করতে হবে। এখন এমন ব্যয়ের সময় নয়, যার অর্থনৈতিক ও সামাজিক ফল পরিষ্কার নয়।
অপ্রতুল রাজস্ব পরিস্থিতির মধ্যে সম্প্রতি নতুন পে-স্কেলও অনুমোদন দেয়া হয়েছে। সরকার এটাকে কীভাবে সামাল দেয়ার চেষ্টা করতে পারে এবং এর ভবিষ্যৎ কী হতে পারে?
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দীর্ঘ সময় পর সমন্বয় করার যুক্তি আছে। কয়েক বছরের উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে তাদের প্রকৃত আয় কমেছে। বিশেষ করে নিচের গ্রেডের কর্মচারীদের ক্ষেত্রে এটি বাস্তব সমস্যা। তাই বেতন সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
কিন্তু সমস্যাটি হচ্ছে সময় ও অর্থায়ন। বাংলাদেশের রাজস্ব পরিস্থিতি খুবই দুর্বল। এর মধ্যে বড় আকারে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন করলে সরকারের নিয়মিত ব্যয় স্থায়ীভাবে বেড়ে যাবে। একবার বেতন বাড়ালে পরের বছর সেটি কমানো যায় না। এর সঙ্গে পেনশন ও বিভিন্ন ভাতার ভবিষ্যৎ দায়ও যুক্ত হবে।
সরকার পর্যায়ক্রমে পে-স্কেল বাস্তবায়নের যে পথ নিয়েছে, সেটি তাৎক্ষণিক চাপ কিছুটা কমাতে পারে। কিন্তু মূল সমস্যার সমাধান নয়। অর্থ কোথা থেকে আসবে, সেটিই আসল প্রশ্ন। যদি কর-রাজস্ব না বাড়ে এবং সরকার ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নিয়ে এ ব্যয় মেটায়, তাহলে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণের জায়গা আরো সংকুচিত হতে পারে। আর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে অর্থায়ন হলে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হতে পারে।
তাই নতুন পে-স্কেলের সঙ্গে একটি বিশ্বাসযোগ্য মধ্যমেয়াদি রাজস্ব পরিকল্পনা থাকা দরকার। পাশাপাশি সরকারি চাকরিতে কর্মদক্ষতা, জনবল কাঠামো এবং সেবা প্রদানের মান নিয়েও আলোচনা করতে হবে। জনগণ যদি বেশি কর দেয় এবং সরকারি কর্মচারীদের বেশি বেতন দেয়, তাহলে তারা উন্নত সরকারি সেবাও প্রত্যাশা করবে। পে-স্কেল সংস্কারকে তাই শুধু বেতন বৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না; এটিকে জনপ্রশাসনের সংস্কারের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।
বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য সরকার নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘উদ্যোগ’ কর্মসূচির আবেদন শুরু হয়েছে। কিন্তু বেসরকারি খাতের ঋণ ও বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি এবং সরকারের ব্যয় ও ঋণ পরিস্থিতি বিচারে কী মনে হয়, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান পরিস্থিতির উন্নয়ন হচ্ছে?
এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য দেখে আমি বলব না যে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে শক্তিশালী পুনরুদ্ধার শুরু হয়েছে। কিছু উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, কিন্তু সামগ্রিক অর্থনীতির সূচকগুলো এখনো সেই বার্তা দিচ্ছে না।
বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি খুবই দুর্বল। এর বিপরীতে সরকারি খাতের ঋণ দ্রুত বাড়ছে। এটি উদ্বেগের বিষয়। কারণ সরকার যদি ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ক্রমাগত বেশি অর্থ নেয়, তাহলে বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য অর্থায়নের সুযোগ সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। একই সময়ে উচ্চ সুদের হার, জ্বালানি অনিশ্চয়তা, দুর্বল চাহিদা এবং ব্যাংক খাতের সমস্যা ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগ সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে।
‘উদ্যোগ’-এর মতো কর্মসূচি নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করতে পারে এবং আমি এ ধরনের উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবেই দেখি। কিন্তু বাংলাদেশের বিনিয়োগ সমস্যাকে শুধু ঋণের একটি নতুন কর্মসূচি দিয়ে সমাধান করা যাবে না। একজন উদ্যোক্তা ঋণ নেবেন তখনই, যখন তিনি মনে করবেন তার পণ্য বিক্রি হবে, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস পাবেন, প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানি করতে পারবেন, কর ও শুল্কনীতি অনুমানযোগ্য থাকবে এবং ব্যবসা সম্প্রসারণ করলে লাভ হবে।
এখানেই আমাদের বিনিয়োগ নীতির বড় দুর্বলতা। আমরা অনেক সময় অর্থায়নের সরবরাহ বাড়ানোর কথা বলি, কিন্তু বিনিয়োগের চাহিদা কেন দুর্বল, সেটি যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে দেখি না। ব্যবসায়ী যদি ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চিত থাকেন, শুধু ঋণের সুযোগ বাড়িয়ে তাকে বিনিয়োগে উৎসাহিত করা যাবে না।
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও একই কথা। ঋণ বিতরণ আর কর্মসংস্থান সৃষ্টি এক বিষয় নয়। আমাদের দেখতে হবে নতুন বিনিয়োগ কোন খাতে হচ্ছে, কত কর্মসংস্থান তৈরি করছে, তরুণ ও নারীরা সেই কর্মসংস্থানে প্রবেশ করতে পারছেন কিনা এবং কাজের মান কেমন। সরকারের সাফল্য কত টাকা ঋণ বিতরণ হলো তা দিয়ে নয়, কতগুলো টেকসই ও উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান তৈরি হলো তা দিয়ে বিচার করা উচিত।
সব মিলিয়ে সরকারকে কী কী পরামর্শ দেবেন?
আমার মতে, সরকারের এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন অগ্রাধিকার ঠিক করা। সব সমস্যা একসঙ্গে সমাধান করা যাবে না। আবার নতুন নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করলেই অর্থনীতিতে আস্থা ফিরে আসবে না। কয়েকটি মৌলিক জায়গায় দৃশ্যমান ফল দেখাতে হবে।
প্রথমত, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। এটি শুধু বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্ব নয়। মুদ্রানীতি, রাজস্ব নীতি, বাজার ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি মূল্য এবং আমদানি নীতির মধ্যে সমন্বয় দরকার। দরিদ্র ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের ওপর মূল্যস্ফীতির যে চাপ পড়েছে, সেটিকে সামষ্টিক অর্থনীতির একটি সংখ্যা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি এখন একটি বড় সামাজিক সমস্যা।
দ্বিতীয়ত, জ্বালানি খাতে একটি বিশ্বাসযোগ্য মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা দরকার। শুধু আজকের গ্যাস বা বিদ্যুতের ঘাটতি কীভাবে সামাল দেয়া হবে, সেটি যথেষ্ট নয়। আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরে শিল্প কতটা জ্বালানি পাবে, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান কীভাবে বাড়বে, আমদানিনির্ভরতার মাত্রা কত হবে, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ভূমিকা কী হবে এবং জ্বালানির মূল্য নির্ধারণে কর ও ভর্তুকির কাঠামো কেমন হবে—এসব বিষয়ে একটি পরিষ্কার পথনকশা দরকার। শিল্পোদ্যোক্তা যদি জানতেই না পারেন আগামী বছর তিনি কী দামে এবং কতটা নির্ভরযোগ্যভাবে গ্যাস বা বিদ্যুৎ পাবেন, তাহলে নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেবেন কীভাবে?
তৃতীয়ত, ব্যাংক খাতের সংস্কারে রাজনৈতিক আপসের সুযোগ নেই। খেলাপি ঋণ, দুর্বল ব্যাংক, সংশ্লিষ্ট পক্ষকে প্রভাব খাটিয়ে ঋণ দেয়া এবং ঋণখেলাপিদের প্রভাবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। ব্যাংক খাতকে সুস্থ না করে বিনিয়োগ পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়।
চতুর্থত, রাজস্ব সংস্কার এখন আর পিছিয়ে দেয়ার বিষয় নয়। কিন্তু রাজস্ব বাড়ানো মানে যারা নিয়মিত কর দেন তাদের ওপর আরো কর চাপানো নয়। করের ভিত্তি বাড়াতে হবে, অযৌক্তিক কর অব্যাহতি ও বিশেষ সুবিধা পর্যালোচনা করতে হবে, প্রত্যক্ষ করের ভূমিকা বাড়াতে হবে, কর প্রশাসনের সক্ষমতা উন্নত করতে হবে এবং কর ব্যবস্থাকে আরো স্বচ্ছ ও হয়রানিমুক্ত করতে হবে।
পঞ্চমত, বেসরকারি বিনিয়োগকে আবার গতিশীল করতে হবে। শুধু বিনিয়োগ সম্মেলন, ঋণ কর্মসূচি বা প্রণোদনা ঘোষণা যথেষ্ট নয়। বিনিয়োগকারীকে জ্বালানি দিতে হবে, ব্যাংক থেকে অর্থায়নের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে, কর ও শুল্কনীতিতে স্থিতিশীলতা আনতে হবে, বন্দর ও কাস্টমসের জটিলতা কমাতে হবে এবং আইন-শৃঙ্খলা ও চুক্তি বাস্তবায়নের পরিবেশ উন্নত করতে হবে। বিশেষ করে দেশীয় বেসরকারি বিনিয়োগ দীর্ঘ সময় ধরে স্থবির থাকলে বিদেশী বিনিয়োগেও বড় উল্লম্ফন আশা করা বাস্তবসম্মত নয়। আগে দেশের বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে।
ষষ্ঠত, সরকারি ব্যয়ে কঠোর অগ্রাধিকার দরকার। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, জ্বালানি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী অবকাঠামোর বাইরে বড় ব্যয়ের ক্ষেত্রে আরো সতর্ক হতে হবে। প্রতিটি বড় প্রকল্পের প্রশ্ন হওয়া উচিত—এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক ফল কী এবং একই অর্থ অন্য কোথাও ব্যয় করলে বেশি ফল পাওয়া যেত কিনা?
সপ্তমত, সামাজিক সুরক্ষাকে নতুন কার্ড বিতরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। একটি সমন্বিত, তথ্যভিত্তিক এবং নিয়মিত হালনাগাদযোগ্য সামাজিক রেজিস্ট্রি দরকার, যাতে নতুন করে দরিদ্র হওয়া পরিবারও দ্রুত ব্যবস্থার মধ্যে আসতে পারে। একই সঙ্গে সামাজিক সুরক্ষার সুবিধার প্রকৃত মূল্য মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিনা সেটিও দেখতে হবে।
সবশেষে, কর্মসংস্থানকে অর্থনৈতিক নীতির কেন্দ্রে আনতে হবে। প্রবৃদ্ধি কত হলো, রফতানি কত বাড়ল কিংবা কত ঋণ বিতরণ হলো—এসব গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অর্থনীতির সাফল্যের বড় পরীক্ষা হচ্ছে মানুষ কাজ পাচ্ছে কিনা এবং সেই কাজ থেকে এমন আয় হচ্ছে কিনা যা দিয়ে তার জীবনমান উন্নত হচ্ছে। বিশেষ করে তরুণদের জন্য উৎপাদনশীল ও মানসম্পন্ন কর্মসংস্থান তৈরি না হলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সমাজের বড় অংশের কাছে পৌঁছবে না।
বর্তমান সরকারের সামনে সুযোগ এখনো আছে। কিন্তু সময় অসীম নয়। মানুষের প্রত্যাশা দ্রুত তৈরি হয়, আর অর্থনীতিতে আস্থা নষ্ট হলে সেটি ফিরিয়ে আনতে অনেক বেশি সময় লাগে। তাই এখন নতুন প্রতিশ্রুতির চেয়ে বাস্তবায়ন, নতুন প্রকল্পের চেয়ে অগ্রাধিকার এবং স্বল্পমেয়াদি জনপ্রিয়তার চেয়ে অর্থনীতির কাঠামোগত সমস্যাগুলো সমাধানে বেশি মনোযোগ দেয়া দরকার।