কর্মসংস্থান তৈরির প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে বড় চ্যালেঞ্জ লক্ষ্যমাত্রাকে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থায় রূপ দেয়া

ড. সেলিম রায়হান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতের বিষয়ে সরকারের প্রতিশ্রুতি ও লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে বাজেট প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বণিক বার্তার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাবরিনা স্বর্ণা

সংকটকালে অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও জনগণের আর্থিক স্বস্তি নিশ্চিতের ক্ষেত্রে এবারের প্রস্তাবিত বাজেট কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে? এবারের বাজেট বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জগুলো কেমন মনে হচ্ছে?

নতুন অর্থবছরের বাজেটে সরকার কর্মসংস্থান তৈরিকে কেন্দ্রীয় অগ্রাধিকার হিসেবে দেখিয়েছে। এটি ইতিবাচক। শিল্প, এসএমই, আইসিটি, সৃজনশীল অর্থনীতিসহ নানা খাতে আঞ্চলিক বিনিয়োগ আকর্ষণের ওপর জোর দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ বাজেটের লক্ষ্যমাত্রায় কর্মসংস্থানমুখী প্রবৃদ্ধির চিন্তা আছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এ বাজেট কত দ্রুত বাস্তব কর্মসংস্থানমুখীভাবে বাস্তবায়ন করা যাবে। কর্মসংস্থান তৈরির জন্য শুধু বরাদ্দ ও প্রণোদনাই যথেষ্ট নয়। এজন্য দরকার বিনিয়োগ পরিবেশের আস্থা, ঋণপ্রবাহ সুগম করা, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চয়তা, শ্রমদক্ষতা, বাজার সম্প্রসারণ এবং নির্ধারিত সময়ে পূর্ণাঙ্গ প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতার ওপর। উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও উচ্চ সুদহার স্বাভাবিকভাবেই বেসরকারি খাতকে সতর্ক অবস্থানে ঠেলে দেয়। এজন্য এবারের বাজেটে কর্মসংস্থান তৈরির প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এ ঘোষণা ও লক্ষ্যমাত্রাকে কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থায় রূপ দেয়া।

এবারের বাজেটে জনগণের আর্থিক স্বস্তি নিশ্চিত করার জন্য নিত্যপণ্যে ছাড় দেয়া হয়েছে। করমুক্ত আয়সীমা ঘোষণা, সামাজিক সুরক্ষায় বরাদ্দ বাড়ানো ছাড়াও স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বরাদ্দ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে সরকার। এসব প্রস্তাবনা জনজীবনে কতটা স্বস্তি আনতে পারে? আবার এবার পাইকারি বিক্রেতাদের আয়ের ওপর কর আরোপ করা হয়েছে। এমন কিছু ক্ষেত্রে রাজস্ব আয়ের পরিসর বাড়ানো হয়েছে। এগুলোকে কীভাবে দেখছেন?

বাজেটে জনজীবনে স্বস্তি আনার লক্ষ্যে সরকার যেসব প্রস্তাব দিয়েছে, সেগুলো মূল্যস্ফীতির এ সময়ে সাধারণ মানুষের ব্যয়ে চাপ কিছুটা কমাতে পারে। নিত্যপণ্যে কর ছাড়া করমুক্ত আয়সীমা নির্ধারণ, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতা বাড়ানো এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় বাড়তি গুরুত্ব দেয়ার ফলে কিছুটা হলেও স্বস্তি আসবে। বিশেষত মূল্যস্ফীতির এ সময়ে নিম্ন আয়ের ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য এসব পদক্ষেপ দ্রুত বাস্তবায়ন জরুরি। এক্ষেত্রে প্রস্তাবনাগুলোর বাস্তব প্রতিফলন বাজারে সঠিকভাবে ঘটছে কিনা তার ওপর স্বস্তির মাত্রা নির্ভর করবে। কর ছাড় দেয়া হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে সরবরাহ ব্যবস্থা দুর্বল থাকে। বাজারে প্রতিযোগিতা থাকে না এবং মধ্যস্বত্বভোগীরা নানাভাবে সুবিধা ধরে রাখে। এমন অবস্থা যদি চলমান থাকে তাহলে ভোক্তা পরিপূর্ণ সুফল পাবেন না। এদিকে কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে নানা সমালোচনার মধ্যেও সরকার কর ভিত্তি বাড়াতে কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে পাইকারি বা খুচরা বিক্রেতাদের ওপর কর আরোপ করেছে। এ সিদ্ধান্তের ফলে রাজস্ব আয় বাড়তে পারে। কিন্তু কর দেয়ার কারণকে অজুহাত করে যদি বাড়তি মূল্য পণ্যের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়, তাহলে তা ভোক্তার ওপর চাপ তৈরি করবে। এজন্য করনীতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বাজার তদারকিতেও সমানভাবে গুরুত্ব দিতে হবে।

বাজেটে বেসরকারি খাতকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি বলা হয়েছে। সব বিনিয়োগকে এক ছাতায় আনার জন্য বিনিয়ন্ত্রণকরণে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। উদ্যোক্তা খাতে বরাদ্দ এসেছে, ফ্রিল্যান্সারদের আয়ও করমুক্ত রাখা হচ্ছে। এগুলো বেসরকারি খাতে নতুন কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা তৈরির পাশাপাশি বিনিয়োগ আকর্ষণে কতটা ভূমিকা রাখতে পারে?

বেসরকারি খাতকে যেকোনো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি বলাটাই আসলে বাস্তবসম্মত। কারণ দেশের কর্মসংস্থান ও উৎপাদনের সিংহভাগই আসে বেসরকারি খাত থেকে। এজন্য বিনিয়োগসংশ্লিষ্ট সেবাগুলোকে এক ছাতার নিচে আনা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিক সুবিধাকে সহজ করতে পারে। বিনিয়ন্ত্রণকরণ, উদ্যোক্তাদের বাড়তি সহায়তা ও ফ্রিল্যান্সারদের আয়ে কর ছাড় দেয়া হলে নতুন কর্মসংস্থানের কিছু সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে শুধু করছাড় দিলেই বিনিয়োগ আকর্ষণ হবে এমন নয়। বিনিয়োগকারীরা নীতির ধারাবাহিকতা, ব্যাংক ঋণের সহজলভ্যতা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির নিশ্চয়তা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসন, কর প্রশাসনের আচরণ বাণিজ্যবান্ধব করা এবং চুক্তি বাস্তবায়নের নিশ্চয়তার দিকেও বেসরকারি খাতের মনোযোগ থাকে। এবার ফ্রিল্যান্সিং আয়ে কর আদায় না করার সিদ্ধান্তে অনেক তরুণই এ খাতে কাজ করতে আগ্রহী হবে। তবে এ খাতের জন্য পেমেন্ট গেটওয়ে, ডিজিটাল দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক নানা প্লাটফর্মের প্রবেশের সুযোগ বাড়াতে হবে। এমনকি এটিকে অর্থনীতির মূলধারায় আনার জন্য সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করাও জরুরি।

সরকারের ক্রিয়েটিভ হাব স্থাপন ও ক্রীড়াকে পেশাদার অর্থনীতিতে অন্তর্ভুক্ত করার নীতিমালাকে কীভাবে দেখছেন? এর সম্ভাবনা আদায়ে প্রতিবন্ধকতা কী? আর সুফল কেমন হতে পারে?

ক্রিয়েটিভ হাব স্থাপন এবং ক্রীড়াকে পেশাদার অর্থনীতির অংশ হিসেবে দেখা একটি নতুন ও সম্ভাবনাময় ভাবনা। বাংলাদেশে হস্তশিল্প, তাঁত, মৃৎশিল্প, চলচ্চিত্র, ওটিটি, ফ্যাশন, সংগীত, নাটক, কনটেন্ট ক্রিয়েশন এবং ক্রীড়া অর্থনীতির বড় সম্ভাবনা আছে। এগুলো তরুণ, নারী, গ্রামীণ উদ্যোক্তা ও ছোট সৃজনশীল পেশাজীবীদের জন্য নতুন আয়ের পথ খুলতে পারে। তবে প্রতিবন্ধকতাও বড়। কারণ এখনো এক্ষেত্রে বাজার সংযোগ দুর্বল, কপিরাইট ও মেধাস্বত্ব সুরক্ষা দুর্বল এবং ঝুঁকিপূর্ণ, অর্থায়ন সীমিত, প্রশিক্ষণ বিচ্ছিন্ন এবং আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিং ভালো অবস্থায় নেই। ক্রিয়েটিভ হাব যদি শুধু ভবন বা প্রদর্শনী কেন্দ্র হয়, তাহলে ফল সীমিত থাকবে। এগুলোকে বাজার, ডিজাইন, প্রযুক্তি, অর্থায়ন, ই-কমার্স ও রফতানি সংযোগের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। তাহলেই মূলত সুফল পাওয়া যাবে।

প্রতিটি জেলা-উপজেলায় মেধাভিত্তিক নিয়োগের ক্ষেত্রে এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জের কথা বলা হচ্ছে। এটি কর্মসংস্থান তৈরিতে কীভাবে অবদান রাখতে পারে?

প্রতিটি জেলা-উপজেলায় মেধাভিত্তিক নিয়োগের জন্য এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জের ধারণা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে সেটি হবে যখন দেশের শ্রমবাজার আধুনিক তথ্য ব্যবস্থায় রূপ নেয়। বাংলাদেশে চাকরিপ্রার্থী ও নিয়োগদাতার মধ্যে তথ্যের বড় ঘাটতি আছে। অনেক তরুণ জানে না কোথায় কাজ আছে, চাকরি পাওয়ার জন্য কী দক্ষতা দরকার বা কীভাবে আবেদন করতে হবে। একটি কার্যকর এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ চাকরির তথ্য, দক্ষতা যাচাই, প্রশিক্ষণ-সংযোগ, ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং এবং স্থানীয় শিল্পের চাহিদাকে সংযুক্ত করতে পারে। তবে ঝুঁকি হলো, এটি যদি কাগুজে রেজিস্ট্রেশন বা রাজনৈতিক সুপারিশের আরেকটি প্লাটফর্ম হয়ে যায়, তাহলে কোনো সুফল আসবে না। সাফল্যের জন্য দরকার ডিজিটাল ডেটাবেজ, বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ, স্বচ্ছতা ও নিয়মিত শ্রমবাজার বিশ্লেষণ।

এবারো বাজেট ঘাটতি মেটানোর বড় উৎস হবে ব্যাংক ঋণ। একদিকে কর্মসংস্থান সৃষ্টির কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে সরকারের ব্যাংক ঋণ নির্ভরতা কি স্ববিরোধী উদ্যোগ হয়ে দাঁড়াতে পারে?

হ্যাঁ, বাজেট ঘাটতি মেটাতে অভ্যন্তরীণ উৎস অর্থাৎ ব্যাংক ঋণের ওপর বড় নির্ভরতা কর্মসংস্থান লক্ষ্যের সঙ্গে একটি বাস্তব টানাপড়েন তৈরি করতে পারে। সরকার যদি ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে বেশি ঋণ নেয়, তাহলে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণপ্রবাহ সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে, বিশেষ করে যখন সুদহার আগে থেকেই বেশি এবং ব্যাংক খাত খেলাপি ঋণ ও মূলধন ঘাটতিতে চাপে আছে। এতে বিনিয়োগ কমতে পারে, আর বিনিয়োগ কমলে কর্মসংস্থানও কমবে। তবে ঘাটতি নিজেই সমস্যা নয়; সমস্যা হলো অর্থায়নের ধরন ও ব্যয়ের গুণমান। যদি ঋণ উৎপাদনশীল অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানমুখী খাতে যায়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে সুফল আসতে পারে। কিন্তু রাজস্ব ঘাটতি, দুর্বল বাস্তবায়ন ও ব্যাংক ঋণ নির্ভরতা একসঙ্গে চললে তা বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

আরও