২০২২ সালের ৪ জুন চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। বিএম ডিপোর হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড বিস্ফোরণের সেই ভয়ংকর ক্ষত ও দাগ এখনো মোছেনি। নয় মাস না যেতেই আবারো বিস্ফোরিত হলো সেই সীতাকুণ্ড। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কদমরসুল (কেশবপুর) এলাকায় ‘সীমা অক্সিজেন অক্সিকো লিমিটেডের’ প্লান্টে গতকাল ঘটল আবার বিপজ্জনক বিস্ফোরণ। এ ঘটনায় ছয়জনের প্রাণহানি এবং শতাধিক মানুষ হয়েছে। এ ঘটনায় চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তবে ওই অক্সিজেন প্লান্টের দায়িত্বশীল কারো বক্তব্য নিতে পারেনি গণমাধ্যম, তারা পালিয়ে গেছেন। বিস্ফোরণের পর ফায়ার সার্ভিসের সীতাকুণ্ড ও আগ্রাবাদের নয়টি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণের কাজে অংশ নেয়। র্যাব, সেনাবাহিনী, পুলিশ, নৌবাহিনী, বিভিন্ন সংস্থা ও সাধারণ মানুষ উদ্ধার তৎপরতা চালায়।
প্রতিটি বিস্ফোরণই বিপজ্জনক, একটির সঙ্গে আরেকটির কোনোভাবেই তুলনা করা যায় না। কিন্তু এবারের বিস্ফোরণে বহুদূরের জনজীবনও নিরাপদ ছিল না। বিস্ফোরণে দুই কিলোমিটারের বেশি এলাকা কেঁপে ওঠে। আশপাশের বহু বাড়ির কাচের জানালা ভেঙে পড়ে। ঘটনাস্থল থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে লোহার খণ্ড উড়ে এসে মাথায় আঘাত পেয়ে মারা গেছে একজন। সীমা অক্সিজেন কারখানায় কেন বিস্ফোরণ ঘটেছে এ বিষয়ে কেউ কিছু জানাতে পারেননি। ‘গ্যাস সিলিন্ডার নীতিমালা ১৯৯১’ অনুযায়ী, অক্সিজেন প্লান্ট স্থাপনের জন্য বিস্ফোরক পরিদপ্তরের লাইসেন্স নিতে হয়। সীমা অক্সিজেন লিমিটেডের লাইসেন্স নবায়ন হয়েছে কিনা কেউ জানে না। এমনকি এ অতিগুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকিপূর্ণ কারখানাটি নিয়মিত পরিদর্শনের আওতায়ও ছিল না। কিন্তু সীমা অক্সিজেন কারখানাটি তো আর চলনবিল বা চিম্বুক পাহাড়ে অবস্থিত নয়। সোনাইছড়ি ইউনিয়নের কেশবপুর গ্রামে এ সীমা অক্সিজেন প্লান্টের অবস্থান। কারখানার উত্তরে নয় মাস আগের অগ্নিদগ্ধ বিএম কনটেইনার। রাসায়নিক কারখানা বোঝাই এ ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে বাস করেন শত-সহস্র শ্রমিক। এরা সবাই বাংলাদেশের বিভিন্ন গ্রাম থেকে সেখানে গেছেন কেবল জীবিকার তাগিদে। কৃষক থেকে হয়েছেন ঝুঁকিপূর্ণ কারখানার শ্রমিক। তো এ ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল, যেখানে এর আগে বিস্ফোরণ ঘটেছে, সেখানকার প্রতিটি কারখানার বিষয়ে রাষ্ট্র কেন মনোযোগী হলো না? কেন এতদিনেও এ গুরুত্বপূর্ণ এলাকা বিশেষ ব্যবস্থাপনার অংশ হলো না?
বিএম ডিপোর পর সীমা কারখানার এ বিস্ফোরণ প্রমাণ করেছে, ঝুঁকিপূর্ণ কারখানার বিষয়ে আমরা দায়িত্বশীল নই। এসব কারখানার লাইসেন্স থেকে শুরু করে উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনা কোথাও আমাদের নজরদারি বা জবাবদিহিতা নেই। অবশ্যই এ বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়ে সামগ্রিক বিবেচনায় আনা জরুরি। আমরা আশা করব, সীমা কারখানা বিস্ফোরণের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে। ঘটনায় নিহত ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে মানবিক সহায়তা নিয়ে রাষ্ট্র দাঁড়াবে। রাসায়নিক বোঝাই ঝুঁকিপূর্ণ সীতাকুণ্ডের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার বিষয়ে রাষ্ট্র পরিবেশবান্ধব সংবেদনশীল নীতিমালা গ্রহণ করবে। আমরা কোনোভাবেই চাই না বিএম ডিপো কিংবা সীমা কারখানার মতো প্রতিষ্ঠানে একের পর এক বিস্ফোরণে দগ্ধ হয়ে চুরমার হোক ঐতিহাসিক সীতাকুণ্ড। সীতাকুণ্ডের উৎপাদন অর্থনীতি থেকে শুরু করে প্রাণ-প্রকৃতি ও জনজীবনের নিরাপত্তা রাষ্ট্রকেই সুরক্ষিত রাখতে হবে।
নিমতলীর রাসায়নিক বোঝাই গুদামঘর, তাজরীন ফ্যাশনস, সেজান জুস কারখানা, বিএম ডিপো থেকে সীমা অক্সিজেন কারখানা। একের পর এক প্রশ্নহীন আগুন। নিমিষেই অঙ্গার কত কত জীবন। চুরমার সংসার, বিশৃঙ্খল পরিবার। তদন্ত হচ্ছে, বিশেষজ্ঞ কমিটি সুপারিশ করে, মামলা হয়, ক্ষতিপূরণ কিছু দেয়া হয় কিংবা কিছু ধড়পাকড় হয় কিন্তু দৃষ্টান্তমূলক কিছুই হয় না। এসব দুর্ঘটনার প্রশ্নহীন প্রাণহানিকে অনেকেই কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড বলেন। তবে কাঠামো বিশ্লেষণে কেবল প্রাতিষ্ঠানিক রাজনৈতিক সংগঠন, দুর্নীতি, অবহেলা, উদাসীনতা, দায়হীনতাকেই মূলত আলাপে টানতে দেখা যায়। বিশ্বায়িত বাজার, করপোরেট বাহাদুরি কিংবা নয়া উদারবাদী ভোগবাদ উল্লিখিত কাঠামোয় আড়াল হয়ে থাকে। অথচ এসব বিস্ফোরণ এবং প্রাণহানির অতলে পোক্ত হয়ে আছে আমাদের নয়া উদারবাদী করপোরেট ভোগবাদ। সীতাকুণ্ডে বিএম ডিপো বা সীমা অক্সিজেন কারখানা বিস্ফোরণের মূলে আছে করপোরেট বিশ্বায়িত বাজারের নিয়ন্ত্রিত ভোগবাদ। সীতাকুণ্ড বিএম ডিপো বিস্ফোরণে নির্মমভাবে প্রাণ হারায় ৪১ জন, এবার সীমা অক্সিজেনের আগুনে পুড়েছে আরো ছয়জন।
এসব বিস্ফোরণে কারা অঙ্গার হয়? গ্রামগঞ্জের মেহনতী গরিব মানুষ। নয়া উদারবাদী বাজারকে আর করপোরেট ভোগবাদকে চাঙ্গা রাখতে এ গরিব মানুষের জীবন সবসময় একেকটি নির্দয় সংখ্যায় পরিণত হয়। আমাদের মনে রাখা জরুরি, ঝুঁকিপূর্ণ কাজে প্রাণ হারানো প্রতিটি জীবন কেবল সংখ্যা নয়, একেকজন স্বতন্ত্র মানুষ। কেন গরিব মানুষের কর্মস্থল প্রশ্নহীনভাবে ঝুঁকিপূর্ণ থাকে? কেন গরিবের কর্মপরিসর অনিরাপদ ও বিপজ্জনক হয়ে থাকবে চিরকাল? অথচ এসব কারখানাই1দেশের গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন খাত এবং উন্নয়নের অন্যতম চালিকাশক্তি। তাহলে এসব কর্মক্ষেত্র কেন মানবিক, নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব হবে না? একের পর এক অগ্নিকাণ্ড বা বিস্ফোরণ ঘটবে আর আমরা ক্ষতিপূরণ কিংবা গাফিলতির মোড়কে কাঠামোগত বৈষম্যকে ঢেকে রাখব। ব্যবস্থাপনা ও নীতিপ্রশ্নের মূল আলাপে টানব না। এভাবে কি সীতাকুণ্ডকে দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যতের জন্য নিরাপদ করে তোলা সম্ভব?
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অগ্নিগর্ভ চট্টগ্রামকে এখন অনেকেই পরিচয় করান ‘বন্দরনগরী’ হিসেবে। আর এ বন্দর আজ বিস্ফোরণের বিপদে বোঝাই। বিএম ডিপো বিস্ফোরণের
পর জানা যায়, বিপজ্জনক রাসায়নিক মজুদ ও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে
সুষ্ঠু নীতিমালা ছাড়াই বন্দরে গড়ে উঠেছে অসংখ্য ডিপো ও কারখানা। ১৯৮৪ সালে সি-ফেয়ার্স লিমিটেড নামে বেসরকারি আইসিডি
চালুর ভেতর দিয়ে বেসরকারি ডিপোর কাজ শুরু হয় এবং ২০২১ পর্যন্ত গড়ে ওঠে ১৯টি ডিপো।
২০২০ সালেও এখানে অগ্নিকাণ্ড ঘটে এবং সে অগ্নিকাণ্ডের পর গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে দেখা যায়, আগুন লাগা শেডে ১৯৮৭ সালের আমদানি করা পণ্যও ছিল। ২০১৫ সালের ২২ এপ্রিল
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং টার্মিনালে মিথানল ভর্তি ড্রামে বিস্ফোরণে1চার শ্রমিক গুরুতর আহত হন ও দগ্ধ হন আরো অনেকে।
কেবল বন্দর নয়, দেশের রাসায়নিক মজুদাগার কি করপোরেট
কারখানা,
সর্বত্রই ঘটছে বিস্ফোরণ ও প্রাণহানি। পুরান
ঢাকার নবাব কাটরার নিমতলীতে বিস্ফোরণ ঘটে ২০১০ সালের ৩
জুন। এতে নিহত হন ১২৪ জন। ২০১২ সালের
২৪ নভেম্বর আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরের তাজরীন ফ্যাশনসের
অগ্নিকাণ্ডে ১১৭ শ্রমিকের মৃত্যু হয়। ২০১৬ সালের ১০ সেপ্টেম্বর গাজীপুরের টঙ্গীর টাম্পাকো ফয়েলস কারখানায় বিস্ফোরণ ও
ভবনধসে ৩৫ জন নিহত হয়। ঢাকার কেরানীগঞ্জের চুনকুটিয়ায় প্রাইম
পেট অ্যান্ড প্লাস্টিক কারখানায় ২০১৯ সালের
১১ ডিসেম্বর অগ্নিকাণ্ডে ২১ জন নিহত হয়। পুরান
ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টার ওয়াহেদ ম্যানশনে রাসায়নিক বোঝাই এক ভবন বিস্ফোরিত হয়
২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে। ঘটনাস্থলেই মারা যায় ৬৭ জন, দগ্ধ
আরো চারজন হাসপাতালে মারা যায়। ২০২১ সালের ৭ জুলাই
রাতে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের কর্ণগোপে ‘হাসেম ফুড বেভারেজ কোম্পানির’ ছয়তলার কারখানায় লাগা আগুনে পুড়ে মারা যান ৫২ শ্রমিক।
প্রতিটি অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণ কেবল মানুষ নয়; প্রাণ-প্রকৃতিসহ
সামগ্রিক প্রাকৃতিক ও সামাজিক জীবনকে তছনছ করে দেয়। জীবনের জন্যই উৎপাদন,
আর এ উৎপাদন যদি বারবার জীবনকে
বিপন্ন করে তোলে, তাহলে দেশের সামগ্রিক বিকাশ প্রশ্নবিদ্ধ
হয়। দাহ্য বিপজ্জনক রাসায়নিক মজুদ, ব্যবহার, উৎপাদন এবং ব্যবস্থাপনায় আমরা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক
নীতি ও কাঠামোগুলো কতটা কীভাবে মানছি বা আমাদের আরো কীভাবে নিজেদের নিরাপত্তা
জোরদার করা যায়, সেসব বিষয়ে দ্রুত রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত ও
অঙ্গীকার জরুরি।
পাভেল পার্থ: গবেষক ও লেখক