আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং জগতে সিন্ডিকেশন লোন বা যৌথ অর্থায়ন একটি সুপ্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থা। মূলত বৃহৎ প্রকল্পে একক ব্যাংকের ঝুঁকি কমাতে একাধিক ব্যাংক মিলে যখন অর্থায়ন করে, তখন তাকে সিন্ডিকেশন ঋণ বলা হয়ে থাকে। বাংলাদেশেও বড় অবকাঠামো বা শিল্পায়নে এ পদ্ধতির ব্যবহার পুরনো। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে সিন্ডিকেশনকে কেবল ‘ঋণ প্রদানের’ মাধ্যম হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের ‘গলার কাঁটা’ হয়ে দাঁড়ানো ‘খেলাপি ঋণ’ মোকাবেলায় এটি একটি অত্যন্ত কার্যকর ও কৌশলগত অস্ত্র হতে পারে। এর জন্য প্রয়োজন প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা ও দৃঢ় আইনি কাঠামো।
কেন সিন্ডিকেশন হবে খেলাপি ঋণ আদায়ের হাতিয়ার: বাংলাদেশে অধিকাংশ বড় খেলাপি ঋণের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো একই করপোরেট গ্রুপ বিভিন্ন নামে একাধিক ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নেয়। যখন তারা খেলাপি হয়, তখন প্রতিটি ব্যাংক আলাদাভাবে আইনি লড়াই শুরু করে, যা দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে। এখানে সিন্ডিকেশন পদ্ধতিকে ‘রিকভারি প্লাটফর্ম’ হিসেবে ব্যবহার করলে নিচের সুবিধাগুলো পাওয়া সম্ভব—
সম্পদের সমন্বিত মানচিত্র তৈরি: একটি গ্রুপের সব দায় ও সম্পদকে এক সুতায় গেঁথে ‘মাইক্রো-ম্যাপিং’ করা সম্ভব হবে। এতে গ্রুপের অভ্যন্তরীণ ক্যাশ-ফ্লো এবং এক প্রতিষ্ঠানের টাকা অন্য প্রতিষ্ঠানে সরিয়ে নেয়ার প্রবণতা বন্ধ হবে।
নেতৃত্ব ও দ্রুত সিদ্ধান্ত: একটি ‘লিড ব্যাংক’ বা ‘নেতৃত্বদানকারী ব্যাংক’ নির্বাচন করতে হবে। এক্ষেত্রে যেই ব্যাংকের ঋণের সবচেয়ে বড় অংশ থাকবে তাকেই লিড ব্যাংক বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে ব্যাংকগুলো নিজেরা একসঙ্গে বসেও অভিজ্ঞতার আলোকে যেকোনো ঋণের যেকোনো অংশের ব্যাংককেও লিড ব্যাংক নির্বাচন করতে পারে। লিড ব্যাংকের অধীনে সব অংশগ্রহণকারী ব্যাংক একীভূত সিদ্ধান্ত নিলে ঋণগ্রহীতার ওপর মনস্তাত্ত্বিক ও আইনি চাপ বহুগুণ বেড়ে যাবে। একক ব্যাংকের খামখেয়ালিপনা বা কোনো বিশেষ ব্যাংকের সঙ্গে গ্রাহকের গোপন আঁতাত করার সুযোগ এক্ষেত্রে থাকে না।
ঝুঁকি ভাগাভাগি: বড় কোনো প্রতিষ্ঠানের করপোরেট ঋণ পুনর্গঠন করার সময় একক ব্যাংকের ওপর যে আর্থিক চাপ তৈরি হয়, সিন্ডিকেশনের মাধ্যমে তা বণ্টন করে দেয়া যায়। এতে পদ্ধতিগত ঝুঁকি হ্রাস পায়। তবে খেলাপি ঋণ আদায় প্রক্রিয়াটি যেহেতু সিন্ডিকেশনের মাধ্যমে হবে সেক্ষেত্রে ‘ফ্যাসিলিটি রিকভারি এগ্রিমেন্ট’ তৈরি করা যেতে পারে, যাতে সব অংশীজন ব্যাংকের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে। এজন্য সব অংশগ্রহণকারী ব্যাংকের সম্মতিক্রমে একজন কমন লিগ্যাল কাউন্সেল নিয়োগ দিতে হবে।
বাস্তবায়ন কৌশল: খেলাপি ঋণ মোকাবেলায় সিন্ডিকেশন ঋণ কার্যক্রমকে কার্যকর করতে হলে আমাদের প্রচলিত ব্যবস্থায় কিছু আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন। যেমন—
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ নীতিমালা: বাংলাদেশ ব্যাংককে একটি নির্দিষ্ট ‘সিন্ডিকেশন ফ্রেমওয়ার্ক’ তৈরি করতে হবে। যেখানে ঋণ আদায় প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন পর্যায়ে লিড ব্যাংকের ক্ষমতা, অংশগ্রহণকারী ব্যাংকের অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং মতভেদের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া স্পষ্ট থাকবে।
অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি (এএমসি): ব্যাংকগুলো যৌথভাবে একটি বেসরকারি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি গঠন করতে পারে। জটিল ও বড় সিন্ডিকেট ঋণগুলো এ বিশেষায়িত কোম্পানির কাছে হস্তান্তর করা হবে। দক্ষ ও অভিজ্ঞ পেশাদারদের মাধ্যমে তারা সম্পদ উদ্ধার বা নিলামের কাজ দ্রুত সম্পন্ন করবে, যা ব্যাংকের ব্যালান্সশিটকে চাপমুক্ত রাখবে।
বন্ধ প্রতিষ্ঠান চালু: অনেক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এককভাবে অনেক সিদ্ধান্ত নিতে অপারগ, যার কারণে অনেক বন্ধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বা পোশাক শিল্প চালু করা যাচ্ছে না। সিন্ডিকেশনের মাধ্যমে একটি সমন্বিত ও অতীব জরুরি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বন্ধ প্রতিষ্ঠান চালু করা যাবে, যাতে সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও বহু শ্রমিকের চাকরি রক্ষা হবে। এক্ষেত্রে কার্যকর মূলধনের চাহিদা মিটিয়ে প্রকল্পের উৎপাদন চালু রাখতে হবে; যদিও প্রকল্প ঋণটি খেলাপি থাকে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংককে একটি বিশেষ ভূমিকা রাখতে হবে, যাতে ব্যাংকগুলোকে লিড ব্যাংকের মাধ্যমে বর্ণিত ‘ফ্যাসিলিটি রিকভারি এগ্রিমেন্ট’-এর আওতায় যুক্তিসংগত কারণসহ চলমান নগদ প্রবাহের ওপর ভিত্তি করে বন্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোকে চালু রাখা যায়।
ডিজিটাল ডেটা রুম: প্রতিটি সিন্ডিকেট ঋণের জন্য একটি অনলাইন ‘ডেটা রুম’ বাধ্যতামূলক করা উচিত। যেখানে অংশগ্রহণকারী সব ব্যাংক রিয়েল টাইমে গ্রাহকের আর্থিক তথ্য, জামানত ও লেনদেনের চিত্র দেখতে পাবে। স্বচ্ছতা নিশ্চিত হলে জালিয়াতির সুযোগ কমে আসবে।
আইনি ঢাল ও বিশেষ আদালত: সিন্ডিকেটভিত্তিক রিকভারির ক্ষেত্রে দ্রুত আইনি সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল বা ত্বরান্বিত প্রটোকল থাকা জরুরি। সম্পদ জব্দ বা বিক্রির ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমাতে শক্তিশালী আইনি সমর্থন অপরিহার্য।
চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণ: অবশ্যই এ পথে কিছু পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে করপোরেট গ্রুপগুলো তাদের প্রকৃত সম্পদ লুকিয়ে রাখে। আবার ব্যাংকগুলোর মধ্যেও অনেক সময় স্বার্থের সংঘাত ও সমন্বয়ের অভাব দেখা দেয়। দীর্ঘসূত্রতাপূর্ণ আইনি ব্যবস্থা এ প্রক্রিয়াকে আরো মন্থর করে দিতে পারে। তবে এ চ্যালেঞ্জগুলো অতিক্রম করা অসম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অভিভাবকসুলভ দৃঢ়তা। সিন্ডিকেশন চুক্তিগুলোতে ‘রোল-কল কন্ডিশন’ এবং স্বচ্ছ গভর্ন্যান্স নিশ্চিত করতে হবে। কোনো ঋণের ইতিহাস লুকানো বা অপেশাদারত্বের মাধ্যমে ঋণ অনুমোদন করলে সিন্ডিকেশন পদ্ধতিও ব্যর্থ হবে।
ব্যাংক খাতে সিন্ডিকেশন ফাইন্যান্সিংয়ে আমার বহু বছরের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, সিন্ডিকেশন ঋণ প্রক্রিয়া কেবল একটি আর্থিক হাতিয়ার নয়, এটি ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার একটি অঙ্গীকার। বাংলাদেশের অর্থনীতিকে খেলাপি ঋণের বিষচক্র থেকে মুক্ত করতে হলে আমাদের ‘একলা চলো’ নীতি ত্যাগ করে ‘সমন্বিত পুনরুদ্ধারের’ পথে হাঁটতে হবে। তাই সিন্ডিকেশন ব্যবস্থার সফল প্রয়োগ কেবল খেলাপি ঋণই কমাবে না, বরং সাধারণ আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনবে এবং দেশের আর্থিক খাতের টেকসই ভিত্তি মজবুত করবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস। সময়ের দাবি এটাই—আমরা কি এ পরিবর্তনের সাহসী নেতৃত্ব নিতে প্রস্তুত?
ড. মো. তৌহিদুল আলম খান: ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী, এনআরবিসি ব্যাংক