আজ থেকে ১০ বছর আগে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) ১৮তম কেন্দ্রীয় কমিটির তৃতীয় প্লেনারি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সামনের দশকগুলোয় চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রাখার পরিকল্পনা পেশ করা হয় সেখানে। চীন যে প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছিল তখন অনেকেই পূর্বাভাস দেয়া শুরু করেছিল ২০২১ সালের মধ্যে জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে যাবে চীন। কেউ কেউ আরেক ধাপ এগিয়ে বলেছিল এ ঘটনাটা ২০১৯ সালের মধ্যেই ঘটে যাবে।
কিন্তু ওই পূর্বাভাসগুলো অনেকটাই হাওয়াই মিঠাইয়ের মতো মিলিয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি যেখানে প্রত্যাশার চেয়েও ভালো করছে সেখানে ধুঁকছে চীনের অর্থনীতি। গোল্ডম্যান স্যাকস ও অন্যরা এখন পূর্বাভাস দিচ্ছে, ২০৩৫ সালের আগে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির ধারেকাছে যেতে পারবে না চীন। যুক্তরাষ্ট্রকে কিছু সময়ের জন্য ছাড়িয়ে গেলেও চলতি শতকের মাঝামাঝিতে এ উত্থান ব্যাহত হতে পারে। শ্রমশক্তি ও উৎপাদনশীলতা হ্রাসের ফলে এমনটা হতে পারে।
উল্লেখ্য, পারচেজিং-পাওয়ার-প্যারিটির দিক থেকে ২০১৭ সালেই যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে গেছে চীন। তবে সামরিক সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কোটার দিক থেকে বেশ পিছিয়ে চীন। তার চেয়ে বর্তমান বিনিময় হারে দেশ দুটোর মোট জাতীয় উৎপাদন তুল্যমূল্য করা যায়।
প্রায় তিন দশক ১০ শতাংশ বার্ষিক প্রবৃদ্ধির পর চীনের অর্থনীতিতে মন্দা ভাব দেখা দিয়েছে। প্রযুক্তির লড়াইয়ে কিছুটা পিছিয়ে পড়া, মূলধনের ওপর মুনাফা কমছে এবং বয়স্ক জনসংখ্যা বাড়ছে। এছাড়া শহরে অভিবাসন করতে চাওয়া কর্মীর সরবরাহও কমছে। প্রবৃদ্ধির নিম্নমুখী ধারায় মনে হচ্ছে, মধ্যম আয়ের দেশের ফাঁদে পড়েছে এশিয়ার বৃহৎ অর্থনীতিটি। প্রত্যাশার চেয়েও অর্থনীতিতে শ্লথগতির কারণ অনেকটা নিজস্ব সৃষ্টি কিনা তাও বলছেন কেউ কেউ। গত এক দশকে নিজদেরই প্রণীত সংস্কার পরিকল্পনা তামিল করতে ব্যর্থ হয়েছেন চীনের নীতিনির্ধারকরা। এতেই দেশের শ্লথগতি আরো তীব্রতর হচ্ছে।
২০১৩ সালে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং প্রণীত সংস্কার পরিকল্পনা সমর্থন করেছিলেন চীন ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিবিদরা। মূলত অর্থনীতিতে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ হ্রাস এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনায় বাজারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবনা ছিল সংস্কার পরিকল্পনায়। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের (এসওই) ভূমিকা হ্রাস করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ তৈরির লক্ষ্য ছিল সে পরিকল্পনায়। এর মাধ্যমে এসওইগুলোয় বেসরকারি বিনিয়োগের সুযোগ উন্মোচিত হয় এবং লভ্যাংশ প্রাপ্তির সুযোগ ঘটে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগকারীদের জন্য। সরকারের আরো লক্ষ্য ছিল অনুমোদনের প্রক্রিয়া ও পরিধি একে একে বিস্তৃত করা। কোন শিল্পগুলো রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত থাকবে তা সুস্পষ্ট করা এবং জ্বালানি ও ইউটিলিটির দাম তদারকি করা এবং এসওইতে ভর্তুকি হ্রাস করা।
আন্তর্জাতিক বাজারে পুঁজি বিনিয়োগের দিকে নজর দেয়াসহ চীনা অর্থ ব্যবস্থার আরো উদারীকরণ হওয়া উচিত ছিল বলে মনে করা হয়। উপরন্তু, এ ধরনের প্রবৃদ্ধি পরিকল্পনার মূল নিয়ামক ছিল বিনিয়োগনির্ভরতা কমিয়ে আনা ও গৃহস্থালি দ্রব্যাদির রফতানিনির্ভরতা থেকে সরে আসা। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে তাদের ভূমির অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেয়াসহ সম্পত্তির মালিকানা এবং বিক্রির স্বাধীনতা প্রদান, জমি বেদখলের ঝুঁকি হ্রাসকরণ, অপ্রয়োজনীয় নির্মাণ প্রকল্প বাতিলের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। গ্রামীণ লোকবলকে শহরমুখী করতে নাগরিক নিবন্ধন ব্যবস্থা (হুকো) সংস্কারসহ অন্যান্য সরকারি পরিষেবা বৃদ্ধির উদ্যোগ গৃহীত হয়েছিল। নাগরিকদের স্বাস্থ্য ও শিক্ষার দিকে নজর দেয়া হয়েছিল। কঠোর এক-সন্তান নীতি বিলোপ করা ও পরিবেশগত বিপর্যয় রোধে প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা এ পরিকল্পনার শীর্ষে স্থান পেয়েছিল।
লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের তিন বছর শেষে চীনের সরকার এ পরিকল্পনার নামমাত্র বাস্তবায়ন করতে পেরেছে। এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিল ২০১৬ সালে এক-সন্তান নীতি বিলোপ ঘোষণা, যদিও ‘সর্বোচ্চ তিনটি সন্তান’-এর আইন বহাল রাখতে হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী পরিবেশগত কিছু উদ্যোগে আংশিক সফলতা এসেছে। এছাড়া অধিকাংশই বাস্তবায়ন হয়নি এবং বেশকিছুসংখ্যক পরিকল্পনা গুটিয়ে নিতে হয়েছে।
উপরন্তু, চীনের অর্থ ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা বেড়েছে। গত এক দশকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণও বেড়ে গেছে। যদিও তৃতীয়বার বৈঠকের সময়কালে পূর্বপরিকল্পনার বিপরীতে বেসরকারি খাতে এ পরিমাণ হ্রাস পেয়েছে। ব্যক্তি মালিকানাধীন ফার্মগুলো অতিরিক্ত মুনাফার আশায় অতিরিক্ত উৎপাদনের দিকে ঝুঁকেছে। ফলে এর জোরালো প্রভাব রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর পড়েছে যা চলমান মন্দা বহাল রেখেছে।
ক্ষুদ্র অর্থনীতি ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন নীতির ওপর চীনা নেতাদের পদক্ষেপ জোরালো হওয়ার ফলে সামষ্টিক অর্থনীতিকেন্দ্রিক পদক্ষেপগুলোর অনেকটাই আর অনুসরণ করা হয়নি অথবা সেগুলো মাঝপথে নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে। বড় রকমের অর্থনৈতিক বিপর্যয় থেকে বাঁচতে দেশের বিদ্যমান অর্থ ও রাজস্ব নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ২০০০ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত যেকোনো আর্থিক পরিস্থিতিতে চীনা সরকার সফলতার সঙ্গে কাজ করে গেছে। ২০০৭-০৮ সালে ঊর্ধ্বগামী অর্থসূচককে দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরাতে পিপলস ব্যাংক অব চীন সফলভাবে মুদ্রাস্ফীতি কমিয়ে এনেছিল। ব্যাংক সুদের হার বৃদ্ধি, রিজার্ভ নীতিতে কঠোর শর্তারোপ, বাড়ির মালিকদের ঋণের ওপর অতিরিক্ত মূল্য ধার্যকরণ প্রভৃতি ব্যবস্থা গ্রহণস্বরূপ চীন ২০১০-২০১১ সালেও একই কৌশল অবলম্বন করেছিল।
পরপর দুটি অর্থনৈতিক বিপর্যয় অতিক্রম করার পর বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলার প্রতিক্রিয়া হিসেবে ২০০৮-০৯ সালে চীনের সামষ্টিক অর্থনীতির বিশেষ কিছু নীতিমালা শিথিল করা হয়েছিল। কেইনসীয় নীতি অনুসরণ করার মধ্য দিয়ে সংকটকালীন বড় ধরনের অর্থনৈতিক পতন মোকাবেলা করাসহ সরকার চীনকে মন্দা থেকে দ্রুত ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছিল।
কিন্তু চলমান অর্থ মন্দার ক্ষেত্রে চীনা নীতিনির্ধারকদের আগের সেই যথাযথ নিষ্ঠার প্রয়োগ লক্ষ করা যায়নি। এমনকি আবাসন খাতের ধস ও কভিডকালে শি জিনপিংয়ের কঠোর লকডাউন নীতিমালার প্রভাবে প্রবৃদ্ধি হ্রাসের পরও চীনা অর্থনীতি মজবুতকরণে অর্থনীতিবিদদের দূরদর্শিতার ছাপ মেলেনি। মোদ্দাকথা, চীনের জিডিপি বর্তমানে গুণগত ও পরিমাণগত উভয় ক্ষেত্রেই মন্দার দিকে।
গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়নে ব্যর্থতা এবং সামষ্টিক অর্থনীতির শর্ত পূরণে কৌশলগত দুর্বলতা এর পেছনে কারণ হিসেবে কাজ করেছে। রাষ্ট্রীয় প্রণোদনার ক্ষেত্রে চীনের হঠাৎ সতর্কাবস্থান এবং সরকারি হস্তক্ষেপের ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী চুক্তি—এ দুই বিষয়কে নীতি ও প্রয়োগের মধ্যকার ফারাকের ব্যাখ্যা হিসেবে দাঁড় করানো যেতে পারে। ২০০৮-০৯ অর্থবছরের বেশির ভাগ ব্যয় এবং শুরুর দিকের এ মন্দাভাব স্থানীয় কর্তৃপক্ষের ফলে সৃষ্ট। কেন্দ্রীয় সরকার এর কোনোটিই নিয়ন্ত্রিত করেনি। অন্যদিকে মানুষের নিট আয় বেড়ে গেলে ভোগের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে চাঙ্গা করে। তবে এতে করে বেসরকারি খাতে উন্নয়ন ত্বরান্বিত হওয়ার ফলে তা দেশটির সরকারি উদ্দেশ্যগুলোর সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ অবস্থা সৃষ্টি করেছে।
এর ফলে দিন দিন বাজার ও রাষ্ট্রের মধ্যে সংকট ঘনীভূত হচ্ছে। অর্থ ব্যবস্থা উদারীকরণের প্রক্রিয়া স্তিমিত হওয়ার ফলে তা আরো অস্থিতিশীলতার দিকে এগিয়ে গেছে। বিশেষত, ২০১৫ সালের জুনে পুঁজিবাজারের বিপর্যয় চরমে পৌঁছে। এ পরিকল্পনার আরেকটি লক্ষ্য ছিল পুঁজি পাচার ঠেকানো এবং স্থানীয় মুদ্রা ইউয়ানের অবমূল্যায়ন রোধ করা। ২০১৪-এর শেষের দিকে এ অস্থিতিশীলতার শুরু হলেও তা ২০১৫-এর আগস্ট পর্যন্ত চীনের বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় বাজারকে তুমুল আকারে অস্থিতিশীল রেখেছিল।
১৯৭৮ সালে দেং জিয়াওপিং চীনের ক্ষমতা গ্রহণ করেছিলেন। দেশীয় অর্থ ব্যবস্থার সংস্কার এবং বহির্বিশ্বের সঙ্গে উদার সম্পর্কনীতি—এ দুয়ের মাধ্যমে তিনি টানা দুই দশক চীনকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ‘সমৃদ্ধ দেশ হওয়া’কে তিনি জাতীয় ভিত্তিতে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন৷ এ নীতি ৪০ বছর ধরে বহাল ছিল। সিপিসির নেতারা দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিকে জনপ্রিয়তা ও নাগরিক সমর্থন বজায় রাখার মূল চাবিকাঠি হিসেবে গণ্য করতেন।
শি জিনপিং অবশ্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের চেয়ে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখায় জোর দিচ্ছেন বলে মনে হচ্ছে। চীনের উন্নয়নে অগ্রণী ভূমিকার স্থলে ২০১৩ সালে গৃহীত বাজারমুখী সংস্কার পরিকল্পনাগুলো বেহাত সুযোগ হিসেবেই রয়ে গেল।
[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]
জেফ্রি ফ্রাংকেল: হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাপিটাল ফর্মেশন অ্যান্ড গ্রোথ বিষয়ের অধ্যাপক। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রপতি বিল ক্লিনটনের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ছিলেন। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ব্যুরো অব ইকোনমিক রিসার্চের গবেষণা সহযোগী
ভাষান্তর: নূশরাত জাহান সিনথিয়া