বিশ্বের ৫০০ ভালো শহরের তালিকায় নেই বাংলাদেশের কোনো শহর

অপরিকল্পিত নগরায়ণ বন্ধ না হলে শহরের মান আরো তলানিতে নামবে

শহরগুলোর মান অবনমনের পেছনে মূলত অপরিকল্পিত নগরায়ণের বড় দায় রয়েছে। ফলে এরই মধ্যে ঢাকা বসবাসের অযোগ্য শহরের তালিকায় নাম লিখিয়েছে।

বর্তমানে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি শহরে বাস করে। ২০৫০ সাল নাগাদ এ সংখ্যা প্রায় ৭০ শতাংশে পৌঁছবে বলে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা অক্সফ্যাম ইন বাংলাদেশের তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। এ তথ্য মূলত জানাচ্ছে বিশ্বে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে নগরায়ণের গতিও ঊর্ধ্বমুখী। এর পেছনে রয়েছে উন্নত জীবন, কর্মসংস্থানের সুযোগসহ নানা কারণ। কিন্তু বাস্তবে শহুরে জনগণের এসব চাহিদা কতটা পূরণ হচ্ছে সেটি একটা বড় প্রশ্ন।

একটি শহর যদি তার জনসংখ্যার সামগ্রিকভাবে উন্নত জীবনের চাহিদা পূরণ করতে চায় তাহলে সেটিকে অবশ্যই গুণগত মানসম্পন্ন হতে হবে। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার সঙ্গে অবকাঠামো আর অর্থনীতির আকার বাড়লেই সেটিকে মানসম্পন্ন বলা যায় না। সেখানে থাকতে হবে বসবাস উপযোগী পরিবেশ, পর্যাপ্ত নাগরিক সুবিধা, নিরাপদ ও ‍শৃঙ্খল যাতায়াত ব্যবস্থা ইত্যাদি। বাংলাদেশের শহরগুলোর দিকে লক্ষ করলে এসব উপাদানের ঘাটতিই নজরে বেশি পড়ে। এর প্রতিফলনই দেখা যাচ্ছে অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের ২০২৬ সালের গ্লোবাল সিটিজ ইনডেক্সে। এতে বিশ্বের ১৬৩টি দেশের এক হাজার শহরকে পাঁচটি সূচকের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হয়েছে, যেখানে ৫০০ তালিকার মধ্যে বাংলাদেশের কোনো শহরের নাম নেই। আরো উদ্বেগজনক হলো গত বছরের একই তালিকায় যেখানে ঢাকা শহরের অবস্থান ৫০০-এর মধ্যে ছিল, এ বছর তার অবস্থান ৩৩ ধাপ পিছিয়ে হয়েছে ৫১৫। অর্থাৎ শহরের মানোন্নয়ন তো দূরের কথা, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষরা মানের অবনমনই ঠেকাতে পারছেন না। অথচ ঢাকা দেশের রাজধানীর হওয়ার পাশাপাশি সবচেয়ে জনবহুল শহরও বটে। আবার মানের এ চিত্র কেবল ঢাকার নয়, অন্যান্য শহরের পরিস্থিতিও একই রকম; অসন্তোষজনক।

শহরগুলোর মান অবনমনের পেছনে মূলত অপরিকল্পিত নগরায়ণের বড় দায় রয়েছে। ফলে এরই মধ্যে ঢাকা বসবাসের অযোগ্য শহরের তালিকায় নাম লিখিয়েছে। এ ধারা অন্যান্য শহরে অব্যাহত থাকলে খুব বেশি দিন নেই যখন বাকিগুলোও বসবাসের অনুপযোগী শহর হয়ে যাবে। তার পরও মানুষ সেসব শহরে বসবাস করে যাবে। কিন্তু এতে সামগ্রিকভাবে জীবন মান, স্বাস্থ্যে বিপর্যয় ঘটতে থাকবে। এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে হলে অবশ্যই কার্যকরভাবে শহর পরিকল্পনা করতে হবে। পরিবেশবান্ধব, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই শহর গড়ার পরিকল্পনা নেয়া প্রয়োজন, যেখানে জনস্বাস্থ্যের নিরাপত্তা ও পরিবেশের সুরক্ষা নিশ্চিতভাবে থাকবে। এজন্য সবার আগে অপরিকল্পিত নগরায়ণের যে ধারা চলমান সেটি যেকোনো মূল্যে বন্ধ করতে হবে। নয়তো কোনো শহরের মানোন্নয়ন হবে না। আর এজন্য সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষকে একত্রে কাজ করে যেতে হবে।

একটি শহরে নানা ধরনের সমস্যা থাকে। যেমন ঢাকার বড় সমস্যা যানজট। আবার রাজশাহীর বড় সমস্যা পানি সংকট। সুতরাং নগর পরিকল্পনায় শহরগুলোর বিদ্যমান সমস্যাগুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে এবং সে মোতাবেক সমাধানের পথে হাঁটা প্রয়োজন।

শহরগুলোর জনসংখ্যা বাড়ছে। স্বাভাবিকভাবেই ভূমির ওপর চাপও বাড়ছে। তাই জনগণের চাহিদা পূরণে কোনো অবকাঠামো নির্মাণের সঙ্গে তার আশপাশের ভূমি ব্যবহার, পানি নিষ্কাশন, পথচারীর চলাচল, গণপরিবহন ও পরিবেশগত প্রভাবের বিষয়গুলোও বিবেচনায় নিতে হবে। একইভাবে আবাসন বাড়ানোর সময় খোলা জায়গা, জলাধার, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়টিও নিশ্চিত করা জরুরি। পরিকল্পনার সঙ্গে পরিবেশ ও স্বাস্থ্যগত এসব বিষয়ের সামঞ্জস্য না থাকলে কোনো উদ্যোগই শহরের গুণগত পরিবর্তন আনতে পারবে না।

বিশ্বের যেসব শহর দীর্ঘদিন ধরে ভালো অবস্থান ধরে রেখেছে, তাদের অভিজ্ঞতায় বিষয়টি স্পষ্ট। নিউইয়র্ক, লন্ডন, প্যারিস কিংবা সিয়াটলের মতো শহরগুলো শুধু অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেনি; গণপরিবহন, নাগরিক সেবা, মানবসম্পদ, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা ও নগর শাসনের ওপরও দীর্ঘদিন ধরে বিনিয়োগ করেছে। অনেক শহরেই ব্যক্তিগত গাড়িনির্ভরতার পরিবর্তে গণপরিবহন, হাঁটা ও সাইকেল চলাচলের সুযোগ বাড়ানো হয়েছে। কোথাও আবার সবুজ এলাকা ও জলাধার সংরক্ষণকে নগর পরিকল্পনার অপরিহার্য অংশ করা হয়েছে। অর্থাৎ একটি শহরের মান ধরে রাখার জন্য ধারাবাহিক পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের শহরগুলোর ক্ষেত্রেও কিছু দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই ব্যবস্থাপনা জরুরি। চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে পাহাড়, খাল ও জলাধার রক্ষা এবং কার্যকর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা জরুরি। রাজশাহীতে বায়ুদূষণের পাশাপাশি পানি ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। খুলনায় ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে নকশা ও পরিবেশগত বিধি মানা এবং পর্যাপ্ত নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা দরকার। একইভাবে কক্সবাজারের মতো পর্যটননির্ভর শহরে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে পরিবেশ সুরক্ষার ভারসাম্য রাখতে হবে। পাশাপাশি ঢাকার ওপর অতিরিক্ত জনসংখ্যা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের চাপ কমাতে হবে।

দেশের অন্যান্য শহরে কর্মসংস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বিনিয়োগের সুযোগ বাড়ানো গেলে রাজধানীমুখী জনস্রোতও কমানো সম্ভব। এতে শুধু ঢাকার চাপ কমবে না, আঞ্চলিক শহরগুলোরও পরিকল্পিত বিকাশের সুযোগ তৈরি হবে। শহরের উন্নয়নকে তাই এককেন্দ্রিক না রেখে একটি সমন্বিত জাতীয় নগর পরিকল্পনার আওতায় আনা প্রয়োজন। আর এটি করতে হবে নগর ব্যবস্থাপনায় দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় ও জবাবদিহি নিশ্চিতের মাধ্যমে। একই শহরে একাধিক সংস্থা কাজ করলেও তাদের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে সমন্বয় না থাকার ফলে জনদুর্ভোগের কমতি নেই। পাশাপাশি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়িয়ে নগর ব্যবস্থাপনায় তাদের কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করতে হবে। নিয়ম ভঙ্গ করে ভবন নির্মাণ, জলাধার ভরাট কিংবা অপরিকল্পিত ভূমি ব্যবহার বন্ধে বিদ্যমান আইনও কঠোরভাবে প্রয়োগ করা প্রয়োজন।

বাস্তবতা হলো নগরায়ণ বন্ধ করার সুযোগ নেই। তবে এটিকে পরিকল্পিত ও জনবান্ধব করার সুযোগ রয়েছে। সেই সঙ্গে নগর সুবিধা প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছানো গেলে অনেক ক্ষেত্রে শহরের ওপর চাপ কমবে না। যেমন স্বাস্থ্যসেবার বিকেন্দ্রীকরণ, কর্মসংস্থানের সুযোগ সর্বত্র বাড়ানো। এতে এককভাবে কোনো শহরের ওপর চাপ কমবে বলেই প্রত্যাশা রয়েছে।

আরও