জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার চিন্তাভাবনা শুরু হয়েছিল গত শতাব্দীর আশির দশকে। সে সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়—এ তিন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় কলেজগুলোর অনার্স ও পাস কোর্সের ওপর তদারকি করত। কোর্স কারিকুলাম তৈরি করা, কলেজগুলোর নিবন্ধন, শিক্ষক নিয়োগ এবং চূড়ান্ত পরীক্ষা গ্রহণসহ বিভিন্ন কার্যক্রম করত এ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোই। কলেজ ছাড়াও এ বিশ্ববিদ্যালগুলো মেডিকেল কলেজগুলোও দেখভাল করত। সময়ের বিবর্তনে কলেজের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মূল ক্যাম্পাসে নতুন নতুন বিষয় চালুর প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয় এবং তাদের কাজের পরিধি বাড়তে থাকে। ফলে তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়কে তাদের প্রশাসনিক কার্যক্রম চালাতে গিয়েই হিমশিম খেতে হচ্ছিল। এ পরিস্থিতিতে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপর কলেজ শিক্ষার চাপ কমাতেই একটি অ্যাফিলিয়েটিং বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। এ চিন্তা থেকেই ১৯৯২ সালের ২১ অক্টোবর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে কলেজগুলোকে নিবন্ধনের পাশাপাশি প্রাগ্রসর শিক্ষায় গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। প্রাগ্রসর শিক্ষার স্বার্থে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি উৎকৃষ্ট গ্রন্থাগার, বিজ্ঞান গবেষণার জন্য ল্যাবরেটরি এবং অন্যান্য গবেষণার জন্য মিউজিয়াম থাকা উচিত। দুর্ভাগ্যের বিষয়, প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে বিশ্ববিদ্যালয়টিকে প্রাগ্রসর শিক্ষার গোড়াপত্তন ও বিকাশের জন্য তেমন কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। শুধু কলেজগুলোকে অ্যাফিলিয়েট (নিবন্ধন) করাই এর কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরুর দিকে যেনতেন কলেজে অনার্স ও মাস্টার্স কোর্স চালু করতে দেয়া হয়নি। পরবর্তীকালে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক মানসিকতা থেকে ঢালাওভাবে চালু করা হয়েছে অনার্স ও মাস্টার্স কোর্স। দিন দিন এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজের সংখ্যা বেড়েছে। কিন্তু যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক ও শিক্ষার উপযুক্ত পরিবেশ আছে কিনা সে বিষয়গুলোকে কখনই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেয়া হয়নি। যেসব কলেজে সুযোগ-সুবিধা তৈরি না করেই অনার্স ও মাস্টার্স কোর্স চালু ও শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয় সেসব কলেজের শিক্ষার্থীরা তাদের শিক্ষা স্তরের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ জ্ঞান অর্জন করতে ব্যর্থ হচ্ছে। এসব শিক্ষার্থী যে করেই হোক অনার্স ও মাস্টার্সের সনদ পেলেও সনদের দাবি অনুযায়ী জ্ঞান অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে। যুগোপযোগী পাঠ্যক্রমের অভাবে এবং মানসম্মত শিক্ষার অভাবে কলেজগুলো দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করতে ব্যর্থ হচ্ছে। ফলে অনার্স ও মাস্টার্স শেষ করেও অনেকেই থাকছেন বেকার।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণা বলছে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থিত কলেজগুলো থেকে স্নাতক শিক্ষার্থীর ২৮ দশমিক ২৪ শতাংশই বেকার। বাকিদের মধ্যে অধিকাংশই স্বল্প আয়ের চাকরিতে নিযুক্ত। এছাড়া নারী ও গ্রামের শিক্ষার্থীর মধ্যে বেকারত্বের হার তুলনামূলক বেশি। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন কলেজগুলোয় বিজ্ঞান বিভাগের তুলনায় ব্যবসায় শিক্ষা এবং সামাজিক বিজ্ঞান ও মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি। এর মধ্যে বিএ (পাস কোর্স), রাষ্ট্রবিজ্ঞান, লাইব্রেরি ম্যানেজমেন্ট, বাংলা ও ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ থেকে পাস করা শিক্ষার্থীদের বেকারত্বের হার বেশি। তবে ইংরেজি, অর্থনীতি, অ্যাকাউন্টিং, সমাজবিজ্ঞান, ফাইন্যান্স ও ব্যাংকিং থেকে পাস করা শিক্ষার্থীদের তেমন বেকার থাকতে হয় না।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন মোট শিক্ষার্থী ৩১ লাখ ৭০ হাজারের বেশি, যা দেশে উচ্চ শিক্ষায় মোট শিক্ষার্থীর প্রায় ৭২ শতাংশ। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন কলেজ আছে ২ হাজার ২৫৭টি। ৫৫৫টি সরকারি। সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে মোট কলেজের মধ্যে ৮৮১টিতে স্নাতক (সম্মান) পড়ানো হয়। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ৩১ লাখের বেশি শিক্ষার্থী সংখ্যা থাকলেও একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নেই পর্যাপ্ত ক্লাসরুম ও পরীক্ষার হলরুম। নেই গ্রন্থাগার, বিজ্ঞান গবেষণার জন্য গবেষণাগার। অধিকাংশ কলেজে নেই দক্ষ ও পর্যাপ্ত শিক্ষকও। লেগে আছে ভয়াবহ সেশনজট। বেশির ভাগ কলেজে স্নাতক-স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পড়াশোনা চলছে ‘কোনো রকমে’। বিশ্ববিদ্যালয়টি নিম্ন মধ্যবিত্ত ও গরিব পরিবার থেকে উচ্চ শিক্ষায় আসা সর্বোচ্চ সংখ্যক শিক্ষার্থীদের আশ্রয়স্থল হলেও সবচেয়ে বেশি অবহেলা আর উদাসীনতার শিকার হচ্ছেন তারা। শিক্ষার্থীরা মানসম্মত শিক্ষা পাচ্ছেন না। বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার কয়েক দশক পেরিয়ে গেলেও ভোগান্তি ও সেশনজট কোনোটিই কমেনি, বরং উল্টো বেড়েছে।
বাংলাদেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় আর্থিকভাবে রীতিমতো ধনী একটি বিশ্ববিদ্যালয়। শিক্ষার্থীর সংখ্যার দিক থেকে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোর শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর তুলনায় ৩০-৪০ গুণ হতে পারে। এদের কাছ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়টি নানা ধরনের ফি আদায় করে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির পুঁজির তহবিল শতকোটি টাকার ঘরে। অথচ দেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অর্থাভাবে গবেষণা প্রোগ্রাম যথাযথভাবে চালু করতে পারছে না। কিন্তু জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে অর্থ কোনো সমস্যা নয়। তার পরও বিগত কয়েক বছরে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাথাপিছু ব্যয় কমছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি বছরে একজন শিক্ষার্থীর পেছনে মাথাপিছু ব্যয়ও কম। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) ৪৯তম বার্ষিক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষার্থীপ্রতি যে ব্যয় করা হয়, সে তুলনায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ব্যয় অনেক কম। ২০২২ সালে শিক্ষার্থীদের পেছনে সবচেয়ে বেশি টাকা ব্যয় করেছে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। তাদের শিক্ষার্থীপ্রতি ব্যয় ৪ লাখ ৬৬ হাজার টাকা। অন্যদিকে শিক্ষার্থীপ্রতি ব্যয়ে সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। তাদের শিক্ষার্থীপ্রতি ব্যয় মাত্র ৭০২ টাকা। প্রতিবেদনে আরো দেখা গেছে, ২০২১ সালে শিক্ষার্থীপ্রতি ব্যয় ছিল ৭৪৩ টাকা। আর ২০২০ সালে এ ব্যয় ছিল ১ হাজার ১৫১ টাকা।
দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য শুরু হয়। অর্থাভাবে ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ার সুযোগ হয় না নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তানদের। শিক্ষার্থীপ্রতি ব্যয়ে এমন অসামঞ্জস্যের কারণে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে এক ধরনের বৈষম্যের সৃষ্টি হচ্ছে। এতে শিক্ষায় এক ধরনের বৈষম্য তৈরি হয়েছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্বল শিক্ষা কাঠামোর কারণেই এ বৈষম্যের সৃষ্টি হচ্ছে।
মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করতে যুগোপযোগী ও কর্মমুখী শিক্ষায় গুরুত্ব দিতে হবে বিশ্ববিদ্যালয়কে। এজন্য প্রয়োজন যুগোপযোগী পাঠ্যক্রম। যেসব কলেজে শিক্ষার উপযুক্ত পরিবেশ নেই সেসব কলেজে ঢালাওভাবে স্নাতক (সম্মান) ও মাস্টার্স কোর্স চালু করা বন্ধ করতে হবে। যেসব কলেজে শ্রেণীকক্ষ, গবেষণাগার ও গ্রন্থাগার নেই সেগুলোয় এসব সংকট নিরসন করে শিক্ষার উপযুক্ত পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে বিশ্ববিদ্যালয়কে উদ্যোগী হতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে যে সঞ্চিত অর্থ রয়েছে তা একটি আন্তর্জাতিক মানের জ্ঞান সৃষ্টির কেন্দ্র নির্মাণের কাজে ব্যবহার করার চিন্তা করতে পারে বিশ্ববিদ্যালয়। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় যদি যথার্থ অর্থে তার দায়িত্ব পালন করতে চায়, তাহলে কলেজগুলোয় দক্ষ ও যোগ্য শিক্ষক নিশ্চিত করতে তাদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।