আলোকপাত

প্রস্তাবিত বাজেটে উপেক্ষিত পাঁচটি বিষয়

প্রস্তাবিত বাজেটের অন্যতম সীমাবদ্ধতা হলো, তা বিরাজমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা তথা বিদায়ী অর্থবছরের অর্থনৈতিক সাফল্য বা ব্যর্থতাকে বিবেচনায় নেয়নি। অনস্বীকার্য যে বিদায়ী অর্থবছরে সরকার দেশের ভেতরে ও বাইরে অনেক প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়েছে। যেমন দেশের অর্থনীতির অসন্তোষজনক প্রবৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে রাজস্ব খাতের সংকোচন, ব্যাংকঋণের ওপর অতিনির্ভরতা, হ্রাসমান বৈদেশিক মুদ্রার

বাংলাদেশে চলমান অর্থনৈতিক সংকট নিরসনে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে জনসাধারণের কিছু প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু প্রস্তাবিত বাজেট প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ এ অর্থে যে দেশের অর্থনীতির জন্য বর্তমানে বিদ্যমান কতিপয় উদ্বেগজনক বিষয় বাজেটে উপেক্ষা করা হয়েছে।

বাস্তবতাবিবর্জিত সামষ্টিক অর্থনৈতিক লক্ষ্য নির্ধারণ

প্রস্তাবিত বাজেটের অন্যতম সীমাবদ্ধতা হলো, তা বিরাজমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা তথা বিদায়ী অর্থবছরের অর্থনৈতিক সাফল্য বা ব্যর্থতাকে বিবেচনায় নেয়নি। অনস্বীকার্য যে বিদায়ী অর্থবছরে সরকার দেশের ভেতরে ও বাইরে অনেক প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়েছে। যেমন দেশের অর্থনীতির অসন্তোষজনক প্রবৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে রাজস্ব খাতের সংকোচন, ব্যাংকঋণের ওপর অতিনির্ভরতা, হ্রাসমান বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ, বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে অরাজকতা সৃষ্টি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যস্ফীতি হয়েছে এবং এসব কারণে জনসাধারণের ক্রয়ক্ষমতা সংকুচিত হয়েছে।

কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত অর্থনীতির সম্ভাব্য গতিবিধি প্রভাবিত করে এমন গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক নির্দেশকগুলোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে এসব উদ্বেগের বিষয়াদি ধর্তব্যে নেয়া হয়নি। যেমন প্রস্তাবিত বাজেটে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। যদিও বিদায়ী অর্থবছরে সংশোধিত বাজেটে প্রবৃদ্ধির হার প্রাক্কলিত ৭ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ৬ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে।

বিনিয়োগ হলো প্রবৃদ্ধির চাবিকাঠি। জিডিপির অনুপাতে সরকারি বিনিয়োগের পরিমাণ বিদায়ী অর্থবছরের কাছাকাছি নির্ধারণ হয়েছে। বেসরকারি বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও প্রত্যাশা আকাশচুম্বী। আগামী অর্থবছরে জিডিপির অনুপাতে বেসরকারি বিনিয়োগের পরিমাণ ২১ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২৭ দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছবে বলে প্রত্যাশা করা হয়েছে। এ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে গেলে প্রত্যাশিত বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য অতিরিক্ত ৪ লাখ ৪ হাজার ৯৭ কোটি টাকা দরকার পড়বে, যা গত বছরের চেয়ে ৪১ দশমিক ৮ শতাংশ বেশি। বর্ধিত মূলধন আউটপুট অনুপাতে (ইনক্রিমেন্টাল ক্যাপিটাল আউটপুট রেশিও) কোনো পরিবর্তন রাখা হয়নি। বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ বৃদ্ধি মাত্র ১৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে, যা বিদায়ী অর্থবছরের চেয়ে সামান্য বেশি। বস্তুত বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির ২৪ শতাংশের কাছাকাছি অবস্থান করছে অনেক বছর ধরে। এক বছরে এর চেয়ে বড় পরিবর্তন কীভাবে হবে তা বোধগম্য নয়?

দেশ-বহিঃস্থ খাতের প্রাক্কলনও একইভাবে করা হয়েছে বিদায়ী অর্থবছরের সাফল্য বা ব্যর্থতা বিবেচনা ব্যতিরেকে। রফতানি, আমদানি ও রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি যথাক্রমে ১২, ৮ ও ১০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। অথচ বিদায়ী অর্থবছরে মে মাস পর্যন্ত রফতানি প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ১ শতাংশ ও রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি ১ দশমিক ১ শতাংশ ছিল। চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত আমদানির পরিমাণ যাচাই করলে দেখা যায়, আমদানিতে প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক ১৪ দশমিক ৪ শতাংশ। দেশ-বহিঃস্থ খাতের আরেক বড় অঙ্গ বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ ৩৫ দশমিক ৮ বিলিয়নে পৌঁছবে বলে অনুমিত হয়েছে, যা বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে ৩৫ দশমিক ৬ শতাংশ নির্ধারণ হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যংকের তথ্যমতে, বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ ২৯ দশমিক ৮ শতাংশ। 

সম্পদ সংগ্রহ ব্যবস্থাপনার কতিপয় পদ্ধতির পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন

বাংলাদেশে দেশীয় সম্পদ সংগ্রহ ব্যবস্থাপনায় চ্যালেঞ্জ সবসময় বিদ্যমান ছিল। কর ব্যবস্থাপনায় অর্থবহ সংস্কারের অনুপস্থিতিতে উচ্চ কর ফাঁকি, ক্ষুদ্র কর নেট ও বড় আকারের অবৈধ অর্থের প্রবাহের মতো সমস্যাগুলোকে এখনো সমাধান করা যায়নি। 

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) একটি শর্তানুসারে, আগামী অর্থবছরে রাজস্ব সংগ্রহ জিডিপির অনুপাতে অতিরিক্ত দশমিক ৫ শতাংশ বাড়ানো হবে। প্রস্তাবিত বাজেটে প্রাক্কলিত রাজস্বের পরিমাণ ৫ লাখ কোটি ধরা হয়েছে। অর্থাৎ রাজস্ব সংগ্রহ আগামী অর্থবছরে ১৫ দশমিক ৫ শতাংশ বাড়বে বলে ধরা হয়েছে। তবে রাজস্ব আদায়ের গতিবিধি দেখে মনে হয় না বিদায়ী অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে। রাজস্ব আদায়ের ফেব্রুয়ারির ২৩ তারিখ পর্যন্ত গতিবিধি অনুসারে, প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব আদায়ের হার ৩৯ শতাংশের মতো বাড়তে হবে। অন্যদিকে পরোক্ষ করের ওপর নির্ভরতা বাড়ানো হয়েছে, যা নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের ওপর চাপ বাড়াবে।

কোম্পানির সংজ্ঞায়নে নতুন আয়কর আইন ২০২৩ বড় ধরনের পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। নতুন সংজ্ঞায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, এনজিও, প্রাইভেট ফাউন্ডেশন, সমবায় সমিতি ইত্যাদিও কোম্পানি হিসেবে গণ্য হয়েছে। কিন্তু কোম্পানির সংজ্ঞায়নে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও এনজিওর মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্তর্ভুক্তি আপত্তিকর। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর আরোপিত কর শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের ঘাড়ে বর্তাবে। আর এনজিওগুলো তো অলাভজনক প্রতিষ্ঠান। এদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে এবং নারীর ক্ষমতায়নে অবদান আছে। 

সামাজিক খাতে স্বল্প বরাদ্দ

শিক্ষা খাতে বরাদ্দ সামান্য বাড়িয়ে বিদায়ী অর্থবছরের ১০ দশমিক ৬৭ শতাংশ থেকে আগামী অর্থবছরে ১১ দশমিক ৫৭ করা হয়েছে। তা এখন জিডিপির অনুপাতে বেড়ে ১ দশমিক ৫৯ শতাংশ থেকে ১ দশমিক ৭৬ শতাংশ হয়েছে। তবে প্রয়োজন অনুযায়ী এ সামান্য বৃদ্ধি হতাশাব্যঞ্জক। কেননা অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৫ সাল নাগাদ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে জিডিপির ৩ শতাংশ করার কথা ছিল। 

যদিও ধরা হচ্ছে, বাংলাদেশ ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে আসবে, জিডিপির অনুপাতে বাংলাদেশের শিক্ষা খাতে ব্যয় ৪১টি স্বল্পোন্নত দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান নিচের দিক থেকে পঞ্চমতম।

স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ চিত্রও একই। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশের বাজেটে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে বরাদ্দ মোট বাজেটের মাত্র ৫ শতাংশের মতো। ২০২২-২৩ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এ বরাদ্দের পরিমাণ ছিল মোট বাজেটের ৪ দশমিক ৫ শতাংশ। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ মাথাপিছু মাত্র ৭০ টাকা বাড়িয়ে ২ হাজার ১৫৮ থেকে ২ হাজার ২২৮ টাকা করা হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতে এত কম বরাদ্দের কারণে সাধারণ মানুষকে নিজের গাঁটের টাকা খরচ করে চিকিৎসা করতে হয়। অর্থাৎ একজন নাগরিক তার চিকিৎসা ব্যয়ের  প্রায় ৭৪ শতাংশ নিজ পকেট থেকে নির্বাহ করেন। গত দুই দশকে বাংলাদেশী নাগরিকদের নিজ পকেট থেকে চিকিৎসা ব্যয় ক্রমাগত বাড়তে থাকলেও ভারত, পাকিস্তান, নেপাল ও শ্রীলংকার মতো পার্শ্ববর্তী দেশগুলোয় যা হ্রাসমান।

মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতিতে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী প্রকল্পের প্রয়োজন আগের চেয়ে বেড়েছে। কিন্তু জিডিপির অনুপাতে ও মোট বাজেটের অনুপাতে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী প্রকল্পগুলোয় বরাদ্দ কমেছে, যদিও তা টাকার হিসেবে ৭ দশমিক ৩৪ শতাংশ বেড়েছে যা মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম। জিডিপির অনুপাতে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী বরাদ্দ ২০১০ সালে ১ দশমিক ৬ শতাংশ ছিল যা এখন হ্রাস পেয়ে প্রস্তাবিত বাজেট অনুযায়ী শূন্য দশমিক ৭ শতাংশে নেমেছে। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী প্রকল্পের অধীনে প্রত্যক্ষ ভাতা বৃদ্ধি অপর্যাপ্ত। বয়স্ক ভাতা ৫০০ থেকে বাড়িয়ে মাত্র ৬০০ টাকা করা হয়েছে। বিধবা ও দরিদ্র মহিলাদের ক্ষেত্রে তা মাত্র ৫০০ থেকে বাড়িয়ে ৫৫০ টাকা করা হয়েছে। 

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে গৃহীত পদক্ষেপ অপর্যাপ্ত

বিদায়ী অর্থবছরে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। যে হারে মূল্যস্ফীতি হয়েছে মানুষের বেতন সে হারে বাড়েনি। তাই মূল্যস্ফীতি দরিদ্র, নিম্ন আয় ও নিম্নমধ্য আয়ের পরিবারগুলোকে প্রকট চাপের মুখে ঠেলে দিয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে মূল্যস্ফীতি রাতারাতি ৬ শতাংশে নেমে আসবে ধরা হয়েছে। বিদায়ী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে মূল্যস্ফীতি একইভাবে ৫ দশমিক ৬ শতাংশ প্রাক্কলিত হয়েছিল, পরে তা ৭ দশমিক ৫ শতাংশে দাঁড়ায়। যদিও বিদায়ী অর্থবছরের মে পর্যন্ত বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতির হার  ৮ দশমিক ৮ শতাংশ ছিল (ভিত্তি বছর ২০২১-২২)। কিন্তু প্রস্তাবিত বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। কয়েক বছর ধরে দাবি ওঠায় এ বছর করমুক্ত ব্যক্তি আয় ৩ লাখ থেকে ৩ দশমিক ৫ লাখ করা হয়েছে। এ পদক্ষেপকে স্বাগত জানাই। কিন্তু তা পর্যাপ্ত নয়। অন্যদিকে কিছু সরকারি সেবা গ্রহণের জন্য কর রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক করায় অনেক নিম্ন আয়ের পরিবারকেও ব্যধ্যতামূলক ২ হাজার টাকা কর দিতে হবে, যা করমুক্ত আয়ের মূল দর্শনের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।

বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় জনগণের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে

বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনয়ন এবং এ প্রক্রিয়ায় জনগণের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি বহু বছরের দাবি। কিন্তু এ রকম একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে স্বয়ং সংসদ সদস্যদের মাঝেই তেমন আগ্রহ পরিলক্ষিত হয় না। সরকারের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে বাজেট প্রণয়নকালে জনগণের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে; বিশেষজ্ঞদের মতামত নেয়াও প্রয়োজন এবং বাজেট বাস্তবায়নে সুষ্ঠুতা বজায় রাখতে প্রতি তিন মাস অন্তর বাজেট বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার পর্যালোচনা হওয়া উচিত।

ড. ফাহমিদা খাতুন: নির্বাহী পরিচালক, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)

আরও