ভরা গ্রীষ্মে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে লোডশেডিংয়ে সাধারণ মানুষের প্রাণ ওষ্ঠাগত। অথচ মাথার ওপর তপ্ত গনগনে সূর্য আমাদের বিশাল এক সম্ভাবনার কথাই মনে করিয়ে দেয়। গোটা বিশ্বই জীবাশ্ম জ্বালানির বদলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের দিকে ঝুঁকছে। অথচ বাংলাদেশের সৌরবিদ্যুতের গতি কেন মন্থর, এ প্রশ্ন এখন ব্যাপক গুরুত্ব পাচ্ছে। কাগজে-কলমে কিংবা বিভিন্ন নথিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে বাংলাদেশের উচ্চাভিলাষী কিছু লক্ষ্য আছে। অথচ বাস্তবে সৌরশক্তি এখনো ‘বিকল্প’ জ্বালানি হয়ে উঠতে পারেনি। এমনটি কেন?
গত এক দশকে দেশের বিদ্যুৎ খাতে উৎপাদনে যে জ্বালানি ব্যবহার হতো তা আমদানির মাধ্যমে আনা হতো। ফলে বিদ্যুৎ খাত পুরোপুরি আমদানিনির্ভর জ্বালানি চাহিদা ব্যবস্থাপনাকেই মূল দর্শন বানিয়ে ফেলে। সুপরিকল্পিতভাবে আইপিপি ও ভাড়ায়চালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র অনুমোদন পায়। মূলত বিদ্যুৎ সংকটকে পুঁজি করে ক্ষমতাবানদের লুটপাট ও সম্পদ পাচারের জন্যই এসব সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এমনকি বিদ্যুৎ খাতে অনিয়ম করে সিঙ্গাপুরে গিয়ে শীর্ষ ধনীদের তালিকায় যুক্ত হওয়ার নজিরও রয়েছে। গত দশকে দেশের মানুষের বিদ্যুতের চাহিদা নানাভাবে পূরণ হয়েছে, এটি সত্য। সেজন্য চড়া মাশুল গুনতে হয়েছে। কারণ এ সময়ে বিদ্যুৎ খাত ছিল উল্টোপথের যাত্রী। অনেকটা ‘ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে’ গোটা ব্যবস্থা পরিচালিত হতো। জাতীয় গ্রিডে এক মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত না হলেও ‘কানসাট আন্দোলনে’ পুলিশের গুলিতে অন্তত ১৭ জনের মৃত্যু ঘটে।
চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারকে ঘিরে মানুষের মনে নতুন প্রত্যাশা দেখা দেয়। দেশের অর্থনীতির জন্য গলার কাটা দূর করা এবং অপ্রয়োজনীয় রেন্টাল/কুইক রেন্টাল এবং আদানি চুক্তি বাতিল করে দীর্ঘমেয়াদি ও সাশ্রয়ী বন্দোবস্ত নেয়া হবে। সে আশাও নিরাশায় পর্যবসিত হয়েছে। তবে এ সময়ে একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ হয়, ‘নেট মিটারিং’ ব্যবস্থা। ফলে এখন ব্যক্তি ও বেসরকারি উদ্যোগে রুফটপ সোলার বিদ্যুৎ একটা নতুন সম্ভাবনা হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে কেবল আবাসিক, বাণিজ্যিক ও শিল্পকারখানার ছাদ ব্যবহার করে পাঁচ-আট হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। এর মধ্যে কেবল টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস খাতের কারখানার ছাদগুলো থেকে প্রায় দুই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যান্য কারখানা মিলে সে পরিমাণ চার হাজার মেগাওয়াটের বেশি হতে পারে। এছাড়া সরকারি প্রতিষ্ঠানের ছাদ ব্যবহার করে অন্তত এক হাজার মেগাওয়াট, আবাসিক ভবনের ছাদ ব্যবহার করে তিন হাজার মেগাওয়াট সোলার বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ আছে। বর্তমান চাহিদার প্রায় অর্ধেক এভাবে কেবল রুফটপ সোলার বিদ্যুৎ থেকে পাওয়া সম্ভব। এর বাইরে কাপ্তাই লেকসহ অনেক লেক, হাওর, নদী, খাল, অবারিত সমুদ্র অঞ্চল, চরাঞ্চল, রাস্তা ও রেললাইনের ওপরের খোলা জায়গা ইত্যাদিতে সোলার বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব এবং অনেক দেশই বাণিজ্যিকভাবে করছে। এ অপার সম্ভাবনার বিপরীতে গত ১০ বছরে সোলার বিদ্যুৎ উৎপাদন শতগুণ বাড়লেও তা এখনো আমাদের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাত্র ৫ শতাংশ (মাত্র ১ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটের মতো)। এর মধ্যে আছে তিস্তা, টেকনাফ ও সিরাজগঞ্জের মতো কয়েকটি সোলার পার্ক। যেখানে ভিয়েতনাম বা ভারতের মতো দেশগুলো এ খাতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ২০-৩০ শতাংশে উন্নীত করেছে, সেখানে দেশের এ গ্রাফ আরো খাড়া বা ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তা হয়নি কেন?
বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে না পারার একটি প্রধান কারণ ‘মাফিয়া তান্ত্রিক’ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। রেন্টাল/কুইক রেন্টাল আর ক্যাপাসিটি চার্জের ফাঁদ থেকে বাংলাদেশ এখনো বের হতে পারেনি। ফলে বিদ্যুৎ খাতে নতুন উদ্যোগের সক্ষমতা সীমিত। এর বাইরে আছে জ্বালানি আমদানিনির্ভর কমিশন বাণিজ্য। কয়লা বা এলএনজি আমদানিতে যে পরিমাণ কমিশন এবং বড় অংকের লেনদেনের সুযোগ থাকে, সৌরবিদ্যুতের মতো দেশীয় ও প্রাকৃতিক উৎসের ক্ষেত্রে তা সীমিত। এ ‘ইম্পোর্ট লবি’ অনেক সময় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সৌরশক্তির প্রসারে অলিখিত বাধা হয়ে দাঁড়ায়। নিজস্ব গ্যাস উত্তোলন না করে আমদানিতে ঝুঁকে পড়ার যে প্রবণতা, সোলারের ক্ষেত্রেও একই মানসিকতা দৃশ্যমান। প্রায় সব সরকারই বলে, সোলার পার্কের জন্য প্রচুর জমির প্রয়োজন, যা কৃষিনির্ভর বাংলাদেশে পাওয়া কঠিন। বাস্তবতা হলো আমাদের দেশে হাজার হাজার কলকারখানা এবং সরকারি-বেসরকারি ভবনের ছাদ অব্যবহৃত পড়ে আছে। ‘রুফটপ সোলার’ বা ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপনের মাধ্যমে মেগা প্রকল্পের জমি সংকটের সমাধান অনায়াসেই সম্ভব ছিল। আরেকটা বড় অজুহাত হলো সৌরবিদ্যুৎ কেবল দিনে পাওয়া যায়, কিন্তু চাহিদা বেশি রাতে। এ অজুহাতে ব্যাটারি স্টোরেজের দোহাই দিয়ে সোলারকে পিছিয়ে রাখা হয়েছে। অথচ বিশ্ববাজারে ব্যাটারি প্রযুক্তির দাম দ্রুত কমছে। স্মার্ট গ্রিড ও আধুনিক সঞ্চালন লাইনে সঠিক বিনিয়োগ করে এ চ্যালেঞ্জ অনেকাংশে উত্তরণ সম্ভব।
নতুন সরকারের সামনে তাই করণীয় কী?
প্রথমত, দেশের বর্তমান সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৬০ ভাগ ব্যক্তি ও বেসরকারি উদ্যোগের সাফল্য। সরকারকে তাই এ মুহূর্তে ব্যক্তি উদ্যোগ থেকে শুরু করে সব প্রতিষ্ঠানে রুফটপ সোলার সেটআপে সহজশর্তে ঋণ সুবিধা দেয়া, নেট মিটারিংয়ের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করা এবং জাতীয় গ্রিডে সরবরাহকৃত বিদ্যুতের জন্য ইনসেন্টিভ দেয়ার উদ্যোগ নিতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এ খাতে একটি রিফাইন্যান্স স্কিম থাকলেও তা খুবই অপ্রতুল এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য নয়। দেশের একটা কোনো সরকারি/বেসরকারি ব্যাংক ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সোলার সেটআপে এক পয়সাও ঋণ দেয় না। নিট মিটারিং করতে চাইলে ‘লোড স্যাংকশন’-এর জটিলতা অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তার জন্য অতিক্রম করা দুরূহ।
দ্বিতীয়ত, স্মার্ট গ্রিড ও আধুনিক সঞ্চালন লাইন জাতীয় প্রতিরক্ষার জন্যই জরুরি। প্রতিরক্ষা বাজেট থেকেই এর উন্নতি সাধন করা দরকার।
তৃতীয়ত, বাংলাদেশ কয়েক বছর ধরে সোলার প্যানেল অ্যাসেম্বলি করে আসছে। গত বছর বাংলাদেশ আমেরিকায় সোলার প্যানেল রফতানি করেছে। এটি বড় অর্জন নিশ্চয়। দেশের বার্ষিক সোলার প্যানেল অ্যাসেম্বলি সক্ষমতা এক হাজার মেগাওয়াটের মতো। কিন্তু এ পরিমাণে সন্তুষ্ট হলে চলবে না। দেশে সৌরবিদ্যুতের পূর্ণাঙ্গ উৎপাদন সম্ভব এবং সময়ের নিরিখে প্রয়োজন। সমস্যা হলো সোলার সিস্টেমের অনেক কাঁচামালের ওপর ভ্যাটের খড়্গ আছে। ফলে তা উৎপাদকবান্ধব নয়। এজন্য এ খাতে নীতিসহায়তা ও ইনসেন্টিভ দিতে হবে। সোলার সিস্টেমের অন্যান্য উপাদানের ক্ষেত্রেও এ কথা প্রাসঙ্গিক।
রাজধানীতে ভূমি সংকট নতুন কিছু নয়। তবে মেট্রোরেল স্টেশনের ছাদে সোলার প্যানেল বসানোর একটা উদ্যোগের কথা শোনা গিয়েছিল এবং পরে দায়িত্বপ্রাপ্তরা যেন তা ভুলে গেছেন। অথচ দিল্লি ঠিকই তাদের মেট্রোস্টেশনের ছাদে ও ভায়াডাক্টের পাশে উল্লম্ব বা দ্বিমুখী সোলার প্যানেল স্থাপন করেছে, যা তাদের দিনের বিদ্যুৎ চাহিদার ৬০ শতাংশ মেটায়। সুইজারল্যান্ড রেললাইনের স্লিপার বা ট্র্যাকে পরীক্ষামূলকভাবে সোলার প্যানেল বসিয়ে ট্রেন চলাচলের পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রযুক্তি তৈরি করেছে। বাংলাদেশে কেবল সব মেট্রোস্টেশনের ছাদে নয়, সম্পূর্ণ মেট্রো পথের ওপর (ছাদের মতো করে), তার নিরাপত্তা দেয়ালে, সারা দেশের সব রেল-মহাসড়কের ওপর (ছাদের মতো করে), এমনকি জলাশয়গুলোয় ভাসমান সোলার বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নিতে পারে।
চারটি প্রস্তাবের কেবল প্রথমটি পালন করলেও দেশের বর্তমান জ্বালানি বিপর্যয় অনেকাংশে লাঘব করা সম্ভব। পাঁচ হাজার মেগাওয়াট রুফটপ সোলার মানে হলো ১০টি বড় বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সমান সক্ষমতা। এজন্য কোনো বাড়তি জমি, জ্বালানি এমনকি বৈদেশিক মুদ্রার বাড়তি ব্যয়ও নেই। জ্বালানি সার্বভৌমত্ব আপাতত স্বল্পমেয়াদে অর্জন সম্ভব নয়। কিন্তু স্বল্পমেয়াদে ন্যূনতম জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে আমদানিনির্ভরতা কমানোর কোনো বিকল্প নেই। সৌরবিদ্যুৎ কেবল একটি পরিবেশবান্ধব সমাধান নয়, এটি বর্তমান ডলার সংকটের সময়ে একটি অর্থনৈতিক ঢাল। সরকার যদি এখনো আমদানিনির্ভর সিন্ডিকেটের মায়া ত্যাগ করে রুফটপ সোলার ও গ্রিড আধুনিকায়নে সত্যিকারের গুরুত্ব না দেয়, তবে ভবিষ্যতের জ্বালানি সংকট আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। সূর্যের প্রখরতা যেন আমাদের কেবল ঘাম না ঝরায়, বরং আমাদের নীতিনির্ধারকদের চোখও খুলে দেয়।
দিদার ভূঁইয়া: যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন