দীর্ঘ দুই দশক পর আবারো রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে দলটি। ১৭ ফেব্রুয়ারি ২৫ জন পূর্ণমন্ত্রী এবং ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী জাতীয় সংসদ ভবনে শপথ নিয়েছেন। এর মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন মন্ত্রিসভা যাত্রা শুরু করেছে। গতকাল বিকালে সচিবালয়ে নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান নতুন মন্ত্রিসভার সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এরই মধ্যে মন্ত্রিসভার সদস্যরা নিজ নিজ ক্ষেত্রে কাজ শুরু করেছেন। বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ নানা কারণে। এ সরকারের জন্য বহুবিধ চ্যালেঞ্জ আছে এবং এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা অত্যন্ত কঠিন। প্রথমত, রাষ্ট্র পরিচালনা করার জন্য প্রশাসন যন্ত্রকে সুষ্ঠু ও দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করতে হয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য এখন দেশের রাষ্ট্রীয় প্রশাসন যন্ত্র ভীষণ বেহাল অবস্থায় রয়েছে। প্রশাসনিক কাঠামোর অভ্যন্তরে বহু ফাটল আছে। আমরা দেখছি, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে পুলিশ বাহিনীর অভ্যন্তরীণ কাঠামোতে বিশৃঙ্খলা আছে। আবার বিচার বিভাগও নানা রকম সমস্যায় ভুগছে।
বিশেষত আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে সংকট সবচেয়ে বেশি বলা যায়। অভিযোগ আছে, দেশের আমলাতন্ত্র অধিকাংশ ক্ষেত্রে দলীয় আনুগত্য এবং নানা ক্ষেত্রে রাজনৈতিক শক্তির প্রভাব বলয়ে আচ্ছন্ন হয়ে আছে। বিদ্যমান সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে দক্ষ, শক্তিশালী ও নিরপেক্ষ আমলাতান্ত্রিক কাঠামোতে রূপান্তর এখন সরকারের প্রাথমিক চ্যালেঞ্জ। এক্ষেত্রে যোগ্য, দক্ষ, অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের দিয়ে আমলাতন্ত্রকে পুনর্গঠন করতে হবে। তবে পুনর্গঠনের কাজটি স্বল্প সময়ে করা অত্যন্ত কঠিন। গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক রূপান্তরের সময় পুলিশ বাহিনীর ব্যবস্থাপনাগত কাঠামো পর্যবেক্ষণ করলে বিষয়টি বোঝা সহজ হবে। আমরা দেখেছি, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনেকেই নিজ নিজ দায়িত্বের আওতায় থাকা থানা-ফাঁড়ি অরক্ষিত রেখে চলে গিয়েছিলেন। তাতে থানা-ফাঁড়ির অভ্যন্তরীণ সম্পদ ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের নির্দেশনায় অনেকে আবার দায়িত্বে ফিরেছেন। কিন্তু আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মূল ব্যবস্থাপনা কাঠামোতে যে সমস্যাগুলো তৈরি হয় সেগুলোর জন্য অনেকেই মনোযোগ দিয়ে আগের মতো দায়িত্ব পালন করতে পারেননি বা এখনো পারছেন না। এক্ষেত্রে তাদের ব্যবস্থাপনাগত কাঠামোটি সুচারু নয়। এ ধরনের ব্যবস্থা কাঠামো দিয়ে দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা কিংবা সুষ্ঠুভাবে আইন প্রয়োগ করার কাজটি অত্যন্ত কঠিন। এজন্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরিচালনার বিষয়ে সরকারকে নতুন আঙ্গিকে চিন্তাভাবনা করতে হবে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যদি রাষ্ট্রযন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হয় তাহলে এতে নতুনভাবে রক্ত সঞ্চালন করতে হবে। রুগ্ণ-জীর্ণ কাঠামোকে সজীব করতে হবে। একই কথা আমরা বিচার ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও বলতে পারি।
বিচার ব্যবস্থার সমস্যাগুলো বাদে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থাও বেশ নাজুক। দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সমস্যার মধ্যে বেকারত্ব, ক্রমবর্ধমান দারিদ্র্য, মূল্যস্ফীতি, ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস, আর্থিক খাতে অস্বচ্ছতা এবং বিনিয়োগ খাতে মন্দা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তবে সবচেয়ে বড় সমস্যা, আর্থিক খাতে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ হ্রাস পাওয়া। অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য খাতে যদি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা না যায় তাহলে বেকারত্ব কিংবা কর্মসংস্থানের অভাবের মতো সামাজিক সমস্যা দূর করার কাজটি কঠিন হয়ে উঠবে। বেকারত্ব ও কর্মসংস্থানের অভাবের সঙ্গে তো ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি রয়েছেই। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে উদ্যোগ নিলেও রাতারাতি মূল্যস্ফীতি কমানো যাবে না। তবে সুষ্ঠু পরিকল্পনার মাধ্যমে এটিকে নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। সেজন্য আর্থিক ও রাজস্বনীতিকে নতুনভাবে সাজানো দরকার। দেশের প্রেক্ষাপটে মূল্যস্ফীতির কারণ চিহ্নিত করতে হবে। বাজারে সিন্ডিকেটের ওপর দায় চাপিয়ে দিলে চলবে না। বরং মূল্যস্ফীতি কেন হচ্ছে সেটি বুঝতে হবে। সরকারকে দেখতে হবে, মূল্যস্ফীতির পেছনে কোন কোন রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, ভূরাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকট বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে। বিশেষত অর্থনীতিতে উদ্বৃত্ত অর্থ রয়েছে কিনা সেটি খতিয়ে দেখতে হবে। নতুন সরকারের জন্য ভূরাজনীতিতে স্বকীয় অবস্থান রাখাও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাবনা। বিশ্ব রাজনীতিতে বিভিন্ন শক্তিবলয়ের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে শক্তির ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। এর মাধ্যমে বাণিজ্যিক সম্পর্কের পথও উন্মুক্ত হবে। কূটনৈতিক অবস্থানের মাধ্যমে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে অক্ষুণ্ন রাখাও কঠিন কাজ। এরই মধ্যে আমরা নানা ক্ষেত্রে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের বৈরী আচরণ দেখেছি। কিন্তু সরকারকে ভাবতে হবে, এ দুই সার্বভৌম দেশের মধ্যে কীভাবে সুস্থ-স্বাভাবিক সম্পর্ক গড়ে তোলা যায়।
অন্যদিকে নতুন সরকারের জন্য ঋণের দায় পরিশোধ করাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ১৭ ফেব্রুয়ারি বণিক বার্তার এক প্রতিবেদন অনুসারে, নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার সময় থেকেই ২৩ লাখ কোটি টাকারও বেশি ঋণের বোঝা চাপছে। এসব ঋণ পরিশোধ করার জন্য রাজস্ব আয় বাড়ানো জরুরি। রাজস্ব সংগ্রহের জন্য সৃজনশীলতা দেখাতে হবে। এমন অভিনব পদ্ধতির আশ্রয় নিতে হবে যাতে কেউ নির্ধারিত কর দেয়ার সময় এড়িয়ে না যেতে পারে। কর দিতে সক্ষম নাগরিকদের করজালের আওতায় আনতে হবে। করের হারও বিদ্যমান প্রেক্ষাপটের নিরিখে পুনর্নির্ধারণ করতে হবে। করদাতারা কীভাবে ভোগান্তি ছাড়া কর দিতে পারবেন সে পদ্ধতিগুলো বিবেচনায় রাখতে হবে। মোটাদাগে এগুলোই সরকারের সামনের বড় চ্যালেঞ্জ।
রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও নতুন সরকারের সামনে কিছু চ্যালেঞ্জ দেখা যাচ্ছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, সংসদে পিআর পদ্ধতি বাস্তবায়ন এমনকি সংবিধান সংস্কার প্রসঙ্গেও রাজনৈতিক অংশীজনদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা যাচ্ছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সংকট অন্যখানে। সদ্যসমাপ্ত জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন হয়েছে তা নির্বাচনের পরাজিত পক্ষ মানতে চাচ্ছে না। তাদের মনে এমন ধারণা আছে যে এ নির্বাচনেও কারচুপি ও জালিয়াতি হয়েছে। এরই মধ্যে অনেক রাজনৈতিক দলের জোট বিক্ষোভ করেছে। যতটুকু বোঝা যাচ্ছে, সামনেও রাজনৈতিক দলগুলো আন্দোলনের মাধ্যমে ক্ষোভ জানাবে। ১৭ ফেব্রুয়ারি জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এরই মধ্যে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ এ জোটের অংশীজনরা মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দেননি। এমনটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য সুসংবাদ নয়। অন্তত এমন অবস্থা দেখে শঙ্কা জাগে, ভবিষ্যতে রাজনৈতিক অঙ্গন সংঘাতমুখর হয়ে উঠতে পারে। নতুন সরকারকে তাই রাজনৈতিক অঙ্গনের অস্থিতিশীলতাগুলোও সামলাতে হবে। এক্ষেত্রে যথেষ্ট মুন্সিয়ানা দেখাতে হবে। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বিএনপিকে নিজেদের সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ধরে রাখার কঠিন কাজটি করতে হবে। কাজটি চরম ধৈর্য ও দক্ষতার সঙ্গে করতে হবে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের এমপিদের মধ্যে বিএনপির প্রার্থীই সংখ্যাগরিষ্ঠ। এ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দলটির জন্য কিছু বিপদ দাঁড় করিয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে দলটির কর্মী থেকে শুরু করে নেতৃত্বস্থানীয় প্রত্যেকের মধ্যেই সিরিয়াসনেস থাকতে হবে। আর বিদ্যমান প্রত্যেক চ্যালেঞ্জকে যথাযথ গুরুত্ব না দিয়ে জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে গা ছাড়া ভাব এলে স্বেচ্ছাচারী মনোভাবও এসে পড়ার ঝুঁকি থাকে। এমনটি যাতে না হয় এবং সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার রাজনৈতিক ঝুঁকি এড়ানোর জন্য বিজয়ী রাজনৈতিক শক্তি বিএনপিকে তীক্ষ্ম দৃষ্টি রাখতে হবে।
ড. মাহবুব উল্লাহ্: অর্থনীতি ও রাজনীতি বিশ্লেষক এবং বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির আহ্বায়ক