একজন মন্ত্রী নির্বাচিত সরকারের নীতির প্রতিনিধিত্ব করেন, সংসদের কাছে জবাবদিহি করেন এবং নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের রাজনৈতিক দায়িত্ব পালন করেন। অতএব, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্ব রাজনৈতিক হওয়া গণতন্ত্রের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু এখানেই একটি মৌলিক নীতিগত সীমারেখা টানা অপরিহার্য। রাজনৈতিক নেতৃত্ব বনাম প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা। মন্ত্রী রাজনৈতিক হতে পারেন, কিন্তু প্রশাসন রাজনৈতিক হতে পারে না।
স্বাস্থ্য সচিব, মহাপরিচালক (ডিজিএইচএস), হাসপাতাল পরিচালক, নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রধান, মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বা প্রো-ভিসি—এসব পদ মূলত পেশাভিত্তিক। অতীতে এসব পদে সক্রিয় দলীয় রাজনীতিতে যুক্ত বা দলীয় পদধারী ব্যক্তিকে নিয়োগ দেয়ায় প্রতিষ্ঠানগুলো রাজনৈতিক মেরুকরণের শিকার হয়েছে।
স্বাস্থ্য খাত প্রযুক্তিনির্ভর, গবেষণাভিত্তিক এবং নৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল। এখানে সিদ্ধান্তের ভুল কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়—এটি জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি, অর্থনৈতিক অপচয়, এমনকি প্রাণহানির কারণও। ফলে স্বাস্থ্য প্রশাসন ও একাডেমিক নেতৃত্বকে দলীয় প্রতিযোগিতার বাইরে রাখা রাষ্ট্র পরিচালনার পরিণত বোধের প্রতিফলন।
স্বাস্থ্য খাতের বিশেষত্ব হলো এখানে সিদ্ধান্তের প্রভাব সরাসরি মানুষের জীবন ও অর্থনীতির ওপর পড়ে। একটি ভুল ওষুধ ক্রয়নীতি, অদক্ষ মানবসম্পদ পরিকল্পনা বা দুর্বল হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়; এটি জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি, রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ক্ষতি এবং নাগরিক আস্থার সংকট সৃষ্টি করে, যার উদাহরণ ভুরি ভুরি। বাংলাদেশ বর্তমানে সর্বজনীন স্বাস্থ্য কভারেজের দিকে অগ্রসর হওয়ার যে অঙ্গীকার করেছে, তা বাস্তবায়নে প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা ও পেশাদারত্ব অপরিহার্য। রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে যদি নীতির ধারাবাহিকতা বারবার ভেঙে যায়, তবে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য সংস্কার কখনো স্থায়ী রূপ পাবে না।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা দেখায়, প্রতিষ্ঠিত গণতন্ত্রগুলো রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও প্রশাসনিক নিরপেক্ষতার এ বিভাজনকে সুস্পষ্টভাবে রক্ষা করে। যুক্তরাজ্যে, স্বাস্থ্যমন্ত্রী একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হলেও ‘ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস’-এর কার্যকর প্রশাসনিক নেতৃত্ব পেশাদার ও নিরপেক্ষ সিভিল সার্ভেন্টদের হাতে ন্যস্ত। ব্রিটিশ সিভিল সার্ভিস ‘ইমপার্শিয়ালিটি’ বা নিরপেক্ষতার নীতিতে পরিচালিত—অর্থাৎ প্রশাসন সরকারের প্রতি দায়বদ্ধ, কিন্তু দলীয় আনুগত্যে আবদ্ধ নয়। সিঙ্গাপুরে মন্ত্রীরা রাজনৈতিক নেতৃত্ব দেন; কিন্তু পাবলিক সার্ভিস কঠোরভাবে মেধাভিত্তিক ও দলীয় কাঠামো থেকে বিচ্ছিন্ন। প্রশাসনিক সার্ভিস দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, কর্মদক্ষতা ও প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতার ওপর গুরুত্ব দেয়। ফলে রাজনৈতিক পরিবর্তন প্রশাসনিক অস্থিরতায় রূপ নেয় না।
অস্ট্রেলিয়ায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারণ রাজনৈতিক নেতৃত্বের অধীনে হলেও বিভাগীয় সচিব ও প্রশাসনিক নেতৃত্ব পেশাদার পাবলিক সার্ভিস কাঠামোর অধীনে পরিচালিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় উপাচার্য নিয়োগ হয় স্বাধীন বোর্ড ও একাডেমিক মানদণ্ডের ভিত্তিতে; সক্রিয় দলীয় রাজনীতি নির্বাহী পদে অসংগত বলে বিবেচিত। কানাডায় মন্ত্রীরা রাজনৈতিকভাবে দায়বদ্ধ; কিন্তু ডেপুটি মিনিস্টার ও প্রশাসনিক নেতৃত্ব সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ক্যারিয়ার কর্মকর্তা। সিনিয়র সিভিল সার্ভেন্টদের সক্রিয় দলীয় সম্পৃক্ততা কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় নেতৃত্ব নির্বাচন গবেষণা, একাডেমিক অবদান ও প্রশাসনিক সক্ষমতার ভিত্তিতে হয়।
উন্নয়নশীল দেশগুলোর অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। শ্রীলংকা দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও মাতৃস্বাস্থ্য সূচকে দীর্ঘদিন তুলনামূলকভাবে অগ্রগামী। এর পেছনে একটি পেশাদার জনস্বাস্থ্য প্রশাসন এবং টেকসই প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্য কর্মসূচির ধারাবাহিকতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়েও টিকাদান ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম সচল রাখা সম্ভব হয়েছে মূলত প্রশাসনিক কাঠামোর পেশাদারত্বের কারণে।
এ দেশগুলোর অভিজ্ঞতা একটি সাধারণ নীতি নির্দেশ করে: রাজনৈতিক নেতৃত্ব নীতির দিকনির্দেশনা দেয়; পেশাদার প্রশাসন বাস্তবায়ন নিশ্চিত করে। দলীয় রাজনীতি সংসদে স্বাভাবিক, কিন্তু নির্বাহী প্রশাসন ও একাডেমিক কাঠামোয় নয়।
কেন এ বিভাজন অপরিহার্য? প্রথমত, এটি নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করে। মন্ত্রী পরিবর্তন হতে পারেন; কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য পরিকল্পনা—যেমন ক্যান্সার নিয়ন্ত্রণ, মানবসম্পদ উন্নয়ন, হাসপাতাল সম্প্রসারণ—অস্থির হওয়া চলবে না। দ্বিতীয়ত, এটি প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখে। রাজনৈতিক চাপমুক্ত প্রশাসন দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার বাস্তবায়নে সক্ষম হয়। তৃতীয়ত, এটি আন্তর্জাতিক বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ায়। গবেষণা সহযোগিতা, বহুপক্ষীয় অর্থায়ন এবং একাডেমিক র্যাংকিং নির্ভর করে প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা ও মানদণ্ডের ওপর। চতুর্থত, এটি দুর্নীতি ও পক্ষপাত কমায়। দলীয় আনুগত্যভিত্তিক নিয়োগ প্রায়ই পৃষ্ঠপোষকতা সংস্কৃতি তৈরি করে; মেধাভিত্তিক নিয়োগ এ ঝুঁকি কমায়। পঞ্চমত, এটি অবসর-পরবর্তী পৃষ্ঠপোষক নিয়োগের সংস্কৃতি প্রতিরোধ করে। যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশে নিয়মিত নির্বাহী পদে অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের পুনঃনিয়োগ সাধারণ চর্চা নয়।
এখানে বাংলাদেশের জন্য একটি কাঠামো প্রস্তাব করা হলো। স্বাস্থ্যমন্ত্রী রাজনৈতিক প্রতিনিধি বা টেকনোক্র্যাট হিসেবে নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করবেন এবং সংসদের কাছে জবাবদিহি করবেন। তবে প্রশাসনিক ও একাডেমিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত নীতিগুলো অনুসরণ করা একান্তভাবে প্রয়োজন। প্রথমত, নেতৃত্ব নির্বাচন হতে হবে সম্পূর্ণভাবে পেশাগত যোগ্যতা ও সক্ষমতার ভিত্তিতে। দ্বিতীয়ত, প্রার্থী যেন সক্রিয় কোনো দলীয় পদে অধিষ্ঠিত না থাকেন—বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি। তৃতীয়ত, তার সততা, আর্থিক স্বচ্ছতা ও সম্পদ বিবরণী যথাযথভাবে যাচাই করতে হবে। পাশাপাশি গবেষণা-অভিজ্ঞতা ও প্রশাসনিক দক্ষতার নিরপেক্ষ ও প্রমাণভিত্তিক মূল্যায়ন অপরিহার্য। নিয়োগ প্রক্রিয়া হওয়া উচিত নির্দিষ্ট মেয়াদভিত্তিক, যাতে জবাবদিহি ও কর্মদক্ষতা নিশ্চিত করা যায়। নিয়মিত সরকারি পদে অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের রুটিনভিত্তিক পুনর্নিয়োগ পরিহার করা বাঞ্ছনীয়। সর্বোপরি দুর্নীতিতে প্রমাণিত কোনো ব্যক্তি অযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হবেন; আর বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ থাকলেও কঠোর ও স্বচ্ছ যাচাই ছাড়া কাউকে দায়িত্ব দেয়া উচিত নয়।
মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের উপাচার্য, প্রো-ভিসি, অধ্যাপক, পরিচালক এবং বোর্ড সদস্য নিয়োগের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা আবশ্যক। এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ প্রদানের সময় কিছু মৌলিক মানদণ্ড কঠোরভাবে অনুসরণ করা উচিত—ব্যক্তিগত সততা ও নৈতিক দৃঢ়তা, দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ শিক্ষকতা অভিজ্ঞতা, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন গবেষণা প্রকাশনা, স্বীকৃত একাডেমিক অর্জন, কার্যকর প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং সক্রিয় দলীয় রাজনীতির সঙ্গে অসংযুক্ত থাকা। একাডেমিক প্রতিষ্ঠান যদি রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা বা ক্ষমতার দ্বন্দ্বের অঙ্গনে পরিণত হয়, তবে গবেষণার মান অবনমিত হয়, মেধার সঠিক মূল্যায়ন ব্যাহত হয় এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জ্ঞানভিত্তিক বিকাশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রাজনৈতিক নেতৃত্ব গণতন্ত্রের স্বাভাবিক ও বৈধ অংশ। তবে পেশাদার, দক্ষ ও নিরপেক্ষ প্রশাসনই গণতান্ত্রিক পরিপক্বতার প্রকৃত সূচক। এ দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে পারলেই একটি সুস্থ ও টেকসই প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে ওঠে—নীতিনির্ধারণ হবে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায়; বাস্তবায়ন হবে পেশাগত দক্ষতার ভিত্তিতে। দিকনির্দেশনা আসতে পারে দলীয় পরিসর থেকে; কিন্তু প্রতিষ্ঠান থাকবে নিরপেক্ষ, জবাবদিহিমূলক ও মেধাভিত্তিক।
স্বাস্থ্য খাতের সংস্কার তাই কেবল বাজেট বৃদ্ধির প্রশ্ন নয়; এটি শাসন ব্যবস্থার সংস্কৃতি গঠনের প্রশ্ন। যদি রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও প্রশাসনিক নিরপেক্ষতার এ ভারসাম্য সুস্পষ্টভাবে রক্ষা করা যায়, তবে বাংলাদেশ একটি টেকসই, জবাবদিহিমূলক ও জনমুখী স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ভিত্তি নির্মাণ করতে পারবে। গণতান্ত্রিক নির্বাচনের পর এ মুহূর্তে দাঁড়িয়ে সে প্রাতিষ্ঠানিক পরিপক্বতার দিকেই আমাদের অগ্রসর হওয়া উচিত।
ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ: অধ্যাপক, স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়