অভিমত

বীজের ব্যবস্থাপনা ও শর্ত রাষ্ট্রের নাগালে থাকছে না

খাদ্য মানে কী? কার খাদ্য, কীভাবে খাদ্য, কেন খাদ্য, কোথায় খাদ্য, কবে খাদ্য, কিসের জন্য খাদ্য—এ রকম কত শর্ত ও চেহারা হাজির হয় নিত্যদিনের এ নাছোড়বান্দা প্রত্যয়টি ঘিরে। খাদ্য নাছোড়বান্দা বলছি এ কারণেই যে এটিও আমাদের ছাড়তে পারছে না আর আমরাও একে ছাড়তে পারছি না। আমরা হরহামেশাই বলি খাদ্যজগৎ। তো বাংলাদেশের ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলের জনজীবন ও খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থায় খাদ্যের

খাদ্য মানে কী? কার খাদ্য, কীভাবে খাদ্য, কেন খাদ্য, কোথায় খাদ্য, কবে খাদ্য, কিসের জন্য খাদ্য রকম কত শর্ত চেহারা হাজির হয় নিত্যদিনের নাছোড়বান্দা প্রত্যয়টি ঘিরে। খাদ্য নাছোড়বান্দা বলছি কারণেই যে এটিও আমাদের ছাড়তে পারছে না আর আমরাও একে ছাড়তে পারছি না। আমরা হরহামেশাই বলি খাদ্যজগৎ। তো বাংলাদেশের ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলের জনজীবন খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থায় খাদ্যের পরিসর মানেও বৈচিত্র্যময়। জিওফ তানশেও (২০০৮) খাদ্য সম্পর্কিত তার একটি লেখায় বলেছেন, খাদ্য বিতর্কের কোনো চেহারা নেই, দুনিয়াময় এটি এক রকমও নয়। ১৯৯৬ সালের বিশ্ব খাদ্য সম্মেলনে ঘোষণা করা হয়, খাদ্য কোনোভাবেই রাজনৈতিক অর্থনৈতিক চাপ হিসেবে ব্যবহার হতে পারে না। কিন্তু তার পরও সারা দেশে আমরা দেখতে পাই খাদ্যের সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ধর্মীয় সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণ। রলফ কুন্নেমান এপাল-রাটজেন সান্দ্রার (২০০৪) মতে, পর্যাপ্ত খাদ্য বলতে আমরা সাধারণত কোনো ব্যক্তির সামগ্রিক পুষ্টি চাহিদা মেটাতে সক্ষম, যেকোনো ক্ষতিকর উপাদান মুক্ত এবং একটি নির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক চর্চার ভেতর গ্রহণযোগ্য খাদ্যকেই বুঝি। কোনো জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক জীবনে এবং আঞ্চলিক স্বাতন্ত্র্যের ক্ষেত্রে খাদ্যাভ্যাস একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রতিটি জনগোষ্ঠী তার এলাকার সম্পদের সহজলভ্যতা এবং ঐতিহ্যগত প্রয়োজনের সঙ্গে মিলিয়েই খাদ্য উৎপাদন করে। ফলে কোনো এলাকার ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য, জলবায়ু, সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য, ধর্মীয় বিশ্বাস, প্রথাগত জ্ঞান সবকিছুর সঙ্গে ওই এলাকার মানুষের সামগ্রিক পুষ্টি চাহিদা মেটানো পর্যাপ্ত খাদ্যের বিষয়টি সম্পর্কিত। জার্মান দার্শনিক লুডভিগ ফয়েরবাখ (১৮০৪-১৮৭২) বলেছিলেন, মানুষ তাই, যা সে খায়। ইংরেজ নাট্যকার জর্জ বার্নাড (১৮৫৬-১৯৫০) বলেন, খাদ্যের প্রতি প্রেমের মতো বিশ্বস্ত প্রেম আর হয় না। জার্মান-আমেরিকান বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন (১৮৭৯-১৯৫৫) যেমন বলেন, মানবস্বাস্থ্যের জন্য এবং পৃথিবীতে মানব প্রজাতির টিকে থাকার জন্য নিরামিষাশী হওয়ার চেয়ে ভালো আর কিছু হতে পারে না। জাতিসংঘ প্রতি বছরের ১৬ অক্টোবর বিশ্ব খাদ্য দিবস পালন করে। প্রতি বছর এর একটি প্রতিপাদ্য থাকে। করোনাকালে এর প্রতিপাদ্য উৎপাদন, পরিচর্যা স্থায়িত্বশীলতা সবকিছুর সমন্বয় জরুরি। দেশের জনগণের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অবশ্যই সমন্বয় জরুরি।

কিন্তু সচরাচর আমরা যখন খাদ্যের কথা বলি তখন কেবল মানুষের খাদ্য পানীয় নিয়েই কথা বলি। কিন্তু বাংলাদেশের গ্রামীণ নিম্নবর্গ খাদ্য বলতে কেবল মানুষের নয়, গবাদি পশু-পাখিসহ অপরাপর প্রাকৃতিক প্রাণবৈচিত্র্যের খাদ্য প্রসঙ্গটিও যুক্ত করে। তারা মনে করে খাদ্য কেবল একটিমাত্র প্রজাতির ওপর নির্ভর করে না, এর সঙ্গে অপরাপর প্রজাতিও জড়িত। গ্রামীণ নিম্নবর্গ থেকে আমরা খাদ্যের প্রতিবেশগত এবং বাস্তুসংস্থানিক একটা ধারণা পাই। মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের চৈলতাছড়ার খাসি পুঞ্জি থেকে জানা যায়, সহরহং এক ধরনের বুনো ডুমুর। গাছটি খাসি আদিবাসীদের লতানো পান চাষের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। ফল পাকা অবস্থায় মানুষ খেতে পারে। ফলটি গাছে থাকা অবস্থায় পিঁপড়া ছোট পোকামাকড় এর থেকে রস খায়। বনের নিচু স্তরের পাখিরাও ডুমুর খায় এবং পাখিদের মাধ্যমে এর বীজ বিসরণ ঘটে এবং নতুন চারা গজায়। ডুমুর গাছটিও একসময় নানান পতঙ্গের খাদ্যে পরিণত হয় এবং ধীরে ধীরে মরে গিয়ে মাটির সঙ্গে মিশে যায়। মাটি থেকে খাদ্য নিয়ে বেঁচে থাকা মৃত ডুমুর গাছ তখন নিজেই মাটিকে খাদ্য জোগায়। ডুমুরবীজ থেকে গজানো নতুন চারাকে আবার মাটি বড় করে তোলে। এভাবেই এক ডুমুরের সঙ্গে মানুষ, পতঙ্গ, মাটি পাখিদের এক অবিচ্ছেদ্য বাস্তুসংস্থানিক সম্পর্ক রয়েছে। এখন যদি আলাদা আলাদাভাবে শুধু পতঙ্গ বা পাখি বা মাটি বা মানুষের খাদ্যের কথা চিন্তা করা হয়, তবে একসময়ে দেখা যাবে এদের সবাই ডুমুরবিচ্ছিন্ন হতে বাধ্য হবে এবং কারোরই আর খাদ্য সংকুলান হবে না। খাসি জাতির রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন অনেক মাতৃভাষা, খাসিদের ওয়ার ভাষায় জিংবাম মানে খাদ্য। আর খাদ্য বলতে তারা চারপাশের সব সম্পর্ককে কোনো একটি খাদ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত করেই বিবেচনা করেন।

হাওরাঞ্চলে খাদ্যকে খাইদ্য বা খাওনদাওন হিসেবে বলা হয়। মানুষ যা খাইয়া বাঁচে তাই খাদ্য’—বলেছেন অনেকে। বান্দরবানের ম্রো জাতির ভাষায় খাদ্য মানে চাখখমা। ম্রো ভাষ্য অনুযায়ী, খাদ্য মানে যা মানুষসহ অন্যান্য পশুপাখির আহার জোগায়; যা খেলে মৃত্যু ঘটে না, জীবন বাঁচে তা- খাদ্য। যা খেলে কেউ মারা যায়, তাকে খাদ্য না বলে ম্রোরা বলেন চিং মানে বিষ। যা খেলে স্মরণশক্তি বাড়ে, স্বাস্থ্য ভালো থাকে এবং শরীরের শক্তি হয়, তাকেই খাদ্য হিসেবে বোঝে গাইবান্ধার চরাঞ্চলের জনগণ। সুন্দরবনের কোলঘেঁষে সাতক্ষীরার শ্যামনগরের আইলাদুর্গত গাবুরার মানুষরা মনে করে, যা খেয়ে পেট ভরে তা- খাদ্য। খাদ্য জোগাড় করতেই মানুষ দিনরাত পরিশ্রম করে আর খেটে মরে। খাদ্য এমন জিনিস, এটি না হলে জীবন বাঁচানো দায় মনে করে আইলাদুর্গত মানুষরা। বারবার নানান বিপর্যয় পুরোপুরি বদলে দিচ্ছে দিনকে দিন এলাকার খাদ্যপঞ্জিকা ধারণা। অন্যায়, দুর্নীতি আর ঘুষ খেয়ে যারা খাদ্য কিনে, সেই খাবারকে হারাম খাবার আর সৎ ন্যায়ের পথে যে খাবার সংগ্রহ করা হয়, তাকে হালাল খাবার বলে গাবুরার মানুষজন।

অনেকেই বলে থাকেন খাদ্য নাকি এক অব্যর্থ রাজনৈতিক অর্থনৈতিক মারণাস্ত্র। কিন্তু বাংলাদেশের গ্রামীণ নিম্নবর্গের কাছে খাদ্য আপাদমস্তক এক সাংস্কৃতিক নির্মাণ বিনির্মাণও বটে। সুকুমারী ভট্টাচার্য (২০০০) তার বেদের যুগে ক্ষুধা খাদ্য বইতে বেদগ্রন্থের শ্লোকগুলোর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন বৈদিক যুগ থেকে সমাজে খাদ্যাভাব অন্নের সংকট ছিল। ছিল খাদ্যের জন্য প্রার্থনা। প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন, অন্ন যথেষ্ট ছিল না বলেই সে সম্পর্কে নানা কুসংস্কারও দেখা গিয়েছিল সমাজে। এখনো আমরা যেমন চাল না থাকলে সরাসরি তা বলি না, বলি ঘরে চাল বাড়ন্ত। ময়নসিংহ গীতিকায়ও আমরা দেখতে পাই কালা জিরা দিয়ে টিয়া পাখির বেনুন-এর মতো নানান পদের ব্যঞ্জন রান্না-কারিগরি সেখানে উল্লিখিত হয়েছে।

বাংলাদেশের সব অঞ্চলের সব জাতির মানুষ একই ধরনের খাবার গ্রহণ করে না। সিদল শুঁটকি মাগুর মাছ দিয়ে কিংবা সিদল শুঁটকি-আদা-রসুন খাবার সোডা দিয়ে বিশেষ ধরনের রান্নার রেওয়াজ আছে ছিটমহলগুলোয়। দেশের উত্তরাঞ্চলে সিদল এক বিশেষ ধরনের প্রক্রিয়াজাত খাবার। পুঁটিজাতীয় মাছ শুকিয়ে গুঁড়ো করে এর সঙ্গে দেশী কচুর ডাঁটা মিশিয়ে পিষতে হয়, তারপর সেই মণ্ড কয়েক দিন মাটির হাঁড়িতে করে রেখে দিতে হয়। আচারের মতো আঠালো সেই মণ্ড গোল গোল দলা পাকিয়ে সরিষার তেল হলুদ গুঁড়ো মাখিয়ে সংরক্ষণ করা হয়। সিদল আর খাবার সোডা বা কলাগাছের বাকল পুড়ে ছাইয়ের পানি দিয়ে রান্না করা হয় সুলকা-পেলকা নামের খাবার। পার্বত্য চট্টগ্রাম সমুদ্র উপকূলীয় এলাকার আদিবাসীদের ভেতর বহুল প্রচলিত নাপ্পি নামের প্রক্রিয়াজাত শুঁটকির সঙ্গে এর বিশেষ মিল আছে। আবার দেশের মান্দি, হাজং কোচ সমাজে বহুল প্রচলিত নাখাম নামের প্রক্রিয়াজাত শুঁটকির সঙ্গেও কিছুটা গন্ধের মিল আছে উত্তরাঞ্চলের সিদলের। মান্দি জনগণের ঐতিহ্যবাহী রান্না হলো খারি, যেখানে খাবার সোডা বা গাছন্ত ছাইয়ের পানি ব্যবহূত হয়। উত্তরাঞ্চলের সিদল, পার্বত্য চট্টগ্রামের নাপ্পি আর মান্দি সমাজের নাখামের ভেতর রয়েছে খাদ্যের আন্তঃসাংস্কৃতিক সম্পর্ক। মান্দি সমাজের খারি এবং উত্তরাঞ্চলের সুলকা-পেলকা খাবার রান্নায় তেলের পরিবর্তে সোডার ব্যবহার উভয়ের ঐতিহ্যগত খাবারের ভেতর হয়তো খাদ্য প্রত্নতাত্ত্বিক কোনো ইশারাও আছে।

১৯৬০ সালে তথাকথিত সবুজ বিপ্লবের মাধ্যমে চাপিয়ে দেয়া কৃষির আগে আধুনিক প্রত্যয়টি যোগ করা হয়েছিল। বাংলাদেশের গ্রামীণ নিম্নবর্গ যারা দেশের খাদ্যের পুরোটা জোগানই তখনো দিয়ে আসছিল, সেই আধুনিকতা তাদের কাছে অপরিচিত ছিল। মাটির তলার জল যন্ত্র দিয়ে টেনে তুলে, রাসায়নিক সার-বিষে জমিন লণ্ডভণ্ড করে, উচ্চফলনশীল বীজ লাগিয়ে চালু হওয়া কৃষি উৎপাদনই তখন আধুনিক নাম নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। তারপর আমরা কী দেখেছি। জুম থেকে জমিন পুরো কৃষি উৎপাদন আজ বহুজাতিক কোম্পানির কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। কারণ মাটির তলার জল, রাসায়নিক সার, বিষ আর কোম্পানির বীজ ছাড়া আধুনিক কৃষি অচল। সবুজ বিপ্লবের ভেতর দিয়ে দেশের ধান বৈচিত্র্য খুন হয়েছে। মাত্র ১০০ বছরে ধানের জাত ১৮ হাজার থেকে মাত্র একশতে নেমে এসেছে। তাও মাত্র হাতেগোনা কয়েকটি জাতই আবাদ হচ্ছে। নিশ্চিহ্ন হয়েছে ফসলের বৈচিত্র্য, বদলে গেছে রান্নার ধরন খাদ্যগ্রহণের অভ্যাস। উচ্চফলনশীল জাতের পর বন্যার দোহাই দিয়ে ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশে ঢুকে বহুজাতিক কোম্পানির হাইব্রিড বীজ বাণিজ্য। মাত্র ২০ বছরে গ্রামীণ নিম্নবর্গের ঘর বীজশূন্য হয়ে পড়ে। দোকানে বীজ-সার আর বিক্রয়মূল্যের দরবার রেখে গ্রামীণ নিম্নবর্গকেই এখন পর্যন্ত ধরে রাখতে হচ্ছে দেশের খাদ্যজগতের হাল। খাদ্যের বহুজাতিক বদল সবচেয়ে বিপন্ন করেছে নারীকে। খাদ্যের বহুমুখী দরবার থেকে ছিটকে নারী এখন খাদ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাত পরিবেশনের নির্দেশ পালনকারী দাসে পরিণত হয়েছেন। বারবার খাদ্য উৎপাদন কি বণ্টন ব্যবস্থাপনায় খাদ্যের আদি কারিগর গ্রামীণ নিম্নবর্গকে অদৃশ্য করে রাখা হয়েছে। রাষ্ট্রের সব খাদ্যনীতি, আইন উন্নয়ন-মারদাঙ্গার ভেতর। তার পরও দেখা যায় হাল আমলে বিশ্বজুড়ে দেখা দেয়া প্রবল খাদ্য সংকটের সময়েও বাংলাদেশকে এই নিদারুণ যন্ত্রণা সামাল দিতে হয়নি তেমনভাবে। কারণ রক্তাক্ত শরীর নিয়ে গ্রামীণ নিম্নবর্গই মজবুত রেখেছে বাংলাদেশের খাদ্য সংগ্রাম।

খাদ্য ঘিরে এমনতর যন্ত্রণা বাড়ছেই। খাদ্যের ব্যবস্থাপনার মালিকানা শর্ত রাষ্ট্রের নাগালে থাকছে না। দখল করছে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো। খাদ্য আজ জনগণ নয়, এজেন্সির একতরফা নিয়ন্ত্রণে। নয়া উদারবাদী দুনিয়ার এমন এক বহুজাতিক বাজারে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ যখন খাদ্যনিরাপত্তার জন্য আবারো আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ঘোষণা দিয়েছে, এটি ফায়সালা হওয়া জরুরি আওয়াজ কার আওয়াজ? স্পষ্ট হওয়া দরকার আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি বলতে আমরা কী বুঝব? জিন প্রযুক্তি বা প্রাণ প্রযুক্তি। মানে জিন প্রযুক্তিতে বিকৃত খাদ্য ফসল উৎপাদনের প্রযুক্তি। চোখের সামনে তো আমরা দেখলাম প্রযুক্তিতে তৈরি করা বিটি বেগুন বাংলাদেশে স্বীকৃতি দেয়া হলো এবং প্রথম বছর ২০ জন কৃষককে চাষ করতে দিল। কিন্তু পরের বছর দিল আরো অন্য ১০৬ জন কৃষককে। কিন্তু নিদারুণভাবে সেই বিটি বেগুন প্রকল্প ব্যর্থ হলো। বিপদাপন্ন হলো মাটি, বেগুনের বৈচিত্র্য কৃষক পরিবার। রাষ্ট্র আবার গোল্ডেন রাইস, বিটি তুলা, বিটি আলু এমনতর গবেষণাগুলোও করে যাচ্ছে। রাষ্ট্র ভালো করে জানে এসব বিপজ্জনক প্রযুক্তির মালিকানা এবং কর্তৃত্ব কোনোভাবেই বাংলাদেশের নয়, নানা নামের বহুজাতিক কোম্পানির। রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ তো এসব কোম্পানির আগ্রাসন সামাল দিতে পারছে না। বারবার বীজ অন্যায় করেও পার পেয়ে যাচ্ছে কোম্পানিগুলো। বিটি বেগুন গবেষণার নামে দেশের নয়টি দেশী বেগুন জাতকে ছিনিয়ে নিয়েছে মনসান্টো। তাহলে বাংলাদেশ আগামীর খাদ্যজগেক কীভাবে দেখছে। বহুজাতিক কোম্পানি নিয়ন্ত্রিত পরিচালিত বাণিজ্যিক ফসলের চুক্তিবদ্ধ আবাদ হিসেবে? বহুজাতিক কোম্পানির বড় বাণিজ্যিক খামারে কাজ করবে দেশের লাখো কোটি গরিব মানুষ? তৈরি হবে ভবিষ্যতের বিপজ্জনক সব খাবার? ১৯৩৪ সালে দুনিয়ার প্রথম গভীর পানির ধান গবেষণা প্রতিষ্ঠান তৈরি হয় হবিগঞ্জের নাগুড়ায়। ১৮৮৪ সালে বেগুন নিয়ে প্রথম গবেষণা শুরু হয় জামালগঞ্জের চৈতন্য নার্সারিতে। নিদারুণভাবে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণার সেই ঐতিহাসিকতা ধরে রাখতে পারেনি। কৃষি গবেষণা হয়ে গেছে বহুজাতিক কোম্পানির খেলার পুতুল। রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ খাদ্যকে কীভাবে এবং কার চোখে দেখতে চায়? উৎপাদন, মালিকানা, বণ্টন, ব্যবস্থাপনার ধরন দর্শন সবকিছুই। সংবিধান থেকে নীতি, নথি প্রকল্প সবখানেই স্পষ্টতা থাকা জরুরি। কারণ বারবার আধুনিকতার দোহাই দিয়ে গ্রামীণ নিম্নবর্গের ওপর প্রশ্নহীন ঔপনিবেশিকতা চাপানো যাবে না। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় না।

 

পাভেল পার্থ: গবেষক লেখক

আরও