অভিমত

শুধু আইন যথেষ্ট নয় শিশুর সুরক্ষায় সামাজিক অভিভাবকত্ব জরুরি

শিশুদের প্রতি ধারাবাহিক সহিংসতা ও নির্যাতনের চিত্র আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় শিশু অধিকার, বিকাশ ও নিরাপত্তাকে গভীর ও দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।

শিশু স্কুলে বা খেলতে বাড়ি থেকে বের হলে অভিভাবক ধরে নেন, পথ ও আশপাশের মানুষ পরিচিত; শিশুটি নিরাপদেই স্কুল বা খেলা শেষে বাড়ি ফিরবে। কিন্তু সেই পরিচিত পরিবেশের মধ্যেই যদি এমন কোনো ঘটনা ঘটে, যা শিশুর জীবন কেড়ে নেয় অথবা শিশুটি নিখোঁজ বা অপহরণের শিকার হয়, তখন আমাদের প্রশ্ন যদি শুধু ‘অপরাধী কে? কীভাবে ঘটনাটি ঘটল? অপরাধী কখন গ্রেফতার হবে? শিশুটির খোঁজ কখন মিলবে বা কতদিনের মধ্যে বিচার হবে?’—এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে এ ধরনের পরবর্তী ঘটনার জন্য আমাদের বেশিদিন অপেক্ষা করতে হবে না। আমাদের প্রশ্নটি আরো গভীর হওয়া উচিত; দেশে আইন আছে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা রয়েছে, আদালত আছে, শিশু সুরক্ষার জন্য বিশেষ আইন ও প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তার পরও উল্লেখযোগ্য হারে শিশুরা নিখোঁজ, অপহরণ, ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হচ্ছে কেন? আমাদের ব্যর্থতার কারণ কী? জবাবদিহি ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার উপায়ই বা কী? আইন কি একাই শিশু সুরক্ষার জন্য যথেষ্ট? এ অবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় কী? আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ একটি সমাজ আমরা কি নিশ্চিত করতে পারছি, নাকি পারব? সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার প্রয়োজনীয়তা আরো বাড়িয়েছে।

শিশুদের প্রতি ধারাবাহিক সহিংসতা ও নির্যাতনের চিত্র আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় শিশু অধিকার, বিকাশ ও নিরাপত্তাকে গভীর ও দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। শুধু পত্রিকায় প্রকাশিত খবরের ভিত্তিতে শিশুদের প্রতি সহিংসতার চিত্র তুলে ধরা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) প্রতিবেদনের বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত শিশুদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার ঘটনায় ৭০৯ শিশু ভুক্তভোগী হয়েছে। আশঙ্কাজনকভাবে একই সময়ে বিভিন্ন ঘটনায় ২৫৪ শিশুর মৃত্যুর তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে; তাদের মধ্যে ১৩৪ জনের বয়স ১৩ বছরের নিচে। নথিভুক্ত মৃত্যুর ঘটনাগুলোর মধ্যে শারীরিক নির্যাতনের পর মৃত্যু ৬৮ জনের (সর্বোচ্চ একক কারণ), পারিবারিক পরিমণ্ডলে নির্যাতনের পর মৃত্যু ৪৯ জনের, নিখোঁজ শিশুর মৃতদেহ উদ্ধার ৩৬ জনের, ধর্ষণের পর মৃত্যু ২৪ জনের, আত্মহত্যা ৩০ জনের (এর মধ্যে ১৩-১৮ বছর বয়সী ২৫ জন) এবং উদ্ধারকৃত অজ্ঞাতনামা মৃতদেহ ২৩ জনের। শিশুদের প্রতি সহিংসতা ও নির্যাতনের এ সামগ্রিক চিত্র আমাদের ভয়াবহ বার্তা দেয়। আসকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের গত আট মাসে ১৮ বছরের কম বয়সী মেয়েশিশুদের ধর্ষণের সংখ্যা ২৭৭, যেখানে ২০২৫ সালের পুরো বছরে শিশু ধর্ষণের মোট সংখ্যা ছিল ৪৫৬। এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে চলতি বছর শেষে সংখ্যাটি ২০২৫ সালের মোট সংখ্যাকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। আশঙ্কাজনকভাবে শিশুমৃত্যুর ঘটনাগুলোর মধ্যে মাত্র ৩২ শতাংশের ক্ষেত্রে মামলা হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে (৮১টি মামলা); অর্থাৎ প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ঘটনায় মামলা হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি। অপ্রাণঘাতী সহিংসতার ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ঘটনায় মামলা না হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। সামগ্রিক সহিংসতার তথ্যে ৭-১২ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে ২৭৯ জন ভুক্তভোগী হওয়ার তথ্য রয়েছে। এ উপাত্ত প্রাক্‌-কৈশোরে শিশুদের তুলনামূলক দুর্বল প্রতিরোধক্ষমতা এবং প্রাপ্তবয়স্কদের তত্ত্বাবধানের ওপর নির্ভরশীলতা নিয়ে আলোচনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

অপরাধতত্ত্ব ও ভিক্টিমোলজির দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শিশু-কিশোর সমাজের ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীগুলোর অন্যতম। শিশুদের বয়সভিত্তিক ঝুঁকি নিরূপণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে মানসিক অপরিপক্বতা এবং শারীরিকভাবে তুলনামূলক দুর্বল অবস্থান তাদের বিভিন্ন ধরনের অপরাধের শিকার হওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষভাবে সংবেদনশীল করে তুলতে পারে। কিছু পরিস্থিতিতে এসব বৈশিষ্ট্য তাদের অপরাধের সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করতে পারে। এছাড়া তাদের ভাষাগত সীমাবদ্ধতা এবং নির্যাতনের অভিজ্ঞতা প্রকাশের ক্ষেত্রে মানসিক ও সামাজিক দক্ষতার অভাব অপরাধীদের জন্য বাড়তি সুবিধা তৈরি করতে পারে। ভিক্টিমোলজির আলোচনায় এ বিষয়টি ‘টার্গেট ভলনারেবিলিটি’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায়। আর্থসামাজিক বাস্তবতায় একটি নির্দিষ্ট বয়সের পর, বিশেষ করে কিশোর বয়সে, শিক্ষা, ক্রীড়া ও বিনোদনের স্বাধীনতা ও সুযোগ নিশ্চিত করার জন্য শিশুদের প্রাপ্তবয়স্ক বা অভিভাবকের তত্ত্বাবধানের ওপর সম্পূর্ণরূপে নির্ভরশীল রাখা যায় না। ব্যক্তিত্বের বিকাশ কিংবা আত্মনির্ভরশীল হয়ে গড়ে ওঠার জন্যও কিশোরদের অনেক সময় অভিভাবকের তত্ত্বাবধানের বাইরে সমাজে চলাফেরা করতে হয়। ধীরে ধীরে একটি শিশুর পরিবারের বাইরের জগতের সঙ্গে সামাজিক সম্পর্ক গড়ে উঠতে থাকে। সামাজিক ক্ষমতার কাঠামোয় অপেক্ষাকৃত দুর্বল অবস্থানে থাকা একটি শিশু বিভিন্নভাবে শারীরিক নির্যাতন, যৌন নিপীড়ন, অবহেলা, পাচার এবং সাইবার অপরাধের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। পরিবারের বাইরে স্কুল, বন্ধুমহল ও আত্মীয়স্বজনের সংস্পর্শে এসে শিশুর নির্ভরতাভিত্তিক সম্পর্ক তৈরি হতে পারে। এসব সম্পর্ক প্রায়ই সম্ভাব্য অপরাধী বা শিশু-অপব্যবহারকারীদের আস্থা অর্জন ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সুযোগ করে দেয়; এ প্রক্রিয়াকে ‘গ্রুমিং’ বলা হয়। অভিভাবকের তত্ত্বাবধানের বাইরে শিশু-কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উপস্থিতি এ গ্রুমিং প্রক্রিয়াকে আরো সহজ করে তুলতে পারে।

একই সঙ্গে শিশু-কিশোরদের মূল্যবান সামগ্রী ব্যবহারের প্রবণতা কিছু পরিস্থিতিতে তাদের অপরাধের ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। যেমন সম্প্রতি কুমিল্লায় সংঘটিত অপ্রতিমের হত্যাকাণ্ড অপরাধতত্ত্বের আরেকটি দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণের সুযোগ দেয়। কোহেন ও ফেলসনের রুটিন অ্যাক্টিভিটি থিওরি এবং ফেলসন ও ক্লার্কের ভিভা মডেলের আলোকে লক্ষ্যবস্তুর উপযুক্ততা বা আকর্ষণীয়তা ব্যাখ্যা করা যায়। ভিভা মডেলে চারটি উপাদান কোনো ব্যক্তি বা বস্তুকে অপরাধের লক্ষ্যবস্তু হিসেবে আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে। ভ্যালু (মূল্য): আইফোন, অ্যাপল ওয়াচ বা এ ধরনের ব্যয়বহুল গ্যাজেটের উচ্চ পুনর্বিক্রয়মূল্য আর্থিক লাভের উদ্দেশ্যে অপরাধে জড়িত ব্যক্তির কাছে সেগুলোকে আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে। বহনযোগ্যতা: মোবাইল ফোন ছোট, হালকা ও সহজে বহনযোগ্য হওয়ায় ছিনতাইয়ের পর দ্রুত সরিয়ে নেয়া সহজ। দৃশ্যমানতা: প্রকাশ্যে ব্যবহৃত ব্যয়বহুল গ্যাজেট সম্ভাব্য অপরাধীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে এবং শিশুটি সচ্ছল পরিবারের সদস্য—এমন ধারণা তৈরি করতে পারে। সহজলভ্যতা: শিশু একা ও তত্ত্বাবধানহীন অবস্থায় চলাফেরা করলে অপরাধীর পক্ষে তাকে লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বেছে নেয়া সহজ হতে পারে। একই সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি কাঠামোর দুর্বলতাও শিশুদের অপরাধের শিকার হওয়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

নিখোঁজ শিশুর অভিযোগকে যখন লঘু করে দেখা হয়—যেমন ‘রাগ করে চলে গেছে’ বলে পরিবারকে অপেক্ষা করতে বলা হয় কিংবা গুরুতর ঘটনায় মামলা না নিয়ে শুধু সাধারণ ডায়েরি করা হয়—তখন প্রয়োজনের মুহূর্তে শিশুর সুরক্ষা ব্যাহত হয়। নিখোঁজ বা নির্যাতনের ঘটনার পর প্রথম কয়েক ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ সময়ে সাক্ষীর স্মৃতি তুলনামূলকভাবে সতেজ থাকে, সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষণ ও ফরেনসিক আলামত সংগ্রহের সুযোগ থাকে। বিলম্বে পদক্ষেপ নিলে অপরাধী পালানো বা আলামত নষ্ট করার সুযোগ পেতে পারে। তাই নিখোঁজ শিশু ও নির্যাতনের ঘটনাকে জরুরি ও উচ্চ ঝুঁকির বিষয় হিসেবে বিবেচনা করে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে শুধু অপরাধ সংঘটনের পর ব্যবস্থা নেয়ার পরিবর্তে সমন্বিত ও বহুমাত্রিক শিশু সুরক্ষা কৌশল গড়ে তোলাও জরুরি।

আইন আছে, কিন্তু আইন একাই কি যথেষ্ট?

বাংলাদেশে শিশু সুরক্ষায় শিশু আইন, ২০১৩, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনসহ বিভিন্ন আইনি কাঠামো রয়েছে। পুলিশ স্টেশনে শিশুবিষয়ক ডেস্ক ও শিশুবিষয়ক পুলিশ কর্মকর্তার ব্যবস্থাও রয়েছে। বাংলাদেশ জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদে ১৯৯০ সালে স্বাক্ষর ও অনুসমর্থন করেছে। কিন্তু আইন থাকা আর শিশুর বাস্তব নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়া এক বিষয় নয়। আইনের কার্যকারিতা নির্ভর করে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, দক্ষ জনবল, জবাবদিহি, সামাজিক সহযোগিতা, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা ও দ্রুত পদক্ষেপের ওপর।

আইন সাধারণত অপরাধ সংঘটনের পর অপরাধী শনাক্ত, গ্রেফতার ও বিচারের ব্যবস্থা করে। কিন্তু ফরেনসিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তার সীমাবদ্ধতা, শিশুবান্ধব প্রশিক্ষণের অভাব এবং দ্রুত ও সংবেদনশীল সাড়া দেয়ার যথাযথ মূল্যায়ন না থাকায় প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা তৈরি হয়। ফলে আলোচিত মামলায় দ্রুত অগ্রগতি হলেও দরিদ্র ও প্রান্তিক পরিবারের কম আলোচিত মামলাগুলো পিছিয়ে পড়তে পারে।

অপরাধবিজ্ঞানের গবেষণায় দেখা যায়, শাস্তির কঠোরতার চেয়ে অপরাধ করে ধরা পড়া ও শাস্তি পাওয়ার নিশ্চয়তা অপরাধ প্রতিরোধে বেশি কার্যকর। তদন্ত ও বিচার বিলম্বিত হলে অপরাধীর মধ্যে দায়মুক্তির ধারণা তৈরি হতে পারে; অন্যদিকে ভুক্তভোগীর পরিবার অভিযোগ করতে নিরুৎসাহিত হতে পারে। এতে অপরাধের প্রকৃত চিত্র আড়ালে থেকে যায়। এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রয়োজন নিখোঁজ শিশুর ঘটনায় অপেক্ষা না করে তাৎক্ষণিক সাড়ার প্রটোকল, গুরুতর ঘটনায় যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ, প্রতিটি থানায় প্রশিক্ষিত শিশুবিষয়ক পুলিশ কর্মকর্তা নিয়োগ, তদন্তকারীদের কাজের চাপ যৌক্তিক পর্যায়ে রাখা এবং পদক্ষেপ নিতে কত সময় লাগছে, সে বিষয়ে স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ। এতে জনরোষের পরিবর্তে তথ্যের ভিত্তিতে জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

অপরাধবিজ্ঞান আমাদের আরো একটি প্রশ্ন করতে শেখায়: অপরাধ সংঘটনের আগেই কীভাবে তার সুযোগ কমানো যায় এবং সম্ভাব্য ভুক্তভোগীকে সুরক্ষিত রাখা যায়? একটি শিশু যখন একা রাস্তায় হাঁটে, স্কুলে যায়, আত্মীয়ের বাড়িতে যায়, বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটায় কিংবা অনলাইনে যোগাযোগ করে, তখন তার নিরাপত্তার দায়িত্ব শুধু পুলিশের ওপর থাকে না। এজন্য প্রয়োজন পরিবার, বিদ্যালয় ও সমাজের সচেতন ও দায়িত্বশীল ভূমিকা। শিশু সুরক্ষায় পরিবার ও সমাজকে প্রাথমিক ভূমিকা পালন করতে হবে, বিদ্যালয় ও কমিউনিটিকে সহযোগিতা করতে হবে এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। যেকোনো একটি স্তরে দুর্বলতা থাকলে ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই পুলিশের দ্রুত ও সংবেদনশীল পদক্ষেপের পাশাপাশি পরিবার ও সমাজের সচেতন, বিশ্বাসভিত্তিক তত্ত্বাবধান জরুরি।

অপরাধের পর শাস্তি—কিন্তু অপরাধের আগে প্রতিরোধ কোথায়?

কোনো শিশু ধর্ষণ, অপহরণ বা হত্যার শিকার হলে জনমনে ক্ষোভ তৈরি হয়। অপরাধ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি। তবে অপরাধবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে এখানেই প্রশ্ন শেষ হয় না। জানতে হবে অপরাধের সুযোগ তৈরি হলো কীভাবে, কেউ আগে অস্বাভাবিক আচরণ লক্ষ করেছিলেন কিনা, শিশুটি কোনো অভিযোগ করেছিল কিনা, ঘটনাস্থল বা প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তার ঘাটতি ছিল কিনা এবং কোনো পর্যায়ে দায়িত্বশীল কেউ হস্তক্ষেপ করতে পারতেন কিনা। এসব প্রশ্ন অপরাধীকে দায়মুক্ত করার জন্য নয়, ভবিষ্যতে অপরাধ প্রতিরোধের উপায় খুঁজতে গুরুত্বপূর্ণ। অপরাধের তদন্তে কী ঘটেছে, তা জানা যায়; পাশাপাশি অপরাধ সংঘটনের সুযোগ কেন তৈরি হয়েছিল, তা বোঝারও চেষ্টা করা প্রয়োজন।

অপরাধবিজ্ঞানের রুটিন অ্যাক্টিভিটি থিওরি অনুযায়ী, অপরাধ সংঘটনের সম্ভাবনা বাড়ে যখন একই সময়ে তিনটি বিষয় উপস্থিত থাকে—অপরাধে আগ্রহী ব্যক্তি, উপযুক্ত লক্ষ্যবস্তু এবং কার্যকর নজরদারি বা সুরক্ষার অভাব। শিশু সুরক্ষায় শেষের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এখানে ‘নজরদারি’ বলতে শুধু পুলিশকে বোঝায় না। অভিভাবক, শিক্ষক, প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন, দোকানদার, বাসচালক, রিকশাচালক, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি কিংবা দায়িত্বশীল অন্য কোনো নাগরিক পরিস্থিতিভেদে শিশুর সুরক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারেন। শিশু যৌন নির্যাতনবিষয়ক গবেষণাতেও সম্ভাব্য ঝুঁকির পরিস্থিতিতে সচেতন ও দায়িত্বশীল প্রাপ্তবয়স্কের উপস্থিতির গুরুত্ব উঠে এসেছে। অর্থাৎ শুধু পুলিশের সংখ্যা বা কার্যকারিতা বাড়ানো যথেষ্ট নয়; সমাজে দায়িত্বশীল উপস্থিতি ও কার্যকর নজরদারি গড়ে তোলাও অপরাধ প্রতিরোধের অংশ।

অভিভাবকের দায়িত্ব: শুধু পাহারা নয়, দোষারোপ নয়, দরকার সক্রিয় সচেতনতা

শিশু সুরক্ষার প্রথম প্রতিষ্ঠান পরিবার। তবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানে সারাক্ষণ শিশুর পেছনে একজন প্রাপ্তবয়স্ককে রাখা নয়; প্রয়োজন সচেতন ও প্রতিরোধমূলক অভিভাবকত্ব। বাবা-মাকে সন্তানের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলতে হবে, তাকে সময় দিতে হবে এবং জানতে হবে সে কোথায় যায়, কার সঙ্গে মেশে, কার কাছে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে, কেউ তাকে ভয় দেখায় কিনা বা কোনো কিছু গোপন রাখতে বলে কিনা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভার্চুয়াল গেম ও অ্যাপে তার যোগাযোগের ধরন সম্পর্কেও সচেতন থাকা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের অধিকাংশ পরিবার শিশুকে শেখায়, ‘অপরিচিত মানুষের সঙ্গে কথা বলবে না বা কারো দেয়া কিছু খাবে না।’ এটি প্রয়োজনীয় শিক্ষা, কিন্তু যথেষ্ট নয়। কারণ শিশু সব সময় অপরিচিত ব্যক্তির দ্বারাই নির্যাতনের শিকার হয় না। অভিযুক্ত ব্যক্তি শিশুর পরিচিত, আত্মীয়, প্রতিবেশী, শিক্ষক কিংবা পরিবারের পরিচিত কেউও হতে পারেন। জামালপুরে সহপাঠীর বাবার বিরুদ্ধে প্রথম শ্রেণীর শিক্ষার্থী মরিয়ামকে (৭) ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগের ঘটনাটি এ ঝুঁকির কথা মনে করিয়ে দেয়।

তাই শিশুকে শুধু অপরিচিত মানুষের কাছ থেকে সতর্ক থাকতে শেখালেই হবে না। তাকে বোঝাতে হবে, পরিচিত হলেও কারো তার শরীরের ওপর অধিকার নেই। শরীরের স্পর্শকাতর অঙ্গ, ভালো ও খারাপ স্পর্শ, অস্বস্তিকর স্পর্শে ‘না’ বলার অধিকার এবং ভয় বা অস্বস্তিকর ঘটনার কথা বিশ্বস্ত প্রাপ্তবয়স্ককে জানানোর গুরুত্ব শেখাতে হবে। একজনকে জানিয়ে সাড়া না পেলে অন্য বিশ্বস্ত প্রাপ্তবয়স্ককে জানানোর বিষয়টিও বোঝানো প্রয়োজন। পাশাপাশি স্কুলে যাতায়াতের নিরাপদ পথ এবং অনলাইনে অপরিচিত বা সন্দেহজনক যোগাযোগের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। শিশু যেন কোনো নেতিবাচক অভিজ্ঞতার কথা অভিভাবককে নির্ভয়ে জানাতে পারে, সেই পরিবেশও নিশ্চিত করা জরুরি।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো শিশু কোনো ঘটনা জানালে তাকে প্রথমেই দোষারোপ করা যাবে না। ‘তুমি সেখানে গেলে কেন?’ ‘তার সঙ্গে কথা বললে কেন?’ কিংবা ‘আগে জানাওনি কেন?’—এ ধরনের প্রশ্ন শিশুকে ভবিষ্যতে নীরব করে দিতে পারে। শিশুর বিশ্বাস, সরলতা বা নির্ভরশীলতা কোনোভাবেই অপরাধীর দায় কমায় না। ভিক্টিমোলজি বা ভুক্তভোগীবিষয়ক অধ্যয়নের আলোকে বলা যায়, শিশুদের শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক নির্ভরশীলতা তাদের ঝুঁকির ধরনকে প্রাপ্তবয়স্কদের থেকে আলাদা করে। তাই ‘শিশুটি কেন সেখানে ছিল?’—এ প্রশ্নের পরিবর্তে জানতে হবে, ‘একজন প্রাপ্তবয়স্ক কীভাবে শিশুটির দুর্বলতাকে কাজে লাগানোর সুযোগ পেলেন?’

শিশুর প্রতি সম্মান, তার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং ব্যক্তিগত সীমারেখাকে স্বীকৃতি দেয়া—সবই নিরাপত্তা শিক্ষার অংশ। অভিভাবকের দায়িত্ব হলো শিশুর কথা বিশ্বাসের সঙ্গে শোনা, তার পরিবেশ নিরাপদ করা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা।

শুধু পরিবার নয়, সামাজিক শিশু সুরক্ষায় সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে

একজন শিশুকে পরিবারের বাইরে শিক্ষা, ক্রীড়া, বিনোদন ও সামাজিকতা শিক্ষার প্রয়োজনে পরিবারের বাইরেও বিচরণ করতে হয়। পরিবারের বাইরে শিশু সুরক্ষার সমাধান কী? সমাধান হলো বহুমাত্রিক সামাজিক শিশু সুরক্ষার সংস্কৃতি গড়ে তোলা। শিশু সুরক্ষার সংস্কৃতি সামাজিকভাবে এমনভাবে গড়ে উঠতে পারে, যেখানে: শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জানে কোন শিশুকে কে বিদ্যালয়ে নিয়ে যায়; অভিভাবকরা পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন; প্রতিবেশীরা সন্দেহজনক আচরণ লক্ষ করলে তা গুরুত্ব দেন; স্থানীয় দোকানদার ও পরিবহনকর্মীরা শিশু সুরক্ষার বিষয়ে সচেতন থাকেন; স্থানীয় সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো শিশু সুরক্ষা নিয়ে নিয়মিত আলোচনা করে; শিক্ষকরা শিশু নির্যাতন ও শোষণের লক্ষণ শনাক্ত করার প্রশিক্ষণ পান; শিশুরা জানে কোথায়, কার কাছে, কীভাবে অভিযোগ করতে হবে। বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অন্তত তিনটি প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর থাকা উচিত: ১. শিশুকে কে নিরাপদ রাখবে? ২. শিশু বিপদে পড়লে কাকে জানাবে? ৩. অভিযোগ পাওয়ার পর কী ব্যবস্থা নিতে হবে? অভিযোগকে ‘পারিবারিক বিষয়’ বলে চাপা দেয়া বা অনানুষ্ঠানিকভাবে মীমাংসা করা শিশুর নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। অর্থাৎ শিশুর নিরাপত্তার জন্য সমাজকে শুধু দর্শক হয়ে থাকলে চলবে না বা ভুক্তভোগী হওয়ার পর প্রতিক্রিয়া জানালে হবে না, একটি সামাজিক অভিভাবকত্ব সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।

পরিশেষে অপরাধবিজ্ঞানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো অপরাধ প্রতিরোধ শুরু করতে হবে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আগেই। বাংলাদেশের প্রয়োজন শুধু কঠোর আইন নয়, প্রয়োজন কার্যকর প্রয়োগ, অপরাধীর দ্রুত শাস্তির দৃষ্টান্ত, প্রয়োজন কার্যকর ও দায়িত্বশীল সামাজিক শিশু সুরক্ষা সংস্কৃতি। প্রয়োজন এমন অভিভাবকত্ব, যারা সন্তানের কথা শোনেন, সন্তানের দৈনন্দিন চলাফেরা ও জীবনাচরণ পর্যবেক্ষণ করেন এবং তাকে নিরাপদ থাকার শিক্ষা দেন। প্রয়োজন এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যেখানে নিরাপত্তা শিক্ষা অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রয়োজন এমন প্রতিবেশী, যারা দায়িত্বশীল এবং বিপদের সংকেত দেখলে নীরব থাকেন না। প্রয়োজন এমন প্রতিষ্ঠান, যেখানে অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে নেয়া হয় এবং প্রতিক্রিয়া জানানো হয়। এবং প্রয়োজন এমন একটি সামাজিক সংস্কৃতি, যেখানে প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক মনে করেন, ‘এ শিশুটির সুরক্ষায় শুধু তার পরিবারের নয়; এ শিশুটির নিরাপত্তার জন্য আমিও দায়বদ্ধ।’ কারণ একটি নিরাপদ সমাজের প্রকৃত সাফল্য শুধু এই নয় যে অপরাধ সংঘটনের পর অপরাধী কত দ্রুত শাস্তি পেল। তার চেয়েও বড় সাফল্য হলো একটি শিশুকে অপরাধের শিকার হওয়ার আগেই আমরা কতটা কার্যকরভাবে রক্ষা করতে পেরেছি, কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পেরেছি।

আওরঙ্গজেব আকন্দ: সহযোগী অধ্যাপক, ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগ, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

আরও