সড়কে মৃত্যুর মিছিল

নিরাপদ সড়ক আন্দোলন আশানুরূপ ফল দিতে ব্যর্থ হলো?

সড়কপথে মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নেই। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য বলছে, ঈদের আগে ও পরে ১০ দিনে ৩৪২টি সড়ক ‘দুর্ঘটনায়’ ২৭৪ জন নিহত হয়।

ঈদের পরই রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে পদ্মা নদীতে বাস পড়ে মারা যান ২৬-এর বেশি যাত্রী। সড়কপথে মৃত্যু যেন চিরাচরিত নিয়তি। তথ্য বলছে, গত ছয় বছরে সড়কপথে প্রাণ হারিয়েছে ৩৭ হাজারের বেশি মানুষ। এ পথে প্রতিদিন গড়ে মারা যায় ১৪ জন। শুধু বেপরোয়া গতির ড্রাইভিংই প্রধান কারণ নয়। প্রায় ছয় লাখ যানবাহনের নেই হালনাগাদ ফিটনেস সনদ। বিপুলসংখ্যক চালকের যথাযথ ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই। ভুয়া ড্রাইভিং লাইসেন্সের ছড়াছড়ি। ড্রাইভিংয়ের নেই পর্যাপ্ত প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ। আনফিট গাড়ির তদারকি নেই। তদারকি হলেও ঘুস লেনদেনে সব বৈধ হয়ে যায়!

এককথায় নিয়মনীতির বালাই নেই। ফলে সড়কপথে নৈরাজ্য স্বাভাবিক রীতিতে পরিণত হয়েছে। এভাবেই কি সড়ক পরিবহনে নৈরাজ্য চলতেই থাকবে? আমরা কি প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো নিয়তি মনে করে সব হত্যা মেনে নেব? সেই ২০১৮ সালের ২৯ জুলাই যখন নিরাপদ সড়ক আন্দোলন তুঙ্গে, তখন এ দেশের জনগণ আশায় বুক বেঁধেছিল। ছাত্রদের নয় দফা দাবি মেনে নিয়ে তৎকালীন সরকার সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ সংসদে পাস করে। দাবি মেনে আইন পাসের পরিপ্রেক্ষিতে ধারণা করা হয়েছিল, সড়কপথে হত্যা ও দুর্ঘটনা কমে আসবে; পরিবহন সেক্টরের অপরাধীরা শাস্তি পাবে; ড্রাইভারের বেপরোয়া গাড়ি চালানো বন্ধ হবে; সড়ক দুর্ঘটনায় দায়ী চালক ও সংশ্লিষ্টদের দ্রুত বিচার হবে; ফিটনেসবিহীন ও মেয়াদোত্তীর্ণ গাড়ি চলাচল বন্ধ হবে; এমনকি সড়কপথে জবাবদিহি বাড়বে। এতে পরিবহন সেক্টরে শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা ফিরে আসবে।

অথচ নিরাপদ সড়ক আন্দোলন এবং সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ পাসের সাত বছর অতিবাহিত হলেও সড়কপথ আরো বেশি অনিরাপদ হয়ে উঠেছে। ২০১৮ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে নিম্নমুখী হলেও ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সময়কে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। কারণ এ সময়ে প্রতি বছর নিহতের সংখ্যা ছিল সাত হাজারের বেশি (সূত্র: রোড সেফটি ফাউন্ডেশন)। ২০১৯ ও ২০২০ সালে হতাহতের সংখ্যা কমে যাওয়ার কারণ ছিল নিরাপদ সড়ক আন্দোলন—এ কথা আমরা বলতে পারি না। কারণ এ সময় ছিল কভিড মহামারীর সময়। কভিড ঝুঁকি কমে গেলে পরিবহন ব্যবস্থা স্বাভাবিক হয়। ‘স্বাভাবিক’ পরিবহন ব্যবস্থাই অস্বাভাবিক সড়ক দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এর মানে নিরাপদ সড়ক আন্দোলন আশানুরূপ ফল দিতে ব্যর্থ হয়েছে। এর অন্যতম কারণ নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের গর্ভ থেকে প্রসূত সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ বাস্তবায়নে ব্যর্থতা। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও এ আইনের বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি।

সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ কীভাবে ব্যর্থ হলো? কেন তা অকার্যকর? মূলত পরিবহনের মালিক-শ্রমিক সংগঠন এ আইনের বাস্তবায়ন চায় না। আইন পাসের সময় থেকে তারা সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮-এর বিরোধিতা করে আসছে। শুরু থেকেই পরিবহন মালিক-শ্রমিক নেতারা ‘সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮-তে জামিন অযোগ্য ধারা, সাজার মেয়াদ ও জরিমানার পরিমাণ বিষয়ে সংশোধনের দাবি জানায়। আইনের ধারা ১০৫ অনুযায়ী, যদি কোনো চালক অবহেলা, বেপরোয়া বা বিপজ্জনকভাবে মোটরযান চালানোর ফলে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটিয়ে গুরুতর আঘাত বা মৃত্যু ঘটান, তাহলে তা একটি গুরুতর তথাপি জামিন অযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে।

এছাড়া ধারা ১০০ অনুযায়ী জাল লাইসেন্স তৈরি করা এবং ধারা ৭৩ অনুযায়ী গাড়ির ভুয়া নিবন্ধন নম্বর বা নম্বর প্লেট ব্যবহার করা গুরুতর বা জামিন অযোগ্য শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে সাব্যস্ত করা হয়। এসব ধারাকে জামিন অযোগ্য আর সাধারণ অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হলে পরিবহন সেক্টরে নৈরাজ্য থাকাই স্বাভাবিক। আমাদের আপত্তিও এ আইন কাঠামোর মধ্যে। যে আইনে ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালানো জামিনযোগ্য অপরাধ (ধারা ৪, শাস্তি: ধারা ১০২), নিবন্ধন ছাড়া গাড়ি চালানো জামিনযোগ্য অপরাধ (ধারা ১৬, শাস্তি: ধারা ৭২) এবং ফিটনেস ছাড়া গাড়ি চালানোও জামিনযোগ্য অপরাধ (ধারা ২৫, শাস্তি: ধারা ৭৫)—সেসব ধারা মৃত্যুকেই লাইসেন্স দিয়ে দেয়।

প্রশ্ন হলো, যে দেশে ফেক ড্রাইভিং লাইসেন্সের ছড়াছড়ি, যে দেশে ছয় লাখের বেশি গাড়ির ফিটনেস নেই, সেই দেশে যদি এসব অপরাধকে জামিনযোগ্য করা হয় আর শাস্তির বিধান রাখা হয় ছয় মাসের জেল অথবা ২৫ হাজার বা ৫০ হাজার টাকা—সেই দেশে সড়ক কী করে নৈরাজ্যমুক্ত হবে? অথচ এ সামান্য বিধানও কার্যকর করা হচ্ছে না। আইনে বলা আছে, বেপরোয়া বা অবহেলাজনিত মোটরযান চালনার কারণে সংঘটিত দুর্ঘটনায় কোনো ব্যক্তি গুরুতর আহত হলে বা প্রাণহানি ঘটলে অনধিক পাঁচ বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয়দণ্ডে দণ্ডিত হবে। পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনের বড় আপত্তি এ বিধানে। আপত্তি এজন্য যে এ রকম প্রাণহানি ঘটবে আর তা মেনে নিতে হবে, সেখানে শাস্তির বিধান কেন থাকবে! এর মানে, ড্রাইভিং সিস্টেম যতই ভয়ংকর হোক না কেন, তারা চায় দায়মুক্তি। কেন তারা এ দায়মুক্তি চায় তা দেখতে হবে। এর মূলে রয়েছে সস্তায় পরিবহন ব্যবসা অব্যাহত রাখা। পরিবহন ব্যবসার বড় অংশ এ দেশের রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় পরিচালিত হয়। অনেক পরিবহন ব্যবসায়ী রাজনীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত। রাজনৈতিক প্রভাবকে পুঁজি করে তারা সস্তায় বড় অংকের মুনাফা হাতিয়ে নেয়। রাজনৈতিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে তারা সড়ক পরিবহন আইন কাঠামোকে অমান্য করছে। তাদের এ কাজে ফুয়েল দিচ্ছে সরকারি প্রশাসন।

বিআরটিএ নামে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এ প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদান ও নবায়ন, মোটরযান রেজিস্ট্রেশন ও নম্বর প্লেট প্রদান, যানবাহনের ফিটনেস সনদ প্রদান এবং সড়ক পরিবহন আইন বাস্তবায়ন ও নিয়ন্ত্রণ করা। বিআরটিএতে উচ্চপর্যায়ের পরিচালনা বিভাগ ছাড়াও রয়েছে মাঠপর্যায়ের মোটরযান পরিদর্শক, সার্জেন্ট/ইন্সপেক্টর, লাইসেন্সিং অথরিটি ও ড্রাইভিং টেস্ট এক্সামিনার। এসব পদে দায়িত্বরত কর্মকর্তারা যদি স্বচ্ছতার সঙ্গে ড্রাইভিং লাইসেন্স, মোটরযান রেজিস্ট্রেশন ও নম্বর প্লেট প্রদান ও যানবাহনের ফিটনেস সনদ প্রদান করতেন, তাহলে সড়কপথ এতটা অনিরাপদ হতো না। ঘুসের লেনদেন এ প্রতিষ্ঠানের রীতিনীতি। বাংলাদেশ পুলিশ বিভাগের দায়িত্ব যান চলাচল ব্যবস্থাপনা, ট্রাফিক আইন প্রয়োগ ও নিয়ন্ত্রণ, সড়ক দুর্ঘটনা তদন্ত ও আইন ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের মধ্য দিয়ে বিআরটিএকে সহযোগিতা করা।

বিআরটিএ যদি দুর্নীতিগ্রস্ত হয়, পুলিশ বিভাগও যদি কাঁচা টাকার বিনিময়ে সব অনিয়মকে বৈধতা দেয়, তাহলে মালিক-শ্রমিক সংগঠনকে দায়ী করে কি লাভ? পরিবহন মালিক-শ্রমিককে তো দায়মুক্তি দিচ্ছে বিআরটিএ। বিআরটিএ আর পুলিশ বিভাগের মধ্যে সংস্কার আনতে না পারলে সড়কে মৃত্যুর মিছিলই দেখতে হবে আমাদের। বর্তমান সরকারের স্লোগান ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। এ স্লোগান ধরে কাজ করতে হলে সবার আগে বাংলাদেশে জনগণের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করে, মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়ে পরিবহন মালিকের মুনাফার পথ প্রশস্ত করা রাজনীতি নয়। রাজনীতি হলো অপরাধীদের শাস্তির বিধান কার্যকর করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়া। সেজন্য বিআরটিএকে জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি।

সরকারি প্রতিষ্ঠানের মতো জনগুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহির বাইরে রাখার পরিণতিতে আজকে দেশের এ অবস্থা। বিআরটিএ ও পুলিশ বিভাগে জবাবদিহিমূলক সংস্কার আনা সরকারের দায়িত্ব। এ দুই প্রতিষ্ঠান স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ করলে ড্রাইভিংয়ের মান, মোটরযানের মান, এমনকি পরিবহন ব্যবস্থাপনার মান উন্নত হবে। বিআরটিএ আর অনলাইন পোর্টালে তাদের সব কাজের বিবরণী থাকবে। তাদের কাছে পরিপূর্ণ ডেটা বেজ থাকবে। সেই ডেটা উন্মুক্ত থাকবে। কেউ যেন ভুয়া লাইসেন্স করতে না পারে, কেউ যেন ভুয়া নিবন্ধন করতে না পারে, তা তথ্য ও তদারকির মধ্য দিয়ে নিশ্চিত করতে হবে। ঘুস লেনদেনের পথ বন্ধ করতে সরকারকে দ্রুত উদ্যোগ নিতে হবে। গোয়েন্দা বিভাগকে কাজে লাগাতে হবে। অপরাধীদের শাস্তি দিতে হবে। এর মানে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক উদ্যোগের মধ্য দিয়ে সড়কপথে জননিরাপত্তা সম্ভব।

ড. আশেক মাহমুদ: সহযোগী অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

আরও