ক্ষমতা, সত্য ও বৈধতার প্রশ্ন

শেখ হাসিনার পতন যে কারণে অনিবার্য হয়ে পড়েছিল

রাজনৈতিক দর্শনের প্রাচীনতম পাঠগুলোর একটা হলো, ক্ষমতা ও বৈধতা—এই দুটো সমার্থক নয়। ক্ষমতা হলো বাধ্য করার সামর্থ্য; বৈধতা হলো বাধ্য না করেই মান্য হওয়ার যোগ্যতা। রুশো থেকে ম্যাক্স ওয়েবার পর্যন্ত এ পার্থক্যটা বারবার উচ্চারিত করেছেন। তারা বলেছেন, শক্তি কখনো নিজে থেকে অধিকার তৈরি করে না। বল প্রয়োগে আনুগত্য আদায় করা যায়, কিন্তু কর্তব্যবোধ তৈরি করা যায় না। দীর্ঘস্থায়ী শাসনের সবচেয়ে বড় বিভ্রম হলো এই দুইয়ের একীভবন, নিয়ন্ত্রণকে সম্মতি বলে ভুল করা

ইতিহাসে কিছু তারিখ থাকে যেগুলো ঘটনার চেয়ে বড়। ৫ আগস্ট ২০২৪ তেমনই একটা দিন। ওই দিন একটা সরকারের পতন হয়েছিল, কিন্তু যা ভেঙে পড়েছিল তা কেবল একটা মন্ত্রিসভা বা একজন স্বৈরশাসকের কর্তৃত্ব না; ভেঙে পড়েছিল, রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ থাকলেই শাসন নিরাপদ, এই ধারণাটা। প্রশ্নটা তাই ঘটনাক্রমের না, দর্শনের। কীভাবে এমন একটা সরকার, যা দেড় দশক ধরে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বিচারব্যবস্থা, নির্বাচন কমিশন ও সংবাদমাধ্যমের ওপর সম্ভবত স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের সবচেয়ে বিস্তৃত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল, কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এমন অবস্থায় পৌঁছাল যেখানে সেই নিয়ন্ত্রণ তাকে কিছুতেই আর রক্ষা করতে পারল না? সহজ উত্তরগুলো, দ্রব্যমূল্য, দুর্নীতি, বিতর্কিত নির্বাচন, কোটা সংস্কার আন্দোলন, সবই সত্য, কিন্তু কোনোটিই এর জন্য যথেষ্ট না। এসবের প্রতিটা আগেও তো ছিল। যা নতুন ছিল তা হলো একটা নৈতিক দূরত্ব, যা এক পর্যায়ে অতিক্রম করা পুরোপুরি অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

ক্ষমতা ও বৈধতা এক জিনিস নয়

রাজনৈতিক দর্শনের প্রাচীনতম পাঠগুলোর একটা হলো, ক্ষমতা ও বৈধতা—এই দুটো সমার্থক নয়। ক্ষমতা হলো বাধ্য করার সামর্থ্য; বৈধতা হলো বাধ্য না করেই মান্য হওয়ার যোগ্যতা। রুশো থেকে ম্যাক্স ওয়েবার পর্যন্ত এ পার্থক্যটা বারবার উচ্চারিত করেছেন। তারা বলেছেন, শক্তি কখনো নিজে থেকে অধিকার তৈরি করে না। বল প্রয়োগে আনুগত্য আদায় করা যায়, কিন্তু কর্তব্যবোধ তৈরি করা যায় না। দীর্ঘস্থায়ী শাসনের সবচেয়ে বড় বিভ্রম হলো এই দুইয়ের একীভবন, নিয়ন্ত্রণকে সম্মতি বলে ভুল করা। প্রতিটা নির্বাচন যখন পূর্বনির্ধারিত ফলাফলে পৌঁছায়, প্রতিটা প্রতিষ্ঠান যখন সম্মতিসূচক প্রতিবেদন দেয়, প্রতিটা মিছিল যখন সরকারি ছত্রছায়ায় সংগঠিত হয়, তখন শাসকের কাছে সম্মতির চিহ্নগুলো অক্ষুণ্ন থাকে, শুধু সম্মতিটাই থাকে না। বৈধতা তখন একটা খালি আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়: বাইরে অটুট, ভেতরে ফাঁপা। এমন কাঠামো কেবল ভাঙে না, ধসে পড়ে। কারণ তাতে ফাটল ধরার কোনো প্রক্রিয়া নাই; আছে শুধু একটা বিন্দু, যেখানে ভয়ের অর্থনীতি হঠাৎ উল্টে যায়। জুলাই ২০২৪ এ ঠিক তা-ই ঘটেছিল। ছাত্রদের ওপর গুলি, রাষ্ট্রীয় ভাষার তাচ্ছিল্য, এবং মৃত্যুর সংখ্যা যখন অস্বীকার করা অসম্ভব হয়ে উঠল, জাতিসংঘ মানবাধিকার দপ্তরের পরবর্তী প্রতিবেদন অনুযায়ী নিহতের সংখ্যা ১ হাজার ৪০০ ছুঁতে পারে, তখন ভয় আর নিয়ন্ত্রণের উপকরণ থাকল না; ভয়ই হয়ে উঠল সরকারের বিরুদ্ধে প্রধান প্রতিরোধ।

জ্ঞানগত অন্ধত্ব

এ কারণটা আরও গভীর এবং আমার বিবেচনায় সবচেয়ে কম আলোচিত। কর্তৃত্ববাদী প্রবণতার সবচেয়ে বড় শাস্তি জনগণ না, শাসক নিজেই ভোগ করে তথ্যের বিকৃতির মাধ্যমে। যখন সমালোচনাকে ষড়যন্ত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, তখন সৎ প্রতিবেদন লেখা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। যখন গবেষণা রাষ্ট্রীয় আখ্যানের অনুমোদনসাপেক্ষ হয়, তখন গবেষক প্রশ্ন বদলে ফেলেন। যখন আমলার পদোন্নতি নির্ভর করে সুসংবাদ পরিবেশনের ওপর, তখন দুঃসংবাদ ওপরে পৌঁছায় না। ফলে রাষ্ট্র ক্রমশ এমন এক তথ্যজগতে বাস করতে শুরু করে যা সে নিজেই নির্মাণ করেছে। এটা নৈতিক ব্যর্থতার আগে জ্ঞানতাত্ত্বিক ব্যর্থতা। মিলের যুক্তি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কেবল ভিন্নমতাবলম্বীর অধিকার না, সমাজের সত্যে পৌঁছানোর একমাত্র নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি, এখানে নিষ্ঠুরভাবে প্রমাণিত হয়েছে। যে সরকার নিজের ভুল শুনতে অস্বীকার করে, সে ভুল সংশোধনের সক্ষমতাও হারায় এবং সংশোধন-অক্ষম ব্যবস্থা কেবল একটা উপায়েই বদলায়, বিস্ফোরণে। জুলাইয়ের বিভ্রান্ত প্রতিক্রিয়াগুলা, আন্দোলনকে সন্ত্রাস হিসেবে ব্যাখ্যা, ইন্টারনেট বন্ধ করে বাস্তবতা আড়াল করার চেষ্টা, তরুণদের প্রতি অবজ্ঞাসূচক ভাষা, কোনো সুচিন্তিত কৌশল ছিল না। ছিল অন্ধত্বের লক্ষণ। ক্ষমতা তখন আর দেশকে দেখছিল না; শুনছিল কেবল নিজের প্রতিধ্বনি।

সার্বভৌমত্ব ও জনধারণার রাজনীতি

এ মাত্রাটা আঞ্চলিক রাজনীতির। ভারত বাংলাদেশের অনিবার্য প্রতিবেশী; ভূগোল কোনো নীতিগত পছন্দ না। একাত্তরে তাদের সহযোগিতা রাজনৈতিকভাবে ক্রিটিকালি দেখা যায় তো বটেই। অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত পারস্পরিক নির্ভরতাই এ দুই অঞ্চলের বাস্তবতা। তাই প্রশ্নটা এখানে বন্ধুত্বের না, ভারসাম্যের। গত দেড় দশকে দেশের একটা বড় অংশের মধ্যে এই ধারণা দৃঢ় হয়েছে যে সম্পর্কটা পারস্পরিকতার নীতিতে চলছে না। সীমান্ত হত্যা, যা বছরের পর বছর বন্ধের প্রতিশ্রুতির পরও অব্যাহত, তিস্তার পানিবণ্টনের অমীমাংসিত প্রশ্ন, বাণিজ্য ঘাটতি এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নির্বাচনী বিতর্কে বাইরের অতি আগ্রহী অবস্থান, এসব মিলিয়ে একটা ভাষ্য তৈরি হয়েছে।

এখানে দার্শনিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টা হলো: রাজনীতিতে জনধারণা নিজেই একটা বস্তুগত শক্তি। প্রভাবের প্রকৃত পরিমাণ নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু যদি নাগরিকদের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ বিশ্বাস করে যে তাদের সরকারের বৈধতা প্রতিবেশীর অনুমোদন থেকে আসছে, নিজেদের ভোট থেকে না, তবে সেই বিশ্বাসই বৈধতাকে ক্ষয় করে। কারণ সার্বভৌমত্ব শুধু আইনি মর্যাদা না; এটা একটা জনগোষ্ঠীর আত্মশাসনের অনুভূতি। যে রাষ্ট্র জনগণের চোখে নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে অক্ষম বা অনিচ্ছুক মনে হয়, সে রাষ্ট্র শক্তিশালী হতে পারে, কিন্তু আপন হতে পারে না। এখান থেকে দুটি ভুল উপসংহার এড়ানো জরুরি। এক, প্রতিবেশীবিদ্বেষ কোনো পররাষ্ট্রনীতি না, তা কেবল নির্ভরশীলতাকে বিদ্বেষে রূপান্তর করে, মর্যাদায় না। দুই, চব্বিশের অভ্যুত্থানকে বাইরের চিত্রনাট্য হিসেবে ব্যাখ্যা করা, দেশের ভেতরে হোক বা বাইরে, আন্দোলনকারীদের নৈতিক কর্তৃত্বকে অস্বীকার করা। ৫ আগস্ট বাংলাদেশের নিজস্ব ঘটনা, এবং সেটিই তার শক্তি।

নতুন প্রজন্মকে না বোঝা

এ কারণটা প্রজন্মগত। যে তরুণেরা রাজপথে নেমেছিল তাদের কাছে ১৯৭১ শ্রদ্ধার বিষয়, কিন্তু আনুগত্যের চূড়ান্ত দলিল না। তারা মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকারকে অস্বীকার করেনি; তারা অস্বীকার করেছে সেই উত্তরাধিকারকে যেটি হয়ে উঠেছিল সমকালীন জবাবদিহি এড়ানোর ঢাল হিসেবে ব্যবহার করার অধিকার। এটা একটা মৌলিক দার্শনিক পার্থক্য: ঐতিহাসিক বৈধতা বনাম ইফিশিয়েন্ট বৈধতা। কোনো রাজনৈতিক দল অতীতের ত্যাগের ভিত্তিতে চিরকাল শাসনের অধিকার দাবি করতে পারে না। প্রতিটা প্রজন্ম নতুন করে সম্মতি দেয়, অথবা দেয় না। যে সরকার এই দাবিকে কৃতঘ্নতা হিসেবে দেখে এবং নাগরিক পরিপক্বতা হিসেবে না; তারা আসলে নিজের ভবিষ্যৎ বুঝতে ব্যর্থ হয়।

হত্যার অন্টোলজি, যখন ক্ষমতা নিজেই এক অস্তিত্বগত রূপ ধারণ করে

গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, রাষ্ট্রীয় বাহিনীর নির্বিচার নিপীড়ন, দলীয় ক্যাডারদের প্রাতিষ্ঠানিক অরাজকতা, নিরীহ মানুষকে ‘জঙ্গি’ বানিয়ে গুলি করা এবং তারপর তার পরিবারকে সামাজিকভাবে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া, এগুলোকে বিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে গণ্য করলে ৫ আগস্টকে বোঝা যাবে না। এসব ছিল একটা সুসংহত অস্তিত্বগত প্রকল্প: কে ‘মানুষ’ এবং কে ‘মানুষ না’ তা রাষ্ট্র নিজেই নির্ধারণ করবে, এই দাবি। দর্শনের ভাষায় এটা সার্বভৌমত্বের সেই রূপ, যেখানে ক্ষমতা আইন প্রয়োগ করে না, আইনকে স্থগিত করে; আর স্থগিতাবস্থাকেই স্বাভাবিক নিয়ম বানিয়ে ফেলে। যাকে গুম করা হয়, সে মৃতও না, জীবিতও না, তার অস্তিত্ব রাষ্ট্র কর্তৃক অনির্ধারিত রেখে দেয়া হয়। এটাই সবচেয়ে গভীর সহিংসতা, মৃত্যু না, মৃত্যুর স্বীকৃতিটুকুও কেড়ে নেয়া। এভাবে একটা গোষ্ঠীকে রাষ্ট্রের সমস্ত পরিসরে, রাজপথে, আদালতে, চাকরিতে, সংবাদপত্রে, এমনকি শোক প্রকাশের অধিকারেও, ‘হত্যাযোগ্য’ বলে ঘোষণা করা হয়েছিল।

এই প্রকল্প একা কোনো বাহিনীর কাজ ছিল না; এর জন্য প্রয়োজন ছিল সমগ্র রাষ্ট্রযন্ত্রের নৈতিক আত্মসমর্পণ। আইন প্রণয়ন করেছে দায়মুক্তির কাঠামো, বিচারবিভাগ দিয়েছে সেই দায়মুক্তির বৈধতার সিলমোহর, এনফোর্সমেন্ট বাহিনী হয়েছে তার হাতিয়ার, দলীয় সশস্ত্র গোষ্ঠী হয়েছে তার অনানুষ্ঠানিক সম্প্রসারণ, আর মিডিয়া, যার কাজ ছিল সত্য উদ্‌ঘাটন, হয়ে উঠেছে সেই ভাষা-নির্মাতা, যে "সন্ত্রাসী", "জঙ্গি", "ষড়যন্ত্রকারী" শব্দগুলো আগেই তৈরি করে রাখত, যাতে গুলি চালানোর আগেই শিকার নৈতিকভাবে হত্যাযোগ্য হয়ে ওঠে। ভূরাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা এই যন্ত্রকে বাইরের জবাবদিহি থেকেও সুরক্ষা দিয়েছে; ফলে শাসন নিজের জনগণের কাছে না, অন্যের কাছে জবাবদিহি করতে অভ্যস্ত হয়েছে। এই সম্মিলনের ফল একটাই: বিবেকের বিলুপ্তি প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ। হান্না আরেন্ট যাকে বলেছিলেন ‘চিন্তাহীনতা’, অর্থাৎ মন্দকে মন্দ হিসেবে চিনতে না পারার সক্ষমতা, তা এখানে ব্যক্তিগত ব্যর্থতা ছিল না, ছিল পদোন্নতির শর্ত। ক্ষমতা তখন আর কোনো নৈতিক সত্তা থাকে না; সে হয়ে ওঠে বিবেকহীন এক অস্তিত্ব, অ্যান ইভিল অন্টোলজি, যা টিকে থাকে কেবল নিজের ভয় উৎপাদনের ক্ষমতার ওপর।

কিন্তু অস্তিত্বের নিয়ম হলো, শূন্যতা দীর্ঘকাল শূন্য থাকে না। রাষ্ট্র যখন বিবেক ত্যাগ করল, বিবেক রাষ্ট্র ছেড়ে নাগরিকের ভেতরে আশ্রয় নিল। যে সমাজে হাজার হাজার পরিবারের কেউ না কেউ নিখোঁজ স্বজনের ছবি হাতে দাঁড়িয়েছে, সেখানে প্রতিটা নাগরিক নিজের অজান্তেই একটি নৈতিক সাক্ষ্যের ধারক হয়ে ওঠে এবং এখানেই ঘটে অস্তিত্বগত উল্টোরথ: রাষ্ট্র মানুষকে ‘হত্যাযোগ্য’ বলে সংজ্ঞায়িত করতে চেয়েছিল, কিন্তু সংজ্ঞা যার হাতে সে-ই যদি অবৈধ হয়ে যায়, তবে সংজ্ঞাটাও ভেঙে পড়ে। মানুষ তখন নিজের অস্তিত্বকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করে, রাষ্ট্রের অনুমোদনের বাইরে, নিজের নৈতিক সত্তার ভেতরে। এটাই উচ্চতর অন্টোলজি: এমন এক অস্তিত্ববোধ যেখানে মর্যাদা রাষ্ট্র-প্রদত্ত নয়, বরং রাষ্ট্রের পূর্ববর্তী ও রাষ্ট্র-নিরপেক্ষ।

ভয়ের সমাপ্তি ঠিক এখানেই। ভয় কার্যকর হয় কেবল তখনই, যখন মানুষ প্রাণকে সর্বোচ্চ মূল্য মনে করে। কিন্তু যখন সে বুঝে ফেলে যে ভয়ের কাছে নতি স্বীকার করাটাই এক ধরনের প্রতিদিনের মৃত্যু, নিজের মানুষ-হওয়াকে অস্বীকার করা, তখন বুলেটের গাণিতিক হিসাব অর্থহীন হয়ে পড়ে। জুলাই-আগস্টে তরুণেরা সাহসী ছিলেন এই অর্থে নয় যে তারা মৃত্যুকে ভয় পাননি; বরং এই অর্থে যে তারা মৃত্যুর চেয়ে বড় একটা সত্য আবিষ্কার করেছিলেন, মর্যাদার সত্য। ক্ষমতার হাতে ছিল মেরে ফেলার সমস্ত উপকরণ, কিন্তু ছিল না একটামাত্র জিনিস যা শাসনকে টিকিয়ে রাখে, বৈধতা, অর্থাৎ নাগরিকের ভেতরকার সেই স্বীকৃতি যে ‘এই শাসন থাকার যোগ্য’। বিবেকহীন অন্টোলজির বিরুদ্ধে বিবেকসম্পন্ন অন্টোলজির মুখোমুখি হওয়ার মুহূর্তে পতন আর ক্ষমতার প্রশ্ন থাকে না, থাকে সময়ের প্রশ্ন। ৫ আগস্ট সেই সময়টুকুর নাম।

মৌলিক শিক্ষা

সব কারণকে একত্র করলে একটা কেন্দ্রীয় সূত্র পাওয়া যায়: চিন্তার স্বাধীনতার সংকোচন কেবল কোনো বিলাসিতার অংশটুকুর ক্ষতি না, রাষ্ট্রের স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি। স্বাধীন চিন্তা রাষ্ট্রকে যা দেয় তা হলো আত্মসংশোধনের ক্ষমতা, ভুল নীতিকে বিপর্যয়ে পরিণত হওয়ার আগে চিহ্নিত করার একমাত্র প্রক্রিয়া। সমালোচনাকে দমন করা তাই কেবল অন্যায় না, অদক্ষতাও। এটা স্বল্পমেয়াদে স্থিতিশীলতা কেনে এবং দীর্ঘমেয়াদে সেই স্থিতিশীলতার ভিত্তি ধ্বংস করে। আর এখানেই ৫ আগস্ট-পরবর্তী বাংলাদেশের জন্য সতর্কবার্তাটি নিহিত। অভ্যুত্থান একটা শাসনকে সরাতে পারে; কিন্তু যে কাঠামো সেই শাসনকে সম্ভব করেছিল তা আপনা-আপনি সরে যায় না। প্রতিহিংসা যদি ন্যায়বিচারের ভাষা দখল করে, নতুন কর্তৃত্ব যদি নতুন ভাষায় পুরোনো অসহিষ্ণুতা চর্চা করে, ভিন্নমতকে যদি আবারও রাষ্ট্রদ্রোহের সমার্থক ধরা হয়, তবে তারিখ বদলাবে, যুক্তি বদলাবে না। ইতিহাস বিপ্লবীদের প্রতি বিশেষ দয়া দেখায় না; সে কেবল প্রতিষ্ঠানের প্রতি সৎ থাকে। তিনটা প্রশ্ন তাই যেকোনো ভবিষ্যৎ সরকারের জন্য পরীক্ষা হয়ে থাকবে। রাষ্ট্র কি নিজের সম্পর্কে অপ্রিয় সত্য শোনার প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা রেখেছে, স্বাধীন সংবাদমাধ্যম, স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়, প্রকৃত বিরোধী দল? জাতীয় স্বার্থ কি প্রকাশ্য, যুক্তিসিদ্ধ নীতির মাধ্যমে নির্ধারিত হচ্ছে, নাকি অপ্রকাশিত সমঝোতার মাধ্যমে? এবং ক্ষমতা হস্তান্তরের একটা নিয়মিত, পূর্বানুমেয় পথ কি খোলা আছে?

কারণ ৫ আগস্টের প্রকৃত শিক্ষা এই না যে জনগণ অজেয়, কিংবা সরকার দুর্বল। শিক্ষা এই, কোনো রাষ্ট্র দীর্ঘকাল কেবল শক্তির জোরে টিকে থাকে না; টিকে থাকে সত্য গ্রহণের সাহসে, নাগরিকের আস্থায়, এবং নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার নৈতিক সামর্থ্যে। যে ব্যবস্থা প্রশ্ন সহ্য করতে শেখে, সে ব্যবস্থাই কেবল প্রশ্নের চেয়ে দীর্ঘায়ু হয়।

মাসুদ জাকারিয়া: গবেষক, দ্য ফ্রিডম অব থট (একটি স্বাধীন গবেষণা উদ্যোগ)

আরও