সম্প্রতি মেট্রোরেলের বিয়ারিং প্যাড দুর্ঘটনায় এক পথচারী নিহত হয়েছেন। এর আগেও একই জায়গায় আরো একটি দুর্ঘটনা ঘটেছিল, যদিও তখন কেউ হতাহত হননি। এ পরিপ্রেক্ষিতে মেট্রোরেল পরিচলনায় ও পথচারীর দৈনন্দিন জীবনে কতটুকু নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করছে?
মেট্রোরেল নির্মাণের ক্ষেত্রে আমরা অনেক ব্যয় করেছি। যারা বড় বড় পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ছিলেন তাদের পেছনেও বড় ব্যয় হয়েছে। প্রথমত, নকশাগত জটিলতার বিষয়টি এখন অনেকটাই প্রমাণিত। মেট্রোরেলের বাঁকের মধ্যেই বিয়ারিং প্যাড খুলে পড়ে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের একটু নড়েচড়ে বসা উচিত। শুধু ফার্মগেটের বাঁক নয়, মূলত মেট্রোরেলে ‘এস শেপ’র দুই-তিনটা কার্ভ আছে। এখন সবগুলোতেই ঝুঁকি তৈরি করছে। ইন্টারন্যাশনাল বা গ্লোবাল কমপ্লায়েন্সে মেট্রোর একটি সেফটি অডিট হওয়ার কথা ছিল, সেটি হয়নি। এ সেফটি অডিটটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শুধু মেট্রো পরিচালনা নয়, যেহেতু মেট্রোর করিডোরটি সড়কের অ্যালাইনমেন্ট অনুসরণ করে বানানো হয়েছে, সেক্ষেত্রে ওপরে ও নিচে দুই ক্ষেত্রেই ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে। আমার জানা মতে, বিশ্বে তিন-চারটি প্রতিষ্ঠানের সেফটি অডিট করার সক্ষমতা আছে। সেফটি অডিটের বিষয়ে মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষের দ্রুত উদ্যোগ নেয়া উচিত। মেট্রোরেলের পুরো করিডোরের সেফটি অডিট করতে হবে। যেহেতু কার্ভে বিয়ারিং প্যাড বারবার পড়ে যাচ্ছে, সেহেতু নকশা অনুযায়ী যেখানে বিয়ারিং প্যাড থাকার কথা, সেখানে ধরে রাখার জন্য ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যান্য জায়গার বিয়ারিং প্যাডগুলো যেখানে থাকার কথা সেখানে আছে কিনা এবং গুণগতমান ঠিক আছে কিনা সেটিও একটি নিরীক্ষা (ইন্সপেকশন) হওয়া উচিত। কারণ বিয়ারিং প্যাড পড়ে নিচের সড়কে ঝুঁকি তো আছেই, একই সঙ্গে যদি দুইটা-তিনটা বিয়ারিং প্যাড পড়ে যায় তাহলে মেট্রোরেল পরিচালনাও একটি বিশাল ঝুঁকিতে পড়বে।
রাজধানী ঢাকায় মেট্রোরেলের মতো ফ্লাইওভার, এক্সপ্রেসওয়েসহ বিভিন্ন অবকাঠামো রয়েছে। এসব অবকাঠামো নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়ায় নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করছে। এ বিষয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ সংস্কৃতি খুবই দুর্বল। নতুন প্রকল্প গ্রহণ করার পর রক্ষণাবেক্ষণও প্রকৌশলী দিক থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একটি অবকাঠামোকে কার্যকর রাখতে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ অপরিহার্য। কিন্তু আমরা সেটি সবসময়ই উপেক্ষা করি। বিয়ারিং প্যাড অবকাঠামোর অবিচ্ছেদ্য অংশ। এগুলো অবকাঠামোর ভারসাম্য ধরে রাখার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে ‘পিরিয়ডিক মেইনটেন্যান্সের’ পাশাপাশি ইমারজেন্সি মেইনটেন্যান্সও করতে হবে। ফ্লাইওভারগুলোয় অনেক জয়েন্ট আছে। এ জয়েন্টগুলোয় অনেক সময় সড়কের আবর্জনা ও ধুলাবালি জমে সেগুলো অকার্যকর করে দেয়। এতে ফ্লাইওভারের ওপর অনেক ধরনের ঝুঁকি ও ত্রুটি তৈরি হয়। এ কারণে শুধু বিয়ারিং প্যাড নয়, জয়েন্টগুলোও নিয়মিত নিরীক্ষা-পরীক্ষা করা দরকার। সেগুলো পরিষ্কার রাখতে হবে। জয়েন্টে যেসব উপকরণ ব্যবহৃত হয়, সেগুলো কতটুকু কার্যকর আছে সেটিও দেখতে হবে। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ না করেই আমরা মুখে বলছি, ফ্লাইওভারের আয়ুষ্কাল ৫০-১০০ বছর। এগুলো নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করলে পরবর্তী সময়ে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় কমে যায়। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণে যদি অবহেলা করা হয় তাহলে পরবর্তী সময়ে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ে একটি বিশাল চাপ তৈরি হয়। শুধু ঢাকা শহর নয়, ঢাকার বাইরে বিভাগীয় শহরেও ফ্লাইওভার গেছে। এসব অবকাঠামো নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ না করে হলে একসঙ্গে রক্ষণাবেক্ষণের চাপ তৈরি হবে। এক্ষেত্রে এত বাজেট ও লোকবল থাকবে না। তখন এ ফ্লাইওভার ও এক্সপ্রেসওয়েগুলো ঝুঁকিতে পড়বে।
রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ফ্লাইওভার ও এক্সপ্রেসওয়ের মতো অবকাঠামোগুলো রক্ষণাবেক্ষণে প্রতিষ্ঠানগুলো সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে না কেন?
নতুন প্রকল্প গ্রহণে আমরা অনেক আগ্রহী। নতুন প্রকল্পের জন্য একটা মোটা বাজেট থাকে। কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণে বাজেটের ঘাটতি থাকে। তবে রক্ষণাবেক্ষণ শুধু বাজেটের বিষয় নয়, রক্ষণাবেক্ষণে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে আগ্রহও থাকতে হয়। প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে, সেখানে বড় ব্যয় থাকে। এটার পেছনে আগ্রহের কোনো কমতি থাকে না। কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় কম, তাই বাজেট কম থাকায় এখানে আগ্রহ তেমন অনুভব করি না। তবে রক্ষণাবেক্ষণ একটি সংস্কৃতির বিষয়। উন্নত বিশ্বে প্রকল্প মানেই শুধু নির্মাণ না, একটা প্রকল্পের আয়ুষ্কালকে মাথায় রেখে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের একটি চমৎকার সংস্কৃতি সেখানে তৈরি হয়েছে। আমাদের দেশে সংস্কৃতি তৈরি করতে হলে আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোর মাঠ পর্যায় থেকে শুরু করে শীর্ষ পদগুলোয় যারা রয়েছেন, সেই ইকোসিস্টেমে একটি জবাবদিহিতার সংস্কৃতি তৈরি করতে হবে। মাঠপর্যায়ে কাজ হচ্ছে না, শুধু এ কথা বলা যাবে না। শীর্ষ পর্যায়ে যারা রয়েছেন তাদের কাছেও জবাবদিহিতা চাইতে হবে, কেন নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ হচ্ছে না। তাই এটি একটি সংস্কৃতির বিষয়। প্রতিষ্ঠানগুলোয় জবাবদিহিতার ইকোসিস্টেম তৈরি না হলে সব অবকাঠামো একসঙ্গে বড় ঝুঁকিতে পড়বে।
আপনার গবেষণায় বাংলাদেশের সড়ক নেটওয়ার্ক কীভাবে নকশাগতভাবে নিরাপত্তাহীন হিসেবে উঠে এসেছে? আমরা কি একটি ‘হিউম্যান সেন্ট্রিক ডিজাইন’-এর ধারণা গ্রহণে ব্যর্থ হয়েছি?
দেশের সড়ক ও মহাসড়ক নেটওয়ার্কে নকশাগত সমস্যা বিদ্যমান। মূল সড়কের সঙ্গে শাখা ও স্থানীয় সড়ক সরাসরি যুক্ত হয়ে গেছে। মহাসড়ক নির্মাণ করা হয়ে থাকে মূলত গতি বাড়ানোর উদ্দেশ্যে। এগুলোকে ‘হাই স্পিড করিডোর’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু একই সঙ্গে ইউনিয়ন পর্যায় বা গ্রামীণ সড়কগুলোয় এমনভাবে যুক্ত হয়ে যাচ্ছে, অনেক জায়গায় শর্ট সার্কিটের মতো অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
এটা শুধু দুর্ঘটনাবহুলই নয়, সড়ক-মহাসড়কের শ্রেণীবিন্যাস বা হায়ারার্কির দিক থেকেও এটি একটি বড় ত্রুটি। কোনোভাবেই মহাসড়কের সঙ্গে স্থানীয় বা শাখা সড়ক সরাসরি যুক্ত হওয়ার কথা নয়। কেননা যখন দ্রুতগতির মহাসড়কে হঠাৎ ধীরগতির স্থানীয় যানবাহন উঠে আসে, তখন স্বাভাবিকভাবেই দুর্ঘটনার আশঙ্কা বেড়ে যায়।
আমরা দেখছি, একদিকে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর মহাসড়ক ও এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করছে, অন্যদিকে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) নির্মাণ করছে ইউনিয়ন, উপজেলা ও গ্রামীণ সড়ক। কিন্তু এ দুই সংস্থার কাজের মধ্যে কোনো সমন্বিত পরিকল্পনা নেই। ফলে বহু স্থানে স্থানীয় সড়কগুলো সরাসরি মহাসড়কের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ছে, যা কার্যত সড়ক নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি তৈরি করছে।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এ ধরনের প্রকল্পগুলোর অনুমোদন প্রক্রিয়া। সাধারণত প্রতিটি অবকাঠামো প্রকল্প পরিকল্পনা কমিশনের মাধ্যমে যাচাই-বাছাইয়ের পর অনুমোদিত হয়। তাহলে প্রশ্ন আসে—যখন কোনো গ্রামীণ সড়ক সরাসরি মহাসড়কের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে, তখন সেই প্রকল্পগুলো কীভাবে অনুমোদন পাচ্ছে? এখানে মূল সমস্যা প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার দুর্বলতা। পরিকল্পনা কমিশন নামটি শুনতে যতটা শক্তিশালী মনে হয়, বাস্তবে সেখানে পরিকল্পনাবিদদের অভাব রয়েছে। ফলে প্রকল্পের পরিকল্পনা যাচাই-বাছাই করার যে বিশ্লেষণাত্মক সক্ষমতা থাকা প্রয়োজন, তা অনুপস্থিত। ফলে আমরা দেখছি, একের পর এক প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে কোনো সমন্বিত নকশা বা নিরাপত্তাবিষয়ক চিন্তা ছাড়াই।
সব মিলিয়ে বলা যায়, বাংলাদেশের সড়ক নেটওয়ার্ক এখনো নকশাগতভাবে নিরাপত্তাহীন থেকে গেছে, কারণ আমরা ‘হিউম্যান-সেন্ট্রিক ডিজাইন’ বা মানুষের নিরাপত্তাকে কেন্দ্র করে পরিকল্পনা করার জায়গাটিতে পৌঁছতে পারিনি। একটা আদর্শ ব্যবস্থায় জাতীয় মহাসড়কের সঙ্গে যুক্ত হবে আঞ্চলিক মহাসড়ক, আঞ্চলিকের সঙ্গে জেলা সড়ক, আর জেলার সঙ্গে গ্রামীণ সড়ক। একটি স্পষ্ট শ্রেণীবিন্যাস বা হায়ারার্কি থাকা উচিত ছিল, সেটিই দেশে অনুপস্থিত। ফলে দেশে ব্যয়বহুল সড়ক তৈরি হলেও নিরাপত্তার দিক থেকে সেটিকে টেকসই করা যায়নি।
সড়ক-মহাসড়কে একেবারেই হিউম্যান সেন্ট্রিক ডিজাইন করা যায়নি। কারণ মহাসড়কের সঙ্গে নির্বিচারে গ্রামীণ সড়ক যুক্ত হয়েছে। ফলে যানবাহনের সংখ্যাও বেড়ে যাচ্ছে। অথচ সড়ক শুধু যানবাহনের জন্য তৈরি হয় না, পথচারীও এর অংশ। বর্তমানে বিশ্বের বহু দেশ ‘সেফ ডিজাইন অ্যাপ্রোচ’ গ্রহণ করছে, যেখানে ধরে নেয়া হয়, পথচারী ভুল করবে, চালকও ভুল করবে। কিন্তু সড়কের নকশা এমনভাবে তৈরি হবে, এ ভুলগুলো প্রাণঘাতী দুর্ঘটনায় পরিণত হবে না। অর্থাৎ সড়ক এমনভাবে নকশা করতে হবে যেন সেটি ‘ভুলকে ক্ষমা করে দেয়।’ সেই দর্শন থেকে বাংলাদেশ এখনো যোজন যোজন দূরে রয়েছে।
সড়ক নির্মাণ ও সম্প্রসারণ প্রকল্পে প্রকৌশলগত ভুল ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কীভাবে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়?
প্রথমত, সড়ক নির্মাণ বা সম্প্রসারণের মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রকৌশলগত ত্রুটি হলো সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর সড়ক ও মহাসড়ক তৈরি করছে একভাবে, আবার এলজিইডি তাদের মতো করে সড়ক তৈরি করছে। কিন্তু এ দুই প্রতিষ্ঠানের তৈরি সড়কগুলোর সংযোগস্থলগুলোয় সবচেয়ে বড় ত্রুটি থেকে যাচ্ছে। সেখানে নকশাগতভাবে যেসব উপকরণ বা উপাদান থাকার কথা, সেগুলো নেই।
সড়ককে কেবল যানবাহন চলাচলের মাধ্যম হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু সংযুক্তিস্থলগুলো সবচেয়ে সংবেদনশীল এলাকা। এখানেই গতির পরিবর্তন ঘটে। যানবাহনের ধরনে পার্থক্য তৈরি হয়। যেমন মহাসড়কের সঙ্গে গ্রামীণ সড়ক যুক্ত হলে বা আঞ্চলিক সড়কের সঙ্গে জেলা সড়ক মিশলে সেখানে যানবাহনের বিলিবণ্টন ও গতির ভিন্নতা দেখা দেয়। সুতরাং যেখানে দুই ধরনের সড়ক মিলিত হচ্ছে, সেই মেলবন্ধনটি যেন নিরাপত্তার সঙ্গে ঘটে, সেভাবে নকশা করা জরুরি। কিন্তু সেখানে নকশাগত প্রস্তুতি নেয়া যায়নি।
বিশ্বে অনেক প্রমাণিত নকশা ও প্রযুক্তি আছে, যেগুলো উন্নত দেশগুলো সফলভাবে ব্যবহার করছে, যেখানে সংযুক্তিস্থলে এমন কাঠামো তৈরি করা হয় যাতে ভিন্ন গতির যানবাহন নিরাপদে চলাচল করতে পারে। কিন্তু আমরা এখনো সেসব শেখার পর্যায়ে পৌঁছাইনি। আমাদের ভাবনা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়ে গেছে, সেটি হলো রাস্তা বানাতে হবে। অথচ প্রশ্ন হওয়া উচিত, এ রাস্তার কাজ কী? কারণ সড়ক কেবল যানবাহনের জন্য নয়; পথচারী ও যাত্রী উভয়ের জন্য সবাই সমান গুরুত্বপূর্ণ।
আরেকটি মৌলিক সমস্যা রয়েছে। দেশে সড়কের শ্রেণীবিন্যাসই অনুপস্থিত। রাজধানীতে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না যে কোনটি প্রধান সড়ক, কোনটি অপ্রধান সড়ক ও কোনটি স্থানীয় সড়ক। যানবাহনের চাপ ও জ্যামিতিক গঠনের ভিত্তিতে যে শ্রেণীবিন্যাসের প্রয়োজন, তার জন্য কোনো কার্যকর নীতি এখনো তৈরি হয়নি। ফলে সড়ক ঠিকই বানানো হচ্ছে, কিন্তু জানি না সেটির প্রকৃত চরিত্র কী। শ্রেণীবিন্যাস জানা থাকলে সেই অনুযায়ী নকশা করা যেত।
এখানেই রয়েছে সবচেয়ে বড় দর্শনগত ও নীতিগত দুর্বলতা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক প্রভাব। রাজনৈতিক বিবেচনায় অনেক সময় এমন সব সড়ক নির্মাণ করা হয়, যেগুলোর পরিকল্পনার প্রয়োজন নেই। ফলে নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা—দুটিই ব্যাহত হয়। সড়ক পরিকল্পনায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ নয়, চাই বিজ্ঞানসম্মত শ্রেণীবিন্যাসভিত্তিক নকশা।
দেশে সড়ক নির্মাণের ক্ষেত্রে, কোন সড়কটি আগে নির্মাণ করা হবে, কোনটি বেশি গুরুত্ব পাবে, কোনটি ‘মিসিং লিংক’ বা যোগসূত্রের ঘাটতি তৈরি করবে—এ সিদ্ধান্তগুলো যদি পুরোপুরি প্রকৌশলগত ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে গ্রহণ করা যেত এবং সেখানে কোনো রাজনৈতিক প্রভাব না থাকত তাহলে বাংলাদেশের সড়ক নেটওয়ার্ক হতো অনেক বেশি কার্যকর, নিরাপদ ও বিজ্ঞানসম্মত।
সড়ক শ্রেণীবিন্যাসের যে ধারণা নিয়ে কাজ করা হয় সেখানে প্রতিটি সড়কের নির্দিষ্ট কাজ ও গুরুত্ব থাকে। কিন্তু সেই বাস্তব প্রয়োগে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ। রাজনৈতিক বিবেচনায় অনেক প্রকল্পের সূচনা হয়। কোনো এলাকার একটি আঞ্চলিক মহাসড়ক বর্তমানে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়, অথচ স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব বা ব্যক্তিগত প্রভাবের কারণে তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্বপূর্ণ অন্য একটি সড়ক আগে নির্মাণ করা হয়। ফলে যে সড়কটি বাস্তবে আগে হওয়ার কথা ছিল, সেটি পিছিয়ে যায়। সেখানে তৈরি হয় একটি ‘মিসিং লিংক’ বা যোগসূত্রের ঘাটতি।
এমন পরিস্থিতি আমাদের পুরো সড়ক ব্যবস্থাপনার ভেতরে একটি কাঠামোগত ত্রুটি তৈরি করে। কারণ সড়ক নির্মাণ শুধু প্রকৌশলগত বিষয় নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ব্যয়, অর্থায়ন ও সেই অর্থায়নের পেছনে রাজনৈতিক ক্ষমতার হিসাব। যার রাজনৈতিক প্রভাব যত বেশি, তার এলাকায়ই বেশি অর্থায়ন হয়, বেশি সড়ক হয়। অথচ অন্য অঞ্চলে যেখানে সড়কটির শ্রেণীবিন্যাসের দিক থেকে গুরুত্ব অনুযায়ী কাজটি আগে হওয়ার কথা, সেখানে হয়তো অর্থায়নের অভাবে সেই সড়কটি বছরের পর বছর অপরিকল্পিত অবস্থায় পড়ে থাকে।
এটিই দেশের পরিকল্পনা ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। পরিকল্পনা পর্যায়ে যদি ত্রুটি থেকে যায়, তাহলে সেই সড়কগুলো পরবর্তী সময়ে তাদের মূল কাজ ঠিকভাবে করতে পারে না। বর্তমানে দেশের সড়ক নেটওয়ার্কে ঠিক সেটাই দেখা যাচ্ছে। এটি এক ধরনের ‘ভোগান্তির নেটওয়ার্ক’, যা পরিকল্পনার ঘাটতি ও রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের কারণে সমস্যার সৃষ্টি করছে।
আপনার পর্যবেক্ষণে কী ধরনের সংস্কার সবচেয়ে জরুরি?
সংস্কারের জায়গাটি স্পষ্ট। সড়ক নির্মাণের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত যেন কেবল রাজনৈতিক বিবেচনায় না নেয়া হয়। পৃথিবীর অনেক দেশেই রাজনৈতিক প্রভাব থাকে, কিন্তু সেটি পুরো প্রক্রিয়াকে শতভাগ নিয়ন্ত্রণ করে না। সেখানে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তও নেয়া হয় প্রকৌশলগত তথ্য-উপাত্তের ওপর ভিত্তি করে, যাকে বলা হয় ওয়েল-ইনফর্মড ডিসিশন (পর্যাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত)।
বাংলাদেশকেও সেই পথেই যেতে হবে। কোন সড়ক আগে হবে, কোনটির গুরুত্ব বেশি—এ সিদ্ধান্তগুলো নিতে হবে যানবাহন প্রবাহ, অর্থনৈতিক কার্যকারিতা ও সামাজিক প্রয়োজনের নির্ভুল বিশ্লেষণের ভিত্তিতে। এটা হওয়া উচিত একেবারে বিজ্ঞানভিত্তিক মডেল অনুসারে। যদি বাংলাদেশের সমগ্র সড়ক নেটওয়ার্ক একটি গণিতভিত্তিক বা তথ্যনির্ভর মডেলের আওতায় আসে, তাহলে মডেল নিজেই বলে দেবে কোন সড়কটি অর্থনীতির জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ, কোন পথে যানবাহনের চাপ বেশি, কিংবা কোন অঞ্চলে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর গতিশীলতার জন্য নতুন সড়ক জরুরি।
অতএব আমাদের দরকার এমন একটি ডিসিশন সাপোর্ট টুল অর্থাৎ একটি বিজ্ঞানসম্মত ও প্রকৌশলভিত্তিক সহায়ক পদ্ধতি, যার মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে থেকে সঠিক ও তথ্যনির্ভর সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব হবে। সড়ক নেটওয়ার্কের টেকসই উন্নয়নের জন্য এটাই সবচেয়ে জরুরি সংস্কার।