নির্ভুল রোগ নির্ণয়ের নেপথ্যে বায়োমেডিকেল যন্ত্রের ক্যালিব্রেশন

একজন চিকিৎসক রোগীর উপসর্গ, শারীরিক পরীক্ষা ও বিভিন্ন পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণ করে চিকিৎসা পরিকল্পনা করেন। ফলে যন্ত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যের নির্ভুলতা তার সিদ্ধান্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। তবে যদি কোনো যন্ত্র ত্রুটিপূর্ণ হয় অথবা দীর্ঘদিন ক্যালিব্রেশন না করার কারণে ভুল তথ্য দেয়, তাহলে চিকিৎসকের সিদ্ধান্তও ভুল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়

সুস্থ জীবনযাপন ও উন্নত জীবনমান নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্যনিরাপত্তা একটি মৌলিক শর্ত। আর স্বাস্থ্যনিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি হলো নির্ভুলভাবে রোগ নির্ণয় এবং সে অনুযায়ী কার্যকর চিকিৎসা। আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থায় একজন চিকিৎসকের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নির্ভর করে বিভিন্ন বায়োমেডিকেল যন্ত্র থেকে পাওয়া তথ্যের ওপর। তাই হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক ল্যাবরেটরিতে ব্যবহৃত এসব যন্ত্রের নির্ভুলতা রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অপরিহার্য পূর্বশর্ত।

বর্তমানে দেশের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোয় আইসিইউ, সিসিইউ, এনআইসিইউ ও অপারেশন থিয়েটারে হাজারো রোগীর চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে অত্যাধুনিক বায়োমেডিকেল যন্ত্রের মাধ্যমে। রোগ নির্ণয় থেকে শুরু করে রোগীর শারীরিক অবস্থার পর্যবেক্ষণ, ওষুধ প্রয়োগ, জীবনরক্ষাকারী সহায়তা—সব ক্ষেত্রেই এসব যন্ত্রের ভূমিকা অপরিসীম। প্রশ্ন হলো, এ যন্ত্রগুলো কি সবসময় সঠিক ও নির্ভরযোগ্য ফল দিচ্ছে?

আধুনিক ও ব্যয়বহুল যন্ত্র হলেও নির্দিষ্ট সময় পরপর ক্যালিব্রেশন করা না হলে তার পরিমাপের নির্ভুলতা ধীরে ধীরে কমে যেতে পারে। ফলে ভুল তথ্যের ভিত্তিতে রোগ নির্ণয় ও ভুল চিকিৎসা পরিচালিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমাদের দেশে চিকিৎসা যন্ত্রের নিয়মিত ক্যালিব্রেশনের বিষয়টি এখনো কাঙ্ক্ষিত গুরুত্ব পায়নি।

ক্যালিব্রেশন কী এবং কেন জরুরি?

ক্যালিব্রেশন হলো এমন একটি বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে কোনো যন্ত্রের পরিমাপ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত রেফারেন্স স্ট্যান্ডার্ডের সঙ্গে তুলনা করে তার নির্ভুলতা যাচাই করা হয়। সহজ ভাষায়, একটি যন্ত্র যে ফলাফল দিচ্ছে তা প্রকৃত মানের কতটা কাছাকাছি, ক্যালিব্রেশন তা নিশ্চিত করে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যন্ত্রের সেন্সর, ইলেকট্রনিক উপাদান ও পরিমাপ ব্যবস্থার কার্যক্ষমতায় পরিবর্তন আসতে পারে। এতে পরিমাপে বিচ্যুতি তৈরি হয়। নিয়মিত ক্যালিব্রেশনের মাধ্যমে এ বিচ্যুতি শনাক্ত ও সংশোধন করা সম্ভব হয়। ফলে যন্ত্র থেকে পাওয়া ফলাফল আরো নির্ভরযোগ্য, সংগতিপূর্ণ ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়। ক্যালিব্রেশনের উদ্দেশ্য যন্ত্র মেরামত করা নয়; বরং তার পরিমাপের নির্ভুলতা যাচাই করা এবং প্রয়োজন হলে সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা নির্ধারণ করা। এ কারণেই ক্যালিব্রেটেড যন্ত্রের ফলাফল বিশ্বের যেকোনো দেশের একই ধরনের যন্ত্রের ফলাফলের সঙ্গে তুলনাযোগ্য হয়। আন্তর্জাতিক পরিমাপ বিজ্ঞানে এটিকে বলা হয় ইন্টারন্যাশনাল কম্প্যারেবিলিটি বা আন্তর্জাতিক তুলনাযোগ্যতা।

চিকিৎসকের সিদ্ধান্ত নির্ভর করে যন্ত্রের তথ্যের ওপর

একজন চিকিৎসক রোগীর উপসর্গ, শারীরিক পরীক্ষা ও বিভিন্ন পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণ করে চিকিৎসা পরিকল্পনা করেন। ফলে যন্ত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যের নির্ভুলতা তার সিদ্ধান্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। তবে যদি কোনো যন্ত্র ত্রুটিপূর্ণ হয় অথবা দীর্ঘদিন ক্যালিব্রেশন না করার কারণে ভুল তথ্য দেয়, তাহলে চিকিৎসকের সিদ্ধান্তও ভুল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। রোগীর হৃদযন্ত্র, শ্বাস-প্রশ্বাস, কিডনি বা রক্তের অবস্থা সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর ধারণা সৃষ্টি হতে পারে। ফলে অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা, প্রকৃত রোগের সঙ্গে সম্পর্কহীন ওষুধ প্রয়োগ—সব মিলিয়ে ভুল চিকিৎসার মতো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি ঘটতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে—ভেন্টিলেটর ভুল চাপ দিলে, ইনফিউশন পাম্প ভুল মাত্রায় ওষুধ দিলে, পালস অক্সিমিটার ভুল অক্সিজেন স্যাচুরেশন দেখালে চিকিৎসকের সিদ্ধান্তও অনিবার্যভাবে প্রভাবিত হবে।

রোগীর নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক

ভেন্টিলেটর, ইনফিউশন পাম্প, পালস অক্সিমিটার, সিপ্যাপ, বাইপ্যাপ, ইনকিউবেটরসহ বিভিন্ন বায়োমেডিকেল যন্ত্র সরাসরি রোগীর জীবনরক্ষায় ব্যবহৃত হয়। এসব যন্ত্রে সামান্য ত্রুটিও গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে নবজাতক, প্রবীণ ও সংকটাপন্ন রোগীদের ক্ষেত্রে এ ঝুঁকি আরো বেশি।

উদাহরণ হিসেবে ইনফ্যান্ট ইনকিউবেটরের কথা বলা যায়, যা নবজাতকের জন্য নির্দিষ্ট তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করে। যন্ত্রটির নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রা, আর্দ্রতা বা অক্সিজেনের মান যদি নির্দিষ্ট মাত্রার চেয়ে বেশি বা কম হয়, তাহলে নবজাতকের শ্বাসকষ্ট, অক্সিজেনজনিত জটিলতা, স্নায়বিক সমস্যা কিংবা স্থায়ী অঙ্গক্ষতির মতো গুরুতর পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।

ক্যালিব্রেশনের পাশাপাশি প্রয়োজন ইলেকট্রিক্যাল সেফটি টেস্ট

বেশির ভাগ বায়োমেডিকেল যন্ত্রই বিদ্যুচ্চালিত এবং সেগুলো অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি রোগীর শরীরের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে। খুব অল্প মাত্রার বৈদ্যুতিক প্রবাহও মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে, বিশেষ করে যখন রোগী শারীরিকভাবে দুর্বল বা সংকটাপন্ন অবস্থায় থাকে।

ক্যালিব্রেশন ও ইলেকট্রিক্যাল সেফটি টেস্ট এক বিষয় নয়; দুটি পৃথক বিষয়। কিন্তু উভয়ই সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই যন্ত্রের পরিমাপের নির্ভুলতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি এর বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা পরীক্ষাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। উন্নত দেশগুলোয় নিয়মিত ইলেকট্রিক্যাল সেফটি টেস্ট হাসপাতালের মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার একটি বাধ্যতামূলক অংশ।

আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য

ক্যালিব্রেশনের মাধ্যমে যন্ত্র দ্বারা পরীক্ষার ফলাফল আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত রেফারেন্স স্ট্যান্ডার্ডের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে। ফলে বিভিন্ন হাসপাতাল, গবেষণাগার ও দেশের মধ্যে টেস্ট-রেজাল্টের সামঞ্জস্য বজায় থাকে। আন্তর্জাতিক পরিমাপ ব্যবস্থার এ ভিত্তি বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্যসেবা ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করে।

বাংলাদেশে গড়ে উঠছে নতুন সক্ষমতা

চিকিৎসা যন্ত্রের নির্ভুলতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ রেফারেন্স ইনস্টিটিউট ফর কেমিক্যাল মেজারমেন্টস (বিআরআইসিএম) হাসপাতালের আইসিইউ, সিসিইউ, এনআইসিইউ ও অপারেশন থিয়েটারে ব্যবহৃত ৩২ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ বায়োমেডিকেল যন্ত্রের ক্যালিব্রেশন সেবা চালু করেছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীন এ প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে ক্যালিব্রেশন সেবা দিচ্ছে এবং এ প্রতিষ্ঠানের ক্যালিব্রেশন সেবা আন্তর্জাতিক মেট্রোলজি নেটওয়ার্কের সঙ্গে সম্পৃক্ত।

এরই মধ্যে দেশের বেশ কয়েকটি স্বনামধন্য হাসপাতাল বিআরআইসিএমের এ সেবা গ্রহণ করছে। এর মাধ্যমে দেশের হাসপাতালগুলো অধিকতর নির্ভরযোগ্য, নিরাপদ ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের সক্ষমতা অর্জন করছে।

সচেতন হতে হবে সেবাগ্রহীতাকেও

স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন কেবলই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ওপর নির্ভর করে না; রোগী ও সেবাগ্রহীতাদের সচেতনতাও এ বিষয়ে সমান গুরুত্বপূর্ণ। রোগী বা তাদের স্বজনেরা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যবহৃত যন্ত্রের সর্বশেষ ক্যালিব্রেশন সম্পর্কে জানতে চাইতে পারেন। যন্ত্রের গায়ে থাকা ক্যালিব্রেশন স্টিকার বা সনদ যাচাই করাও সচেতনতার অংশ হতে পারে।

শেষ কথা

আধুনিক স্বাস্থ্যসেবায় উন্নত যন্ত্রপাতি থাকা যথেষ্ট নয়; সেগুলো নির্ভুলভাবে কাজ করছে কিনা সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত ক্যালিব্রেশন ও বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা পরীক্ষা নিশ্চিত করা গেলে রোগ নির্ণয়ের নির্ভুলতা বাড়বে, অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসা কমবে এবং রোগীর নিরাপত্তা আরো সুদৃঢ় হবে। তাই বায়োমেডিকেল যন্ত্রের নিয়মিত ক্যালিব্রেশন ও বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা পরীক্ষা নিশ্চিত করাকে হাসপাতালের মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং জাতীয় স্বাস্থ্যনীতির অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার এখনই সময়।

ড. মালা খান: চিফ সায়েন্টিফিক অফিসার ও প্রতিষ্ঠাতা বিজ্ঞানী; বাংলাদেশ রেফারেন্স ইনস্টিটিউট ফর কেমিক্যাল মেজারমেন্টস (বিআরআইসিএম)

আরও