কৃষি ভাবনা

বাণিজ্যিক কৃষি ও কৃষিতে চৌকস প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধিতে মনোযোগ জরুরি

গত পাঁচ দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান গেম চেঞ্জার হচ্ছে কৃষিপ্রযুক্তি। আমরা আমাদের প্রধান খাদ্যশস্য ধান নিয়ে পরিবর্তনটা শুরু করেছিলাম উচ্চফলনশীল (উফশী) ধান আবাদের মাধ্যমে।

গত পাঁচ দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান গেম চেঞ্জার হচ্ছে কৃষিপ্রযুক্তি। আমরা আমাদের প্রধান খাদ্যশস্য ধান নিয়ে পরিবর্তনটা শুরু করেছিলাম উচ্চফলনশীল (উফশী) ধান আবাদের মাধ্যমে। উফশী প্রথমে বাইরে থেকে এল, পরে আমাদের গবেষকরা নিজেরাই দেশীয় জলবায়ু, মাটি, পানি, তাপমাত্রা প্রভৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আরো অনেক চৌকস ধানের জাত উদ্ভাবন করলেন একের পর এক। নলকূপের সেচ এল, ধানের ফলন বেড়ে গেল বহু গুণ। কাজেই সেটিই ছিল প্রথম গেম চেঞ্জার। ফলে খাদ্যের জন্য আমাদের পরনির্ভরতা হ্রাস পায়। পরবর্তী গেম চেঞ্জার রাষ্ট্রীয় খাতের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের অনুকূলে নীতি পরিবর্তন ও কৃষিতে প্রণোদনা। রাষ্ট্রীয় সুবিধা নিয়ে বেসরকারি খাত বাণিজ্যিকায়নের পথ ধরে যেভাবে কৃষিপ্রযুক্তি ও উন্নত উপকরণ কৃষক পর্যায়ে পৌঁছে দেয়ার জন্য এগিয়ে এল, সেটিও আমাদের কৃষি উন্নয়নের গতি বাড়িয়ে দিয়েছে এবং পথটাকে আরো সুগম করেছে।

পৃথিবী যেভাবে এগোচ্ছে, তাতে খাদ্যেরও ধরন পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে আমাদের ভাত ও আটাজাতীয় খাবারের প্রয়োজন আরো কমে আসবে। আমাদের ফুড চেইন অন্যভাবে রূপান্তরিত হবে। আমরা অনেক বেশি প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার পাব। এজন্য শস্যের পাশাপাশি মৎস্য ও প্রাণিজ খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে হবে। আমাদের ভূমিনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থা থেকে সাগরকেন্দ্রিক পানিনির্ভর খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থায় যেতে হবে। ভূমি, পানি, বায়ু—সবকিছু মিলিয়ে একটা নতুন খাদ্য ব্যবস্থা তৈরি হবে। তার জন্য আমাদের খামারের কার্যকর আয়তন বাড়াতে হবে। যার যার মালিকানা ঠিক রেখে উৎপাদন ও বিপণন দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে কোনো না কোনোভাবে জমির একত্রীকরণের মাধ্যমে ব্যবহারিক আয়তন বাড়াতেই হবে। বলছি না, সবার খণ্ড খণ্ড জমিকে এক জায়গায় নিয়ে আসতে হবে। এটা অবাস্তব, চলবে না—প্রয়োজনও নেই এমনটার। আধুনিক যন্ত্রপাতি যেমন ট্রাক্টর, ট্রান্সপ্লান্টার, থ্রেসার, হারভেস্টার—এসবের সর্বোচ্চ লাভজনক ব্যবহার বাড়াতে খামারের কার্যকর আয়তন বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। এটাকে বলছি, ‘জমির ব্যবহারিক একত্রীকরণ’ বা অপারেশনাল কনসলিডেশন অব ল্যান্ড।

আমি মনে করি, কৃষি ব্যবসায় আরো লোক আসবে। সেটা চুক্তিভিত্তিক কৃষিতে হোক কিংবা অন্য কোনো ব্যবস্থা। যেমন জমি লিজ, বন্ধক বা নগদ বর্গা ইত্যাদি চুক্তি ব্যবস্থা এরই মধ্যে দ্রুত বিস্তার লাভ করছে। এখানে জমির মালিক যাদের কৃষিকাজ করার মতো শ্রমশক্তি নেই তাদের এবং জমির ব্যবহারকারী বর্গাচাষী বা বন্ধকগ্রহীতা যাদের পারিবারিক শ্রমিক আছে কিন্তু জমি নেই তাদের উভয়েরই লাভ হচ্ছে। এটাকেই বলছি কৃষিতে লাভ-লাভ উৎপাদন ব্যবস্থা। কৃষকের লাভ হবে, ব্যবসায়ীর লাভ হবে, প্রযুক্তিবিদরা উৎসাহিত হবেন, সরকারও অনুকূল নীতি সমর্থন দিতে আরো বেশি উৎসাহিত হবে। এ অবস্থার ভেতর দিয়ে খামারের মালিকানা দিয়ে নয়, বরং ব্যবহারের দিক থেকে খামারের আয়তন বেড়ে গেল। বহু যুবক এরই মধ্যে এমন উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে এসেছেন কৃষিপণ্যের খামার করতে। এ ব্যবস্থা প্রসারিত করা গেলে আধুনিক উন্নত প্রযুক্তি, যেমন গ্রিনহাউজ, ড্রোন ও ক্রপ রোবোটিকস ব্যবহার করে প্রেসিসন কৃষির প্রচলন করে নিয়ন্ত্রিত অবস্থায় উৎপাদন লাভজনকভাবে কয়েক গুণ বাড়ানো সম্ভব হবে। এর সঙ্গে আমাদের যুক্ত করতে হবে সাপ্লাই চেইন বা জোগানের বিষয়টি। উৎপাদিত পণ্য তো বাজারে আসতে হবে। সেটি শস্যের বেলায় যেমন সত্য; তেমনি মাছ, মাংস, দুধ, শাকসবজির বেলায়ও সত্য। কাজেই নিয়ন্ত্রিত চৌকস কৃষি যেটিকে বলা হচ্ছে সেদিকে যেতেই হবে। ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে সুনির্দিষ্ট মাটিতে ন্যূনতম প্রয়োজনীয় সার কীটনাশক দিলেই কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় উচ্চ ফলন পাওয়া যাবে। যন্ত্রের সাহায্যে মাছের ও গবাদিপশুকে বিজ্ঞানসম্মতভাবে প্রয়োজনীয় খাবারটুকুই দিতে হবে। বেশিও নয়, কমও নয়। আমি সেই আধুনিক চৌকস কৃষির কথাই বলছি। এতে জমির উর্বরতা শক্তি বাড়বে, ফলে জমির ওপর অনাবশ্যক চাপ কমে যাবে।

বাংলাদেশ যেহেতু একটা জনবহুল দেশ, সেহেতু আমাদের এ ধরনের একটা ইনটেনসিভ কৃষির চিন্তা করতেই হবে। দেশটি ডিঙি নৌকার মতো ছোট আকারের। এর ভার বহন ও যাত্রী বহনের সক্ষমতা অনেক গুণ বাড়াতে হবে। আমরা বৃদ্ধি করেছিও অনেকটা। এ দেশের মানুষ করে দেখিয়েছে কী করে অল্প জমি থেকে দ্রুত উৎপাদন বাড়ানো যায়। তবে এর গতিটা বাড়াতে হবে টেকসইভাবে, পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি না করে। আমাদের অন্য দেশের সঙ্গে তুলনা করার মতো অবস্থা নেই। থাইল্যান্ড বা ভিয়েতনামে এখনো ছিটিয়ে ধান বোনা হয়, তাতে ফলন কম হয়। তবুও এ দুটো দেশ বছরে ৫০-৬০ লাখ টন চাল রফতানি করে যাচ্ছে। আমরা তা পারি না, আমাদের লাইন করে ধান রোপণ করতে হয়। তাতে ক্রমহ্রাসমান জমি থেকে আমাদের ফলন বাড়ে ঠিকই, কিন্তু শ্রম, সেচ ও যন্ত্র ব্যবহারের খরচ বেড়ে গিয়ে কৃষকের লাভ অনেক কমে যায়। তাই আমাদের মতো করে ভাবতে হবে। আমরা আরো দ্রুত এগোতে পারতাম যদি আমাদের কৃষক পরিবারের সংখ্যা আরো কম হতো, খামারের আয়তন আরেকটু বড় হতো। তবে কৃষিতে মানুষ বেশি থাকায় কিছু সুবিধাও পাওয়া যায়। যেমন ধরুন, কৃষি সম্প্রসারণ কার্যক্রম বা প্রযুক্তির বার্তা অনেক সুলভে করা যায়। জনঘনত্বের ফলে একের থেকে অন্যের কাছে প্রযুক্তির খবরটা সহজে কম সময়ে পৌঁছে যায়। দ্বিতীয়ত, গ্রামীণ বাজার ব্যবস্থায় আমরা একে অন্যকে এত বেশি চিনি যে চট করে আপনি নিম্নমানের উপকরণ বা ওষুধ বিক্রি করে চলে যাবেন বা সবসময় পণ্যের দাম কম দেবেন, আপনি একা লাভ করবেন, আমাকে লাভ করতে দেবেন না, তা হবে না। কারণ গ্রাম সমাজে নিবিড় দায়বদ্ধতা ও একে অন্যের মাঝে সম্পর্কেরও একটা শক্তি আছে। এ শক্তিও এ দেশে খুব কাজ করে। আমাদের আত্মশক্তিও প্রবল। বড় কথা, কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। এখন মোবাইল সেবা এসেছে। কোনো কিছু কিছুটা সময় গোপন রাখা গেলেও সবসময় রাখা যাচ্ছে না। আপনার জমিতে ভালো ফলন কেন হয় তা আপনি শত চেষ্টায়ও গোপন রাখতে পারবেন না।

তৃতীয়ত, ক্ষুদ্র কৃষকদের প্রতি অযৌক্তিক আবেগ সৃষ্টি করে যেন না বলা হয়, তাদের কী হবে। আগামী দিনে চ্যালেঞ্জিং যে কৃষি আসছে, সেখানে প্রতিযোগিতামূলক বাজার ব্যবস্থা প্রধান নিয়ামক হিসেবে আসবে। ভর্তুকি বা দান-খয়রাতের কৃষি টিকিয়ে রাখা চলবে না। যারা জ্ঞান-বিজ্ঞানে, প্রযুক্তি ব্যবহারে পিছিয়ে থাকবে কিংবা যার খামারের আয়তন ছোট এবং ব্যবস্থাপনা অদক্ষ তার পক্ষে টিকে থাকা সম্ভব নয়। তাকে টিকে থাকতে হবে প্রতিযোগিতা করে। গ্রামাঞ্চলে এরই মধ্যে অনেকেই এগিয়ে এসে বলছেন, ঠিক আছে, আমার সামান্য জমি আছে, কিন্তু নিজের লোকজন নেই, আমি তা বন্ধক রেখে অকৃষি খাতে চলে যাই। গ্রামীণ অর্থনীতিতে অনেক কর্মক্ষেত্র সৃষ্টি হচ্ছে। এটি তার জন্য অধিক লাভজনক। এরই মধ্যে অনেকে এমনটা করছেন। কৃষিকাজ ছেড়ে বা এর পাশাপাশি বাজারে একটা ছোট দোকান আছে কিংবা ফাঁকে ফাঁকে ভ্যান চালান। তাতে কৃষির কোনো ক্ষতি হচ্ছে না। কৃষি অনেক ভালো হচ্ছে। এখানে বড় ম্যাজিক হচ্ছে কৃষিতে যন্ত্রের ব্যবহার বেড়ে যাচ্ছে। এখন হালগরুর পেছনে দিনভর থাকতে হয় না। যন্ত্র তার কর্মক্ষমতা বাড়িয়ে দিয়েছে। তিনি পরের জমি বর্গা বা লিজ নিয়ে খামারের আয়তন আরেকটু বাড়িয়ে ফেলতে পারছেন, আরো লাভজনক কৃষিতে যাচ্ছেন। অনেকে ফলের বাগানে যাচ্ছেন, মাছের খামার করছেন, কেউ কেউ দুএকটা গাভি কিনে ছোট পরিসরে দুগ্ধখামার করছেন। কেউ ভালো করবেন, কেউ করতে পারবেন না, ছেড়ে দেবেন। এটিই কৃষি ব্যবসার নিয়ম। দেশে দেশে তাই হয়।

ছোট কৃষকের কী হবে? তারা গ্রাম ছেড়ে যাচ্ছেন না। তারা গ্রামেই থাকছেন। হয়তো শহরে যাচ্ছেন কাজে, কিন্তু পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ ঠিকই রাখছেন। কৃষি ও অকৃষি খাত মিলে জীবিকা অর্জন করছেন। এটা হলো প্রথম কথা। দুই. আমাদের শক্তির জায়গা হলো তরুণ জনগোষ্ঠী। শিক্ষিত তরুণরা এখন কৃষিতে আসছেন। তাদের মধ্যে যন্ত্রের প্রতি প্রবল আকর্ষণ সৃষ্টি হয়েছে। তারা এটা ব্যবহার করছেন লাভজনক, নিজের কাজে এবং ভারা খাটিয়ে। তারাই হলেন উদ্যোক্তা। কেউ ছোট, কেউ বড়। সবাই ব্যবসায় ভালো করতে পারেন না। এটা যেকোনো ব্যবসার ক্ষেত্রে সত্য। কৃষি ব্যবসাও তার ব্যতিক্রম নয়। অনেকে একটা ছেড়ে আরেকটায় যাবেন। এটি এভাবেই হয়। এ তরুণ জনগোষ্ঠী আগামী দিনের কৃষিতে থাকবেন বলে আশা রাখি। কৃষির পক্ষে সব ধরনের অনুকূল নীতি সমর্থনের একটা রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার অব্যাহত থাকতে হবে।

শ্রমবাজার নিয়ে একটা প্রশ্ন আছে, সেটি আমাদের ভালোভাবে বুঝতে হবে। কৃষি এখনো দেশে কর্মসংস্থানের বড় ক্ষেত্র। কিন্তু যত উন্নত হবে, কর্মসংস্থানটা সেভাবে নাও বাড়তে পারে। এটা নিয়ে আমাদের চিন্তিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। গ্রামীণ অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলেই আমরা খুশি। সেটি কৃষিতে হতে হবে এমন কথা নয়। অকৃষি খাতেও হতে পারে। গ্রামীণ শিল্পায়নে হবে। গ্রামীণ ব্যবসায় হবে। গ্রামীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা ও নির্মাণ খাতে হবে। কৃষিযন্ত্র কারখানা ও যানবাহন মেরামত খাতে কর্মসংস্থান হবে। ফসল উৎপাদন বা মাছ চাষে কর্মসংস্থান সংখ্যাতাত্ত্বিকভাবে কমে যেতেও পারে। এতে ঘাবড়ানোর কোনো কারণ নেই। বৃহত্তর গ্রামীণ অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান বাড়লেই হলো।

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বর্গাচাষীর সংখ্যা বেড়েছে। বাণিজ্যিক কৃষির জন্য এটি সহায়ক হতে পারে। বর্গা মানে কেবল আধাআধি ফসলের ভাগ দেয়া নয়। এখন কিন্তু নগদ টাকায় বর্গা দেয়া হয়। এটাকে বলে লিজ বা বন্ধকি ব্যবস্থা বলে। যারা ফলের বাগান করেন, তারা পাঁচ বছরের জন্য লিজ নিচ্ছেন। মাছ চাষ যারা করেন, তাদের আরো দীর্ঘ সময়ের জন্য ইজারা নিতে হয়। কারণ তাকে পুকুর খনন ও পানির ব্যবস্থার জন্য বিনিয়োগ করতে হচ্ছে। এতে ক্ষতির কিছু দেখছি না। সবাই বর্গা নেবেও না। যাদের কৃষিকাজ জানা আছে এবং পারিবারিক শ্রমের সংস্থান আছে তারাই বর্গা চাষে যাবে। বিশেষ করে নারীরা অনেকে জমি ইজারা নিয়ে কৃষিকাজে আসছেন। আজকাল স্কুল বা স্থানীয় পর্যায়ে কলেজপড়ুয়ারা কীভাবে যেন একটা সময় বের করে নিচ্ছেন কৃষিতে যুক্ত হতে। যাদের লক্ষ্য ভবিষ্যতে উদ্যোক্তা হওয়া। কাজেই আমি জমি লিজ বা বর্গা চাষকে একটা গতিময় ব্যবস্থা হিসেবে দেখছি।

আমাদের কৃষির আরেকটি লক্ষণীয় দিক হচ্ছে কৃষিতে নারী শ্রমিকের উপস্থিতি। আমি নারী শ্রমিক না বলে নারী কর্মী বলতে পছন্দ করি। তারা উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন। আমি আশান্বিত যে তারা স্থানীয় বাজারের সঙ্গেও সংযোগ রাখছেন। তারা ফলমূল, শাকসবজি উৎপাদন করছেন। বাজারে এসে বিক্রি করছেন কিংবা ফড়িয়া ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করছেন। এখানে প্রধান চালক হচ্ছে সেলফোন। তবে অভিযোগ রয়েছে, নারীরা কৃষক হিসেবে স্বীকৃতি, চাষী কার্ড পান না। ফলে রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি, প্রণোদনা থেকে তারা বঞ্চিত হন। এটা খুব ভালো করে খতিয়ে দেখা দরকার।

কৃষকদের পক্ষ থেকে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় অভিযোগ শোনা যায়, কৃষক উৎপাদিত পণ্যের যৌক্তিক দাম পান না। কৃষক ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না, এটা কোনো কোনো ফসলের বেলায় যেমন সত্য, আবার একই মৌসুমে কোনো কোনো ফসলের বেলায় ভালো দাম পাচ্ছেন, এটাও সত্য। কয়েক বছর ধরে পাটের ভালো দাম পাচ্ছেন না কৃষক। দুই বছর আলুর ভালো দাম পেয়েছেন। এখন আবার পাচ্ছেন না। কৃষক যৌক্তিক দাম না পেলে লোকসান গুনতে হবে। এতে অনেকে কৃষিকাজ ছেড়ে দিতে পারেন। কিন্তু কৃষিকাজটাই ঝুঁকিযুক্ত, কাজেই কৃষি বীমার প্রশ্ন বাণিজ্যিক কৃষির জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ।

আমাদের এখানে প্রায় পৌনে দুই কোটি কৃষক পরিবারের কাছ থেকে শহরের তিন কোটি লোকের কাছে খাদ্যপণ্য আসছে। আসছে পাঁচ কেজি, দশ কেজি করে গ্রামের বাজার হয়ে। এজন্য বাজার ব্যবস্থায় ফড়িয়া বেপারির সংখ্যা বেশি হয়। এসব ফড়িয়া বেপারি নিজেরাও ছোট ছোট কৃষক। হাটে কিনে হাটেই সামান্য লাভে বেচে দেন। এরা বাজারের অবিচ্ছেদ্য অপরিহার্য অঙ্গ, তাদের লাভটাও থাকতে হবে। আমাদের বুঝতে হবে কৃষিপণ্যকে যেহেতু লাভজনক করতে হবে এবং এর উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে, তাই উন্নত কৃষি প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। কৃষিপণ্যের লাভের অংকটা বাড়াতে হবে। আর এ লাভের অংকটা যাবে ভোক্তার পকেট থেকেই। এটুকু আমাদের মানতে হবে। যেমনভাবে প্রাইভেট টিউটর, ডাক্তার, ওষুধপত্র, বিলাসদ্রব্য, কাপড়-চোপড়, লুঙ্গি ইত্যাদি কিনতে আমাদের দাম দিতে হয়, তেমনি খাদ্যপণ্য কিনতেও আমাদের দাম দিতে হবে। এসবের জন্য আমরা কোনো কার্পণ্য করতে পারছি না, যে যা চাইছে তাই তো দিতে বাধ্য হচ্ছি। মানসম্পন্ন নিরাপদ কৃষিপণ্য চাইলে আমাদের একটু বেশি দাম দিতে প্রস্তুত থাকতে হবে বৈকি। তাতে পরিণামে কৃষি ও কৃষকেরই লাভ হবে।

কৃষি তথ্য নিয়ে অনেক প্রশ্ন রয়েছে। শুধু কৃষি নয়, জাতীয়ভাবে অন্যান্য জায়গায়ও তথ্যের জায়গায় আমাদের একটা বড় সমস্যা আছে। কোন পণ্য কত উৎপাদন হলো, এর তেমন সঠিক তথ্য নেই। সরকারি সংস্থাগুলোর একটা স্বাভাবিক প্রবণতা থাকতে পারে উৎপাদন একটু বাড়িয়ে দেখানোর। এর পরিণতি আমাদের জন্য ভালো হয় না, বরং বেশ ক্ষতিই করে। কারণ আমরা বুঝতে পারি না, আসলে কত উৎপাদন হয়েছে। সঠিক তথ্য না থাকায় আমাদের কত আমদানি করতে হবে, রফতানির সুযোগটা কতখানি, সেটিও আমরা বুঝি না। এ কারণে মাঝে মাঝে বাজারে ধস নামে, সংকট হয়। সঠিক তথ্য সংগ্রহ ও সরবরাহ খুবই দরকার। এটিই হলো বাণিজ্যিক কৃষির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ।

ড. এম এ সাত্তার মণ্ডল: প্রফেসরিয়াল ফেলো, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস)। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২১তম উপাচার্য ও বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রথম ইমেরিটাস অধ্যাপক। একুশে পদকপ্রাপ্ত কৃষি অর্থনীতিবিদ

আরও