জুলাই অভ্যুত্থানের পর দায়িত্ব নেয়া অন্তর্বর্তী সরকার আদৌ সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন আয়োজন করতে পারবে কিনা এ নিয়ে অনেকের মনে একসময় শঙ্কা জেগেছিল। সব শঙ্কা দূর হয়েছে। ভোটপর্ব সফলভাবে শেষ হয়েছে এবং সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন বিজয়ী দল হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকার গঠন করেছে।
এ নির্বাচনের মাধ্যমে গোটা দেশ সফলভাবে এক ক্রান্তিকাল উতরে গেল। তবে লক্ষণীয়, বহুল প্রতীক্ষিত এ নির্বাচনে প্রায় ৬০ শতাংশ ভোটার উপস্থিতি নিশ্চিত হয়েছে। এমনটি অবশ্যই হতাশার বিষয়। নির্বাচনের দিন সহিংসতা হতে পারে এ নিয়ে কি জনমনে আতঙ্ক কাজ করেছে? নাকি নির্বাচনের বিষয়ে বিশাল একটি অংশ উদাসীন ছিল? ভোটের দিন প্রায় ৪০ শতাংশ ভোটার অনুপস্থিতির কারণ তাই গবেষণার বিষয়। তবে ভোটের দিন এবার সহিংসতা অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় কমই ছিল। অবশ্য ভোটপর্ব শেষ হওয়ার পর বেশকিছু এলাকায় সহিংসতা-সংঘর্ষের খবর মিলেছে। ১৬ ফেব্রুয়ারি ইলেকশন ওয়ার্কিং অ্যালায়েন্স নামে একটি সংস্থা সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচন এবং তার পরবর্তী দুই দিনসহ মোট তিনদিনের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে। সংস্থাটির ওই পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচন ও এর পরবর্তী এ তিনদিনে সারা দেশে ২১০টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব সহিংসতার ৫৩ শতাংশই শারীরিক হামলা। এর মধ্যে সহিংসতায় নিহত হওয়ার অভিযোগও নথিভুক্ত হয়েছে। এসব সহিংস ঘটনার বিচারের দায় এখন নতুন সরকারের ওপরই বর্তাবে।
যা-ই হোক, রাজনৈতিক মতবিরোধ থেকে যেন সহিংসতা না ছড়ায় সেজন্য নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর তিনি বিরোধী প্রার্থীদের বাড়িতে সশরীরে সাক্ষাৎ করেছেন। বলা বাহুল্য, এমন আচরণ তার দলের কর্মী ও অনুসারীদেরও প্রভাবিত করবে। এছাড়া নেতাকর্মী ও অনুসারীদের প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক কর্মীদের প্রতি সহনশীল আচরণ প্রদর্শনে উদ্বুদ্ধ করবে। অবশ্য যারা বিএনপির মনোনয়ন পেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন তাদের যদি তারেক রহমান দলের পক্ষ থেকে বিরোধী পক্ষের সঙ্গে সাক্ষাতের নির্দেশ দিতেন, তাহলে নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতা অনেকাংশে কমত বলেই অনুমান করা যায়।
আধুনিক বিশ্বে গণতন্ত্র রাষ্ট্র পরিচালনার সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি ও চর্চা বলে বিবেচিত। গণতন্ত্রে জনগণই রাষ্ট্রের মূল চালিকাশক্তি। জনগণের ভোট তথা সম্মতির ওপরই জনপ্রতিনিধিদের রাষ্ট্র পরিচালনার সিদ্ধান্তের গতিবিধি নির্ভর করে। উন্নত দেশগুলোয় গণতান্ত্রিক চর্চার অনেক কিছু অবকাঠামোগত সুবিধার কারণে বাস্তবায়ন সম্ভব হলেও উন্নয়নশীল দেশগুলোর চিত্র ভিন্ন। নানা প্রতিবন্ধকতা থাকায় এসব দেশে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক চর্চার প্রকৃত সুফল থেকে জনগণ নানাভাবে বঞ্চিত হন। আমাদের দেশেও এসব সমস্যা রয়েছে। অতীত অভিজ্ঞতা বলে, দেশের বিভিন্ন নির্বাচনে অর্থ ও পেশিশক্তির প্রভাব, রাজনৈতিক পক্ষ-প্রতিপক্ষের মধ্যকার বিদ্বেষ, নির্বাচন প্রক্রিয়ায় আমলাতন্ত্রের প্রভাবের ফলে নির্বাচনের সুষ্ঠতা নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দেয়। এসব সংকট বরাবরই এদেশে সুস্থ ধারার গণতান্ত্রিক রাজনীতি চর্চার পথে প্রতিবন্ধকতা হয়ে জিইয়ে ছিল এবং এখনো অনেকাংশে রয়েছে। অভিযোগ আছে, ২০০৮ সালের পর এ দেশের ভোটাররা প্রকৃত অর্থে স্বাধীনভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেনি। সে অর্থে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ অতিক্রম করেছি।
নির্বাচন সফল হয়েছে এ কথায় অবশ্য আত্মতৃপ্ত হওয়ার সুযোগ নেই। বিজয়ী দল হিসেবে বিএনপির সামনে রয়েছে অনেক প্রতিবন্ধকতা। দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নাজুক অর্থনীতিকে গতিশীল করার মতো কঠিন কাজগুলোর বিষয়ে দ্রুত স্পষ্ট পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। সরকার এরই মধ্যে একটি বড় মন্ত্রিসভা গঠন করেছে। মন্ত্রিসভার সদস্যদের নিয়ে ভালো-মন্দ এ দুই ধরনের মন্তব্যই দেখা যাচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ কিছু মন্ত্রণালয়ে বেশ ক’জন বিতর্কিত ব্যক্তিকে নিয়োগ দেয়ায় জনমনে কিছুটা হতাশাও পরিলক্ষিত হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে মন্ত্রিপরিষদকে জনমনে আস্থা তৈরির উদ্যোগ নিতে হবে। প্রথম বৈঠক শেষে আগামী এক সপ্তাহে জনমনে মন্ত্রিপরিষদের প্রতি আস্থা গড়ার কাজটি করতে হবে। চব্বিশ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরবর্তী সময়ের জনপ্রত্যাশাকে বিবেচনায় রেখে রাষ্ট্রকাঠামো পরিচালনা করতে হবে। জনপ্রত্যাশার নিরিখে রাষ্ট্র পরিচালনা করলে পরবর্তী নির্বাচনেও আবারো জনরায়ে নির্বাচিত হয়ে ফেরার সুযোগ থাকবে। আর যদি তা করতে ব্যর্থ হন, তাহলে ফিরে যেতে হবে আস্তাকুঁড়ে।
বিজয়ী দলের ওপর দায়িত্বের পাল্লাটা ভারি। তবে বিরোধী দলকে ঘিরেও আমাদের কিছু প্রত্যাশা রয়েছে। অতীতের মতো হরতাল, অবরোধ কিংবা সংসদ অধিবেশন থেকে বিরোধী দল যেন আর ওয়াক আউট না করে। বরং দেশের নীতিনির্ধারণী সব ক্ষেত্রে বিরোধী দল যেন অর্থবহ ভূমিকাও রাখে। সরকার গঠন না করলেও ভোটারদের প্রতি বিরোধী দলের দায়িত্ব রয়েছে। পরিস্থিতি এখন এমন যে আগামী পাঁচ বছর সাধারণ মানুষ রাজনৈতিক অঙ্গনে তীক্ষ্ম দৃষ্টি রাখবে। পর্যবেক্ষণের প্রতিফলন আমরা আবারো ভোটের মাধ্যমে পাব। জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেয়া তরুণ প্রজন্মের প্রতি নানা কারণেই প্রত্যাশার পারদ ছিল আকাশচুম্বী। তাদের কাছে আরো পরিশীলিত নেতৃত্ব প্রত্যাশিত ছিল। সে সুযোগ এখনো হারায়নি। ভবিষ্যতে তারা আরো সুসংহত হয়ে রাজনীতি করবেন, এমন রাষ্ট্রকে পথ দেখাবেন, এমনটিই আমাদের প্রত্যাশা।
ড. মো. সিরাজুল ইসলাম: অধ্যাপক, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়