চতুর্থ বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সম্মেলন

সরকারি ও বেসরকারি খাতকে অর্থসংস্থানে ব্যাংকের বিকল্প উৎস খুঁজতে হবে

আমাদের অর্থনীতি অনেক গভীর সমস্যায় নিপতিত। সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় আমরা কিছুটা উন্নতি করেছি। এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা খাতে। আমাদের মূল লক্ষ্য ছিল বিনিময় হারকে স্থিতিশীল রাখা।

আমাদের অর্থনীতি অনেক গভীর সমস্যায় নিপতিত। সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় আমরা কিছুটা উন্নতি করেছি। এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা খাতে। আমাদের মূল লক্ষ্য ছিল বিনিময় হারকে স্থিতিশীল রাখা। সেটা আমরা মোটামুটি সফলতার সঙ্গে অর্জন করতে পেরেছি। আমরা শুরু থেকেই বলেছিলাম মূল্যস্ফীতি কমাতে চাইলে প্রথমে আমাদের বিনিময় হার স্থিতিশীল করা দরকার। বিনিময় হার ধরেবেঁধে রাখার কথা বলছি না, স্থিতিশীল রাখার কথা বলছি। আমরা এখানে সাফল্য দাবি করতে পারি।

আগে বিদেশী ব্যাংকগুলো আমাদের ক্রেডিট লিমিট কমিয়ে দিচ্ছিল, এমনকি বন্ধও করে দিচ্ছিল। এখন তারা সব লিমিট পুনরায় খুলে দিয়েছে। আমাদের ব্যাংকগুলোর রিইন্স্যুরেন্সসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে এখন আর কোনো সমস্যা হচ্ছে না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আরো বেশি ক্রেডিট পাচ্ছে তারা। আমাদের প্রায় সাড়ে ৩ বিলিয়ন ডলারের যে বৈদেশিক পাওনা জমে ছিল, সেগুলো সব পরিশোধ করা হয়েছে। ‘টাকা দিচ্ছেন না কেন?’—এমন অভিযোগ আর নেই।

আমাদের কারেন্ট অ্যাকাউন্ট এখন সারপ্লাস আছে। গত বছর আমাদের ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্টেও সামান্য সারপ্লাস ছিল। সে হিসাবে মনে করি আমাদের এক্সটারনাল সেক্টর এখন স্থিতিশীল, কোনো দুর্বলতা নেই। আমদানির ক্ষেত্রে যা ইচ্ছা আমদানি করা যাবে। কেউ যদি বলেন যে তিনি আমদানি করতে পারছেন না, সেটা তার নিজস্ব সমস্যা; ডলারের কোনো অভাব নেই। ইচ্ছামতো ডলার কেনা যাবে। আমাদের কোনো বাধ্যতামূলক মার্জিন নেই। বাংলাদেশ ব্যাংক সব মার্জিন তুলে নিয়েছে এবং ব্যাংক-ক্লায়েন্ট সম্পর্কের ভিত্তিতে ব্যবসা করার সুযোগ দিয়েছে। এদিক থেকে আমরা একটু স্বস্তির জায়গায় আছি।

আমি যেদিন গভর্নর হিসেবে যোগ দিয়েছিলাম, সেদিন ডলারের দাম ছিল ১২০ টাকা, এখন ১২২ টাকা। একটু বেশিই স্থিতিশীল মনে হচ্ছে ডলারের দাম। একই সময়ে ভারতে ডলারের দাম ৮৪ থেকে ৮৯ রুপি বা ৫ রুপি বেড়েছে। গত ১৫ মাসে ডলারের মান অবমূল্যায়ন করেছি দুটো কারণে। আমাদের খেয়াল রাখতে হবে ডলারের দামে অতিরিক্ত স্থিতিশীলতা ভালো নয় (জোর করে দাম ধরে রাখা)। আমরা ডলারের দর সম্পূর্ণ বাজারভিত্তিক করে দিয়েছি। ডলারের দাম নির্ধারণে বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো হস্তক্ষেপ করছে না। সরবরাহ-চাহিদার ওপর ভিত্তি করেই ডলারের মূল্য নির্ধারিত হচ্ছে।

গত রমজান মাসটা একটু কঠিন ছিল। তখন আমরা পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রা দিয়ে সরবরাহ ঠিক রেখেছিলাম। এবারের রমজান সামনে রেখেও এখন পর্যন্ত কোনো ঝুঁকির ইঙ্গিত দেখছি না। রমজানের প্রয়োজনীয় সব পণ্যের এলসি এরই মধ্যে খোলা হয়েছে। অনেক পণ্যের ক্ষেত্রে এলসি খোলার হার গত বছরের তুলনায় ১৫-২০ শতাংশ পর্যন্ত বেশি। ফলে আমদানি বাড়লেও ডলারের ওপর চাপ পড়ছে না। আমাদের আমদানি কি বাড়েনি তাহলে? হ্যাঁ, অবশ্যই বেড়েছে। চলতি বছরে আমদানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে দুই অংকের, তবু বিনিময় হারে কোনো চাপ পড়ছে না।

কিছু স্বস্তির জায়গা থাকলেও আমাদের অনেক সমস্যা আছে এবং এগুলো রাতারাতি সমাধান হবে না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমরা এখনো সমস্যাটাই শনাক্ত করে যাচ্ছি। এর মধ্যে খেলাপি ঋণ একটি বড় সমস্যা। নতুন নীতি ও প্রতি প্রান্তিকে হালনাগাদ তথ্য আসার কারণে আমরা এনপিএলের (খেলাপি ঋণ) প্রকৃত পরিস্থিতি দেখতে পাচ্ছি। গত সরকার যখন এনপিএল ৮ শতাংশ বলেছিল, আমি অনুমান করেছিলাম আসল এনপিএল তার তিন গুণ অর্থাৎ ২৫ শতাংশ হবে। বাস্তবে সেটা এখন ৩৫ শতাংশ। এটা কোনো ছোট সমস্যা নয়। এক-তৃতীয়াংশের বেশি ঋণ মন্দ ঋণ হলে বাকি দুই-তৃতীয়াংশের ওপর ভিত্তি করে ব্যাংক চালানো অনেক বড় চাপ। আমাদের ব্যাংক ও আর্থিক খাত দীর্ঘদিন ধরে এ সমস্যায় ভুগছে। এ ক্ষত সারাতে কমপক্ষে ৫-১০ বছর অপেক্ষা করতে হবে।

এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে সুদের হার কিছুটা বেশি। কিন্তু আমাদের প্রেক্ষাপটও দেখতে হবে। গত বছরের আগস্টে যখন যোগ দিই তখন আমাদের মূল্যস্ফীতি সাড়ে ১২ শতাংশ ছিল। সে তুলনায় নীতি সুদহার ১০ শতাংশ বেশি নয়। ভারত, যুক্তরাষ্ট্রসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশেই মূল্যস্ফীতি ও নীতি সুদহারের ব্যবধান আড়াই থেকে তিন শতাংশ দেখা যায়। এর নিচে সাধারণত হয় না। আমাদেরও লক্ষ্যমাত্রা সে রকমই। সে তুলনায় আমাদের সুদহারের পার্থক্য খুব বেশি নয়। বর্তমানে আমাদের মূল্যস্ফীতির হার ৮ দশমিক ২ শতাংশ। এটা যদি ৭ শতাংশ বা তার নিচে যেত তাহলে আমরা নীতি সুদহার কমাতে পারতাম। আমরা হয়তো ৭ শতাংশের ঘরে যেতে পারতাম। কিন্তু কিছু নীতিগত ব্যর্থতার কারণে সেখানে যেতে পারিনি। চলতি বছরের আগস্ট-সেপ্টেম্বরে দেশের চালের দাম বৃদ্ধি হয়েছিল ১৮ শতাংশ। সেজন্য মূল্যস্ফীতি ১ দশমিক ৪ শতাংশীয় পয়েন্ট বেড়ে গিয়েছিল। বিশ্বের কোথাও চালের দাম বাড়েনি, ভারতে তো বাড়েনি। আমরা আমদানি বন্ধ রেখেছিলাম। এতে চাপ তৈরি হয়েছে। দেখা গেছে আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম কম ছিল কিন্তু আমাদের বাজারে চড়া। পরে হয়তো খুলেছি, কিন্তু সেটা আবার আমন মৌসুমের একটু আগে। তখন অবশ্য অনেক দেরি হয়ে গেছে। বাজারের ওপর যে আমলাতান্ত্রিক খবরদারি করা হয় সেটা আখেরে ভালো ফল দেয় না। আমাদের চেষ্টা থাকা উচিত বাজার মনিটরিংয়ের এবং বাজারকে কীভাবে আরো কার্যকর করা যায় তা। আমাদের সরবরাহ চেইন এবং পণ্যমূল্য ইত্যাদি মনিটরিং করা যেতে পারে। সবসময় খেয়াল রাখতে হবে সরবরাহ যাতে সচল থাকে। ভোজ্যতেলের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা দেখছি। আমরা দাম ঠিক করে দিচ্ছি। সরকার যে দাম ঠিক করে দেয় বাজার থেকে সে দামে কিন্তু ভোজ্যতেল পাওয়া যায় না। দাম বেঁধে দেয়ার পাল্টা প্রতিক্রিয়া আমরা দেখতে পাই কখনো কখনো। দেখা গেছে, বাজার থেকে হঠাৎ করে ভোজ্যতেল উধাও হয়ে যায়। কিছুদিন বিক্রি বন্ধ রেখে সরকারের মাধ্যমে দাম বাড়িয়ে ফের বাজার সচল করা হয়। ভোজ্যতেলের দাম ধরেবেঁধে দেয়ার কী প্রয়োজন রয়েছে। তার চেয়ে বাজার উন্মুক্ত থাকা ভালো নয় কি? সরবরাহ ঠিক থাকলে ভোজ্যতেলের বাজারে অস্থিরতা কম হবে। এজন্য আমি মনে করি সরকারের তরফ থেকে নীতিগত কিছু পরিবর্তন আনতে হবে। এতে বাজার আরো স্থিতিশীল হতে পারে।

আমাদের আমানত প্রবৃদ্ধির হার ৬ শতাংশে নেমে গিয়েছিল, এখন তা ১০ শতাংশ। সামনে আরো বাড়বে। তবে সরকারকে ঋণ নেয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকের বিকল্প উৎস খুঁজতে হবে। ৬ শতাংশ আমানত থেকে ১ লাখ কোটি টাকা যদি সরকারই নিয়ে যায়, তাহলে বেসরকারি খাত কী করবে? ব্যাংকের ওপর সরকারের ঋণ চাহিদা কমানো না গেলে মানি মার্কেটের ওপর চাপ কমবে না। আমরা যদি আমানত প্রবৃদ্ধির হার ১৪ শতাংশে নিতে পারি তাহলে বাজারে ৪০ হাজার কোটি টাকা নিয়ে আসতে পারি। সে অর্থ পুরোটাই বেসরকারি খাতে যাবে। সরকার তো এক লাখ কোটির মতো টাকা নেবেই, বেসরকারি খাতের জন্য তো অর্থ লাগবে। সেটা আসবে আমানত প্রবৃদ্ধি হলে। কিন্তু দীর্ঘদিন আমাদের আমানত প্রবৃদ্ধি না হওয়ার পেছনে কারণ ছিল অর্থ পাচার। অনেকে বলেন আমদানি কমে গেছে, কিন্তু সত্যিকারে ভলিউম কমেনি। চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রেকর্ড ভলিউমে আমদানি হয়েছে। অর্থের বিচারে নয়, পণ্যের পরিমাণ বিবেচনায় এ রেকর্ড আমদানি হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ পর্যন্ত (জুলাই-অক্টোবর) পণ্য আমদানি (পরিমাণে) দুই অংকের প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এবং কনটেইনার শিপমেন্টও ৮ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে। কিন্তু আমদানি বিল কমেছে। এর কারণ হলো অর্থ পাচার কমেছে। আগে যেসব ওভার ইনভয়েসিং হতো তা কমে গেছে। সেজন্য শুধু পরিসংখ্যান দেখে ভুল সিদ্ধান্তে যাওয়া যাবে না।

আমাদের ব্যাংক খাতের মূল সমস্যা হলো কাঠামোগত দুর্বলতা। আমাদের বন্ড মার্কেট নেই বললেই চলে, স্টক মার্কেট দুর্বল, ইন্স্যুরেন্স খাত করুণ অবস্থায়। সবাই ব্যাংকের ওপর নির্ভরশীল। বিশ্ববাজারের অভিজ্ঞতা আমলে নিলে আমাদের অবশ্যই বন্ড মার্কেট গড়ে তুলতে হবে। বৈশ্বিক বন্ড মার্কেটের আকার ১৩০ ট্রিলিয়ন ডলার। স্টক মার্কেটের আকার হলো ৯০ ট্রিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে ব্যাংক বা মানি মার্কেটের আকার হলো ৬০ ট্রিলিয়ন ডলার। এখানে লক্ষণীয়, বৈশ্বিক বন্ড ও স্টক মার্কেটের আকার ব্যাংক খাত থেকে বড়। আমাদের ক্ষেত্রে পুরো উল্টো দৃশ্য। সবাই ব্যাংক থেকে অর্থ নিচ্ছেন, যে কারণে এ খাতে ঝুঁকিও বেড়েছে। অর্থনৈতিক সব চাপ ব্যাংকের ওপর পড়ে, যা অসহনীয়। আমাদের এ কাঠামো পরিবর্তন করতে হবে। আমরা যদি ব্যাংক খাতনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসতে না পারি তাহলে আমাদের শিল্প খাত বিকশিত হবে না। অন্য খাতগুলো বিকশিত না হওয়ার কারণে আমাদের ব্যাংক খাতের ওপর অতি নির্ভরশীল হতে হচ্ছে। আমাদের বন্ড মার্কেট বিকশিত করতে হবে। এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংক পলিসি গ্রহণ করেছে। আমরা বিএসইসির সঙ্গে আলোচনা করেছি, আর্থিক বিভাগের সঙ্গে আলোচনা করেছি। শিগগিরই বাস্তবায়ন কার্যক্রম এগোবে।

ব্যবসায়ীদের মধ্যে যাদের এক্সপোজার অনেক বেশি, তাদের বলব আপনারা আর ব্যাংকের দিকে তাকাবেন না। বাজার থেকে বন্ড তুলুন। ব্যাংক ১৫-২০ বছরের ঋণের জন্য উপযুক্ত প্রতিষ্ঠান নয়। আমরা আপনাদের উৎসাহিত করব বন্ডে যেতে। আমাদের স্টক মার্কেটকেও পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। সেখানে আস্থাহীনতা দূর করতে হবে। পুঁজিবাজারে নতুন স্ক্যান্ডাল হলে অর্থনীতির ক্ষতি হবে।

ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা ১৪টি ব্যাংকের বোর্ড পরিবর্তন করেছি। ফলও পাচ্ছি। ইসলামী ব্যাংকের দুরবস্থা ছিল; এখন তারা ঘুরে দাঁড়িয়েছে। আমরা ইসলামী ব্যাংককে ১০ হাজার কোটি টাকা লোন দিয়েছিলাম। তারা সে টাকা ফেরত দিয়েছে। ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার ফলেই এটা সম্ভব হয়েছে। আমাদের ব্যাংক খাত ধ্বংস হয়ে যায়নি; বরং দুটি অংশে ভাগ হয়েছে। ভালোভাবে পরিচালিত ব্যাংক আর খারাপভাবে পরিচালিত ব্যাংক। যেখানে সমস্যা আছে সেখানে আমাদের হস্তক্ষেপ করতেই হবে। ব্যাংক খাতে সুশাসন নিশ্চিতের জন্য অনেকগুলো আইনের খসরা করেছি। কিছু অধ্যাদেশ আকারে প্রকাশিত হয়েছে, আবার কিছু পাইপলাইনে রয়েছে। রাজনীতিবিদদের কাছে অনুরোধ, এ আইনগুলো সংসদে পাস করে স্থায়িত্ব দেবেন।

ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন করছি—বোর্ডে অন্তত ৫০ শতাংশ স্বতন্ত্র পরিচালক, মেয়াদ ১২ বছর থেকে কমিয়ে ৬ বছর (৩ বছর করে), পরিবারভিত্তিক মালিকানা ১০ শতাংশের বেশি নয় (বিদেশী ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী ব্যতিক্রম) ইত্যাদি নীতি সংশোধন করা হয়েছে। ব্যাংকগুলোকে মালিক নয়, তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে কাজ করতে হবে।

আমাদের ব্যাংক খাতের দুরবস্থার পেছনে বাংলাদেশ ব্যাংকের রাজনৈতিকীকরণ দায়ী। কেন্দ্রীয় ব্যাংককে বিরাজনৈতিকীকরণ করতে হবে। পৃথিবীর কোনো দেশেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বেতন কাঠামো সরকারের সঙ্গে মেলে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে পেশাদারত্ব বজায় রাখতে হলে স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করতে হবে।

আমানত সুরক্ষা স্কিম ১ লাখ থেকে বাড়িয়ে ২ লাখ টাকা করা হয়েছে, আর্থিক প্রতিষ্ঠানও (এনবিএফআই) এর আওতায় আসছে। খারাপ সম্পদ মূল্যায়নের জন্য অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি তৈরি হচ্ছে। বছরের পর বছর মামলা ঝুলে থাকা থেকে বাঁচতে অর্থঋণ আদালতকে কার্যকর করার পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। সম্মানজনক এক্সিটের জন্য ব্যাংকরাপ্সি আইন আনা হচ্ছে। ব্যবসা বন্ধ হলে মারামারি-ধরাধরি নয়; বাজার থেকে বের হওয়ার জন্য বৈধ পদ্ধতি থাকা দরকার।

আমাদের খারাপ ও অচল ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে কিছু করার দরকার ছিল। সেজন্য ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ প্রয়োগ করে পাঁচ দুর্বল ব্যাংককে নিয়ে আমরা একটি শক্তিশালী নতুন ব্যাংক গঠন করছি। আশা করি, আগামী সপ্তাহেই এর আনুষ্ঠানিক সূচনা হবে। এখানে ৩৫ হাজার কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধন থাকবে। এটিই দেশের সবচেয়ে বড় পুঁজিসংবলিত ব্যাংক হতে যাচ্ছে। সরকার ২০ হাজার কোটি টাকা দিচ্ছে।

আমরা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য বেশকিছু উদ্যোগ নিয়েছি। নিয়মকানুনে পরিবর্তন এনে গ্যারান্টি ব্যবস্থাকে আরো উদার করার চেষ্টা করছি। এর লক্ষ্য হচ্ছে ব্যাংকগুলো যেন গ্যারান্টি স্কিম ব্যবহার করতে উৎসাহিত হয়, সাহস পায় এবং এসএমই খাতে আরো জোরালোভাবে এগোতে পারে। প্রয়োজন হলে ব্যাংকগুলো এনজিওদের সঙ্গেও কাজ করে কৃষিঋণ বা এসএমই ঋণ বিতরণ করতে পারবে। এসএমই খাতে ২৫ হাজার কোটি টাকা বিতরণ হয়নি। এ অর্থ কীভাবে কৃষি ও এসএমই খাতে দেয়া যায় সে চেষ্টা করছি। আমরা দেখেছি কৃষিতে মাত্র ২ শতাংশ ঋণ বিতরণ হয়। অর্থনীতিতে কৃষির অবদান কমলেও এখনো তা ১৪ শতাংশের মতো। কিন্তু ব্যাংক ও আর্থিক খাত থেকে কৃষি খাত মাত্র ২ শতাংশ ঋণ পাচ্ছে। এখানে বাংলাদেশ ব্যাংককে বড় রকমের ভূমিকা পালন করতে হবে।

এনআরবিরা (অনাবাসী বাংলাদেশী) বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিশাল ভূমিকা রাখছেন। শুধু রেমিট্যান্স নয়, বিনিয়োগের মাধ্যমেও প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন তারা। আমি নিজেও একজন প্রবাসী ছিলাম, সে সহমর্মিতা তো আছেই। ৩২ বছর বাইরে থেকে দেশে চলে এসেছি। বিদেশে গেলেই যে চিরকাল সেখানে থাকতে হবে বিষয়টি এমন নয়। দেশে নানাভাবে প্রবাসীরা ভূমিকা রাখতে পারেন।

রাজনৈতিক নেতৃত্বদের বক্তব্যে একটি আকাঙ্ক্ষা স্পষ্ট, তারা বাংলাদেশকে শিগগিরই ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করতে চায়। এখন আমরা প্রায় অর্ধ ট্রিলিয়নের কাছে। সেখান থেকে পূর্ণ ট্রিলিয়নে পৌঁছার লক্ষ্য অবশ্যই আমরা সমর্থন করি। কিন্তু এটাকে অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে হবে; কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও পরিবেশগত স্থায়িত্ব নিশ্চিতে জোর দিতে হবে।

সমস্যা চিহ্নিত করতে গিয়ে সবাই এ বিষয়ে একমত হয়েছেন আমাদের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রয়েছে, অদক্ষতা রয়েছে। যা অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতাকে ব্যাহত করছে, দুর্নীতিকে উৎসাহিত করছে। রাজনীতিবিদরা এ সমস্যা চিহ্নিত করেছেন কিন্তু সমাধানের কথা বলেননি। আমলাতন্ত্রের এ সংকট রাজনীতিবিদদেরই সুরাহা করতে হবে।

আলোচনায় প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও ব্যর্থতার কথাও উঠে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও নির্বাচন কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের। বিগত সরকারগুলো এসব প্রতিষ্ঠানকে অপব্যবহার করায় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা কমেছে। এ কারণে আমরা দেশকে ভালোভাবে গড়ে তুলতে পারিনি। প্রতিষ্ঠান ছাড়া জনগণের কাছে ভালো সেবা তুলে দেয়া যায় না। প্রশাসন কিংবা পুলিশে এখন পর্যন্ত সংস্কার হয়নি। এসব প্রতিষ্ঠানকে ভালোভাবে সংস্কার করতে না পারলে জনগণের কাছে সেবা পৌঁছানো সম্ভব নয়। এটা করতে গেলে আমাদের ডিজিটাল ইকোনমি ও ডিজিটাল গভর্ন্যান্সের ওপর জোর দিতে হবে। ব্যক্তির হস্তক্ষেপ থাকলে জবাবদিহিতা দুর্বল হয়, দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হয়।

অর্থনৈতিক ন্যায্যতা নিয়েও কথা হয়েছে। অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি ও ন্যায্যতা—দুটোই দরকার। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে আমরা আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকে একটি চালিকাশক্তি হিসেবে নিয়েছি। এখন পর্যন্ত প্রায় ৬৬ শতাংশ মানুষ আনুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। বাকি ৩৪ শতাংশকেও যুক্ত করতে হবে। এক্ষেত্রে আমরা বিভিন্ন কৌশল নিয়ে এগোচ্ছি। আশা করছি, আগামী পাঁচ-দশ বছরের মধ্যে প্রতিটি পরিবার কোনো না কোনোভাবে আনুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অংশ হবে। এজেন্ট ব্যাংকিং, মাইক্রোক্রেডিট ও অটোমেশনের মাধ্যমে আমরা এ প্রচেষ্টাকে তাদের দ্বারে দ্বারে পৌঁছে দেব। স্মার্টফোনকে আমরা আরো সহজলভ্য করতে ব্যবস্থা নিয়েছি। ৫-৬ হাজার টাকার মধ্যে একটি স্মার্টফোন ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়ার কাজ করছি। এক্ষেত্রে আমরা জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) সহযোগিতা পাচ্ছি। ব্যাংকগুলোর সঙ্গেও কথা বলেছি। এর মাধ্যমে আমরা সবাইকে আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যাংক খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে পারব।

দেশের হাজার হাজার কোটি টাকা লুট করে বিদেশে নিয়ে গেছে যারা, তাদের বিষয়ে আমরা অনেক দূর এগিয়েছি। পরবর্তী সরকারকেও বিষয়টি এগিয়ে নিতে হবে। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক আপস করলে দেশের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং ভুল উদাহরণ তৈরি হবে। নাগরিক হিসেবে আমাদের দাবি—যারা দেশের সম্পদ লুট করেছে, তাদের কাউকে ছাড় দেয়া যাবে না।

প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নের অংশ হিসেবে এবং ভবিষ্যতে অর্থ পাচার রোধে বা অর্থনৈতিক অপরাধ দমনে আমরা একটা প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে যাচ্ছি। প্রতিষ্ঠানটি অনেকটা যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সির মডেলে গঠন করা হবে। এর কাজ হবে যারা এ ধরনের অপরাধ করবে তাদের দায়বদ্ধ করা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনা। এর বাইরে আমরা ফরেনসিক অডিট করার কার্যক্রম শুরু করেছি। এরই মধ্যে কিছু ট্রেনিংয়ের কাজ শুরু হয়েছে। শিগগিরই আমরা এ অডিট সম্পন্ন করতে পারব।

আমাদের জীবদ্দশায় অনেক আন্দোলন-অভ্যুত্থান দেখলাম। কিন্তু এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ প্রয়োজন। বর্তমান সরকার আংশিকভাবে হলেও যেসব সংস্কার করছে, পরবর্তী সরকার তা এগিয়ে নেবে এটাই দাবি। জবাবদিহি, স্বচ্ছতা, ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখা, প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নের সংস্কৃতি গড়ে তোলা হবে—এটাই প্রত্যাশা। আমরা বারবার অভ্যুত্থান দেখতে চাই না। চব্বিশের অভ্যুত্থানের অনুপ্রেরণা যেন আগামী দিনের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত হয়।

ড. আহসান এইচ মনসুর: বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর

[‘অর্থনীতির ভবিষ্যৎ পথরেখা ও রাজনৈতিক অঙ্গীকার’ প্রতিপাদ্যে অনুষ্ঠিত অর্থনৈতিক সম্মেলনে চেয়ার হিসেবে রাখা বক্তৃতায়]

আরও