করোনার অভিঘাত

কেন বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে?

ব্যাহত হওয়া সরবরাহ নিগড় সাংঘাতিকভাবে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বিভিন্ন ধরনের পণ্য ও সেবা সরবরাহ বিলম্বিত হচ্ছে এবং ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। যেভাবে ভোগ্যপণ্য থেকে শুরু করে সেমিকন্ডাক্টরসহ বিভিন্ন মধ্যবর্তী পণ্য এবং সেগুলোর ওপর নির্ভরশীল চূড়ান্ত পণ্যে সংকট দৃশ্যমান, তাতে মনে হচ্ছে এটা একটা যুদ্ধ পরিস্থিতি। সাধারণত

ব্যাহত হওয়া সরবরাহ নিগড় সাংঘাতিকভাবে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বিভিন্ন ধরনের পণ্য সেবা সরবরাহ বিলম্বিত হচ্ছে এবং ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। যেভাবে ভোগ্যপণ্য থেকে শুরু করে সেমিকন্ডাক্টরসহ বিভিন্ন মধ্যবর্তী পণ্য এবং সেগুলোর ওপর নির্ভরশীল চূড়ান্ত পণ্যে সংকট দৃশ্যমান, তাতে মনে হচ্ছে এটা একটা যুদ্ধ পরিস্থিতি। সাধারণত কেবল যুদ্ধকালীন অর্থনীতিতে ধরনের বিপর্যয় দেখা যায়, অথচ বাস্তবে ধরনের কোনো যুদ্ধাবস্থা নেই। কাজেই বর্তমান পরিস্থিতি অনেক দিক থেকে অদ্ভুত, বিস্ময়কর।

প্রকৃত প্রস্তাবে চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি ব্যাপকভাবে বাড়বে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছিল। কিন্তু সেই প্রাক্কলন ভুল প্রমাণ হয়েছে। বরং তার পরিবর্তে সরবরাহ বিপর্যয়ের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি বেকায়দায় পড়েছে। সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত যে হতে পারে সে বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা যথাযথভাবে সংকেত দিতে ব্যর্থ হয়েছেন। অবশ্য প্রভাবশালী সামষ্টিক অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করেছিলেন যে ব্যাপক সম্প্রসারণমূলক মুদ্রানীতি, বেড়ে চলা পারিবারিক সঞ্চয়ের স্থিতি, দমিত চাহিদা রাষ্ট্রের ব্যাপক আর্থিক ব্যয় তাত্পর্যজনকভাবে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বাড়াবে। তাদের পূর্বাভাসে (যা বেশ দূরদর্শী মনে হয়) ইঙ্গিত মেলে যে তারল্য অসার সম্পদ দাম-সৃষ্ট সামষ্টিক চাহিদার উল্লম্ফন সরবরাহকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। তবে ভারসাম্যহীনতা কতদিন থাকবে, সেই সময়টা কেউ বলতে পারেননি। অনেকে বলেছেন, সরবরাহ ব্যাহত হওয়াজনিত মূল্যস্ফীতি হবে সাময়িক

তবে বৈশ্বিক সরবরাহ নিগড়ে অংশগ্রহণকারীরা বারবার অনুমান করছেন যে ঘাটতি, অচলাবস্থা এবং সরবরাহ চাহিদার মধ্যকার ভারসাম্যহীনতা ২০২২ সালের পরেও থাকবে এবং সম্ভবত তা আরো দীর্ঘ হবে।

এটা মনে হয় স্পষ্ট যে কিছু তাত্পর্যজনক সময়ের জন্য বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সরবরাহ দ্বারা ব্যাহত হবে, ২০০৮ সালের আর্থিক সংকটের পর যেমনটা হয়েছিল। চাহিদায় উল্লম্ফন মহামারীর মাঝামাঝিতে করা পূর্বাভাসের চেয়ে বড় হতে পারে বলে ইঙ্গিত দেয়া হলেও মহামারীকালীন পুনরুদ্ধারে এটিই ছিল উচ্চ প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলনের ভিত্তি।

এটি সরবরাহ দিকের দুটো মৌলিক প্রশ্নকে আরো বড় মাত্রায় হাজির করে। প্রথমত, মহামারী-সংক্রান্ত অচলাবস্থা শেষ হওয়ার পরও আর কোনো সরবরাহ বাধা বজায় থাকবে কিনা? দ্বিতীয়ত, বৈশ্বিক সরবরাহ নিগড়ের ফাংশনিং কনফিগারেশনে কোনো ঘাটতি আছে কিনা; যা সরবরাহ রেসপন্স ব্যাহত করে?

যে কেউ যুক্তিসংগতভাবে বলতে পারেন যে কিছু সরবরাহ ফ্যাক্টরে মহামারী মধ্যমেয়াদি পরিবর্তন এনেছে। মহামারী সাপোর্ট ম্যাকানিজম চালিয়ে যাওয়া সত্ত্বেও অনেক কর্মীই শ্রমবাজার থেকে ঝরে পড়েছেন কিংবা তাদের পুনঃপ্রবেশ বিলম্বিত হয়েছে, হচ্ছে। মহামারীর চূড়ান্ত সময়ে দেখা গেছে কাজ করা স্বাস্থ্যকর্মীর মতো ব্যাপক চাপযুক্ত বা বিপজ্জনক অবস্থায় কাজ করা কর্মীরা অনেক চাপে পড়েছিলেন। অনেক কার্গো কর্মীকে কয়েক মাস পর্যন্ত জাহাজে আটকা পড়তে হয়েছিল।

এখন যদি স্বাস্থ্যের মতো সম্মুখসারির ধরনের পদ-পেশা গ্রহণ করতে হয়, তাহলে তারা সম্ভব আরো ভালো পারিশ্রমিক কর্মপরিবেশ পরিবর্তনের বিষয়টি দাবি করবেন। একইভাবে মহামারীতে যারা ওয়ার্ক ফ্রম হোমে চলে গিয়েছিলেন, তাদের অনেকেই পূর্ণকালীন অফিসে ফিরতে বাধার মুখে পড়ছেন। চাহিদা প্রাধিকারে ধরনের রূপান্তর দীর্ঘমেয়াদি কিছু অজানা প্রভাবসহ শ্রমবাজারের অনেক অংশে সরবরাহ দিকের পরিবর্তন ইঙ্গিত দেয়।

কিন্তু শ্রম সরবরাহে প্রভাবের বিষয়টি গল্পের একটি অংশ মাত্র। এখানে আরো বিষয় আছে। আমরা জানতাম যে চাহিদায় উল্লম্ফন আসছে। কেন তাহলে বৈশ্বিক সরবরাহ নিগড় ধসে পড়ল? এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

এর একটি কারণ হলো মহামারীর আগে থেকেই চাহিদা বাড়ছিল। কিন্তু মহামারীতে মানুষ তাতে অনেকটা নিয়ন্ত্রণ আনে। ফলে সময়ে চাহিদা কিছুটা ভাটা পড়ে। তবে সংক্রমণ অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে আসার পর চাহিদা যেহেতু বাড়তে শুরু করেছিল সেহেতু মহামারী-সংক্রান্ত ডিজরাপশন প্রধান বন্দরগুলো ম্যানুফ্যাকচারিং ফ্যাসিলিটিজগুলোয় প্রভাব ফেলে। প্রেক্ষাপটে চাহিদা অনুপাতে সরবরাহ নিশ্চিত করাটা কঠিন হয়ে পড়ে এবং তাতে সাপ্লাই রেসপন্স নিষ্প্রভ হয়ে পড়ে।

আরেকটা ফ্যাক্টর হলো যে ব্যবস্থার পিক লোড সিস্টেমের বাইরে গিয়ে মনে হয় চাহিদা বেড়েছে। ওই ক্যাপাসিটি বাড়াতে প্রয়োজন বিনিয়োগ এবং আরো বেশি সময়। তবে পিক লোড ক্যাপাসিটি বিদ্যুতের মতো সেবায় (যেগুলো সংরক্ষণ, মজুদ করা কঠিন) গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটি পণ্য, চাহিদার ক্ষেত্রে কম গুরুত্বপূর্ণ, যেটি অবশ্যই একটি সুসমন্বিত কার্যকর ব্যবস্থার মাধ্যমে সামলাতে হয়; যে ব্যবস্থা সঠিকভাবে অনুমান করতে অর্ডার ফ্লো ছড়িয়ে দিতে সমর্থ।

এখানেই সমস্যা লুকিয়ে। দক্ষতা সর্বোচ্চ এবং অপচয় দূর করতে বৈশ্বিক সরবরাহ নেটওয়ার্কবর্তমানে যেভাবে গঠিত হয়বেশ জটিল, বিকেন্দ্রীভূত, সুসমন্বিতভাবে কঠোর। তবে অ্যাপ্রোচ স্বাভাবিক সময়ে কাজ করলেও এটি বড় বড় অভিঘাত সামলাতে পারে না। তার ওপর বিকেন্দ্রীকরণ বিশেষ করে স্থায়িত্বশীলতা নিশ্চিতের ক্ষেত্রে নিম্ন বিনিয়োগ ঘটায়। কারণ ধরনের বিনিয়োগের ওপর প্রাইভেট রিটার্ন সিস্টেমওয়াইজ রিটার্ন বা সুফলের চেয়ে অনেক কম।

বিকেন্দ্রীকরণের আরেকটি ফল বেশ সূক্ষ্ম এবং সম্ভবত আবহাওয়ার পূর্বাভাসের তুলনা দিয়ে সেটি খুব সহজেই ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। যদিও আবহাওয়া অবিশ্বাস্য রকম জটিল আন্তঃসংযুক্ত ব্যবস্থা, তবে সময়ান্তরে পূর্বাভাস অব্যাহতভাবে সংক্ষিপ্ত অনেকটা নির্ভুল হয়েছে। এজন্য বায়ু, বায়ুমণ্ডলীয় সাগরের তাপমাত্রা, মেঘ গঠনের মতো মিথস্ক্রিয়াকারী সংশ্লিষ্ট ফ্যাক্টরগুলো নির্ণয়ে সক্ষম ব্যাপক জটিল মডেলগুলো অবশ্যই ধন্যবাদ প্রাপ্য।

বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থাও সমরূপভাবে জটিল। ব্যবস্থায় বৃহত্তর প্রবণতাগুলো (যেমন চাহিদা বাড়বে কিনা) অনুমান করতে আমরা সমর্থ হলেও কীভাবে এসব প্রবণতা সরবরাহ নিগড়ের সুনির্দিষ্ট উপাদানে প্রভাব ফেলতে পারে, সেটি যথাযথভাবে অনুমানে সমর্থ এমন কোনো মডেল নেই। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে, কীভাবে বাজার অংশগ্রহণকারীরা তাদের আচরণ সমন্বয় করতে পারে, এটা বলা ছাড়া নতুন বাধাগুলো কোথায় সংঘটিত হবে, সেটি জানার কোনো উপায় নেই।

যখন পূর্বাভাসগুলো কর্মযোগ্য-কার্যকর হওয়ার জন্য যথেষ্ট সুনির্দিষ্ট না হয়, তখন সরবরাহ ব্যবস্থা সময়মতো কিংবা দক্ষতার সঙ্গে অভিযোজন করতে পারে না। তদুপরি যেহেতু এতে তুলনামূলক কম পরিসর-ফুরসত থাকে, সেহেতু স্বাভাবিক ধরন থেকে বড় বিচ্যুতি বিলম্বিত সাড়া, ঘাটতি, অচলাবস্থা প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেআজকে আমরা যেমনটা দেখছি।

সুতরাং এখানে করণীয় স্পষ্ট। অভিঘাতে যথাযথভাবে সাড়া দেয়ার জন্য  সরবরাহ শৃঙ্খলের নাজুকতা নির্ণয় পূর্বাভাস ব্যবস্থার উন্নয়নে আরো ভালো মডেল দরকার। অধিকন্তু ওইসব পূর্বাভাস প্রকাশ্যে সহজলভ্য হতে হবে, যাতে সব অংশগ্রহণকারী সেগুলো দেখতে পারেন এবং অভিযোজন করতে পারেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্ভবত এক্ষেত্রে সাফল্যের চাবিকাঠি হবে। প্রকৃতপক্ষে এটিই প্রযুক্তির স্বাভাবিক অ্যাপ্লিকেশনের শক্তি। তবে সাপ্লাই চেইন নেটওয়ার্কে উৎপাদিত রিয়েল টাইম ডাটা বিনিময়সহ আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও সমানভাবে প্রয়োজন হবে। হারিকেন কিংবা সুনামির ক্ষয়ক্ষতি ব্যাপকভাবে কমানো যায়, যখন নির্ভুল পূর্বাভাসগুলো মানুষকে সামনের পরিকল্পনা গ্রহণে সমর্থ করে তোলে। সরবরাহ ব্যবস্থার ব্যাঘাতও তার ব্যতিক্রম নয়।

[স্বত্ব:
প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
]

 

মাইকেল স্পেন্স: নোবেলজয়ী মার্কিন অর্থনীতিবিদ, ইমেরিটাস অধ্যাপক স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি, হুভার ইনস্টিটিউশনের সিনিয়র ফেলো

ভাষান্তর: হুমায়ুন কবির

আরও