কিছুদিন
আগে আমরা জানলাম বিবিসি বাংলা রেডিও সার্ভিস বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং করপোরেশন (বিবিসি)। আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি বা মার্চের দিকে এটি বাস্তবায়ন হবে। এতে আশ্চর্যজনকভাবে জনগণের যে প্রতিক্রিয়াটি হয়েছে তাতে বোঝা যায়, এটি কত দরদি প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠেছিল। মানুষের মনের বিশাল পরিসরে এর স্থান ছিল। কী কারণে এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে সেটি আমরা কমবেশি সবাই জানি। আর্থিক চাপ সামলাতে গিয়ে কর্তৃপক্ষ এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে খুব সবল, নিরপেক্ষ, স্বাধীন এবং বিশেষ বিশেষ সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে বিবিসি রেডিও। আমি নিজে ‘গণমাধ্যম ও ১৯৭১’ বই লেখার সময় দেখেছি মুক্তিযুদ্ধের সময় বিবিসির পরিসর ছিল সবচেয়ে ব্যাপক, মানুষ সে সময়ে সবচেয়ে বেশি বিবিসি শুনেছে। বিবিসি দুনিয়ার সব খবর এক জায়গায় এনেছে।
মুক্তিযুদ্ধে বিবিসি বাংলার ভূমিকা ছিল অনেক বড়। বিবিসি বাংলা সব খবর এক করে নিয়েছে এবং এসব খবর তারা বাংলা সার্ভিসে চালিয়েছে। মানুষ আন্তর্জাতিক দুনিয়ার তথ্য পেয়েছে বিবিসি বাংলা থেকে। এছাড়া ছিল স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। তাদের কাছ থেকেও মানুষ তথ্য পেয়েছে। কিন্তু স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের চরিত্র ছিল সংগ্রামী রাষ্ট্রের। কিন্তু বিবিসি বাংলা তুলে ধরেছে আন্তর্জাতিক দুনিয়া বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে কীভাবে দেখছে, সেটি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রতি বিভিন্ন রাষ্ট্রের সমর্থন কতটা রয়েছে সেটিও তারা তুলে ধরেছে। যে মানুষটার কথা সবাই বলেছে তার নাম মার্ক টালি। মার্ক টালি স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে এসেছিলেন। বিবিসির চেয়ে সবল ভিত্তি এখানে আর কারো ছিল না। সে সময় ভয়েস অব আমেরিকা ছিল, কিন্তু বিবিসির কাছাকাছি তারা ছিল না। তাদের উপস্থাপনার ধরন, ঘটনার বর্ণনা, নিরপেক্ষতা ইত্যাদি প্রশ্নে বিবিসি মানুষের আস্থা অর্জন করতে সমর্থ হয়েছিল।
স্বাধীনতার পর গণমাধ্যমের সঙ্গে সরকারের বা রাষ্ট্রের সম্পর্ক কোনো দিনই সুস্থ ছিল না। আমাদের গণমাধ্যম রাজনৈতিক এবং আমাদের সরকারও গণমাধ্যমকে রাজনৈতিক চোখ দিয়ে দেখে। যার ফলে এটা প্রতিপক্ষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছে। প্রশ্ন হলো, এখানে বিবিসির সুবিধাটা কি ছিল? বিবিসি কোনোদিনই রাষ্ট্রের প্রতিপক্ষ ছিল না। বিবিসি যেহেতু একটি বিদেশী সংবাদ সংস্থা এবং বাংলাদেশের রাজনীতিতে তার কোনো ভূমিকা নেই—সেহেতু বিবিসি খুব স্বাচ্ছন্দ্যে কেবল সংবাদগুলো দিয়ে গেছে। শুধু তথ্যগুলো দিয়েছে এবং তথ্যগুলোই যথেষ্ট ছিল। তথ্যের আধার হিসেবে বিবিসিই ছিল প্রধান, যেটা দীর্ঘদিন ধরেই প্রধান ছিল।
১৯৭৩ সালে একটা টেলিগ্রাম বের করার কারণে দৈনিক বাংলা থেকে তোয়াব খান ও হাসান হাফিজুর রহমান দুজনেরই চাকরি চলে গেল। কারণ তারা ওই পত্রিকায় রীতিমতো পলিটিক্যাল অ্যাক্টিভিস্টের মতো কাজ করেছিলেন। বিবিসি সে খবরটা দেয়নি, বিবিসি বলেছে গুলি হয়েছে, এতজন মারা গেছে, এই হয়েছে ইত্যাদি। পরে বলেছে যে এ কারণে
দুজন সাংবাদিককে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। এর ফলে মানুষ দুটি ঘটনার মধ্যে আলাদা বিচার করতে শিখেছে। মানুষ জানত, বিবিসিতে গেলে তথ্য পাওয়া যাবে, আর অন্যখানে গেলে মন্তব্য পাওয়া যাবে। বিবিসির জন্য এ মন্তব্যহীন সাংবাদিকতা ছিল সবচেয়ে বড় অর্জন। তারা এটা ধরে রাখতে পেরেছে; কারণ বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাদের কোনো আগ্রহ ছিল না। পরবর্তী সময়ে বিবিসি এটাকে সবল করেছে এবং বিভিন্ন সময় যারা সাংবাদিক হিসেবে বিবিসিতে কাজ করেছেন তারা খুব সহজে এ কালচারের সঙ্গে পরিচিত হয়ে গেছেন। এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে তারা হাঁটতে শিখেছেন।
আমি বিবিসির করেসপন্ডেন্ট ছিলাম, আমরা অন্যদের কাছ থেকে মন্তব্য নিতাম। কিন্তু আমাদের মন্তব্য কোনো দিন দিতাম না। একটা ঘটনা নিয়ে আমার সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল। শেখ হাসিনা যখন বিরোধীদলীয় নেত্রী ছিলেন, তখন তিনি একদিন বলেছিলেন তিনি ক্ষমতায় এলে কৃষকের ঋণ মাফ করে দেবেন। এখান থেকে খাজনা উঠিয়ে দেবেন। আমি রিপোর্ট করেছিলাম, কিন্তু মন্তব্য দিইনি। আমি বলেছিলাম, এতে দাতা সংস্থারা আপত্তি জানাবে। দাতা সংস্থারা সবসময় আপত্তি জানিয়েছে, যেটা এখন আমরা দেখতে পাচ্ছি। আইএমএফ বলছে তোমরা ভর্তুকি উঠিয়ে দাও। কিন্তু তারা ভাবলেন আমি মন্তব্য করেছি। এর কারণ হচ্ছে বাংলাদেশের গণমাধ্যম সারা বছর মন্তব্য করে। আমার লাইনটি মন্তব্যের অংশ ছিল না, এটা ছিল যে এ জায়গায় দাতা সংস্থারা আপত্তি করবে। দাতা সংস্থারা ভর্তুকির ব্যাপারে সবসময়ই আপত্তি করে। এখনো আপত্তি করেছে। ৩০/৪০ বছর আগের সে কথাটা এখনই প্রমাণ হচ্ছে, আমরা শুধু তথ্য দিয়েছি। এ তথ্য দেয়ার ফলে বিবিসির বিশাল একটা পরিসর তৈরি হয়েছে। রাজনীতির মধ্যে তাদের কোনো আমল নেই, তারা কারও পক্ষেও না, বিপক্ষেও না। এটাই ছিল বড় সুবিধা, এটাই ছিল বড় অর্জন। গণমাধ্যমের জন্য এটা বড় শিক্ষা। কারণ বিবিসি যারা প্রতিষ্ঠা করেছে তারা জানে মন্তব্যমুক্ত সংবাদ খুব প্রয়োজন।
গণমাধ্যমের ক্রান্তিকালে সবচেয়ে বড় আঘাত হানল বিবিসি। রেডিওর বদলে এখন সব ধরনের গণমাধ্যম রয়েছে। বিবিসি শুধু রেডিও দিয়ে চলতে পারবে না। বিবিসি এখন চলে গেছে মাল্টিমিডিয়ায়, যেখানে সবই থাকবে। কিন্তু ইতিহাসের একটা সময়ে বিবিসি রেডিওর যে বড় ভূমিকা ছিল, তা অস্বীকার করা যাবে না। পরবর্তী সময়ে নতুন গণমাধ্যম এসেছে, পরিসর বেড়েছে। কিন্তু কনটেন্টের ট্রিটমেন্টের ক্ষেত্রে বিবিসি যে শিক্ষাটা বারবার দিয়ে যাচ্ছে—আমরা যদি মন্তব্যমুক্ত, রাজনীতিমুক্ত তথ্য দিই, জনগণ অংশগ্রহণ করবে, জনগণ নেবে। এর ফলে সবচেয়ে জনপ্রিয় হয়তো হবে না, কিন্তু সবচেয়ে নির্ভরশীল গণমাধ্যম হবে। বিবিসির এ মডেল, অর্জন ও শিক্ষা সবচেয়ে বড়। এটা আমাদের অনুসরণ করা উচিত।
বিবিসি সবসময় স্বাধীন প্রতিষ্ঠান ছিল। বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস যুক্তরাজ্য সরকারের টেলিভিশন লাইন্সেস ফিয়ের অর্থে পরিচালিত হতো। কিছু অর্থ আসত বিজ্ঞাপন ও বিবিসি স্টুডিও পরিচালনার মুনাফা থেকে। যুক্তরাজ্যের ফরেন অ্যান্ড কমনওয়েলথ অফিস থেকে সহায়তা দিয়ে আসছে দশকের পর দশক। কিন্তু বর্তমানে তার আয়ের ওপর আঘাত এসেছে। ফলে বিবিসিকে কর্মচ্যুতি থেকে শুরু করে বিভিন্ন অনুষ্ঠান বন্ধ করতে হচ্ছে। অনেক দিন ধরে এর আলাপ চলছে, কিন্তু করোনার আঘাতের কারণে এটি ত্বরান্বিত হয়েছে। প্রচুর বিলেতি গণমাধ্যম বন্ধ হচ্ছে, বিবিসি টিভি থেকে অনেকের চাকরি চলে যাচ্ছে।
আমাদের দেশে বিবিসিকে রেডিও হিসেবে দেখি, কিন্তু ব্রিটেনে বিবিসি টেলিভিশনটাই মুখ্য। সেখানেও প্রচুর মানুষের চাকরি যাচ্ছে, ছাঁটাই হচ্ছে। কারণ আর্থিক টানাপড়েন। সব ভাষার গণমাধ্যম বিবিসি বন্ধ করেনি, তবে বাংলাটা করছে। আরো কয়েকটি সার্ভিস তারা বন্ধ করছে। বাংলাদেশের যে অবস্থা, তাতে বিবিসি ভাবছে সনাতনী রেডিও দিয়ে এখানে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব নয়। এজন্য বিবিসি বাংলা রেডিও বাদ দিতে যাচ্ছে। তারা অনলাইনে সংবাদ পরিবেশ করবে নিয়মিত।
বিজনেস মডেল হিসেবে বিবিসি ব্যর্থ হওয়ার প্রসঙ্গে যদি বলি—এটি চলছিল খয়রাতি অর্থে। সেটা ষাট, সত্তর, আশির দশক পর্যন্ত ছিল। নব্বইয়ের দশকে এসে এর দুর্বলতা প্রকাশ পেতে থাকে। তারা বুঝেছে, ষাটের দশকের মডেল দিয়ে ২০২২ সালে টিকে থাকা যাবে না। অন্যান্য ব্যবসার মতো গণমাধ্যমও ভোক্তানির্ভর। এটি টিকিয়ে রাখতে যে পরিমাণ ভোক্তা দরকার, তা আসছে না। তাই বিবিসির এ রূপান্তর। অনলাইনে বিজ্ঞাপন দিয়ে তারা আয় বাড়াবে। এখন মিডিয়ার প্রতিযোগিতা সোশ্যাল মিডিয়ার সঙ্গে। সব খবরই আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলে আসছে। সত্য, মিথ্যা ইত্যাদি ইত্যাদি। কেউ যদি ঘটনা ঘটার সময়ই খবর পেয়ে যায় সে কেন সাড়ে ৭টার জন্য বসে থাকবে। এটিই মূল বিষয়। এখানেই প্রতিযোগিতা রূপ নিয়েছে। খবর আগে দিতে হবে, তবে সেটি অবশ্যই শতভাগ অথেনটিক হতে হবে। এমন পরিপ্রেক্ষিতে বিবিসি খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করেছে। কিন্তু খাপ খাওয়াতে পারেনি।
মানুষের কাছে এখন অনেক পছন্দ আছে, মানুষ কম্পিউটারে খবর দেখে, স্মার্টফোনে খবর দেখে। এ রকম পরিস্থিতিতে পুরনো ধাঁচের রেডিও শোনার জন্য কেউ অপেক্ষা করবে না। এ মডেল আর চলবে না। সময়ভিত্তিক ব্রডকাস্ট চলে না। মানুষের যখন দরকার, তখন তিনি সেটা শুনতে চাইবেন। এটি হচ্ছে অনলাইন। এখন বিবিসি অনলাইনে যাবে। এতে তারা টিকে থাকবে। তবে সত্তর ও আশির দশকে বিবিসি যে বিশাল পরিসর নিয়ে প্রধান ভূমিকায় ছিল সেটা আর থাকবে না। সেটা হয়তো কারো পক্ষে থাকা সম্ভব না। যেটা থাকবে সেটা হলো স্থানীয় গণমাধ্যম। স্থানীয় গণমাধ্যম অনেক বিশাল হয়ে গিয়েছে। সেটা হয়তো অনেক সময় নিরপেক্ষ রিপোর্ট করে না, কোয়ালিটি রিপোর্ট করে না। কিন্তু তারা বড় হয়ে গিয়েছে, এটাই হলো বিষয়।
আফসান চৌধুরী: গবেষক, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ও বিবিসি বাংলার সাবেক কর্মী