বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল মেগাসিটিগুলোর একটি যেখানে জলাবদ্ধতা একটি গুরুতর সংকট হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, যা অপর্যাপ্ত নিষ্কাশন ব্যবস্থা, প্রাকৃতিক জলপথের দখল এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের ফলে দিন দিন আরো প্রকট হয়ে উঠছে। ঐতিহাসিকভাবে, ঢাকায় প্রাকৃতিক নিষ্কাশন চ্যানেল, জলাভূমি ও জলধারণক্ষম অঞ্চলগুলোয় একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্ক বিদ্যমান ছিল, যা অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি দক্ষতার সঙ্গে নিষ্কাশনে সহায়ক ভূমিকা রাখত। কিন্তু অপরিকল্পিত নগর সম্প্রসারণের কারণে এসব প্রাকৃতিক জলাধার ও নিষ্কাশন পথ উল্লেখযোগ্যভাবে সংকুচিত বা বিলুপ্ত হয়ে গেছে, ফলে ভারি বৃষ্টিপাতে শহরের অধিকাংশ অংশেই জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। জলাবদ্ধতার কারণে যানবাহন চলাচলে বিঘ্নতা ঘটে, সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি ও জলবাহিত রোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে। জলাবদ্ধতার এ বহুমাত্রিক প্রভাব ঢাকার অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা, জনস্বাস্থ্য এবং সামগ্রিক জীবনমানকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করছে। এ প্রতিবেদনে ঢাকার নিষ্কাশন ব্যবস্থার বর্তমান অবস্থা উপস্থাপন করা হয়েছে, জলাবদ্ধতার প্রধান সংকটপূর্ণ এলাকা ও অন্তর্নিহিত কারণগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে এবং ঢাকার নিষ্কাশন নেটওয়ার্ক, ঐতিহাসিক বন্যার ধরন এবং নগর পরিকল্পনার তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণের ভিত্তিতে বাস্তবভিত্তিক সুপারিশমালা প্রদান করা হয়েছে।
ঢাকা শহরের নিষ্কাশন ব্যবস্থা
ঢাকা মহানগরের বৃষ্টির পানি পশ্চিমে তুরাগ নদী, দক্ষিণে বুড়িগঙ্গা, পূর্বে বালু নদী ও উত্তরে টঙ্গী খালে গিয়ে মিশে। ভৌগোলিক অবস্থার ভিত্তিতে শহরের নিষ্কাশন অববাহিকা তিন ভাগে বিভক্ত: পশ্চিম ঢাকা, পূর্ব ঢাকা ও ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-ডেমরা (ডিএনডি) এলাকা। ফ্লাড অ্যাকশন প্ল্যান (FAP-8A) অনুযায়ী পশ্চিম ঢাকায় ১৬টি এবং পূর্ব ঢাকায় তিনটি প্রধান নিষ্কাশন অঞ্চল নির্ধারিত হয়েছে। অন্যদিকে ঢাকা ওয়াসার মাস্টারপ্ল্যান ২০১৬-তে পুরো মেগাসিটিকে ১৩টি পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাপনা অঞ্চলে এবং সেগুলোকে আরো কয়েকটি উপ-অববাহিকায় ভাগ করা হয়েছে। বর্তমানে শহরে প্রায় ৪৫টি প্রাকৃতিক খাল রয়েছে, যেগুলোর দৈর্ঘ্য প্রায় ১৪২ কিলোমিটার। কিন্তু অধিকাংশ খাল দখল ও দূষণের কারণে কার্যকারিতা হারিয়েছে। এছাড়া প্রায় ৩৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন লাইন, ৮ দশমিক ৭৫ কিলোমিটার বক্স কালভার্ট এবং অসংখ্য উন্মুক্ত নালা ও ড্রেন মিলে বর্তমান ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক গঠিত হয়েছে। এ লাইনগুলো ইট ও কংক্রিট নির্মিত এবং ব্যাস দশমিক ৬ থেকে ৩ মিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। পশ্চিম ঢাকাকে নদীজনিত বন্যা থেকে রক্ষায় তুরাগ ও বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। এ বাঁধে দুটি বড় পাম্পিং স্টেশন (কল্যাণপুর ও গোরানচাটবাড়ি) রয়েছে, যাদের সম্মিলিত ধারণক্ষমতা প্রায় ৪২ ঘনমিটার/সেকেন্ড। পূর্ব ও দক্ষিণাংশে রামপুরা, কমলাপুর ও মিল ব্যারাকে স্থায়ী পাম্পিং স্টেশন স্থাপন করা হয়েছে, যেগুলো যৌথভাবে প্রায় ৬২ ঘনমিটার/সেকেন্ড পানি অপসারণ করতে পারে। এছাড়া প্রগতি সরণি প্রতিরক্ষামূলক বাঁধের ভূমিকা পালন করে এবং এখানে ১৩টি পানি নির্গমন পথ রয়েছে। তবে দ্রুত নগরায়ণ, খাল ভরাট ও নিম্নাঞ্চল দখল হয়ে যাওয়ায় প্রাকৃতিক নিষ্কাশন ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে। ফলে ভারি বর্ষণে বিদ্যমান অবকাঠামো পর্যাপ্ত না হওয়ায় জলাবদ্ধতা একটি স্থায়ী নগর সংকটে পরিণত হয়েছে।
ঢাকার জলাবদ্ধতা প্রবণ এলাকাগুলো
ঢাকায় বিশেষ করে জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত দীর্ঘ বর্ষা মৌসুমে অতি বৃষ্টিপাতের কারণে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ঢাকায় ৬ ঘণ্টার মধ্যে ১৩০ মিমি বৃষ্টিপাত হয়। ফলে উল্লেখযোগ্য নগর বন্যা দেখা দেয়। ২০০৪ সালের সেপ্টেম্বরে ঐতিহাসিক বৃষ্টিপাত হয়েছিল; ৮ ঘণ্টার মধ্যে ঢাকায় ৩৪১ মিমি বৃষ্টিপাত হয়। একইভাবে, ২০০৯ সালের ২৮ জুলাই ৩৩৩ মিমি বৃষ্টিপাত হয়, যার মধ্যে ৬ ঘণ্টায় প্রায় ২৯০ মিমি বৃষ্টিপাত হয়, যা শহরে তীব্র পানি নিষ্কাশন সমস্যা সৃষ্টি করে। ঢাকার বেশকিছু এলাকা জলাবদ্ধতার ঝুঁকিতে রয়েছে, কারণ এসব এলাকার ভূমি নিচু, নিষ্কাশন ব্যবস্থা অপর্যাপ্ত এবং প্রাকৃতিক জলাশয়গুলো দখলের কারণে পানিপ্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলগুলোর মধ্যে রয়েছে: কল্যাণপুর, মিরপুর ও মোহাম্মদপুর, রামপুরা, বাড্ডা, পুরান ঢাকা ও ধোলাইখাল, গুলশান, বনানী ও নিকুঞ্জ, ডিএনডি (ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-ডেমরা) এলাকা, উত্তরা ও বিমানবন্দর রোড, যাত্রাবাড়ী ও শনির আখড়া, নিউমার্কেট, গ্রিন রোড এলাকা, মতিঝিল, নটর ডেম কলেজ এলাকা ইত্যাদি।
ঢাকায় জলাবদ্ধতার কারণ
ঢাকার অনেক প্রাকৃতিক নালা, যেগুলো স্থানীয়ভাবে খাল নামে পরিচিত, অবৈধভাবে দখল ও ভরাট করে জমি উন্নয়নের কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, বেগুনবাড়ি খাল ও ধোলাইখাল—যেগুলো একসময় শহরের প্রধান নিষ্কাশন নালা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। বর্তমানে উল্লেখযোগ্যভাবে তাদের ধারণক্ষমতা হারিয়েছে। এসব প্রাকৃতিক নিষ্কাশন পথ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ফলে ভূপৃষ্ঠে পানি জমে থাকার প্রবণতা বেড়েছে, যা শহরের বন্যার ঝুঁকি বহুগুণে বৃদ্ধি করেছে।
কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: প্লাস্টিক, নির্মাণসামগ্রী এবং গৃহস্থালির আবর্জনা প্রায়ই সরাসরি পানি নিষ্কাশন পথগুলোয় ফেলা হয়। ফলে গুরুতর প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে বস্তি এলাকাগুলোয় বর্জ্য সংগ্রহ ব্যবস্থার ঘাটতি এ পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তোলে। ভারি বৃষ্টিপাতের সময় এসব প্রতিবন্ধকতাযুক্ত নিষ্কাশন পথগুলো পানি নিষ্কাশনে ব্যর্থ হয়। ফলে শহরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোয় তীব্র জলাবদ্ধতা দেখা দেয়।
অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং ভূমি ব্যবহারের পরিবর্তন: অনিয়ন্ত্রিত নগর উন্নয়নের ফলে বহু জলাভূমি এবং পুকুর বিলুপ্ত হয়েছে, যেগুলো অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি শোষণে একসময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। হাতিরঝিল ও গুলশান লেক প্রকল্প, যা মূলত জলধারণ এলাকা হিসেবে পরিকল্পিত ছিল, সেগুলোও দখলের শিকার হয়েছে। ফলে বৃষ্টির পানি ব্যবস্থাপনায় এ জলাশয়গুলোর কার্যকারিতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে।
অপর্যাপ্ত নিষ্কাশন অবকাঠামো: ঢাকার বিদ্যমান বৃষ্টির পানির নিষ্কাশন ব্যবস্থায় ৪৫টি প্রাকৃতিক খাল (১৪২ কিমি), ৩৮০ কিমি বৃষ্টির পয়োনিষ্কাশন লাইন এবং ৮ দশমিক ৭৫ কিমি বক্স কালভার্ট রয়েছে, যা ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা এবং পরিবর্তিত জলবায়ু পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য অপর্যাপ্ত। অনেক নিষ্কাশন লাইনের রক্ষণাবেক্ষণ খুব খারাপ এবং ভবিষ্যতের চাহিদা মেটাতে ব্যবস্থাটি সম্প্রসারণে বিনিয়োগের অভাব রয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তন ও বর্ধিত বৃষ্টিপাত: জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ঢাকা শহরে বৃষ্টিপাতের হার ও তীব্রতা বৃদ্ধি পেয়েছে। নদী প্লাবন থেকে শহরকে রক্ষাকারী বাঁধগুলো অভ্যন্তরীণ পানি নিষ্কাশন ব্যাহত করছে। কারণ এগুলো পানি বাইরে যাওয়ার পথ সীমিত করে ফেলেছে। অধিক বৃষ্টিপাতের কারণে বিদ্যমান পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা অতিমাত্রায় চাপের মুখে পড়ে। ফলে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা দেখা দেয়।
প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ: ঢাকা ওয়াসা, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এবং রাজউকসহ একাধিক সংস্থা পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাপনার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত। কিন্তু তাদের মধ্যে খুব কম সমন্বয় রয়েছে। দায়িত্বের দ্বন্দ্ব ও আমলাতান্ত্রিক অদক্ষতার কারণে প্রয়োজনীয় পানি নিষ্কাশন উন্নয়ন প্রকল্প বিলম্বিত হয়। বিল্ডিং কোডের যথাযথ প্রয়োগের অভাব পরিস্থিতিকে আরো খারাপ করে তোলে, কারণ অবৈধ নির্মাণ প্রাকৃতিক জলপ্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করে।
জলাবদ্ধতা নিরসরনের বিকল্পগুলো
ঢাকার জন্য প্রস্তাবিত বৃষ্টির পানি ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো শহরের নিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নত করা। এ পরিকল্পনায় এমন একটি সমন্বিত পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়েছে, যেখানে কাঠামোগত (স্ট্রাকচারাল) ও অ-কাঠামোগত (নন-স্ট্রাকচারাল) উভয় ধরনের সর্বোত্তম ব্যবস্থাপনা অনুশীলন (BMP) অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যাতে বৃষ্টির পানির প্রবাহ (পরিমাণ) এবং গুণগতমান (দূষণ)-সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা যায়। কাঠামোগত বা স্ট্রাকচারাল সমাধানের মধ্যে উল্লেখযোগ্যগুলো হচ্ছে: ১. রক্ষণাবেক্ষণ ২. স্থানীয় নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নতি ৩. সেকেন্ডারি ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নতিকরণ ৪. নতুন খাল খনন ৫. পুরনো খাল খননের মাধ্যমে সচলীকরণ ৬. ভূমি উঁচুকরণ ৭. পাম্প হাউজ স্থাপন ৮. বন্যা প্রতিরোধে স্লুইস গেট স্থাপন ইত্যাদি। অ-কাঠামোগত পদক্ষেপগুলো বা নন-স্ট্রাকচারাল সমাধান উৎসস্থলে পানিপ্রবাহ হ্রাস, সম্প্রদায়ের সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন সম্পৃক্ত পক্ষের মধ্যে সহযোগিতা, যেমন সরকারি কর্তৃপক্ষ, ঠিকাদার, নাগরিক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দেয়। যদিও অ-কাঠামোগত ব্যবস্থা তাদের দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্বের জন্য পছন্দনীয়, কিছু এলাকায়, বিশেষ করে মূল শহরের মধ্যে, ভৌত অবকাঠামোগত উন্নতির প্রয়োজন রয়েছে। অ-কাঠামোগত পদক্ষেপগুলো ন্যাচার বেজড সমাধান (NBS) বা লো-ইম্প্যাক্ট ডেভেলম্পমেন্ট (LID) হিসেবেও পরিচিত। অ-কাঠামোগত পদক্ষেপগুলো হচ্ছে ১. বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, ২. মাটিতে বৃষ্টির পানি অনুপ্রবেশ সুবিধা, ৩. জলাশয় বা জলাধার নির্মাণ ৪. গ্রস-পুলিউট্যান্ট ট্র্যাপ ৫. সিল্ট-ট্র্যাপ ৬. বায়ো-সোয়্যাল ৭. সবুজ উন্মুক্ত জায়গা নির্ধারণ ইত্যাদি।
বাস্তবায়নের জন্য প্রধান সুপারিশমালা
ঢাকার জলাবদ্ধতা সংকট মোকাবেলায় বহুমুখী ও সামষ্টিক পদ্ধতির প্রয়োজন, যার মধ্যে অবকাঠামো উন্নয়ন, নীতিমালার সংস্কার এবং জনসাধারণের সম্পৃক্ততা অন্তর্ভুক্ত থাকবে। একই সঙ্গে পদক্ষেপগুলোকে স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি এবং দীর্ঘমেয়াদি হিসেবে দেখতে হবে। তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের বা স্বল্পমেয়াদের জন্য নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলোকে অগ্রাধিকার দেয়া উচিত:
- বর্ষাকাল আসার আগেই সব ড্রেন এবং খাল পরিষ্কার করা প্রয়োজন।
- ঢাকা ওয়াসা মাস্টারপ্ল্যান অনুসারে নির্বাচিত গুরুত্বপূর্ণ জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকাগুলোর জন্য স্থানীয় নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নতি করা প্রয়োজন।
- সব খাল দখল ও দূষণমুক্ত করা, পরিচ্ছন্নকরণ, খালে বর্জ্য না ফেলা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয় কাঠামোগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ, খালের পানি অবাধে নদীতে নিষ্কাশন নিশ্চিতকরণ এবং খালের দুই ধারে স্থায়ী ওয়াকওয়ে নির্মাণসহ সৌন্দর্যবর্ধন করা অতি জরুরি।
- রাজউক কর্তৃক একটি সমন্বিত নিষ্কাশন মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের সূচনা করা উচিত।
- শহরের জন্য সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সূচনা করা প্রয়োজন।
- ডিএনসিসি এবং ডিএসসিসি ড্রেনেজ ইউনিটের প্রয়োজনীয় ক্ষমতায়ন ও জনবল নিয়োগ।
- একটি উচ্চ-স্তরের সমন্বয় দল গঠন করা প্রয়োজন।
নগর নিষ্কাশন ও বন্যা ব্যবস্থাপনায় বিদ্যমান সংকট মোকাবেলায়, টেকসই নগর উন্নয়ন, কার্যকর শাসন ব্যবস্থা এবং জলবায়ু প্রতিকূলতা মোকাবেলার সক্ষমতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা অপরিহার্য। এ দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপগুলোর মধ্যে নিম্নলিখিত বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেয়া উচিত:
- ডিএনসিসি এবং ডিএসসিসির বর্ধিত এলাকা বিবেচনা করে রাজউকের তত্ত্বাবধানে একটি নতুন মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন।
- নতুন মাস্টারপ্ল্যানের ওপর ভিত্তি করে ড্রেনেজ অববাহিকাভিত্তিক একাধিক প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন।
- বিদ্যমান রাজধানীর ওপর চাপ হ্রাস করতে, যানজট ও জলাবদ্ধতা কমাতে একটি পরিকল্পিত নতুন নগরী গঠন।
- উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ বন্যা অঞ্চলের পূর্বাভাস ও ব্যবস্থাপনার জন্য জিআইএস-ভিত্তিক ড্রেনেজ মডেল তৈরি করা।
- জল শোষণ ক্ষমতা উন্নত করার জন্য প্রকৃতিভিত্তিক সমাধান, যেমন শহুরে জলাভূমি এবং জৈব-ধারণ অববাহিকা, সবুজ উন্মুক্ত স্থান, বৃষ্টি পানি সংরক্ষণ ইত্যাদি প্রবর্তন করা।
- ড্রেনেজ সমস্যা মোকাবেলায় একটি আন্তঃমন্ত্রণালয়ভিত্তিক উচ্চ-স্তরের সমন্বয় দল গঠন।
- খাল এবং ড্রেনে বর্জ্য ফেলার বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ করা।
- প্রাকৃতিক নিষ্কাশন ব্যবস্থায় অবৈধ দখলের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা কার্যকর করা।
- বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে দায়িত্ব সুবিন্যস্ত করার জন্য একটি ঐক্যবদ্ধ ড্রেনেজ মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা করা।
- নিষ্কাশন অঞ্চলে ভূমি উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণের জন্য আইনি কাঠামো শক্তিশালী করা।
- নিষ্কাশন অবকাঠামো রক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে নাগরিকদের শিক্ষিত করার জন্য জনসচেতনতামূলক প্রচারণা পরিচালনা করা।
ঢাকার জলাবদ্ধতা সংকট একটি জটিল সমস্যা, যার সমাধানের জন্য তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। এ সমস্যা সমাধানের জন্য প্রাকৃতিক নিষ্কাশন ব্যবস্থা পুনরুদ্ধার, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগত উন্নয়ন, টেকসই নগর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং আন্তঃসংস্থা সমন্বয় উন্নত করা প্রয়োজন। জরুরি পদক্ষেপ না নেয়া হলে জলাবদ্ধতার পরিণতি আরো বৃদ্ধি পাবে, যা লাখ লাখ বাসিন্দাকে প্রভাবিত করবে এবং শহরের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করবে।
ড. মো. আতাউর রহমান: অধ্যাপক, পানিসম্পদ কৌশল বিভাগ, বুয়েট
ড. মো. মোস্তফা আলী: অধ্যাপক, পানিসম্পদ কৌশল বিভাগ, বুয়েট