আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রভূত উন্নয়নের এতগুলো ধাপ পেরুনোর পরও আমরা এ কেমন অবস্থানে রয়েছি? সমতার প্রসঙ্গে নৈতিক ও আদর্শিক গুরুত্ব রয়েছে। এক্ষেত্রে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক গুরুত্বের বিষয়টি না ভাবলেও হয়। এমনকি প্রায় সব ধর্মেই নারী-পুরুষের সমতার কথা রয়েছে। তার পরও সমমর্যাদা ও অধিকার আদায়ের জন্য নারীদের শতাব্দীর পর শতাব্দী সংগ্রাম করতে হয়েছে। বিষয়টি বিভিন্ন দেশের সংবিধান ও আন্তর্জাতিক কনভেনশনের অংশ। চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানেও বৈষম্যহীনতা ও সমঅধিকারের প্রসঙ্গটিই ছিল কেন্দ্রীয় পরিসরে। নারী-পুরুষ সমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হলে তা এক অর্থে লৈঙ্গিক বৈষম্যকে সমর্থন করারই নামান্তর। পুরো ব্যাপারটি শুধু উদ্বেগজনক বা ক্ষোভেরই নয়, বরং ভীতিকরও। কারণ এর পেছনে রয়েছে নারীর প্রতি বিদ্বেষ ও পক্ষপাত। ভয়ের বিষয় হলো সমাজে এ ধরনের প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে।
সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীদের প্রতি বিদ্বেষ ও পক্ষপাতের এ বৃদ্ধি কয়েকটি কারণে ঘটছে: পিতৃতান্ত্রিক কাঠামো, পুরুষদের চরম শ্রেষ্ঠত্ববোধ জাহির করার প্রবণতা, ক্রমবর্ধমান মৌলবাদ এবং নারীবিদ্বেষী সংস্কৃতির বিস্তারের কারণে। এসব কারণে পুরুষেরা নারীদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার কেড়ে নিতে চায়, তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। অনেক সময় নারীদের কণ্ঠ রুদ্ধ করতে চায় এবং তাদের বহুমাত্রিক পরিচয়কে সীমাবদ্ধ করার চেষ্টা করে। শেষ পর্যন্ত নারীদের প্রতি এ বিদ্বেষ ও বিরুদ্ধ পক্ষপাত তাদের ক্ষমতাহীন করতে চায় এবং সহিংসতার জন্ম দেয়। বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়নে দৃশ্যমান উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, এ কথা সত্য। কিন্তু অধিকাংশ নারী এখনো অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে ক্ষমতাহীন। নারীর এ ক্ষমতাহীনতার পেছনে অনেকগুলো কারণ রয়েছে। মোটামুটি বলতে গেলে, কিছু কারণ অর্থনৈতিক। যেমন অনেক নারী পুরুষের ওপর অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরশীল। সম্পদের মালিকানার ক্ষেত্রেও নারীর অধিকার সীমিত। এছাড়া কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও তাদের অধিকার সীমিতি। অন্যদিকে নিরক্ষরতা, সামাজিক অবহেলা, পারিবারিক বৈষম্য, পর্দা প্রথার মতো সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় কারণও এক্ষেত্রে বড় প্রভাব রাখছে। শুধু তাই নয়, রাজনৈতিক অঙ্গনেও নারীর অংশগ্রহণ সীমিত। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলের উদাসীনতা এবং নির্বাচনী রাজনীতিতে নানা প্রতিবন্ধকতা অনেকাংশে দায়ী।
নারীর স্বাধীনতা নিশ্চিত করার জন্য অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে কর্মক্ষম নারীদের (১৫-৬৫ বছর) মাত্র ৩৬ শতাংশ সক্রিয়ভাবে আয় করছে। মাত্র ১০ শতাংশের একটু বেশি উচ্চ ব্যবস্থাপনা পর্যায়ের পদে রয়েছে। অথচ পুরুষদের ক্ষেত্রে এ হার ৮৮ শতাংশ। তাছাড়া কর্মরত নারীদের প্রায় ৯২ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন। এ খাতে নারী-পুরুষ উভয়েরই মজুরিবৈষম্য বেশি এবং সুযোগ-সুবিধা সীমিত। এও সত্য, দেশে নারী উদ্যোক্তার সংখ্যা বাড়ছে। অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৪ অনুযায়ী, দেশে প্রায় ১ কোটি ১৮ লাখ এসএমইর মধ্যে মাত্র ৬.৪৭ শতাংশ নারীদের মালিকানাধীন। নারী পরিচালিত ব্যবসাগুলো সাধারণত ছোট আকারের। বেশ কয়েকটি গবেষণায় দেখা গেছে নারীরা মূলত কম মজুরি ও কম উৎপাদনশীল খাত (যেমন কৃষিকাজ) এবং অবৈতনিক কাজে বেশি যুক্ত। ফলে নারীর অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা কম এবং অনেক ক্ষেত্রে নেই বললেই চলে। এজন্য বিভিন্ন অঞ্চলে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। দেখা গেছে, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিএসএস) সর্বশেষ ‘টাইম ইউজ সার্ভে’ অনুযায়ী, পরিবারের আয়মূলক কাজে সরাসরি যুক্ত থাকা নারীদের একটি বড় অংশ কোনো আনুষ্ঠানিক বেতন পান না। অথচ গৃহস্থালি ও সেবামূলক কাজে নারীরা তাদের সময়ের ২৬ শতাংশ ব্যয় করেন। এদিকে পুরুষরা ব্যয় করেন মাত্র ৫ শতাংশ।
পিতৃতন্ত্রই বাংলাদেশী নারীদের সামাজিক ক্ষমতাহীনতার প্রধান প্রতিবন্ধকতা। এটি মূলত তাদের জীবন ও আকাঙ্ক্ষাকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং নির্ধারণ করে দেয় যে তারা কী করতে পারবে বা হতে পারবে। বাংলাদেশের অধিকাংশ নারী যেখানেই থাকুন বা যা-ই করুন না কেন, তাদের আয়ের সিংহভাগ স্বামী বা পরিবারের অন্য কোনো সদস্যের হাতে তুলে দেন। অর্থনৈতিক সেবায় নারীদের প্রবেশাধিকারও কম। কারণ অনেক ক্ষেত্রে পুরুষেরা তা অনুমোদন করেন না। বাংলাদেশে মাত্র ৩৬ শতাংশ নারীর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট রয়েছে। এছাড়া বাল্যবিবাহ এখনো নারীদের সামাজিক-অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের বড় বাধা। যদিও নারী শিক্ষার প্রসারের জন্য নীতিনির্ধারণী অনেক সিদ্ধান্তের ফলে বাল্যবিবাহের হার কিছু কিছু জায়গায় কমেছে। দেশে বর্তমানে প্রায় ৬০ শতাংশ কিশোরী প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগেই বিয়ে করতে বাধ্য হন। শিক্ষা থেকে মেয়েদের ঝরে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণও অল্প বয়সে বিয়ে। নারীদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার অভাবও তাদের সামাজিক ক্ষমতাহীনতার বড় দিক। পারিবারিক সহিংসতা তাদের জন্য একটি বড় হুমকি। নারীর প্রতি সহিংসতার হার এখনো অনেক বেশি। ২০১৬ সালে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, বাংলাদেশের প্রতি দুজন বিবাহিত নারীর একজন জীবনের কোনো না কোনো সময় গার্হস্থ্য সহিংসতার শিকার হয়েছেন। যৌন হয়রানি, অ্যাসিড নিক্ষেপ এবং আত্মহত্যাও তাদের নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত গুরুতর সমস্যা।
বাংলাদেশী নারীদের রাজনৈতিক ক্ষমতাহীনতার শিকড়ও সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিধিবিধানের সঙ্গে সম্পর্কিত। এ বিধিবিধান পিতৃতন্ত্র দ্বারা নির্ধারিত। পিতৃতন্ত্র প্রায়ই নারীদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বা রাজনৈতিক ক্ষমতাকে স্বীকৃতি দেয় না। ঐতিহ্যগতভাবে বাংলাদেশে নারীর রাজনীতিতে সক্রিয় উপস্থিতি প্রত্যাশিত নয়। বিশেষত গ্রামীণ এলাকায় তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রেও স্বাধীনতা কম থাকে। অনেক সময় পুরুষই তাদের হয়ে সিদ্ধান্ত নেয়। খুব কমসংখ্যক নারীই রাজনৈতিক দলের সদস্য হন বা বিভিন্ন স্তরে প্রতিনিধিত্বের জন্য প্রার্থী হতে পারেন। সংক্ষেপে বলতে গেলে নারীর মুক্তমত, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও অধিকার আজও সীমিত। অথচ নারীর ক্ষমতায়ন তাদের স্বাধীনতা ও সামাজিক-অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
নারীর ওপর নির্যাতন-নিপীড়ন ও সহিংসতার পরিসংখ্যানই বলে দেয় বিদ্যমান সমাজ তাদের প্রতি কেমন বিদ্বেষমূলক মনোভাব পোষণ করে। সমাজে এ সহিংসতা ক্রমেই বাড়ছে এবং জীবনের প্রতিটি ধাপে নারী ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। কোথাও তা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের রূপে, আবার কোথাও যৌন হয়রানি ও ধর্ষণের মাধ্যমে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরাসরি হামলার মাধ্যমেও এমনটি হয়। চলতি বছরের প্রথম দুই মাসেই প্রায় ৪০০ নারী ও কন্যাশিশু সহিংসতার শিকার হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। বাস্তবে এ সংখ্যা আরো বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রশ্ন হলো এগুলো কেন ঘটে? প্রথমত, বিষাক্ত পিতৃতান্ত্রিক কাঠামো ও সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের ফলে সৃষ্ট ক্রোধ থেকেই নারীর ওপর সহিংস আচরণকে উসকে দেয়া হচ্ছে। নারীরা মানসিকভাবে দৃঢ় এবং পুরুষরা শারীরিক শক্তিতে। এক্ষেত্রে তুলনা হয় না। কিন্তু অনেক পুরুষ শারীরিক শক্তির জোরে পেশিশক্তিকেই প্রধান হাতিয়ার ভাবতে চায়। এক্ষেত্রে যুক্তি বা নৈতিক অবস্থান কাজ করে না। নারীদের যেন পুরুষের ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিবন্ধকতা বলেই ভাবা হয়। পিতৃতান্ত্রিক ভাবধারাই পুরুষদের নিষ্ঠুর করে তোলে। এভাবেই নারীর প্রতি বিদ্বেষ অনেক বাড়ে। দ্বিতীয়ত, পুরুষদের মধ্যে এক ধরনের চরম শ্রেষ্ঠত্ববাদী বোধ কাজ করে। তারা মনে করে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তারা নারীদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ এবং সবকিছু করার অধিকার ও ক্ষমতা তাদেরই আছে। অন্যদিকে নারীরা নিজেদের শক্তি ও দুর্বলতা সম্পর্কে সচেতন। পুরুষরা নারীদের দুর্বলতা নিয়ে উপহাস করে, কিন্তু নারীদের শক্তি তাদের অস্বস্তিতে ফেলে। নারীরা জীবনে পুরুষদের পরিপূরক হিসেবে দেখে, কিন্তু অনেক পুরুষ নারীদের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখে। এ চরম শ্রেষ্ঠত্ববোধের কারণেই পুরুষরা নারীদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে দেখে, তাদের বুদ্ধি ও সংবেদনশীলতাকে উপহাস করে এবং তাদের চিন্তাভাবনাকে অবমূল্যায়ন করে। তৃতীয়ত, কিছু চরমপন্থী মৌলবাদী ধারণা নারীদের নিয়ন্ত্রণ করাকে সঠিক বলে মনে করে এবং পুরুষদের কর্তৃত্বকে সমর্থন করে। এসব ধারণা ছড়িয়ে পড়লে নারীদের আত্মনিয়ন্ত্রণে পুরুষদের হস্তক্ষেপ বাড়ে। তখন পুরুষরা ঠিক করে দেয় নারীরা কী পরবে, কোথায় যাবে, কী করতে পারবে। এসব নিয়ম ভাঙলে সামাজিক পরিসরে নারীদের হয়রানি বা শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়। সেই অর্থে পুরুষ এক ধরনের ‘মোরাল পুলিশিং’-এর দায়িত্ব নেয়। নারীবিদ্বেষী সংস্কৃতির বিস্তার এ চরম শ্রেষ্ঠত্ববোধকে আরো শক্তিশালী করেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের কোনো কোনো রাজনৈতিক দলের ভাষ্য পুরো বিষয়টিকে আরো নারীবিরূপ করে তুলেছে। নারীর ওপর খবরদারির কথা বলা মানে, নারীরা কর্মক্ষেত্রে দুর্বল ও অক্ষম। সেক্ষেত্রে পুরুষই নারীদের দেখভাল করবে। নারীর সক্ষমতার প্রতি এ এক উপহাস। নারীর মর্যাদা এতও ঠুনকো নয় যে তাতে পুরুষের স্বীকৃতি লাগবে। এ বিষয়ে শেষ কথা হচ্ছে যে অধিকার দিলেই একজন মানুষ মর্যাদা পায়। নারী অধিকার চায়। পৃষ্ঠপোষকতা বা দান নয়। এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ কারণ এগুলোকে ভিন্ন খাতে বইয়ে দেয়ার বিতর্ক হয়তো আমরা সামনে নীতিনির্ধারণী স্তরেই দেখতে পাব। বিদ্যমান বাস্তবতায় নারীর প্রতি বিদ্বেষ ও সহিংসতা ভয়াবহ পরিস্থিতিতে পৌঁছেছে। এটি আর ব্যতিক্রম নয়, বরং এই বিদ্বেষ এবং সহিংসতা সামাজিক পর্যায়ে স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হচ্ছে। এর দায় রাষ্ট্র, সমাজ ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিতে হবে। কারণ নারীদের জীবনের বহু বাস্তবতা পুরুষদের মানসিকতা এবং আচরণ দ্বারা নির্ধারিত হয়। নারী-পুরুষের সমতার বিরুদ্ধে যে অবস্থান নেয়া হচ্ছে, তা মানবতার বিরুদ্ধেই এক ধরনের বিদ্বেষ এবং আমাদের সবার জন্যই একটি বড় হুমকি।
সেলিম জাহান: সাবেক পরিচালক, মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন দপ্তর এবং দারিদ্র্য দূরীকরণ বিভাগ, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি