কক্সবাজারের ইনানী সৈকতের পাটুয়ারটেক এলাকাটি বরাবরই পর্যটকদের কাছে এক শান্ত ও মায়াবী স্বর্গরাজ্য হিসেবে পরিচিত। যেখানে মেরিন ড্রাইভের একপাশে আছড়ে পড়া নীল জলরাশি আর অন্যপাশে পাহাড়ের সবুজ মিতালী নাগরিক জীবনের সব ক্লান্তি ভুলিয়ে দেয়। কিন্তু আজ শনিবার ভোরের আলো ফুটতেই সেই স্বর্গরাজ্য ঢেকে গেল আগুন আর মৃত্যুর বিভীষিকায়। ‘টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্ট’ নামক একটি কাঠের রিসোর্টে লাগা ভয়াবহ আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে ১০টি তাজা প্রাণ। ছুটির সকালে যে পর্যটকদের ঘুম ভাঙার কথা ছিল সমুদ্রের গর্জনে, ইনানীর সৈকতে আজ তাদের দেখতে হলো কাঠ-কয়লা হওয়া ঝলসানো লাশের সারিতে। ঘুমন্ত মানুষের এভাবে দগ্ধ হয়ে মৃত্যুর ঘটনা কেবল কক্সবাজারকেই স্তব্ধ করেনি, দেশের পর্যটন খাতের নিরাপত্তা ও তদারকি ব্যবস্থা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন সামনে এনেছে।
ইনানীর এ অগ্নিকাণ্ড দেশের পর্যটন খাতের ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার বেশ কিছু দুর্বলতা সামনে এনেছে। পর্যটকরা যেন কেবল টাকা আয়ের উৎস, তাদের জীবনের নিরাপত্তা বিবেচ্য বিষয় নয়। ফায়ার সার্ভিস ও কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের জানিয়েছে, একপাশে ইটের দেয়াল থাকলেও, মূলত কাঠ, বাঁশ আর টিন দিয়ে তৈরি করা ‘নান্দনিক’ এই রিসোর্টটি কোনো প্রকার ফায়ার লাইসেন্স ছাড়াই বছরের পর বছর ধরে চলছিল। গত জুনে ফায়ার সার্ভিসের পরিদর্শক দল এই রিসোর্টটিকে ‘অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করে নোটিশও দিয়েছিল। কিন্তু সেই সতর্কবার্তার পরও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। সেই সতর্কবার্তাকে যথাযথ গুরুত্ব না দিয়ে রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ কার্যক্রম চালিয়ে গেছে।
আরো উদ্বেগের বিষয় হলো, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের প্রস্তুতি ও দায়িত্ব পালনে বড় ধরনের ঘাটতি ছিল। আগুন লাগার পর যখন ঘুমন্ত পর্যটকদের বাঁচানোর জন্য চেষ্টা না করে রিসোর্টের ম্যানেজার ও কর্মচারীরা সেখান থেকে পালিয়ে যান।
পুরো রিসোর্টে আগুন ছড়িয়ে পড়ার পর একের পর এক এসি ও রান্নার গ্যাসের সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হতে থাকে। এমন পরিস্থিতিতে কর্মীদের সময়োচিত সতর্কতা ও উদ্ধার তৎপরতা থাকলে হতাহতের মাত্রা হয়তো কমানো সম্ভব হতো। এটা প্রমাণ করে যে, দেশের পর্যটন খাতে অতিথিদের দেখভালের জন্য কোনো পেশাদার বা দায়িত্বশীল জনবল তৈরি করা হয়নি।
কক্সবাজারে সাম্প্রতিক সময়ে পরিবেশবান্ধব ও নান্দনিকতার কথা সামনে রেখে মেরিন ড্রাইভের দুপাশে কাঠ, বাঁশ, খড় ও টিনের তৈরি অনেক রিসোর্ট গড়ে উঠেছে। ভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতার খোঁজে পর্যটকদেরও এসব রিসোর্টের প্রতি আগ্রহ রয়েছে। কিন্তু ইনানীর এ অগ্নিকাণ্ড মনে করিয়ে দিয়েছে, বাহ্যিক সৌন্দর্য ও প্রচারের পাশাপাশি নিরাপত্তা ব্যবস্থাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। অনুমোদনহীন একটি তিনতলা কাঠের স্থাপনা কীভাবে মেরিন ড্রাইভের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় গড়ে উঠল এবং দীর্ঘদিন ধরে কার্যক্রম চালিয়ে গেল, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
ফায়ার সার্ভিস নোটিশ দিয়েই কী তাদের দায়িত্ব শেষ করে ফেলেছে? কিংবা সেই নোটিশ বাস্তবায়নে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর জানাও জরুরি?
প্রতিটি বড় দুর্ঘটনার পর একটি চেনা চিত্রনাট্য দেখতে হয়। কয়েক সদস্যবিশিষ্ট একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠিত হয়, দ্রুত প্রতিবেদন জমা দেয়ার নির্দেশ আসে, ব্যস—এটুকুই। কিন্তু মূল সমস্যা অধরাই থেকে যায়। যদি আমরা সত্যিই দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছে কক্সবাজারকে একটি নিরাপদ গন্তব্য হিসেবে গড়ে তুলতে চাই, তবে ‘টুপটুপ রিসোর্ট’-এর মালিক ও সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের আইনের আওতায় এনে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে, কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় গড়ে ওঠা অনুমোদনহীন ও অগ্নিঝুঁকিপূর্ণ হোটেল-রিসোর্টগুলোর বিরুদ্ধে এখনই সমন্বিত ও কার্যকর অভিযান চালানো উচিত।
ইনানীর সৈকতে ঘুমন্ত পর্যটকদের এমন মর্মান্তিক মৃত্যু আমাদের পর্যটন মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসন এবং তদারককারী সংস্থাগুলোর জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। মুনাফার পাশাপাশি পর্যটকদের জীবনের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া না হলে অবকাঠামো, সৌন্দর্য কিংবা প্রচার—কোনোটিই দীর্ঘমেয়াদে পর্যটন খাতকে এগিয়ে নিতে পারবে না। পর্যটনের বিকাশের প্রয়োজনে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বেশি জরুরি।