পর্যালোচনা

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সেক্টরে সমস্যার মাঝেই রয়েছে সমাধান

একদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব, অন্যদিকে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের চ্যালেঞ্জ পুরো পৃথিবীর জ্বালানি ব্যবস্থায় গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এনেছে। সঙ্গে রয়েছে নিরবচ্ছিন্নভাবে সবাইকে জ্বালানি সরবরাহ করার লক্ষ্যমাত্রা। এ আলোকে তিনটি প্যারামিটারের ওপর ভিত্তি করে বিশ্ব জ্বালানি সংস্থা (ওয়ার্ল্ড এনার্জি কাউন্সিল) জ্বালানি

একদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব, অন্যদিকে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের চ্যালেঞ্জ পুরো পৃথিবীর জ্বালানি ব্যবস্থায় গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এনেছে। সঙ্গে রয়েছে নিরবচ্ছিন্নভাবে সবাইকে জ্বালানি সরবরাহ করার লক্ষ্যমাত্রা। আলোকে তিনটি প্যারামিটারের ওপর ভিত্তি করে বিশ্ব জ্বালানি সংস্থা (ওয়ার্ল্ড এনার্জি কাউন্সিল) জ্বালানি সমস্যাকে এনার্জি ট্রাইলিমা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছে। প্যারামিটারগুলো হলো: . জ্বালানি সংযোগ, . জ্বালানি নিরাপত্তা এবং . জ্বালানি ব্যবস্থার পরিবেশগত দিক। উল্লেখ্য, এই প্যারামিটারগুলো একটি আরেকটির সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং যে কারণে এরা প্রত্যেকেই একটি করে ডাইলিমা। উদাহরণস্বরূপ, জ্বালানি কিংবা বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর মাধ্যমে নিরবচ্ছিন্নভাবে তা গ্রাহককে বা উৎপাদনশীল সেক্টরগুলোয় সরবরাহ করা যায় এবং নতুন গ্রাহককে সংযোগের আওতায় আনা যায়। এতে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হলেও বিদ্যুৎ উৎপাদন যদি প্রধানত জ্বীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর হয়, তা পরিবেশ জলবায়ুর জন্য হুমকিস্বরূপ; যা গত কয়েক দশকে গ্রিনহাউজ গ্যাস প্রশমনের উদ্দেশ্যে নেয়া পদক্ষেপের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। আবার অতিমাত্রায় আমদানিমুখী হলে একটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মূলত এসব কারণে জ্বালানি সমস্যাএনার্জি ট্রাইলিমাকেসমাধান করা অনেক ক্ষেত্রেই জটিল এবং সহায়ক নীতিমালার ওপর নির্ভরশীল। পৃথিবীর অধিকাংশ দেশ চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন।    

এদিকে বাংলাদেশের জ্বালানি বিদ্যুৎ ব্যবস্থা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, গত এক দশকে জ্বালানি বিদ্যুৎ সরবরাহ বৃদ্ধিতে বাংলাদেশ সরকার অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে। পরিসংখ্যানগত দিক থেকে বর্তমানে আমাদের মোট ২০ হাজার ৫৫৯ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন বিভিন্ন জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুেক্ষত্র রয়েছে, যদি ক্যাপটিভ উৎপাদনকে হিসাবে না নেয়া হয় (তথ্যসূত্র: পাওয়ার সেল, পিডিবি সে ডা) এর বিপরীতে ২০০৯ সালে সক্ষমতা ছিল মাত্র হাজার ৯৯২ মেগাওয়াট। উল্লেখ্য, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং বিদ্যুৎ বিভ্রাট নির্মূলের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় ২০০৯ সালে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেয়ার পর বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা বাড়ানোর কোনো বিকল্প পথ সরকারের হাতে ছিল না। সেক্ষেত্রে বিদ্যুৎ উৎপাদনে জীবাশ্ম কিংবা আমদানীকৃত জ্বালানির ব্যবহার বাড়ল কিনা, তাকে অনেকটা সংগত কারণেই গৌণ হিসেবে দেখা হয়েছে। এতে গত এক দশকে আমাদের সমৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং বিদ্যুৎ সংযোগের হার বেড়ে ৯০ শতাংশের উপরে দাঁড়িয়েছে। ফলে জ্বালানি সংযোগ সূচকে বিশ্বের প্রথম ১০টি দেশের মাঝে অবস্থান করে নিতে পারলেও সর্বোপরি এনার্জি ট্রাইলিমা সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ক্রমে নিম্নমুখী।

২০১৯ সালের এনার্জি ট্রাইলিমা সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১২৮ দেশের মধ্যে ১১৪তম, যা ২০১৮ সালের তুলনায় সূচক নিচে। মূলত জ্বালানি নিরাপত্তার ঝুঁকি এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে অতিমাত্রায় জ্বীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতা এক্ষেত্রে দায়ী। বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা অতীতেও খুব একটা ছিল না, কিন্তু ক্রমে তা আরো খারাপের দিকে যাচ্ছে। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আমদানীকৃত বিদ্যুতের চাপ।     

বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ব্যবহার জ্বালানি নিরাপত্তা রক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে, কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমাদের বিদ্যুৎ স্থাপনার মাত্র ৬২৭ মেগাওয়াট বা শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে আসে। তার মধ্যে ২৩০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন জলবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছিল ১৯৬২ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত। অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুতের অধিকাংশই আসে সোলার হোম সিস্টেম থেকে। অবস্থায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিদ্যুৎ ক্ষেত্রে খুব বেশি ভূমিকা রাখতে পারছে না।

অন্যদিকে একসময় প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল হওয়ার কারণে আমাদের বৈদ্যুতিক গ্রিড অনেকটাই পরিবেশবান্ধব ছিল। কিন্তু অভ্যন্তরীণ গ্যাস সংকট এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে যথেষ্ট সফলতা না পাওয়ায় ফার্নেস অয়েল, ডিজেল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন অনেক বেড়েছে। ফলে পরিবেশগত প্যারামিটারেও বাংলাদেশের অবস্থান অবনমিত হচ্ছে।     

তবে এনার্জি ট্রাইলিমা ইনডেক্সে খারাপ অবস্থানের চেয়েও শঙ্কার জায়গাটি হলো, অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতায় পৌঁছানো। একসময় যেখানে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের (লোডশেডিং) কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য দৈনন্দিন কাজকর্ম স্থবির হয়ে যাচ্ছিল, আজ আমরা বিদ্যুৎ উৎপাদনে এমন সক্ষমতা অর্জন করেছি যে বিভিন্ন পত্রপত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী বিদ্যুতের চাহিদা মোট উৎপাদনক্ষমতার মাত্র ৫০ শতাংশ। অর্থাৎ বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সামগ্রিক উৎপাদনক্ষমতার অর্ধেক অব্যবহূত থেকে যাচ্ছে। কভিড-১৯-এর কারণেও চাহিদা কিছুটা কমেছে। কিন্তু চাহিদা না থাকার কারণে বেশকিছু বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র কোনো প্রকার বিদ্যুৎ সরবরাহ না করেই ক্যাপাসিটি চার্জ পাচ্ছে, যা হাজার হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। 

লক্ষণীয় যে অনেক শিল্প-কারখানাই জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুতের ওপর আস্থা রাখতে পারছে না, বরং ক্যাপটিভ প্লান্টের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে ব্যবহার করছে। গ্রামগঞ্জে নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুৎ বিতরণও অনেক ক্ষেত্রে ব্যাহত হচ্ছে বলে শোনা যায় মূলত বিদ্যুৎ বিতরণ সিস্টেমে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না হওয়ায়। দুটো কারণে বলা চলে আমরা আজ অতিরিক্ত বিদ্যুৎ সক্ষমতায় পৌঁছেছি। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সঠিকভাবে বিদ্যুতের চাহিদা নিরূপণ করতে না পারা।

যেহেতু বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করার পর তা কাজে না লাগিয়ে বসিয়ে রাখা অর্থনৈতিক দিক থেকে অযৌক্তিক, তাই করোনার প্রাদুর্ভাব থেকে মুক্তির পর প্রথমেই আমাদের ভবিষ্যতের বিদ্যুৎ চাহিদা নির্ভুলভাবে নিরূপণ করার সক্ষমতা অর্জন করার দিকে মনোনিবেশ করতে হবে। এর সঙ্গে বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থায় সক্ষমতা বাড়াতে হবে এবং তুলনামূলকভাবে বেশি চাহিদাসম্পন্ন গ্রাহক যেমন শিল্প-কারখানাগুলোকে জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ ব্যবহারে উৎসাহিত করতে হবে, যাতে তারা জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর ক্যাপটিভ প্লান্ট চালানো কমিয়ে দেয়।   

এদিকে যদিও ভাড়ায় চালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো গত এক দশকে দেশের উন্নয়নে এবং আমাদের দুর্দিনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে, তার পরও কখন এবং কীভাবে কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে চুক্তি বাতিল করা হবে, সে-সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট নীতিমালা তৈরি করার এখনই মোক্ষম সময়। মোট কথা, আমাদের অস্থায়ী ব্যয়বহুল বিদ্যুৎকেন্দ্রের চেয়ে স্থায়ী সাশ্রয়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রয়োজন।

এছাড়া গত এক দশকে বিদ্যুৎ ক্ষেত্রে নিরাপত্তা অর্জন মূল লক্ষ্য থাকলেও সময় এসেছে জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়ে মনোযোগ দেয়ার। প্রসঙ্গে বলা যেতে পারে, আমাদের নিজস্ব গ্যাস উত্তোলনে যথেষ্ট বিনিয়োগ প্রয়োজন। অন্যদিকে ২০২০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুতের ১০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অনেক আগে থেকে নির্ধারিত থাকলেও সেটা অর্জন করা অসম্ভবই বলা যায়। তবুও বিদ্যুৎ উৎপাদনে সহজলভ্য সূর্যালোকের ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। আমাদের যে নিট মিটারিংয়ের দিকনির্দেশনা রয়েছে, তা বাসাবাড়ি এবং শিল্প-কারখানার অব্যবহূত ছাদে সোলার প্যানেল স্থাপনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করতে বাসাবাড়ি কলকারখানার মালিকদের উৎসাহিত করবে। বলে রাখা ভালো, দেশীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইডকলের সমীক্ষায় দেখা যায়, হজার ৫০০ টেক্সটাইলের অব্যবহূত ছাদে প্রায় ৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন সোলার প্যানেল বসানো সম্ভব। এর বাইরে অনেক গার্মেন্ট, অন্যান্য শিল্প-কারখানা এবং বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি বাণিজ্যিক ভবন রয়েছে, যেখানে সোলার প্যানেল স্থাপন করা সম্ভব। এছাড়া দেশের জলাভূমিগুলোয় ফ্লোটিং সোলার প্যানেল স্থাপনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা যাচাই করে দেখা যেতে পারে। অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির সুযোগ সীমাবদ্ধ হলেও সেদিকে মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন। এতে বিদ্যুৎ গ্রিড পরিবেশবান্ধব হবে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা কমবে।

তাছাড়া নিজস্ব গ্যাস উত্তোলন বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যক্তিগত প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে জ্বালানি ব্যবহারে দক্ষতা বাড়াতে হবে। এর প্রভাবে জ্বালানি বিদ্যুতের চাহিদা কমার সঙ্গে গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমন হ্রাস পাবে।    

পরিশেষে, আইনস্টাইনের ভাষায় বলা যায়, সমস্যার মাঝেই সুযোগ তৈরি হয়। ঠিক একই রকম, জ্বালানি সেক্টরের সমস্যাগুলো আমাদের সমাধানের পথ দেখিয়ে দেবে। এক্ষেত্রে প্রয়োজন সমস্যাগুলোকে ক্ষতিয়ে দেখা এবং সমাধানের জন্য উপযুক্ত নীতিমালা প্রণয়ন বাস্তবায়ন। তবে আমাদের বসে থাকলে চলবে না এবং সমাধানের যে পথই বেছে নিই না কেন, তা অত্যন্ত দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।  

 

শফিকুল আলম: একজন হুম্বল্ডট স্কলার পরিবেশ অর্থনীতিবিদ। তিনি সিনিয়র অ্যাডভাইজর হিসেবে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থায় কর্মরত

আরও