আমরা এখন আর ঔপনিবেশিক শাসকের ভাষা হিসেবে ইংরেজি ভাষা শিখি না। ব্যবসায়-বাণিজ্য, শিক্ষা-সংস্কৃতি, রাজনীতি-সমরনীতি, বিজ্ঞান-গবেষণা, চিকিৎসাসহ নানা ক্ষেত্রে কাজের তাগিদে, কাজের ভাষা হিসেবে আমরা ইংরেজি শিখি। ইংরেজি ভাষায় যোগাযোগ দক্ষতা এখন একটি অপরিহার্য যোগ্যতা হওয়ায় বাংলাদেশে প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত আবশ্যিক বিষয় হিসেবে ইংরেজি ভাষা পড়ানো হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্নাতক পর্যায়েও শিক্ষার্থীদের আরো এক বছর ইংরেজি পড়তে হয়। কিন্তু আমাদের ইংরেজি শিক্ষার প্রকৃত অগ্রগতি কতদূর?
সুইডেনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘এডুকেশন ফার্স্ট’ প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী শতাধিক দেশে মানুষের ইংরেজি ভাষার দক্ষতা যাচাইয়ের জন্য জরিপ পরিচালনা করে। জরিপের ফলাফলকে তারা পাঁচটি সূচকের মাধ্যমে প্রকাশ করে। ২০১৮-২৪ পর্যন্ত প্রাপ্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বাংলাদেশের অবস্থান বরাবরই নিচের দিকে থাকে (‘নিম্ন দক্ষতা’ বা ‘খুবই নিম্ন দক্ষতা’)। বাংলাদেশে পরিচালিত বিভিন্ন গবেষণায়ও একই রকম চিত্র পাওয়া যায়। শিক্ষার্থীদের ইংরেজি ভাষার দক্ষতা মোটেই সন্তোষজনক নয়। বাস্তব পরিস্থিতিতে সফল যোগাযোগ স্থাপনে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব শিক্ষার্থী ব্যর্থ হয়।
বিষয়টি খুবই উদ্বেগের। দেশে প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত কয়েক কোটি শিক্ষার্থী ১২ বছর ধরে আবশ্যিক বিষয় হিসেবে ইংরেজি অধ্যয়ন করে। কিন্তু অধিকাংশ শিক্ষার্থীর ইংরেজি ভাষার প্রায়োগিক দক্ষতা খুবই হতাশাজনক। এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার ফল বিপর্যয় হলে প্রায়ই ইংরেজি বিষয়কে মূল কারণ হিসেবে ধরা হয়।
আমাদের ইংরেজি শিক্ষার প্রকৃত অগ্রগতি বা বেহাল দশা বুঝতে নিশ্চয় আর বেশি তথ্য-উপাত্তের প্রয়োজন নেই। কিন্তু এ বেহাল দশা কেন এবং সেখান থেকে আমাদের উত্তরণের উপায় কী?
এ অবস্থার কারণ ও উত্তরণের উপায় আলোচনার জন্য আমরা তিনটি বিষয় বিবেচনায় নেব। ইংরেজি ভাষা রপ্ত করার জন্য এ ভাষার কোন দক্ষতাগুলো গুরুত্ব দিয়ে শেখানো উচিত, সেই দক্ষতা শিখন কখন শুরু করা উচিত আর এজন্য কেমন শিক্ষক ও অবকাঠামোগত সুবিধা চাই।
যেকোনো ভাষার চারটি প্রধান দক্ষতা থাকে। এর মধ্যে প্রথম দুটি হলো শ্রবণ (কথা শুনে বুঝতে পারা) ও কথন (কথা বলে অন্যকে বোঝাতে পারা)। এ দুটিকে বলা হয় ভাষার প্রাথমিক দক্ষতা। পঠন (পড়ে সঠিক অর্থ বুঝতে পারা) ও লিখনকে (লিখে অন্যকে সঠিক অর্থ বোঝাতে পারা) বলা হয় দ্বিতীয় স্তরের দক্ষতা। জন্মের পর আমরা প্রথম শ্রবণ বা কথা শোনা শিখি। তারপর শিখি কথন বা কথা বলা। আমাদের চারপাশে অনেক মানুষ আছেন, যারা লিখতে ও পড়তে জানেন না। তবে শুধু শ্রবণ ও কথন দক্ষতা দিয়েই তারা সুন্দরভাবে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করেন, নিজের কাজ সারেন, মনের ভাব প্রকাশ করেন। অর্থাৎ লিখতে-পড়তে না জানলেও কাজ চালানোর মতো ভাষিক দক্ষতা অর্জন করা যায়।
একটা ভবন তৈরি করতে গেলে যেমন আমরা প্রথমে ছাদ ঢালাই না দিয়ে, আগে তার ভিত্তি রচনা করি, তেমনি ভাষা শেখার ক্ষেত্রেও প্রথমে ভিত্তি দিয়ে যাত্রা শুরু করতে হয়। যেহেতু ভাষিক দক্ষতার প্রাথমিক ভিত্তি হলো শ্রবণ ও কথন দক্ষতা, সেহেতু আমাদের ইংরেজি ভাষা শিক্ষার পাঠও শুরু হওয়া উচিত তার ভিত্তি বা শ্রবণ ও কথন দক্ষতা উন্নয়ন দিয়ে।
আমাদের ইংরেজি শিক্ষার মূল গলদটা এখানেই। আমাদের ইংরেজি পাঠ্যক্রমে শ্রবণ ও কথন দক্ষতা উন্নয়নে কখনই গুরুত্ব দেয়া হয়নি। আপনাকে যদি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ না দিয়ে সরাসরি সেকেন্ডারি বা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করে দেয়া হয়, তাহলে কী ঘটবে? নিশ্চয় আপনি বিভিন্ন বিষয় পড়তে ও বুঝতে গিয়ে হাবুডুবু খাবেন। কিন্তু আপনার কোনো দোষ নেই। যারা আপনাকে বর্ণ পরিচয়, পঠন, লিখন না শিখিয়েই মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়েছেন, দোষটা তাদের।
একইভাবে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত কোথাও ইংরেজি ভাষার প্রাথমিক দক্ষতা বা শ্রবণ-কথন শেখানো হয় না। শ্রেণীকক্ষে এবং পরীক্ষায় তার কোনো মূল্যায়ন করা হয় না। যুক্তির খাতিরে অনেকেই হয়তো বলবেন, শ্রেণীকক্ষে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বই থেকে কিছু পড়েন। অন্য শিক্ষার্থীরা আবার সেটাই শোনেন। তাহলে সেখানে এক ধরনের শ্রবণ-কথন সম্পন্ন হয়।
কিন্তু এ শ্রবণ-কথনের মান ও পদ্ধতি নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে। যেহেতু শ্রেণীকক্ষের এ লক্ষ্যহীন শ্রবণ-কথনের কোনো মূল্যায়ন ব্যবস্থা নেই, সেহেতু শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা এ বিষয়ে কোনো আগ্রহ দেখান না। আমি নিজের গবেষণায় দেখেছি, যেসব বিষয় পরীক্ষায় আসে না বা পরীক্ষার গ্রেড উন্নয়নে ভূমিকা রাখে না, সেসব বিষয় শেখার ব্যাপারে শিক্ষার্থীদের কোনো আগ্রহ থাকে না। অন্য এক গবেষণায় দেখা গেছে, শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার গ্রেড বা ফলাফল তাদের পড়াশোনার জন্য প্রেরণা হিসেবে কাজ করে। যেসব বিষয়ের পাঠ গ্রেড উন্নয়নে ভূমিকা রাখে না, সেসব বিষয়ে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক বা শিক্ষা প্রশাসক—কারোরই কোনো আগ্রহ থাকে না।
আমাদের স্কুল-কলেজের ইংরেজি পাঠ্যক্রমে প্রাথমিক দক্ষতাকে বাদ দিয়ে দ্বিতীয় পর্যায়ের দক্ষতাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এটা অনেকটা ভবনের ফাউন্ডেশন তৈরি করার আগে ছাদ ঢালাই দেয়ার মতো। ফলাফল যা হওয়ার, তা-ই হয়। খুব নগণ্যসংখ্যক ব্যতিক্রমী শিক্ষার্থী ভাষাটা যথার্থভাবে শিখতে পারেন। কিন্তু এ নগণ্যসংখ্যক ব্যতিক্রমী শিক্ষার্থী দিয়ে তো দেশ পরিবর্তন করা যাবে না। আমাদেরকে সেই পন্থা অবলম্বন করতে হবে যা সবার জন্য সহজ, কার্যকর ও উপকারী।
এসব কারণে ইংরেজি পাঠ্যক্রমে পঠন ও লিখনের আগে শ্রবণ ও কথনকে অন্তর্ভুক্ত না করলে আমাদের ইংরেজি শেখা কখনই পূর্ণরূপ পাবে না। এখন প্রশ্ন হলো, আমরা যদি ইংরেজি ভাষার প্রাথমিক ভাষিক দক্ষতাকে আমাদের পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করতে চাই, তাহলে সেটা কখন করব? এ প্রশ্নের উত্তর দেয়ার আগে তিনটি বাস্তব ঘটনার কথা বলতে চাই।
যশোর সদর উপজেলার বেলেরমাঠ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষিকা শিশুদেরকে শতচেষ্টা করেও ‘জন্মদিন’ এবং ‘উৎসব’ শব্দ দুটির সঠিক বাংলা উচ্চারণ শেখাতে পারছেন না। তিনি শব্দ দুটো ভেঙে ভেঙে শেখাচ্ছেন ‘জনমো...দিন’। বাচ্চারা ঠিকই ‘জন্মদিন’ শব্দটাকে ভেঙে ভেঙে উচ্চারণ করছে ‘জনমো’...‘দিন’। কিন্তু যখনই ‘জন্মদিন’ শব্দটাকে একটি একক শব্দ হিসেবে উচ্চারণ করতে বলা হচ্ছে, তখনই শিশুরা বলছে ‘জরমোদিন’। একইভাবে বারবার শেখানো সত্ত্বেও তারা ‘উৎসব’ শব্দটার উচ্চারণ করছে ‘উশ্শব’। শিশুরা তাদের পরিবার ও প্রতিবেশীদের কাছ থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে শেখা ভুল উচ্চারণ থেকে আর বেরিয়ে আসতে পারছে না।
২০১৭ সালের দিকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এসে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন ড. জাকির হোসেন। তার দুই ছেলেরই জন্ম যুক্তরাষ্ট্রে। ছেলে দুটির ইংরেজি বলার ধরন শতভাগ নেটিভ আমেরিকানদের মতো। ড. জাকির হোসেন ও তার স্ত্রী খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট। তারা দীর্ঘদিন আমেরিকানদের সঙ্গে আমেরিকায় চাকরি করেছেন। কিন্তু তাদের ইংরেজি বলার ও লেখার ধরন আর দশজন শিক্ষিত বাঙালির মতো।
আমার এক আত্মীয় বছর দুয়েক আগে সপরিবারে লন্ডনে গেছেন। সঙ্গে যাওয়া শিশু ছেলেটি এখন ব্রিটিশ শিশুদের মতো ইংরেজি বলে। কিন্তু শিশুটির মা-বাবা বাংলাদেশে লেখাপড়া শিখেছেন। লন্ডনে যাওয়ার পর তাদের ইংরেজিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসেনি, যেমনটা এসেছে তাদের ছেলের ইংরেজিতে।
প্রথম ঘটনা থেকে সহজেই বোঝা যায়, শৈশবে যেটা শেখা হয়, তার ভিত্তি হয় শক্ত—হোক সেটা ভুল বা শুদ্ধ। ফলে শৈশবে সঠিক শিক্ষাদান অত্যন্ত জরুরি। আবার দ্বিতীয় এবং তৃতীয় ঘটনায় দেখা যাচ্ছে, সঠিক, দ্রুত, স্থায়ী ও কার্যকরভাবে ভাষা শেখার সক্ষমতা বয়স্কদের থেকে শিশুদের বেশি। এটা শুধু আমার পর্যবেক্ষণে প্রাপ্ত তথ্য নয়। বিশ্বের বহু গবেষক অনেক আগেই প্রমাণ করেছেন যে শৈশবে ভাষা শেখা দ্রুত, স্থায়ী ও কার্যকর হয়।
ফলে শিশুদের উপযোগী ইংরেজি ভাষায় শ্রবণ-কথনের পাঠ প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই শুরু করতে হবে। সম্ভব হলে শিশু শ্রেণী থেকেই। তারপর ধীরে ধীরে পঠন ও লিখন শুরু হবে, যেমনটা হয় আমাদের মাতৃভাষা শেখার ক্ষেত্রে। পঠন-লিখনের ন্যায় শ্রবণ-কথনকেও মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় আনতে হবে। শ্রবণ-কথন শেখানোর জন্য অডিও টেক্সট ও শিক্ষা উপকরণ হতে হবে চিত্তাকর্ষক, শিশুতোষ, বয়স ও সক্ষমতা অনুযায়ী উপযুক্ত।
এভাবে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই শিশুদের সঠিক পদ্ধতিতে সঠিক ইংরেজি শেখার ভিত্তি রচনা করতে হবে। কিন্তু কে সেই ভিত্তি রচনা করবে? শিশুকে ইংরেজি শেখানোর আগে অবশ্যই শিক্ষককে শ্রবণ, কথন, পঠন, লিখনে দক্ষ হতে হবে। কিন্তু আমাদের হাইস্কুল ও কলেজ পর্যায়েও এরূপ দক্ষ শিক্ষকের সংখ্যা খুবই কম। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এ সংকট আরো প্রকট। তাহলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ইংরেজি কে শেখাবেন? ইংরেজি ভাষায় দক্ষ একজন গ্র্যাজুয়েট অনায়াসে ৪০-৫০ হাজার টাকা বেতনের চাকরি পেতে পারেন। তাহলে তিনি কেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১১ হাজার টাকা বেতনের চাকরি করতে আসবেন? প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ইংরেজিতে দক্ষ শিক্ষকের সংকট দূর করতে হলে আগে এ সমস্যার সমাধান করতে হবে।
শিশুদের জন্য প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ইংরেজি ভাষায় দক্ষ শিক্ষক নিয়োগের জন্য ৪০-৫০ হাজার টাকা বেতন দিলে ‘আইইএলটিএস’-এ ভালো স্কোর করা অথবা ইংরেজি বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রিধারী দক্ষ গ্র্যাজুয়েটরাও প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিতে আগ্রহী হবেন। এর সঙ্গে প্রতিটি বিদ্যালয়ে ন্যূনতম একটা মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম তৈরি করতে হবে যেখানে ইংরেজিসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ক্লাসগুলো অনুষ্ঠিত হবে।
কিন্তু সরকার কেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ এবং মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম তৈরিতে এত টাকা ব্যয় করবেন? সরকারকে এ খাতে ব্যয় করতে হবে। কারণ শিক্ষা খাতে ব্যয় জাতির জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ বিনিয়োগ। দেশ-বিদেশের নানা ক্ষেত্রে অন্যান্য সফট স্কিলের সঙ্গে ইংরেজি ভাষায় দক্ষ গ্র্যাজুয়েটদের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। ফলে ইংরেজি ভাষায় দক্ষ জনগোষ্ঠীর সামনে অনেক সম্ভাবনার দুয়ার খুলে যাবে। দেশের জন্য মূল্যবান মানবসম্পদ তৈরি হবে। দেশের কোটি কোটি শিশুর উন্নত ভবিষ্যৎ নির্মিত হলে দেশের ভিত্তি শক্ত হবে। তাই এ খাতে বিনিয়োগের রিটার্ন বহুগুণে জাতি ফেরত পাবে।
ড. মো. মুনিবুর রহমান: সহযোগী অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়