বড়দের রাজনীতি ও অর্থনীতি

অর্থনীতিতে বিশ্লেষণ পদ্ধতি ও ব্যক্তি বিশ্লেষকের মতাদর্শ

এ পর্যন্ত গবেষণার লক্ষ্য সম্পর্কে আলোচনা থেকে আমরা নিম্নোক্ত সারসংকলনে উপনীত হতে পারি: গবেষণা থেকে গবেষক নামক ব্যক্তি বিশেষকে বিচ্ছিন্ন করলে, অনেকটা সংজ্ঞাগত কারণেই গবেষণার প্রাথমিক লক্ষ্য হলো সত্যানুসন্ধান। জ্ঞান তত্ত্বের আলোকে এ সত্যানুসন্ধানকে আমি কর্মপন্থা নির্ধারণের নিমিত্ত হিসেবে গণ্য করছি। কিন্তু সময় ও

[গতকালের পর]

পর্যন্ত গবেষণার লক্ষ্য সম্পর্কে আলোচনা থেকে আমরা নিম্নোক্ত সারসংকলনে উপনীত হতে পারি: গবেষণা থেকে গবেষক নামক ব্যক্তি বিশেষকে বিচ্ছিন্ন করলে, অনেকটা সংজ্ঞাগত কারণেই গবেষণার প্রাথমিক লক্ষ্য হলো সত্যানুসন্ধান। জ্ঞান তত্ত্বের আলোকে সত্যানুসন্ধানকে আমি কর্মপন্থা নির্ধারণের নিমিত্ত হিসেবে গণ্য করছি। কিন্তু সময় যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অনুসন্ধানকারী প্রয়োগকারীর মাঝে পার্থক্য ঘটায় গবেষণার চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জনে গবেষকের কোনো হাত নেই। কেবল গবেষণার বিষয় নির্বাচনের মাধ্যমেই গবেষণাকর্মকে বিশেষ কোনো লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক হিসেবে উপযোগী করে তোলা সম্ভব। এখানেই ব্যক্তি গবেষকের উদ্ভব। অনুসন্ধান প্রয়োগের পৃথককরণ প্রক্রিয়ায় গবেষকদের দক্ষ মজুরে রূপান্তর জড়িত। এবং সেই সঙ্গে ব্যক্তি গবেষকের অন্তরে ব্যক্তি সমাজ মানসের সংঘাত। যেখানে ব্যক্তি প্রাধান্য পায়, গবেষণার লক্ষ্য নির্ধারণ হয় বাজারের চাহিদা অনুযায়ী, যা প্রধানত বৈদেশিক ঋণ/অনুদান দিয়ে প্রভাবান্বিত।

লক্ষ্য আলোচনাকালে আমরা মাঝেমধ্যে পদ্ধতির উল্লেখ করেছি। এমনকি নির্দিষ্ট বিষয়ের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে আমরা কোনো না কোনো পদ্ধতি অবলম্বন করেছি। তবে লক্ষ্যের আদর্শভিত্তিক শ্রেণীবিভাজনের ক্ষেত্রে বিষয় নির্বাচনের ওপর অধিকতর গুরুত্ব দিয়েছি, যা ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। অনেকের মাঝেই রেওয়াজ আছে, মার্ক্সীয় অর্থনীতির বিপরীতে নিও-ক্ল্যাসিক্যাল (নব্য-ধ্রুপদী) অর্থনীতিকে বুর্জোয়া আদর্শভিত্তিক হিসেবে চিহ্নিত করার। ব্যাখ্যা গ্রহণ করলে পূর্বে উল্লিখিত গবেষণাকর্মের বিষয়ভিত্তিক বিভাজনকে অযৌক্তিক গণ্য করা হয়। অর্থাৎ অনুমান করা হতে পারে যে প্রতিটি বিষয়ের ওপর উভয় ধরনের গবেষণা পদ্ধতি প্রযোজ্য, এবং নিও-ক্ল্যাসিক্যাল অর্থনীতি প্রদত্ত কাঠামো সেসব ক্ষেত্রে বুর্জোয়া আদর্শ প্রতিষ্ঠায় নিয়োজিত। ভিন্নভাবে বললে, ওই বিশ্লেষণ পদ্ধতি প্রয়োগ থেকে প্রাপ্ত ফলাফল বুর্জোয়াদের পক্ষে যায়। অথচ বহুদিন আগে পোলিশ, মার্ক্সবাদী অস্কার ল্যাং নিম্নোক্ত মন্তব্য করেছিলেন:

কিছু কিছু সমস্যার সম্মুখে মার্ক্সীয় অর্থনীতি বেশ অসহায়। অথচ বুর্জোয়া অর্থনীতি সহজেই সেসবের সমাধান দেয়। যেমন একচেটিয়া বাজারে দাম নির্ধারণ, অর্থ ঋণতত্ত্বের প্রাথমিক সমস্যা, করভার, মজুরির ওপর নতুন প্রযুক্তি প্রয়োগের প্রভাব, ইত্যাদি।

নিতান্ত পরিতাপের বিষয় হলেও আজও উক্তি সত্য রয়ে গেছে। [তবে সময়ের বিবর্তনে সব বিশ্লেষণ-কাঠামোতে পরিবর্তন এসেছে, বিশেষত অনুমানগুলো বাস্তবসম্মত করার ক্ষেত্রে, যা ১৯৮০ সালের পর থেকে ক্রমাগত ঘটছে।]

সাধারণত নিও-ক্ল্যাসিক্যাল অর্থনীতিকে দুটি প্রেক্ষিতে এর সমালোচকরা দেখেনএর আংশিক ভারসম বিশ্লেষণ এবং পূর্ণ ভারসম বিশ্লেষণ। কেমব্রিজ বিতর্ক (১৯৫০-এর দশকে) নিও-ক্ল্যাসিক্যাল আংশিক ভারসম বিশ্লেষণে যুক্তির অসংগতি দেখাতে পারলেও সে জাতীয় কোনো ত্রুটি দ্বিতীয়টির ক্ষেত্রে দেখানো সম্ভব হয়নি। [ প্রেক্ষাপট আজ বিস্মৃতপ্রায়।] আমি অবশ্য ভিন্ন প্রেক্ষিত থেকে বিষয়টি উপস্থাপন করার পক্ষে। নিও-ক্ল্যাসিক্যাল অর্থনীতির নিজস্ব কিছু বিশ্লেষণ পদ্ধতি রয়েছে, যা পরবর্তী ধাপেমুক্তবাজার অর্থনীতিরউত্কৃষ্টতা স্থাপনে ব্যবহার করা হয়। দ্বিতীয়টিকে যেহেতু প্রথমটির ফলাফল [অথবা প্রথমটিকে মুক্তবাজারের যৌক্তিক ভিত্তি] হিসেবে দেখা হয়, স্বভাবতই প্রথমটিকে [মার্ক্সবাদীদের মাঝে] বুর্জোয়া বিশ্লেষণ পদ্ধতি হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা রয়েছে। সাধারণভাবে পদ্ধতির বৈশিষ্ট্যগুলো নিম্নরূপ:

) বিশ্লেষণের কেন্দ্রবিন্দু হলো ব্যক্তি অথবা অণু আকারের কারখানা (ফার্ম)

) সহজ যোগের মাধ্যমে ব্যক্তি থেকে সমগ্র বাজার অথবা সমাজের চিত্রায়ণ।

) () নম্বরে উল্লিখিত ব্যক্তি বা কারখানা মালিকের নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য আছে এবং সে উদ্দেশ্য মেটাতে সে সচেষ্ট। যেমন অনেক বিশ্লেষণে অনুমান করা হয়, এক ব্যক্তি তার মোট আয় অথবা মোট উপযোগিতা সর্বাধিক করতে সচেষ্ট; অথবা একজন কারখানা মালিক তার প্রাপ্ত নিট লাভ সর্বাধিক করতে সচেষ্ট।

) যেকোনো বিশ্লেষণে নির্দিষ্ট সমাধান পেতে হলে প্রতিটি ব্যক্তি বা কারখানা মালিক কিছু সীমাবদ্ধতার মাঝে তাদের উদ্দেশ্য চরিতার্থে সচেষ্ট। সাধারণত প্রথম ক্ষেত্রে ব্যক্তির প্রাথমিক সম্পদ-মালিকানা এবং দ্বিতীয় ক্ষেত্রে বাজারের চাহিদা দ্রব্য উৎপাদনের খরচ দিয়ে সীমাবদ্ধতা নির্ধারণ হয়।

স্থিতি-বিশ্লেষণ থেকে চলমান বিশ্লেষণের পার্থক্য এখানেই যে দ্বিতীয় ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতাকে নির্দিষ্টভাবে [পূর্বনির্ধারিতভাবে] পরিবর্তনশীল হিসেবে গণ্য করা হয়। তবে পরিবর্তনের মাত্রা প্রাথমিক সম্পদ সম্ভারের [ বিন্যাসের] ওপরই নির্ভরশীল।

ব্যক্তিভিত্তিক হোক অথবা বৃহত্তর কোনো গণ্ডিভিত্তিক হোক, অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে ব্যবহূত মডেলে উল্লিখিত চতুর্থ উপাদানটি অন্তর্ভুক্ত থাকে। যেমন মূলধারা অর্থনীতির পাঠ্যপুস্তকের কনজিউমার থিউরিতে (ভোক্তা তত্ত্বে) আমরা ব্যক্তির আয় সীমাবদ্ধতা লক্ষ করি, যা নির্দিষ্ট দামের পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন দ্রব্যের মিশ্রণে সর্বোচ্চ প্রাপ্যতা বেঁধে দেয় ( নং উপাদান দ্রষ্টব্য) নির্দিষ্ট সমাধান পাওয়ার জন্য মূলধারা অর্থনীতিতে উল্লিখিত তৃতীয় উপাদানটি অন্তর্ভুক্ত করা হয়। পাশাপাশি স্রাফা প্রদত্ত বিশ্লেষণ কাঠামো তুলনা করা যেতে পারে। সেখানে বিরাজমান প্রযুক্তিগত সম্পর্ক থেকে মজুরি-মুনাফা রেখা নির্ণয় করা হচ্ছে। সীমিত অর্থে এটি ব্যক্তিপরিসরের ন্যায় সমগ্র অর্থনীতির পরিসরে এক ধরনের সীমাবদ্ধতা (উল্লিখিত চতুর্থ উপাদান) তবে নির্দিষ্ট সমাধান অর্জিত হয় সমাজের দুই শ্রেণীর ভেতরকার দরকষাকষিতে। একইভাবে পুঁজি গ্রহণের দ্বিতীয় খণ্ডে মার্ক্স বর্ণিত মডেল উল্লেখযোগ্য। সেখানে বাজারজাতের সমস্যা এড়িয়ে গেলে প্রযুক্তিগত সম্পর্ক পুনরুৎপাদনের প্রাথমিক শর্ত বেঁধে দেয়। পরবর্তী সময়ে নিরবচ্ছিন্ন পুনরুৎপাদনের জন্য চাহিদা সম্পর্কে কিছু অনুমান আবশ্যিক। আরো পরে, পুঁজির তৃতীয় খণ্ডে মূল্য থেকে দামে রূপান্তরের ক্ষেত্রে সম মুনাফার হার শর্তটি আরোপ করতে হয়েছিল।

উল্লিখিত আলোচনা থেকে আমরা দুটি সাধারণ ধারণায় উপনীত হতে পারি

. অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে ব্যবহূত যেকোনো মডেলে কিছু সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করা হয় এবং নির্দিষ্ট সমাধান পেতে হলে বাইরে থেকে কোনো শর্ত আরোপ আবশ্যিক।

. একবার গবেষণার বিষয়বস্তু স্থির করা হলে সেটাই নির্ধারণ করছে কী ধরনের বিমূর্ত ধারণাগুলো বিশ্লেষণ কাঠামোয় অন্তর্ভুক্ত হবে এবং কী জাতীয় বিশ্লেষণ পদ্ধতি ব্যবহার করতে হবে।

পূর্বে উল্লিখিত নিও-ক্ল্যাসিক্যাল অর্থনীতির বৈশিষ্ট্যগুলোর তৃতীয় চতুর্থ উপাদান সাধারণভাবে প্রতিটি অর্থনীতির মডেলে রয়েছে। কর্মক্ষেত্রের ক্ষুদ্র পরিসরের কারণেই ব্যক্তি বা অণু আকারের কারখানা বিশ্লেষণে স্থান পায়।

দ্বিতীয় উপাদানটি, যা ক্ষুদ্র পরিসরের বিশ্লেষণ সামষ্টিক বিশ্লেষণের যোগসূত্র হিসেবে গণ্য করা হয়, সে পদ্ধতির কার্যকারিতা সম্পর্কে মূলধারা অর্থনীতিতেই শঙ্কা রয়েছে। খোদ নিও-ক্ল্যাসিক্যাল অর্থনীতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ বিমূর্ত ধারণাগুলো দিয়ে যে কেইনসীয় অর্থনীতি গড়ে উঠেছে, তার যথার্থ ক্ষুদ্র পরিসরের ভিত্তি নেই বলেই আজ (১৯৮০-এর দশকে) পশ্চিমা অর্থনীতিবিদরা অনুধাবন করছেন। ঠিক একইভাবে অস্কার ল্যাংয়ের ক্ষেদোক্তির কারণ মার্ক্স বা স্রাফা প্রদত্ত মডেলের সঙ্গে ক্ষুদ্র পরিসরে বিশ্লেষণের যোগসূত্রের অভাব। অর্থনীতির তত্ত্ব ক্ষেত্রে সংকট অনুধাবন আবশ্যিক এবং কেবল নিখাদ অর্থনীতির পরিসরে সংকট নিরসন সম্ভব কিনা তা ভেবে দেখা প্রয়োজন। [শেষ]

[উল্লেখ্য, ১৯৮০-এর দশকে তথাকথিত মাইক্রো ফাউন্ডেশন অব ম্যাক্রো ইকোনমিকস খোঁজার হিড়িক পড়েছিল। পরবর্তী একটি পর্বে আমি মূলধারা অর্থনীতিতে সামষ্টিক অর্থনীতির আলোচনার সংকীর্ণতা উদ্ঘাটনে সচেষ্ট হব এবং ব্যষ্টিকভিত্তিক সামষ্টিক বিশ্লেষণ-কাঠামোর বিকল্প প্রস্তাব দেব।]

[যে সময় নিবন্ধটি প্রকাশ পেয়েছিল, লেখক তখন টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডির ছাত্র এবং বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত

 

. সাজ্জাদ জহির: অর্থনীতিবিদ, নির্বাহী পরিচালক, ইকোনমিক রিসার্চ গ্রুপ (ইআরজি)

আরও